সম্পর্ক

বোঝাপড়ার দশদিক

0
181

সাখাওয়াত সৈকত: “সম্পর্ক” শব্দটির সাথে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। চিরচেনা এই শব্দটির অর্থ ব্যাপক, এর গুরুত্বও অনেক। যার ব্যাখ্যা করতে গেলে রাত ফুরিয়ে যাবে তবু লেখা শেষ হবে না। এখানে সম্পর্ক বলতে বন্ধু-বান্ধবী, প্রেমিক-প্রেমিকা, স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোনসহ যে কোন ধরনের সম্পর্কের কথাই বলা হয়েছে। যেখানে কতগুলো বিষয় থাকে যা মেনে চলার ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু আমরা মানতে পারি কতজন সেটাই এখন ভেবে দেখার বিষয়। তবে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে গবেষণা করে যতটুকু বুঝেছি একটি সম্পর্ক ভাল রাখতে যেগুলো না মানলেই নয় সেগুলোর মধ্য থেকে ১০ পয়েন্ট উল্লেখ করার চেষ্টা করেছি। অবশ্য এগুলো আমার একান্তই ব্যক্তিগত মতামত। আশাকরি প্রত্যেকের জীবনে এটি কাজে লাগবে-

১। যতটুকু শুনবেন তার চেয়ে বেশি বলবেন না: আজ যদি আপনি অপরজনকে মনযোগ দিয়ে না শোনেন বা মূল্যায়ন না করেন তবে আরেকদিন আপনার কথা সে মনযোগ দিয়ে শুনবেনা। এমনকি আপনাকে মূল্য দিবে না। অন্যের কথা শুনুন। মতামতের মূল্য দিন। তাহলে সে ভবিষ্যতে আপনাকে নতুন কোন কথা বলতে আগ্রহ পাবে।

২। আপনার সিদ্ধান্ত কারো উপরে চাপাবেন না: আপনি যেটাই সিদ্ধান্ত নিবেন সেটাই যে সঠিক হবে কিংবা আপনারটা সবার পছন্দ হবে এমনটি ভাববেন না। অন্যের জায়গায় নিজেকে ভাবুন। বুঝতে পারবেন আপনি কতটা সঠিক। যদি আপনার সিদ্ধান্ত জোর করে অন্যের উপর চাপিয়ে দেন তাহলে একটা সময় দেখবেন সে আপনার প্রতি বিরক্ত হবে।

৩। সবসময় নিজের ভাললাগা/সুখটাকে প্রাধান্য দিবেন না: আপনি অন্যের কথা না ভেবে স্বার্থপরের মত সবসময় নিজের সুখটা কিংবা ভালোটা নিয়ে মগ্ন হবেন না। মাঝে মাঝে একে অপরকে গিফট করুন। সে কি কি পছন্দ করে ভাবুন, আর তা করার চেষ্টা করুন। কারণ অন্যকে সুখী করতে পারাটা নিজের আনন্দের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।

৪। কারো উপর বিরক্ত হবেন না: কারও উপর একটুতেই বিরক্ত হবেন না। কারণ সবার মেধা এক নয়। কম-বেশি বোঝাটা দোষের কিছু নয়। মনে রাখবেন আপনিও কারও চাইতে কম বোঝেন। বিরক্ত হলে পরে আপনাকে সে কোন কথা শেয়ার করতে স্বস্তি পাবে না। বিরক্ত হবেন বলে সে আপনাকে এড়িয়ে চলবে।

৫। অহংকার কিংবা বড়াই করবেন না: নিজের টাকা, সৌন্দর্য্য, মেধা, সামাজিক মর্যাদা নিয়ে কখনও অহংকার করবেন না। কারণ, এটি আপনার সৃষ্টি নয়। চাইলে আল্লাহ আপনার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারেন। মনে রাখবেন, আপনিই যে সেরা তা কিন্তু নয়। আপনার চেয়ে আরও কেউ সেরা আছেন।

