নিউজের মানুষের ট্রমা ও একটি জরিপ

নাজনীন আখতার তন্বী: আমার প্রায় সময়েই মনে হয়, এই যে এতো শত ঘটনা ঘটে, সাংবাদিক হিসেবে আমরা কেমন থাকি, তা কি কেউ ভাবেন। একজন পাঠক নিউজের ভয়াবহতা বিচার করে তা না পড়ে এড়িয়ে যেতে পারেন। এতে ঘটনার ভয়াবহতা বিন্দুমাত্র না কমলেও তিনি নিজের মনকে বিধ্বস্ত হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারেন। কিন্তু আমরা সাংবাদিকেরা এমন চোখ বন্ধ করে প্রলয় ঠেকাতে পারি না। ঘটনার বীভৎসতায় আমাদের প্রবেশ করতে হয়, একের পর এক স্টোরি করতে হয়, সেই সব সম্পাদনা হয়, প্রকাশ হয়। কোনো পর্যায়েই তা এড়ানোর সুযোগ নেই।

এই যে আমি রান্না প্লাজা কাভার করে আসার পর রাতে ঘুমের মধ্যে ছটফট করলাম, কংক্রিটের জঙ্গল আমার মুখে পড়ে দমবন্ধ করার মতো অনুভূতি তৈরি করল। তাতে কি আমি আর এই স্টোরি করব না বলে এড়িয়ে যেতে পেরেছিলাম। এই যে নিমতলীর আগুনে পোড়া বিয়ে বাড়িটির হাঁড়ি হাঁড়ি খাবার পড়ে থাকার দৃশ্য, একটি ছোট বাচ্চার পুতুল পড়ে থাকতে দেখা, সিঁড়িতে সারি সারি লাশ পড়ে থাকার বর্ননা শুনে আমার ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিল, তাতে কি সেদিনের মতো নিউজ করা থেকে বিরত ছিলাম!

এসব ঘটনা কি পেশাগতদায়িত্ব পালন থেকে আমাদের সাংবাদিকদের দূরে রাখতে পারে! কষ্ট তো আমাদেরও হয়। একটি শিশুকে ধর্ষণ, বীভৎস কায়দায় হত্যার নিউজ করতে গিয়ে আমাদেরও গা কেঁপে ওঠে। কেউ কি ভাবে আমরা কেমন ট্রমা বোধ করি। আমার প্রায়ই এসব মনে হয়।

করোনাকালে প্রথম আলোর বার্তা কক্ষ
ছবি: নায়ার ইকবাল তনয় (নাজনীন আখতার তন্বীর ফেসবুক টাইম লাইন থেকে)

উত্তর কিছুটা দিল রয়টার্স।

কোভিড–১৯ মহামারি নিয়ে নিউজ করা সাংবাদিকদের ট্রমার কথা উঠে এসেছে ছোট্ট সেই জরিপে।

দ্য রয়টার্স ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব জার্নালিজম অ্যান্ড দ্য ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো জুন মাসে আন্তর্জাতিক কয়েকটি গণমাধ্যমের ৭৩ জন সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার নেয়। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা কিছু পর্যায়ের মানসিক সংকটে ভুগছেন।

২৬ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের দুশ্চিন্তা বিষয়ক রোগের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দুশ্চিন্তা, খিটখিটে মেজাজ, অনিদ্রা, অমনোযোগিতা ও অবসাদ।

সাংবাদিকদের প্রায় ১১ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারের উল্লেখযোগ্য লক্ষ্মণ প্রকাশ পাচ্ছে। অনাকাঙ্খিত সব ভাবনা ও কোভিড–১৯ সম্পর্কিত বেদনাদায়ক স্মৃতি ফিরে ফিরে আসছে। ঘটনাগুলো এড়িয়ে যেতে ইচ্ছা করে এবং অপরাধবোধ, ভয়, ক্ষোভ, ভয়াবহতা ও লজ্জার অনুভূতি কাজ করে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, যাদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে, তারা বড় পরিসরে, প্রতিষ্ঠিত নিউজরুমে কাজ করেন এবং অভিজ্ঞ। যদি ছোট মিডিয়ায় জরিপটি চালানো হতো, তাহলে হয়তো আরও গুরুতর সমস্যা পাওয়া যেতো।

একজন সাংবাদিক বলেছেন, ‘আমি অনেক বেশি মানসিক পীড়নের মধ্যে রয়েছি, কারণ আমি পশ্চিমা দেশগুলোর মতো নিজের দেশের মহামারি কাভার করতে পারছি না। নিজেকে কেমন ভণ্ড মনে হয়। কারণ সরকার যা বলছে, আমি শুধু তাই অনুসরণ করে যাচ্ছি। দেশের বাকি অংশে কিভাবে মহামারি সামাল দেওয়া হচ্ছে, তাতেও আলোকপাত করতে পারছি না।’

পশ্চিমা সাংবাদিকেরাও আরেক ধরনের হতাশায় ভুগছেন। তারা স্টোরিগুলো করার সময় এক ধরনের নৈতিক চাপ বোধ করেন, যা তাদের ওপর, তাদের পরিবারের ওপর ও বন্ধুদের ওপর প্রভাব ফেলে।

জাতিগত উত্তেজনা, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং মহামারির গল্পগুলো যা তিনি লিখেন, তা শুধু অন্যের গল্পই নয়, এসব তাঁর নিজেরও গল্প। এরপর সেসব স্টোরি যখন জনগণের বিরুদ্ধাচারণ ও গণমাধ্যম অনাস্থার অবস্থা তৈরি করে তখন হতাশা এবং চাপ বোধ হয়।

৬০ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা মহামারির সময়ে একই সঙ্গে অফিস ও বাড়িতে শ্রম বেশি দিয়েছেন। সাংবাদিকেরা মহামারির এই সময়ে অফিসের সাপোর্টের বিষয়ে নম্বর দিয়েছেন ১০ এ ৬।

লেখক পরিচিতি: নাজনীন আখতার তন্বী; সিনিয়র রিপোর্টার, প্রথম আলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *