৩১ ডিসেম্বর ২০২১ (নিউজ ডেস্ক): করোনা ভাইরাসের রেকর্ড সংক্রমণ আর মৃত্যুর মধ্যেও ২০২১ সাল শেষে বাংলাদেশের অর্থনীতির সূচকগুলো মহামারীর প্রথম বছরের তুলনায় ছিল ইতিবাচক।
অর্থনীতির সব সূচক অবশ্য খেটে খাওয়া মানুষের গল্প সব সময় বলে না। ২০২০ সালে কাজ হারিয়ে যারা সরকারি সহায়তা আর ঋণ করে টিকে ছিলেন, ২০২১ সালে তাদের অনেকে কাজে ফিরেছেন। এর মধ্যে বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়, মধ্যবিত্তের চাল-তেলের অর্থনীতিতে তাই ২০২২ আসছে কঠিন মূর্তি নিয়েই।
পঞ্জিকা বর্ষের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম ও বাড়তি আমদানি ব্যয় নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি খাতের ভাবনা বেড়েছে।
চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় মূল্যস্ফীতির শঙ্কা। আশার কথা, রেমিটেন্সের নিম্নমুখী ধারার মধ্যেও অনেক দেশের চেয়ে প্রবাসী আয়ের ধারা ছিল অব্যাহত।
বিদায়ী বছরের সবচেয়ে বড় সুসংবাদ… বছরের শুরুতেই স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে বাংলাদেশ।
মহামারী আর কঠোর লকডাউনের পথ মাড়িয়ে উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানিসহ বেসরকারি খাতের পাশাপাশি সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও অর্থনীতির সাময়িক জড়তা কাটিয়ে এনেছে গতি। রেকর্ড গড়ে একক মাসের রপ্তানি আয়ও চমক দিয়েছে।
মহামারীর শুরুর ধাক্কায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি নেমে গিয়েছিল ৩ দশমিক ৫১ শতাংশে, যা তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম। পরের ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির হিসাব দেয় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো।
চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ৭ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরেছে। তবে বিশ্ব ব্যাংকের পূর্বাভাসে তা ৬ দশমিক ৪ শতাংশ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রাক্কলনে তা ধরা হয় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ।
উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা
বাংলাদেশের জন্য ২০২১ সালটি শুরু হয়েছে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় নাম লেখানোর মধ্য দিয়ে। ২৬ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি বা ইউএন-সিডিপির বৈঠক থেকে আসে কাঙ্খিত এ ঘোষণা।
বছরের শেষভাগে ২৪ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে রাখার প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। ২০২৬ সাল পর্যন্ত উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পর্যবেক্ষণে থাকবে বাংলাদেশ, এর ভেতরে চলতে থাকবে উন্নয়নের বড় প্রস্তুতিগুলো।
রপ্তানি আয়ে সুবাতাস
মহামারীর কারণে ২০২০ সালে হোঁচট খায় রপ্তানি খাত। এপ্রিল, মে ও জুনে রপ্তানি নেমে গিয়েছিল তলানিতে। জুলাই থেকে আয় কিছুটা বাড়লেও বছর শেষে তা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি।
তবে ২০২১ সালের চিত্রটা একেবারে উল্টো। লকডাউন শেষে পশ্চিমা বাজারগুলোতে পণ্যের চাহিদা বাড়তে শুরু করলে বাংলাদেশের রপ্তানিও গতি পায়। এই পঞ্জিকা বছরে আয় বাড়ার ধারায় ভালোভাবেই ফিরেছে রপ্তানি খাত। এর মধ্যে গত অগাস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে একক মাসে রপ্তানি আয়ে হয় রেকর্ড। বরাবরের মতো তৈরি পোশাকই ছিল রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত।
বেড়েছে আমদানিও
মহামারীকালে লকডাউনের বিধিনিষেধ উঠে যাওয়ার পর চলতি বছরের জুলাইয়ের পর থেকে দেশের আমদানি-রপ্তানি খাত চাঙ্গা হতে থাকে। রপ্তানির ক্রয়াদেশ বাড়ার সাথে তাল মিলিয়ে বাড়তে থাকে আমদানিও।
জুলাই মাসে আমদানি হয়েছে ৪৫৫ কোটি ডলারের পণ্য, যা ২০২০ সালের জুলাইয়ের তুলনায় ৩৪ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৪ হাজার ২১৫ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। যেখানে আগের বছরের প্রথম ১০ মাসে আমদানিতে ব্যয় ছিল তিন হাজার ২৯৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
রেমিটেন্সে ছন্দপতন