৬। একজনের কথা আরেকজনকে বলে বেড়াবেন না: আজ যা আপনি কারও কোন বিষয় নিয়ে অন্য আরেকজনকে বলছেন এটা খুব খারাপ কাজ। এতে আপনি আপনার বন্ধুরই ক্ষতি করলেন না বরং নিজেরই ক্ষতি করলেন। কারণ, আপনি যার সামনে বলছেন সে কিন্তু আপনাকে আর মোটেও ভালভাবে নিবে না। আপনাকে ওজন করে নিলো। এমনকি ভবিষ্যতে তার নিজের কোন বিষয় আপনাকে বলতে আর উপযুক্ত মনে করবে না, এমনকি আস্থাও পাবে না।

৭। কারো থেকে বেশি আশা করবেন না: আপনার সাথে সম্পর্ক আছে তার মানে এই নয় যে সবকিছু ফেলে দিয়ে আপনাকে নিয়েই পড়ে থাকবে। যেটা বলবেন সেটাই শুনবে… এমনটি ভাবা ঠিক হবে না। তারও একটি জগত আছে। নিজস্বতা আছে। এটা আপনাকে বুঝতে হবে। আপনার সবটুকু ভালবাসা দিয়ে তাকে বোঝান। তাকে পুরোটা বোঝার চেষ্টা করুন। স্বাধীনতা দিন। দেখবেন, আপনাকেও সে বুঝবে। প্রত্যাশা কম করুন তাতে, কষ্ট কম পাবেন। আবার প্রত্যাশার চেয়ে প্রাপ্তিটা বেশি হলে তখন যে সুখটা পাবেন সেটাই সবচেয়ে আনন্দের।

৮। ক্ষমা করার মানসিকতা থেকে বিচ্যুত হবেন না: একজন রেগে গেলে অপরজন চুপ থাকুন। ইগোটাকে একদম ঝেড়ে ফেলে সবার আগে সালাম দিয়ে কথা বলার প্রতিযোগিতা করুন। তারপর ঠাণ্ডা মাথায় একে অপরের ভুলটা ধরিয়ে দিন। এরপর সে যদি তার ভুল বুঝতে পারে তবে তাকে ক্ষমা করে দিন। তার ভুলগুলোকে শোধরানোর সুযোগ দিন। যদি দেখেন এটা তার অভ্যাস তবেই তাকে এড়িয়ে চলুন।

৯। কারো দুর্বলতা নিয়ে বারবার খোঁটা দিবেন না: প্রত্যেক মানুষেরই কোনো-না-কোনো দুর্বল পয়েন্ট থাকে। সেই বিষয় নিয়ে যদি একজন আরেকজনকে বারবার খোঁটা দেন তাহলে সে কষ্ট পাবে। তখন সম্পর্কে দূরত্ব বাড়বে। একে অপরের প্রতি সম্মান কমে যাবে। কারণ, একটি ভাল সম্পর্কের প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একে অপরের প্রতি সম্মান থাকা।

১০। অতিরিক্ত সন্দেহ করবেন না: সম্পর্কের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আস্থা ও বিশ্বাস। একজন আরেকজনের প্রতি যদি আস্থা বা বিশ্বাস না থাকে, সন্দেহপ্রবণতা বেশি থাকে তখন সম্পর্কের খুঁটিটা নড়বড়ে হয়ে যায়। আর সন্দেহ করলে একে অপরের জিদটাও বেড়ে যায়। সেজন্যে অতিরিক্ত সন্দেহ করবেন না।

সব শেষ কথা হলো, সম্পর্কের মধ্যে যথেষ্ট পজেটিভ হোন। একে অপরকে ছাড় দিন। ইগো ঝেড়ে ফেলুন। আপনার প্রিয়জনের শুধু ভালটুকু নয়, খারাপটুকুকেও গ্রহণ করতে শিখুন। ভালবাসুন, জীবন সুখ আর সমৃদ্ধিতে ভরে যাবে।

লেখক পরিচিতি: সাখাওয়াত সৈকত; শিক্ষক, কবি ও আবৃত্তিশিল্পী