
রেজাউর রহমান: আমরা তখন উত্তর শাহজাহানপুর থাকি! চারিদিকে শুধু খালি মাঠ আর অনাবাদী জমি। খেলার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ। স্কুল বন্ধ, কোন পড়াশোনা নেই। শুধু খেলা আর খেলা। ঢাকায় যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব, মনে হয় একটা নির্বাচন হয়ে গেছে ঠিক মনে করতে পারছি না। তবে আমাদের বাসার সামনেই আব্বা আওয়ামী লীগের একটা ক্যাম্প করেছিলেন, আর বাসায় করেছিলেন মহিলাদের ভোট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র; বড় দু’বোন চতুর্থ আর পঞ্চম শ্রেণী পাশ করে বসে আছে, হাতে অখণ্ড অবসর, ওঁরাই প্রশিক্ষক।
ক্যাম্পে অনেক বক্তৃতা হত। চারদিকে সাজ সাজ রব। বেগম মুজিব আসবেন, মহিলাদের মধ্যে বক্তৃতা দেবেন। পাড়ার এক চাচার বাসায় অনুষ্ঠান হবে। তবে শুধু মহিলারা যাবেন। তা যাক, আমি বাইরে ৬ দফা পড়ে ঘোরাঘুরি করবো। অনুষ্ঠান কি হলো কিছুই বুঝলাম না। কিন্তু পরদিন সকালে ইত্তেফাক নিয়ে হামলে পরলাম মিটিং আর আম্মার ছবি দেখতে। হাল্কার ভিতরে ঝাপ্সা মনে পড়ে, আব্বার সাথে ৫ ও ৬ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দি উদ্যান) আওয়ামী লীগ এর মিটিং–এ গিয়েছিলাম।
চারিদিকে শুধু সাদা পাঞ্জাবি আর মুজিব কোট। লম্বা লম্বা মিটিং আর বক্তৃতা– কত দিনে শেষ হয়েছিল আল্লাহ মালুম। একদিন আব্বার সাথে নৌকা মার্কা একটা মঞ্চে এক সিঁড়ি দিয়ে উঠে অন্য সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেছি, মঞ্চের মাঝে বঙ্গবন্ধুর সাথে করমর্দন। আমার মনে হয় কাউন্সিলের কিছু কিছু আলোচনা নটরডেমের উল্টো দিকে হোটেল ইডেনেও হতো। কাঊন্সিলের সবচেয়ে গুরুত্ব পূর্ণ দিন ৭ই মার্চ। ওই দিন সারা দেশ থেকে সব নেতা কর্মী আসবেন। অনেক ভীড় হবে। বাচ্চাদের যাওয়া নিষেধ। অন্য দিনের মত আজ আর আব্বা আমাকে কাউন্সিলে নিলেন না।
হাজীগঞ্জ আর চাঁদপুর থেকে আসা নেতারা আমাদের বাসায় উঠলেন। তারপর যাবেন রেসকোর্স। আম্মাকে পটিয়ে ঠিকই চলে গেলাম চাচাদের সাথে। ভাষণ শুরু হতে দেরি আছে। বুকে ৬ দফা কোটপিন লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। এক চাচা বললেন, তোমরা ছাত্র, তোমাদের হল ১১ দফা। কি আর করা আবার কিনো কোট পিন, এক আনা (ছয় পয়সা) পানিতে গেলো। বাসাবোর হাকিম ভাইয়ের খেলাঘর থেকে প্লে গ্রুপের খেলাধুলা শেষ করে, শাহজাহানপুর সরকারি প্রাইমারি স্কুলে মাত্র একদিন ঢু মেরে, শান্তিবাগ স্কুলে সরাসরি ক্লাস টুতে ভর্তি হয়ে গেলাম। সবে দ্বিতীয় শ্রেণি পাশ করেছি। চারিদিকে যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। যুদ্ধে যাবো, খেলনা বন্ধুক নিয়ে তৈরী… এমন সময় ভর্তি হতে হল মতিঝিল সেন্ট্রাল গভর্ণমেন্ট প্রাইমারী স্কুলে। খেলাধুলা কমে এলো। বই-পত্র গোছগাছ শুরু হবে হবে। এদিকে আরবি হুজুরের অত্যাচার ক্রমশই বাড়ছে। এমন সময় এসে গেলো সুখবর, খালার (বড় ভাগ্নি) বিয়ে। আল্লাহ বোধ হয় এবার একটু মুখ তুলে তাকালেন। শুরু হলো লাগাতার আনন্দ অনুষ্ঠান।
