স্যালুট, হ্যা‌লো বেল‌জিয়াম!

0
387

রাফিজা রহমান: হ্যা‌লো বেল‌জিয়াম free রেল‌টি‌কিট! বেলজবাসী‌কে চাঙ্গা কর‌তে সরকা‌রের এ উপহার!!‌ নিজ দে‌শ ঘুরে দেখা জন্য বেলি‌জিয়া‌ম অরিজিন আর কার্ডধারী সবাইকে ৬ মা‌সে ১২টি রেলটি‌কিট free দেবে এ ঘোষণা এল এ বছরের আগস্ট-সেপ্ট‌েম্বরের দি‌কে। ‌এমন উপহার‌ কে না চায়! প্রায় ২০ লাখ আবেদন পড়ল। আবেদনকারীর কেউ বাদ পড়ল না। সবাই পেল সু‌যোগে‌টি। সবার ঘরেই পৌ‌ছে গেল টি‌কিট।

free! free! Absolutely free!!

‌টিকিট‌টি দি‌য়ে প্রতি মা‌সে মন চায় বেল‌জিয়া‌মের যে কোন জায়গায় ঘুরে আসা যা‌বে। উদ্দেশ্য, বেল‌জবাসী‌কে ঘুর‌তে বের করা। ইউরোপীয়রা ঘুরতে পছন্দ ক‌রে এটা সত্য। তবে শোনা যায় বেলজরা ততো আগ্রহী না; দে‌শের ভেত‌রে আরও না। তাই সরকা‌রের উদ্যোগ, আগে নিজের দেশে ঘুরুন… ত‌বে না ভিন‌দে‌শ। বু‌দ্ধিমান সরকার। সে সা‌থে আন্তরিক, জনবান্ধবও ব‌টে।

সাধুবাদ জানাই উদ্যোগকে।‌ ত‌বে বাধ সাধলো বর্তমান সময়। ‌টি‌কিট হা‌তে! যে‌তে পার‌ছি না। বিশ্বজুড়ে ক‌রোনার দ্বিতীয় তাণ্ডব চল‌ছে। ২০২০-এর ন‌ভেম্বরে এসে তাণ্ডবলীলায় এবার প্রথম স্হান নি‌য়ে‌ছে বেল‌জিয়াম! ছোট দেশ হ‌লে হ‌বে কি? তেজ আছে। রোগ ছড়ানোয় প্রথম! হাহাহা!! ত‌বে প্রতিরোধ করার প্রাণান্ত চেষ্টাও আছে। বারবার লকডাউন চল‌ছে। সম‌য়ের প্রয়োজনে পা‌ল্টে দিচ্ছ‌ে নিয়ম কানুন। পয়লা দফায় লকডাউন ছিল অনেকটা জেলখানার অনুভূ‌তি। এখন তা ঠে‌কে‌ছে খুঁ‌টি গাড়া গরুর ম‌তো। যাক, চল‌ছে চলুক। ভা‌লোর জন্যইতো এত সব।

ত‌বে আমার ভাবনা অন্য জায়গায়। ভাব‌ছি এ‌কটি ক‌রে মাস আসছে আবার চ‌লেও যাচ্ছ‌ে। দু‌টো ক‌রে ছয়‌টি টি‌কিট নষ্ট হচ্ছ‌ে। মন খুব খারাপ। টি‌কি‌টের সদ্ব্যবহার বু‌ঝি আর হলো না।

৭ ন‌ভেম্বর, ২০২০। ‌কি করা যায় ভাব‌ছিলাম।‌ বাইরে সূর্য জে‌গে‌ছে। আলোর ঝিক‌মিক। আবহাওয়া রিপোর্ট দেখলাম। বৃ‌ষ্টি নেই। তাপমাত্রা ১৬ গ্রাড। ঠাণ্ডার সময় ঠাণ্ডা‌তো কিছুটা থাক‌বেই। মন যেন কি চাইছে চাইছে কর‌ছে।

ফেসবুক নাড়‌ছি, গুগ‌লে যাচ্ছ‌ি… হঠাৎ দে‌খি মাই‌কেল মধুসূদন যেমন বলে‌ছেন- ‘জ‌ন্মি‌লে ম‌রি‌তে হ‌বে, অমর কে কোথা ক‌বে’। ম‌নে হলো, ‌ঠিক তাই। ভয় কি‌সে? সাহ‌সে কর‌বো জয়। সবাই যখন ঘর আর হাসপাতাল কর‌ছে, এখন‌তো শহর ফাঁকা। এটাই মোক্ষম সময়। যেমন ভাবনা, তেমনই কাজ।

আমরা তিন মা মে‌য়ে বে‌ড়ি‌য়ে পড়লাম। গন্তব্য অজানা নয়। পূর্ব নির্ব‌াচিত।‌ নিজ শহর থে‌কে ঘন্টা খা‌নে‌কের রেলযাত্রা। শহর‌টির নাম ‘Bruges’ ।

‌আমাদের গন্তব্য… ‘Bruges’

শুরু হোল অভিযান। আমরা তিনজন। সা‌থে আছে চিপস, চক‌লেট আর লেম‌নেড পানীয়। ব্যাস্। ‌রেলগাড়ী‌তে চে‌পে বসলাম। ঘন্টা খা‌নে‌কের পথ। ‌জানালার ধার ধ‌রে বসলাম। মি‌ষ্টি রোদ লাগ‌ছিল গা‌য়ে। ‌ভিটা‌মিন ডি নেয়ার এইতো সময়।

তখন ঘ‌ড়ির কাটায় সকাল ৯টা ২০ বা‌জে। সৌম্যের (আদরের বড় ভাগনা ব‌লে, Bristol ইউনির্ভা‌সিটি অ্যাপার্টমেন্টে সময় পেলে সকালে এ সময়ই ভিটামিন ডি নেই) ভাষায় এটাই ডি নেয়ার উপযুক্ত সময়। এদিকে বড়জন এক নাগাড়ে ক্যামেরায় ক্লিক করে চলেছে। ভেতরের কাঁচের এ পাশ থেকে বাইরে ছুটে চলা গাছ গাছা‌লি আর আকাশে রোদের খেলা থেমে নেই। ছোটজন একাধা‌রে সেলফি তু‌লে চলছে আর বল‌ছে, মাম দেখো রো‌দে চেহারা কি উজ্জ্বল দেখায়। বাংলা‌দে‌শের ম‌তো সব সময় রোদ থাক‌লে কি মজাই না হতো। কথায় কথায় পৌঁছেও গেলাম। মজার কাণ্ড হলো আজকাল টি‌কিট চেক হয় না। ক‌রোনার ভ‌য়ে সবাই তিন হাত দূরে থা‌কে।

নামলাম। এগিয়ে যাচ্ছি। স্টেশন থে‌কে ১০ মি‌নিটের পথ শ‌পিং মল। ২০ মি‌নিট এগু‌লে মূল মা‌র্কেট স্কয়ার। একে ঘি‌রে পু‌রো শহর। চললো খুঁজে দেখা শহর‌টি‌তে কি কি আছে। আসার আগে কিছুটা গ‌বেষণা ক‌রে বে‌রি‌য়ে ছিলাম। তাই অসু‌বিধা হলো না। সত্যি বল‌তে ইউরোপে য‌দি হা‌তে থা‌কে টাউন প্ল্যান আর আধুনিককালের স্মার্ট ফোন উইথ জি‌পিএস তাহ‌লে‌তো কর্ম সাবার। আপনার অজা‌ন্তে টে‌নে নে‌বে পছ‌ন্দের জায়গায়।

ব্যক্তিগতভাবে একা অজানা জায়গায় চল‌তে একটু ভয়ই পাই। আজ পাচ্ছ‌ি না! কারণ, সা‌থে আছে আমার বীর দুই নারী। কন্যারা- অজন্তা আর আদিবা। বীরই বলবো। অনেকগুলো বছর একা আছে এ বি‌দেশ বিভূঁই‌য়ে। পড়‌তে পড়‌তে একজন অনার্স শেষ‌ে মাস্টার্স আর আরেকজন অনার্স শে‌ষের প‌থে। তাই কি বা ভয়। ‌চি‌নে নি‌য়ে‌ছে একা পথচলা। অজানা জায়গা খুঁজে নেয়ার টেক‌নিক শি‌খে‌ছে। আর ‌শি‌খে‌ছে কিভা‌বে নি‌জে‌কে সেফ রে‌খে চল‌তে হয়।

Bruges বেল‌জিয়া‌মের এক‌টি প্রদেশ। ম্যা‌পে এর আকার ডিম্বাকৃ‌তি। ক্যা‌সল, ছোট ছোট পুল, খা‌লের সমা‌রো‌হে এটি উত্ত‌রের ভে‌নিস ব‌লে খ্যাত। জনসংখ্যার দিক থে‌কে বেল‌জিয়া‌মের সপ্তম বড়ো শহর। এবার ব্রুজ নি‌য়ে আমি যা জে‌নে‌ছি তা একটু ব‌লে নেই। তারপর ঘুরে দেখাব কোথায় কি আছে।

শুনুন ত‌বে, নবম শত‌কে জলদস্যুরা (vikings) প্রথম জায়গাটিকে আশ্রয়কেন্দ্র হি‌সে‌বে গ‌ড়ে তোলে। সে সময় স্ক্যান্ডেনেভিয়ান লোকদের আসা যাওয় ছিল অনেক বেশি। আর তাই স্ক্যান্ডেনেভিয়ান শব্দ Brygga মানে harbour বা mooring place অর্থাৎ আশ্রয় বা পোতাশ্রয় থেকে Bruges নামকরণ‌ হয়েছে। zwin নদী‌টির সা‌থে উত্তর সাগরের সংযোগ থাকায় সে সময় থে‌কে Bruges খুব দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ এক‌টি আন্তর্জাতিক ব্যবসা‌য়িক বন্দর হয়ে দাঁড়ায়।

১২ শত‌কের দি‌কে এটি শহর হি‌সে‌বে স্বীকৃ‌তি পায়। Twin নদী‌র কারণে পৃ‌থিবীর বি‌ভিন্ন দেশ থেকে ব্যবসা‌য়িরা কাপড় বেচাকেনা করতে আসতো। তখন এখানকার টেক্সটাইল ব্যবসা রমরমা ছিল। একসময় এখানে গেন্টে তৈরি আন্তর্জাতিকভাবে প্র‌সিদ্ধ কাপড় পাওয়া যেতো ।

১৪ শত‌কে শহর‌টি উত্তর ইউ‌রো‌পের ও‌য়্যার হাউ‌জে প‌রিনত হয়।‌বি‌শেষ ক‌রে ইতা‌লি, জার্মানী, স্পেনের নিজস্ব প্রতিনিধিরা এখা‌নে থাকতেন। ফ‌লে এলাকা‌টি বি‌ভিন্ন ভাষাভা‌ষি লো‌কের দ্বারা ইউ‌রো‌পীয়ান সেন্টা‌রে প‌রিণত হয়। ‌ফ‌লে সে সময় একজোটিক কাপড় পাওয়া যেত।

১৫ শত‌কের দি‌কে এসে শহর‌টি তার সম্পদ হারা‌তে থা‌কে।‌কিছুটা প্রাকৃ‌তিক প‌রিবর্ত‌নের কারণে বন্দর এলাকা‌টি বন্ধ হ‌য়ে যে‌তে থা‌কে। আর Antwerp port-টি গুরুত্ব পেতে থাকে। কাপড়ের প্র‌তিষ্ঠানগুলোর ধস নামে।ত‌বে ধস নাম‌লেও অন্য দিক থে‌কে এগু‌নোর চেষ্টা ক‌রে। গা‌র্মেন্টস নষ্ট হ‌য়ে গে‌লেও এর আর্ট, আর্কিটেকচার ভিন্ন মাত্রা পায়। late gothic church বাড়‌তে থা‌কে। সে সময় নামকরা দুই পেইন্টার Anthony Van Dyck এবং Hans Memling চমৎকার সব কাজ কর‌ছিল যা নতুন আকর্ষণ তৈরী ক‌রে ।

য‌দিও ১৬ শত‌কে শহর‌টির নিজস্ব ক্ষমতা কম‌তে থা‌কে এবং ১৮ শত‌কে এটি দ‌রিদ্রতম শহ‌রে প‌রিণত হয়।

২০ শত‌কের দি‌কে আবার এটি জে‌গে ওঠে। এটি আন্তর্জাতিক টুরিস্টদের কাছে একটি উল্লেখযোগ্য টুরিস্ট স্পট হ‌য়ে দাঁড়ায়। ‌মি‌ডিয়া‌ভেল শৈ‌ল্পিকতার কারণে শহর নতুন জীবন পায়। প‌রি‌চিত হ‌য়ে ওঠে venice of the north হিসেবে। বর্তমা‌নে এটি উত্তর-পূর্ব‌ বেল‌জিয়া‌মের ফ্ল্যা‌মিস অন্ব‌লের রাজধানী। শোনা যায়, এখা‌নে পৃ‌থিবীর সব‌চে‌য়ে আভিজাত্যপূর্ণ লেইস তৈরী হয়। এখানে এক‌টি লেইস সেন্টারও র‌য়ে‌ছে, যা‌তে এর ইতিহাস পাওয়া যা‌বে। ব্যাস এটুকু ইতিহাস এ পর্যন্ত জানলাম।

এবার চলুন ঘুরে যতটা পা‌রি দেখা যাক।‌ সেই তখন রেল ‌স্টেশন থে‌কে নামলাম। কু‌ড়ি মি‌নি‌টে চলে এলাম মার্ক‌‌েট স্কয়ারে। এই চত্বরে নানা সময় নানান ধ‌রনের উৎসবের আয়োজন হয়।‌ Christmas ফেস্টিভ্যাল, ‌বিয়ার ফে‌স্টিভ্যাল; আবার কোন ঋতু‌কে, দিবসকে কেন্দ্র করে চলে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার নানা উৎসব আয়োজন। আমরা খোলা যে স্কয়ারে এসে পৌঁছালাম তা মার্কেট স্কয়ার। মার্কেট স্কোয়ারটি‌কে ঘিরে র‌য়ে‌ছে নানা ধর‌নের রেস্টুরেন্ট, ফু‌লের দোকান, অ্যান‌টিক্স শপ। চত্বরের মাঝ বরাবর উপ‌রে আকাশ ছুয়ে গে‌ছে Belfry টাওয়ার। টাওয়ার‌টি মধ্যযু‌গে এ এলাকার সম্পদ আর স্বাধীনতার প্রতীক হ‌য়ে দাঁড়িয়ে আছে। যে কেউ এটা‌কে উঠে পু‌রো bruges দেখতে পারে। এতে রয়েছে ৩৬৬টি ধাপ। প্রত্যেক ১৫ মি‌নিট পর carillion music বেজে ওঠে।এক সময় এখান থেকে ভিন্ন ঘন্টার আওয়াজে ভিন্ন ভিন্ন বার্তা দেয়া হতো।

‌ঠিক বাঁয়ে প্রা‌দে‌শিক প্রাসাদ। গ‌থিক ডিজাইনের বিল্ডিংটি এখন প‌শ্চি‌ম ফ্ল্যান্ডা‌রের গভর্নরের বাসভবন। স্কয়ারের ঠিক মাঝখানটায় দাঁড়িয়ে আছে jan breydel এবং pieter de coninck দুইজন ঐ‌তিহা‌সিক ব্যক্তিত্বের ভাস্কর্য। ডান দিকে তখনকার কোন ধনবানের দূর্গবাড়ী।

মা‌র্কেট স্কয়া‌রের সা‌থে ক্যাসেল স্কয়ার। এখা‌ন‌ে প্রথম প্রশাস‌নিক, সাম‌রিক ব্যক্তিদের জন্য ক্যা‌সেল গড়া হয়। সেখান থে‌কে জলদস্যু‌দের প্রতিহত করা হতো। এখা‌নে আরও আছে সি‌টি হল, চ্যাম্বার্স। তার সা‌থে বেঞ্চ পাতা আছে। সেখানে বসে আশপাশে নজর বোলাতে বোলাতে পানাহার করা যায়। প্রতি বছর এখান থে‌কে হ‌লি ব্লাড প্রসেশান বের হয়।

এ বিল্ডিংগু‌লোর বে‌শির ভাগ গ‌থিক আর্কিটেকচারে তৈরী। গ‌থিক কালচা‌রের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বাই‌বেল, ছোট ছোট মূর্তি দি‌য়ে দেয়াল ডিজাইন করা হ‌য়ে‌ছে। এ সব উঁচু বি‌ল্ডিংয়ে ছোট জানালা। ভেতরটা গোলাকৃ‌তি। এমনভা‌বে তৈরী যার মধ্য দি‌য়ে ঘরে আলো প্রবেশ কর‌তে পা‌রে।

স্কয়ার ছা‌ড়ি‌য়ে ভেত‌রে ঘুর‌তে ঘুর‌তে দেখলাম বাড়িগু‌লোর পাশ ‌দি‌য়ে গা‌য়ে গা‌য়ে ঘেঁ‌ষে গে‌ছে খাল। লম্বা সরু এসব খাল কেমন যেন নে‌চে‌নে‌চে বেঁকে গে‌ছে। এপার ওপার যাতায়াতের জন্য রয়ে‌ছে ছোট ছোট পুল।

ওভাল আকৃতির Bruges-এ ৪৭০টি ক্যাসেল রয়েছে।এর মধ্যে অন্তত ১০‌টি ক্যাসেল বিশাল আর আভিজাত্যের প্রতিক। এক হাঁটায় দেখে শেষ করা যাবে না শহরকে। তাই পর্যটকদের জন্য রয়েছে সাইকেল। ভাড়া নিয়ে দূর শহরতলীর সৌন্দর্য দেখা যায়। রয়েছে ক্যানেলে ঘুরে বেড়া‌নোর জন্য নৌকা আর ছোট বাষ্পচা‌লিত চাকাওয়ালা জাহাজ। ছোট জাহাজ‌টি পা‌নির উপর ‌দি‌য়ে ঘড়ঘড় ক‌রে চাকা চা‌লি‌য়ে চলছে। মা‌ঝে মা‌ঝে বাষ্প ছ‌ড়ি‌য়ে এনার্জি নি‌য়ে এগোয়।

মা‌ল্টি ভাষাভা‌ষি গাইড ব‌লে চ‌ল‌ছে, কখন কোন প‌থে চলছে। জাহাজ‌টি যখন পা‌নির উপর‌ দি‌য়ে পার হচ্ছ‌িল তার ক্ষা‌ণিক পর পর মাথার ওপরে থাক‌ছে ছোট পুল। অনেকটা ছোট‌বেলা অপেন টু বায়‌স্কোপ খেলার মত লাগ‌ছিল। এবার গা‌য়ে ঠাণ্ডা অনুভব কর‌ছি। হঠাৎ এক রাশ ঠাণ্ডা বরফ শীতল বাতাস পা‌শের জন‌কে টপ‌কে হুড়হুড় ক‌রে আমার কান‌ে ঢু‌কে পড়ায় সারা গা শির‌শির ক‌রে উঠলো। অম‌নি খেয়াল হলো। আরে, আমার শ্বাপু(টু‌পি)টা ফেললাম কোথায়। আসলেই। খালি খা‌লি কি মানুষ ব‌লে ইউরোপের ও‌য়েদা‌রের ঠিক নেই। রোদ দে‌খে উঠলাম আর এখন কিনা এত কনক‌নে ঠাণ্ডা!

শুন‌ছিলাম, পু‌রো শহর জুড়ে ৮০টিরও বে‌শি পুল র‌য়ে‌ছে। যে‌তে যেতে দেখলাম সা‌রি সা‌রি, গা‌য়ে গা‌য়ে ঘেষা বি‌ভিন্ন রং‌য়ের বাড়ী। হালকা বাদামী, ইট কালার, ছাই আর কমলা মেশা‌নো। লাইন দি‌য়ে‌ পিরা‌মিড আকারে মাথা উচিয়ে আছে বাড়ীগু‌লো। ধারগু‌লো খাঁজ কাটা। ম‌নে হচ্ছ‌িল বাড়ীগু‌লো রে‌লের লা‌গোয়া ব‌গির ম‌তো একটা আরেকটার হাত ধরাধ‌রি ক‌রে চল‌ছে।

ক্যা‌নে‌লের পাশ ‌দি‌য়ে সাইকেল চা‌লি‌য়ে আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছ‌ে পুরো প‌রিবার। জাহাজ‌টি শহর ছা‌ড়ি‌য়ে শহরতলী‌তে ভে‌সে গেল। দূর থে‌কে দেখলাম প্রথম windmill…। ১০৭০ সালে গড়া। এখনও এটি একইভাবে কাজ করছে। পর্যটকদের জন্য এ‌টি এখন উন্মুক্ত। এখানটায় একটা মিউ‌জিয়ামও আছে। চাইলে যে কেউ এখানটায় নে‌মে পড়‌তে পা‌রে। জাহাজ‌টি Bruges থেকে Damme পর্যন্ত চ‌লল।‌ নেমে পড়লাম।

ওখান থে‌কে নে‌মে সরু রাস্তা ধ‌রে চললাম। এখা‌নে বেশ ক‌য়েকটা লেক র‌য়ে‌ছে। এসব লেক আর সরু গ‌লি ক্যাসলগু‌লো নি‌য়ে নানা অলৌকিক কল্পকা‌হিনী র‌য়ে‌ছে। এমন‌কি ভৌ‌তিক গল্পও ছ‌ড়ি‌য়ে আছে। ওখানকার Meenawater বলে একটা পার্ক আছে। তাতে আছে একটি স্বচ্ছ পানির বিশাল লেক। শোনা যায়, এক নাবিকের এক সুন্দরী মেয়ে ছিল। নাম মীনা। মেয়েটি ওখানকার tribe এক যুবকের প্রেমে পরে। তার বাবা বিয়ে দিতে রাজী হয়নি। সে পা‌লি‌য়ে এ জায়গায় চ‌লে আসে।‌ এ জায়গাতেই মীনা তার প্রে‌মি‌কের বাহু‌তে মারা যায়। সে থে‌কে লেক‌টির নাম মিনাওয়াটার। আর যে পুল‌টি পা‌ড়ি দি‌য়ে আসে তা lovers পুল বলে প‌রি‌চিত।

এম‌নি ক‌রে হাঁট‌তে হাঁট‌তে হঠাৎ দে‌খি জন ভ্যান আইকের ভাস্কর্যের ঠিক উল্টো দি‌কে চারতলা উঁচু এক‌টি নীল তি‌মি গলা উচিয়ে পা‌নি থে‌কে বে‌রি‌য়ে আসতে চাইছে। কিন্তু এ‌গুতেই দ‌েখলাম, এ সত্যিকারের তি‌মি না। ‌শিল্প স্টু‌ডিওয়াকারের প্লাস্টিকে তৈরী তি‌মি। ‌শিল্পীর প্রতিবাদী সতর্কী কন্ঠ বল‌ছে, তোমরা ম‌নে রেখো ১৫ কোটি টন প্লা‌স্টিক বর্জ্য সাগ‌রে র‌য়ে‌ছে।

দেখতে দেখ‌তে খা‌নিকটা ক্ষি‌ধে পে‌য়ে গে‌ছে। তখন দুপুর আড়াইটা। খাবার দোকান খোলা। ত‌বে ব‌সে খাবার জো নেই। ‌কি আর করা। মে‌য়েরা বলল চল খাবার খে‌তে খে‌তে বাকী জায়গাটুকু দে‌খে‌ নেব। ক্ষি‌ধে আর ঠাণ্ডা বাতা‌সে বেশ শীত অনুভব কর‌ছি। য‌দিও গরম কাপ‌ড়ের কম‌তি ছিল না। ‌তিনজনই ছিলাম প্যাক। হা‌তে মোজা, পা‌য়ে বুট, গা‌য়ে পশমী কা‌লো কোট। গলায় ভারী মাফলার। ‌কিছুই বাদ দেইনি। ক‌রোনায় বাড়‌তি যোগ মাস্ক। কালারফুল মাস্ক। ড্রেসের সা‌থে বেশ ম্যাচ হলো।

ছোট‌ মে‌য়ে বললো, এখানকার ফিঙ্গার টিপস, সস, মায়া‌নেজ আর প‌টে‌টো ক্রো‌কে‌টের নাম আছে। দেরি না ক‌রে তিন বা‌কেট নি‌য়ে নিলাম। ঠাণ্ডায় গরম খাবা‌রের মজাই অন্যরকম। সসে গলি‌য়ে চললো খাবার। থেমে নেই। চল‌তে চল‌তে বা‌কেট প্রায় খা‌লি। আর পারা যাচ্ছ‌ে না। তাই শেষটুকু ফে‌লতে ‌হলো। পা‌শের ক্যা‌ফে থে‌কে ক্যাপু‌চিনু নি‌য়ে ঠাণ্ডা জু‌ড়ি‌য়ে হাঁট‌তে লাগলাম।

স্যু‌ভি‌নিয়রের দোকা‌নে ঢুঁ মারলাম। বিখ্যাত ক্যা‌সেলের এক পিস নিলাম। Bruges লেখা কলম আর বিখ্যাত লেসের ছোট এক টুকরা লাগানো একটা ট্যু‌রিস্ট ব্যাগ কিনলাম। টুরিস্টদের আকৃষ্ট করতে কত কি যে আছে তা আর বলতে! বাকী রইলো চক‌লেট।