বিদায়ী ২০২১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ২ হাজার ৪৪ কোটি ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশীরা। বছরের প্রথম ছয় মাস রেমিটেন্স প্রবাহ ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও জুলাইয়ের পর তা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। তবে এসময়ে সার্বিক প্রবাহ ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ বেড়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এসেছিল এক হাজার ৯৬৮ কোটি ডলার।
রেমিটেন্সের নিম্নগতির মধ্যে অক্টোবরে আসে ১৬৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ কম।
রিজার্ভে ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি
গত বছরের তুলনায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৯ শতাংশ বেড়েছে। এরমধ্যেই বছরের শেষ দিকে এসে রেমিটেন্স প্রবাহ কমেছে। ডলারের দাম এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে আমদানি ব্যয় মেটাতে হয়েছে অন্য বছরের তুলনায় বেশি। এরপরও ২০২০ সালের তুলনায় কিছুটা প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ।
বাংলাদেশে ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে রিজার্ভের মজুদ ছিল ৪৩ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার। অপরদিকে, ২০২১ সালের নভেম্বরে এসে রিজার্ভের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৪৪ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলাল। আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
নিত্যপণ্যের চড়া বাজার
শীতের সবজি বাজারে এলে কাঁচাবাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও সামগ্রিকভাবে চাল, তেলসহ নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় সংসার চালাতে বছরজুড়েই বেগ পেতে হয়েছে সীমিত আয়ের মানুষকে।
কোভিড মহামারীতে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। সবশেষ ডিজেলের দামের ‘রেকর্ড’ বৃদ্ধি আগে থেকে চড়া বাজারে আরও ব্যয় বাড়িয়েছে সবার। বছরের শেষ দিকে জ্বালানি তেল উত্তাপ ছড়ালেও বড় অংশজুড়েই ভুগিয়েছে ভোজ্যতেলের ক্রমাগত দাম বৃদ্ধি। থেমে থেমে চালের দাম বাড়ার বিষয়টিও চাপে রেখেছে ক্রেতাদের।
চিনি, পেঁয়াজ, ডালসহ বছরজুড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি ভুগিয়েছে বেশ।
মূল্যস্ফীতি ‘চোখ রাঙাচ্ছে’
নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দামের মধ্যে খাদ্য বর্হিভূত পণ্য বিশেষ করে তেলের দাম বাড়ার প্রভাব দেখা গেছে সবশেষ মূল্যস্ফীতির হিসেবে। এতে গেল নভেম্বরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৬ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে করোনা ভাইরাস মহামারীর মধ্যে গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে রাখার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। সবশেষ হিসাবে এক বছরের গড় মূল্যস্ফীতি নভেম্বরে ছিল ৫ দশমিক ৪৮, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে একটু বেশি।
এডিপি বাস্তবায়নে পরিবর্তন নেই
সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ের প্রায় পুরোটাই হয়ে থাকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায়। ২০২১-২০২২ অর্থবছরে দুই লাখ ৩৬ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা এডিপি ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে ৪৪ হাজার ৬১ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ১৮ দশমিক ৬১ শতাংশ।
আগের অর্থবছরের চেয়ে ব্যয় বেড়েছে কিছুটা। ২০২০-২১ অর্থবছরে একই সময়ে বাস্তবায়নের হার ছিল ১৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
এতে আগামী পঞ্জিকা বর্ষের প্রথম ছয় মাসে সরকারকে এডিপির ৭১ শতাংশের বেশি অর্থ ব্যয় করার চাপ বরাবরের মতো রয়েই গেল।
রাজস্ব আহরণের চাপ কমেনি
চলতি অর্থবছরের নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে এক লাখ ২৬৭ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে, যা আগের ২০২০-২১ অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি।
সালতামামি/এসকেএম/আরএম
আর্ট নিউজ ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করতে:















Leave a Reply