মার্চ মাস। চারদিকে থমথমে পরিবেশ। কিছুদিন আগেই বাসার ছাদে ৯/১০ ইঞ্চি ইট তুলে রাখা হয়েছে। শুনেছি, বিহারিদের সাথে আমাদের অনেক মারামারি হবে। বুঝলাম না, আমাদের পাশে যে বিহারী খালারা থাকেন তারা অনেক ভাল। আর মাঝে মাঝে আসে কাবুলিওয়ালা। সেতো আরও ভালও। কিশমিশ-আলুবোখারা খেতে দেয়। সামনের বাসায় থাকে আরেক নিরীহ পরিবার। ওদের ইঁদারাটা আমার অনেক পছন্দ।
ইতোমধ্যে বাসার ছাদে উঠে গেলো বাংলাদেশের পতাকা। স্বাধীনতার চূড়ান্ত পর্ব। ফেরার কোন পথ নেই। আইয়ুব-মোনেম ভাই ভাই- এক রশিতে ফাঁসি চাই… পোস্টারে পোস্টারে মহল্লা ভরে গেল।
২৫শে মার্চ খালার বিয়ের রাত। ডেকোরেটরের কাঠের চেয়ারে চিপা খেয়ে মনে হল, আজ কপালে দুঃখ আছে। পথে আবার গাড়ির দরজায় খেলাম হাতে চিপা। রাতে বিয়ে খেয়ে আরামবাগ থেকে ফেরার সময় পথে কি আর্মি জীপ দেখলাম? কি জানি। পথেই মনে হয় ঘুমিয়ে পরেছিলাম! গভীর রাত! চারিদিকে নিকষ কালো, বাইরে প্রচণ্ড শব্দ। কেউ একজন বললো, এটা থ্রি-নট-থ্রি, এটা স্টেইন গান… আরও কতো কি! কিন্তু এরা কারা? আমদের বাসায় এত লোক কেন? আমি তখন সবে ক্লাস টু পাস করে থ্রিতে উঠেছি…
যুদ্ধ শুরু হল। আমরা সপরিবারে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় পালিয়ে বেড়াচ্ছি। কখনও গোয়াল ঘরে, কখনও বা কোন এক স্কুলের বেঞ্চে রাত কাটাচ্ছি। তখন আব্বা প্রায়ই বলতেন, আমাকে যুদ্ধে পাঠিয়ে দিবেন…। দেশ স্বাধীন করতে হবে পাশাপাশি বংশের বাতি অন্তত একজনকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
যুদ্ধের প্রথম দিকে একদিন ঢাকা থেকে নৌকায় করে পালানোর মুখে পিছন থেকে যখন পাকিস্তানি আর্মি আক্রমণ করল, আমাকে আর আমার চাচাতো ভাইদের সত্যি সত্যি নৌকা থেকে নামিয়ে দিয়ে বললেন, যাও গ্রামের ভিতর গিয়ে মুক্তিবাহিনী খুঁজে তাদের সাথে যোগ দাও। ফাঁকিবাজ চাচাত ভাইয়েরা কয়েক ঘণ্টা এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে, নদীর পাড় ধরে আমাদের নৌকা খুঁজে বের করে আমাকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিল।
অনেক কষ্টে ঢাকা থেকে নৌকায়, লঞ্চে, শেষে বাসে করে চাঁদপুরের হাজিগঞ্জে পৌঁছুলাম। কিছুদিন পরে গ্রামে আমাদের পাশের বাড়ীর হিন্দু দাদারা যখন সব ভারতে চলে যায়, ওখানে মুক্তি বাহিনী ক্যাম্প করে। অন্যরা আমাদের বাড়ীতে এসে সকাল বিকাল ট্রেনিং করত। আমি তাদের পিছনে দাঁড়িয়ে ছোটদের একটা গ্রুপ নিয়ে লেফট রাইট করতাম। গ্রামে কয়েকবার যুদ্ধের ভিতর মানে একেবারে গোলাগুলির মাঝে পড়েছিলাম। গোলাগুলি থেকে বাঁচতে বাড়ির দুই মাথায় ছোট দুটো ট্রেঞ্চ খুড়েছিলাম। ট্রেঞ্চ খুড়ে বড় ভাইদের প্রচণ্ড বকা খেয়েছিলাম। ওনাদের ভয় ছিল ট্রেঞ্চ দেখে রাজাকাররা পাকিস্তানিদের খবর দিবে যে এখানে মুক্তি আছে। বাড়ীর পশ্চিম দিকের ট্রেঞ্চটা মুক্তিবাহিনীরা মাটি দিয়ে চাপা দেয়। কিন্তু পূব দিকের ট্রেঞ্চটা পরে এক যুদ্ধের সময় ওনাদের কাজে লেগেছিল। ওটাকেই একটু বড় করে ওখান থেকেই যুদ্ধ করেছিল। পরে অবশ্য আমাকে ছোট একটা ধন্যবাদও দিয়েছিল।
লেখক পরিচিতি: রেজাউর রহমান; চাকুরিজীবী
















Leave a Reply