Dumon Choclatier কথা শু‌নে‌ছিলাম। হাতে তৈরী মজাদার ক্রি‌মি বেল‌জিয়াম চকলেট এখানে পাওয়া যায়। ঢুকে পড়লাম। এক লেডি এগিয়ে এসে ভেতরে নিয়ে গেলেন। বানিয়ে দেখালেন।‌ সেই সাথে এক টুকরা করে খেতেও দিলেন। মোলায়েম ক্রিম আর অরিজিন্যাল বাদামের টেস্ট। জিহ্বার গোড়ায় গিয়ে লাগলো। আহ কি সুস্বাদু। সাধারণ বাজার থে‌কে কেনাগু‌লোর সা‌থে এর পার্থক্য নি‌মি‌ষে বোঝা গেল। চড়া দাম। তাও ছোট এক প্যা‌কেট কি‌নে নিলাম।

ওখান থে‌কে বে‌রি‌য়ে ফেরার প‌থে চললাম। তখন বেলা সাড়ে ৪টা। খুব দ্রুতই সন্ধ্যা হ‌বে। তাই কিছুটা তাড়াও আছে। এ চলার প‌থে ভারী সুন্দর লাগল আরেকটি খুব সাধারণ জি‌নিস। মা‌ঝে মা‌ঝে অর্বাচীণভাবে ফে‌লে রাখা হ‌য়ে‌ছে একেকটি ছাদ ছাড়া ভাঙা বাড়ী। বাড়ীগু‌লোয় ঝুলা‌নো নানা রং‌য়ের ফুল, হার্ব এর গাছ। শু‌নে‌ছি প্রতিবেশিরা নিজ থে‌কে এগু‌লো লাগায়। এগু‌লো secret garden বলে প‌রি‌চিত। মনে হলো অগোছালো এ সৌন্দর্য পথিককে বার বার এ পথে ফিরিয়ে আনার সফল চেষ্টা।

ফেরার প‌থে মে‌য়ে‌দের বায়না, ঘরে ফিরে আজ ভাত মাছ খাবে না। এখানকার Screams Potatos বিখ্যাত। Potatoes Bar-টি‌র নাম ডাক শুনেছি। এর ফিঙ্গার চিপস আর croquettes খুব বিখ্যাত। নিয়ে নিলাম ৩টি ক্রোকেত। ‌দোকানি বললেন, এর ভেতর আছে স্ম্যাশ eel fish আর asperagus ।নিয়ে সোজা চলে এলাম স্টেশানে। উঠে পড়লাম ট্রেনে।

তর সইছিল না কা‌রোরই। ওদের সা‌থে সা‌থে আমারও। মু‌খে তুলে নিলাম। কামড় দি‌তেই উপ‌রের মুচমু‌চে স্তর ভেদ ক‌রে মু‌খে লাগল মা‌ছের আর অ্যাসপারাগাসের creamy faty টেস্ট। ভারী সুস্বাদু। মুখে লেগে থাকার মত। দ্রুতই যেন শেষ হয়ে গেল। ব্যাগ থেকে লেমোন্যাড দিয়ে শেষ তু‌প্তিটুকু নিলাম। সবাই চাঙা। হা‌সি হা‌সি মুখ। ভালো কাটলো দিনটি। ঘন্টাখানেক বাদে নামলাম নিজ শহ‌রে।

ধন্যবাদ, Hellow Belgium । অল্প খরচে সব স্বাদ পেলাম। ‌কে বলে ছুটে যেতে হবে বহুদূর। ‌দিন বা সপ্তাহ কিম্বা ১০/১২ দিনের জন্যও এখা‌নে ছুটি কাটানো যায় নিশ্চিন্তে। একটুও বির‌ক্তি আসবে না। সব‌শে‌ষে ক‌বি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকু‌রের ভাষায়। বল‌তে ইচ্ছা করছে:

বহু‌দিন ধ‌রে বহু ক্রোশ দূ‌রে / বহু ব্যয় ক‌রি বহু দেশ ঘুরে / দেখিতে গি‌য়ে‌ছি পর্বতমালা / দে‌খি‌তে গি‌য়ে‌ছি সিন্ধু / দেখা হয় নাই চক্ষু মে‌লিয়া / ঘর হই‌তে শুধু দুই পা ফে‌লিয়া / এক‌টি ধা‌নের শী‌ষের উপ‌র / এক‌টি শি‌শির‌বিন্দু ৷৷

লেখক পরিচিতি: রাফিজা রহমান; তথ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা, বর্তমানে বেলজিয়াম প্রবাসী