আলতাফ মাহমুদের শেষ কয়েক ঘণ্টা

(লেখাটা যখনই চোখে আসে, আমি পড়ি, বারবার পড়ি। আমারই লেখা, তারপরও পড়ি। পড়তে পড়তে সাহস আর শক্তি সঞ্চয় করি, করতেই থাকি। সবার জন্য আবারও দিলাম তাই। পড়ুন, বারবার পড়ুন, সাহস আর শক্তি সঞ্চয় করুন, করতেই থাকুন। ক্ষতি নেই তাতে।)

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদের মেয়ে শাওন মাহমুদ তার বাবাকে নিয়ে লিখেছেন ফেসবুকে। প্রতিটি পংক্তিতে জড়িয়ে আবেগ আর ভালবাসা। ইতিহাসের সেই নৃশংস ঘটনা আর্ট নিউজের পাঠকদের জন্য:

“আলতাফ মাহমুদের শেষ কয়েক ঘণ্টা”

২৯ অগাস্ট। ১৯৭১। উদ্ভ্রান্ত, উষ্কখুষ্ক, অশান্ত সারাদিন। ক্র্যাক প্লাটুন এর অনেক গেরিলা যোদ্ধা আজ ধরা পড়েছে। উঠোনে মাটিচাপা দেওয়া অস্ত্রভর্তি ট্রাঙ্কগুলো নিয়ে সবচেয়ে বড় চিন্তা। আগামী অপারেশনে অস্ত্রগুলো কাজে লাগাতে হবে। বাসায় যদি আর্মি রেইড করে তাহলে এগুলোর কি হবে?

সারাদিন কালো মরিস গাড়ি করে কোথায় কোথায় ঘুরেছিল সে, কে জানে! হয়তো বা অস্ত্র রাখবার জন্য নিরাপদ কোন জায়গা খুঁজেছিল। সারাদিন পর রাত ১১ টায় বাড়ি ফিরে আসার পর মা বলেছিল, ভাত দেবো? ভাতপ্রিয় আলতাফের খিদে ছিলনা, একদম না। তাই জবাবে বলেছিল, পেট ভরা, খাবো না। শোবার ঘরে শাওন আর ঝিনু ঘুমিয়ে পরেছিল। সন্তর্পণে সেই ঘরে ঢুকে কি করেছিল আলতাফ? কেউ জানে না। হয়ত বা নির্ঘুম চোখে সারারাত পরিবারের সবাইকে পাহারা দিচ্ছিল, কে জানে!

আজান দেবার পর ৩০ অগাস্ট ভোরবেলার কথা সবার জানা। ঘর ছেড়ে যাবার আগে কখনো ভাবেনি সে, এ জীবনে আর ঘরে ফেরা হবে না। একসাথে ভাত খাওয়া হবে না। কখনও না।

৩৭০ আউটার সার্কুলার রোড থেকে সোজা নাখালপাড়া এমপি হোস্টেল-টর্চার সেল থেকে ইন্টারোগেশন চেম্বার। ক্ষতবিক্ষত আলতাফ পানি চেয়েছিল, তাঁর মুখে পেশাব করেছিল পাকসেনারা। অত্যাচারের পালা শেষ হলে ছোট বাথরুমটায় গাদাগাদি করে ঢুকিয়ে দিতো অনেকের সাথে। একটা পানির কল ছিল, শক্তি ছিল না সেটা ছেড়ে পানি খাওয়ার মত। সাথের সাথীরা একজন অন্যজনের জন্য সাধ্যমত করতো। আজলা ভরে পানি খাইয়েছিল তাদেরই কেউ। রাত ১০টার পর সবাইকে ট্রাকে করে রমনা থানায় পাঠানো হয়। সেখানে সাধারণ কয়েদীরা তাদের ভাগের শুকনো রুটি আর ডাল খেতে দিয়েছিল সে রাতে। সেদিন আর আলতাফের খাওয়া হয়নি, ব্যাথায় কোঁকাতে কোঁকাতে জ্বরের ঘোরে ঘুমিয়ে গিয়েছিল।

পরের দিন আবার সকাল ১০ টায় এমপি হোস্টেল-টর্চার সেল থেকে ইন্টারোগেশন চেম্বার। মুখ খোলাবার জন্য আলতাফকে কয়েক ঘণ্টা পর পর টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এক সময় অধৈর্য্য হয়ে পাকসেনারা তাঁর পা ফ্যানের রডে বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে বেধড়ক পেটায়। আর তখনই হাঁটু, কনুই আর পাঁজর ভাঙ্গে আলতাফের। গরম পানি দিয়ে ঝলসে দিয়েছিল শরীরের বেশীর ভাগ অংশ। ফোঁসকা পরেছিল গায়ে।

সুরের সাধনায় শহীদ আলতাফ মাহমুদ

একটা নাম, শুধু একটা নাম চেয়েছিল ওরা। একেবারেই বেঁকে বসা দীর্ঘদেহী সুঠাম শরীরের আলতাফ মুখ খোলেনি, শেষ পর্যন্ত না। এভাবেই রাত হয়, ১০টায় আবার রমনা থানায় পাঠাবার আগ মুহূর্তে পাকসেনারা ঠিক করে ফেলেছিল কাকে ছাড়বে আর কাকে নয়।

রমনায় বেশ রাতে এক আর্দালি ভাত আর পেঁপে ভাজি খেতে দিয়েছিল কি মনে করে কে জানে। সবাই মিলে ভাগ করে খাবার আগে রক্তাক্ত আলতাফ খোঁড়াতে খোঁড়াতে দেয়াল ধরে হেঁটে হেঁটে গরাদের কাছে গিয়ে ঐ আর্দালিকে বলেছিল, একটা কাঁচা মরিচ হবে ? আর্দালি এনে দিয়েছিল একটা মরিচ।

আরও পড়ুন: বিএনপি এখন মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত অপশক্তির মুখপাত্র

আমি চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই দীর্ঘদেহী আলতাফ নুয়ে পড়ে টিনের থালায় ভাত আর পেঁপে ভাজিতে কাঁচা মরিচ মাখিয়ে লোকমা তুলে তৃপ্তি করে খাচ্ছে। কপালের চামড়া বেয়োনেট এর আঘাতে ঝুলে আছে, প্রচণ্ড জ্বরের ঘোরে খোলা মুখের সামনের পাটির দাঁতগুলো ভাঙ্গা। শেষবারের মত সবাইকে নিয়ে ভাত খাচ্ছে আলতাফ- হাতের আঙ্গুলে জমে থাকা রক্ত দিয়ে সাদা ভাত লাল, সাথে সবুজ কাঁচা মরিচ।

লাল সবুজ পতাকা আমার।

লেখক পরিচিতি: শাওন মাহমুদ; মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদের মেয়ে

http://artnewsbd.com

আর্ট নিউজ ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করতে:

https://www.youtube.com/channel/UCC2oLwZJYHIEygcbPX3OsWQ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *