হাসিব চৌধুরী: বাঙালি জাতির প্রাণের মানুষ, মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মুক্তি যুদ্ধের দীর্ঘ ৯ মাস যিনি বন্দি ছিলেন পাকিস্তানের নির্জন কারাগারে, যে নামটি মুখে নিয়ে লক্ষ মানুষ আত্মহুতি দিয়েছিলো মুক্তির প্রত্যাশায়। সেই বঙ্গবন্ধু নামের প্রাণের মানুষটি ১৯৭২ সালের ৮ই জানুয়ারী পাকিস্তান জেল থেকে মুক্তি পান। একটি বিশেষ বিমানে বঙ্গবন্ধু সকাল সাড়ে ৬টায় পৌঁছেন লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে (সহযাত্রী ছিলেন ডক্টর কামাল হোসেন)।
হোটেল ক্লারিজে ৪ ঘন্টা বিশ্রাম নেন। সকাল ১০টার পর থেকে তিনি টেলিফোনে যোগাযোগ করেন কয়েকজনের সাথে। প্রথমে কথা বলেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীসহ আরও অনেকের সাথে।
এরপর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এওয়ার্ড হিথ তার অফিসিয়াল বাসভবন ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটে বঙ্গবন্ধুকে আমন্ত্রণ জানান। তার আমন্ত্রণে বঙ্গবন্ধু সেখানে যান এবং আলোচনা করেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সাথে। এভাবেই সূচিত হয় উন্নত শক্তিধর রাষ্ট্রের স্বীকৃতি।
১০ নং ডাউনিং স্ট্রিট থেকে বেরিয়ে এসে বঙ্গবন্ধু বলেন, “I have talked to Mr Heath. I have talked to Mr Wilson. And I am happy.”। একই দিন লন্ডনে অবস্থানরত প্রবাসী বাঙালি ও সংবাদিকদের সাথেও সাক্ষাৎ করেন এবং বলেন,
“Today I am free to share the unbounded joy of freedom with my fellow countrymen, who have won their freedom in an epic liberation struggle. The ultimate achievement of this struggle is the creation of an independent, sovereign People’s Republic of Bangladesh, of which my people declared me as their president while I was a prisoner in the condemned cell, awaiting the execution of a sentence for hanging.”
হোটেলের বাইরে অবস্থানরত হাজার হাজার প্রবাসী বাঙালি ও ব্রিটিশ নাগরিক… তারা বঙ্গবন্ধুকে এক নজর দেখার জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষা করছিলেন। বঙ্গবন্ধু হোটেলের জানালায় এসে হাত নেড়ে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা প্রকাশ করেন। ১০ তারিখ সকালে তিনি প্রথমে দিল্লীতে যাত্রা বিরতি করেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, ভারতীয় মন্ত্রিসভা, ভারতীয় নেতারা, ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর তিন প্রধান এবং অন্যান্য অতিথি ও সে দেশের জনগণের কাছ থেকে উষ্ণ সংবর্ধনা লাভ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
ভারতীয় জনগণের অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রতি সম্মান জানাতে ”বঙ্গবন্ধু” ভারতের মাটিতে এক বিশাল জনসভা করেন। তখন উন্মুক্ত মাঠে লাখ লাখ ভারতীয় জনতার মুখে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে উচ্চারিত হচ্ছিলো ‘জয় বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু’। বঙ্গবন্ধু ভারতের জনগণ ও নেতাদের কাছে তাদের ভালোবাসা ও সাহায্যের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সাথে তিনি ইন্দিরা গান্ধীর কাছে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী ফিরিয়ে নেয়ার জন্য অনুরোধ করেন এবং সম্মতি আদায় করেন। যা ছিল বাংলার মুক্তিকামী মানুষের পক্ষে তাৎপর্যময় অনন্য প্রাপ্তি। বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে আখ্যায়িত করা হয়েছিল “অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা”। জননন্দিত বাঙালি জাতীর নয়নের মনি ‘বঙ্গবন্ধু’ জাতির জনক হয়ে ঢাকা এসে পদার্পণ করেন ১০ই জানুয়ারি ১৯৭২ তারিখে।
আমাদের বিজয় হয়েছিল ১৬ই ডিসেম্বর। কিন্তু মানুষের মনে ছিল উৎকণ্ঠা শুধু বঙ্গবন্ধু জন্যে। বঙ্গবন্ধুকে আমরা কি ফিরে পাবো? বঙ্গবন্ধু কি বেঁচে আছেন? কবে আসবেন বঙ্গবন্ধু? কি এক উৎকণ্ঠা। তাঁকে ছাড়া সমস্ত বাঙালি জাতির বিজয়ের আনন্দ কেমন জানি ম্লান হয়ে যাচ্ছিলো। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া… সারা বাংলার মানুষ অপেক্ষায় ছিল শুধুই বঙ্গবন্ধুর জন্যে। কারও পরনে কাপড় নাই, পেটে খাবার নাই। কারও হাত নাই, পা নাই, কারও আপন জনের সন্ধান নাই… সকল কষ্ট, দুঃখ ভুলে বঙ্গবন্ধুকে এক নজর দেখার জন্য কি যে আকুতি তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। অবশেষে জাতির জনক সব জল্পনা কল্পলার অবসান ঘটিয়ে নব্য স্বাধীন বাংলার রাজধানী ঢাকা বিমান বন্দরে অবতরণ করেন। মহানন্দে আত্মহারা আবেগে উদ্বেলিত লাখ লাখ মানুষ আনন্দাশ্রু নিয়ে ঢাকা বিমান বন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান পর্যন্ত তাঁকে স্বতঃস্ফূর্ত সংবর্ধনা জানান।
বিকাল পাঁচটায় রেসকোর্স ময়দানে জাতির পিত বঙ্গবন্ধু নামে এক নুতন সূর্য ১০ লাখেরও বেশি মানুষের উপস্থিতিতে আবেগঘন ভাষণ দেন। হিমালয়সম, জননন্দিত, বাঙালি জাতির প্রাণ প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু মুজিব সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঐতিহাসিক মঞ্চের যেখানে দাঁড়িয়ে তিনি ৭ই মার্চ ১৯৭১ বলেছিলেন ”রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দিবো, এদেশের মানুষ কে মুক্ত করে ছাড়বো ” ইতিহাসের বাস্তবতায়, সেই একই মঞ্চে আবেগঘন বজ্রকণ্ঠে বিজয়ী বেশে শহীদদের প্রতি সশ্রদ্ধ চিত্তে অশ্রু সজল নয়নে তিনি সবার ত্যাগের কথা স্মরণ করেন। বলেন, ‘আমার বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে, আমার জীবনের স্বাদ আজ পূর্ণ হয়েছে। যে মাটিকে আমি এত ভালবাসি, যে মানুষকে আমি এত ভালবাসি, যে জাতিকে আমি এত ভালবাসি, আমি জানতাম না সে বাংলায় আমি ফিরে যেতে পারবো কিনা? আজ আমি বাংলায় ফিরে এসেছি বাংলার ভাইয়েদের কাছে, মায়েদের কাছে, বোনদের কাছে। বাংলাদেশ আজ স্বাধীন সার্ভভৌম, বাংলাদেশ চিরদিন স্বাধীন থাকবে।’
হাজার বছর ধরে নির্যাতিত শত, হাজার, লাখো মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে যে স্বপ্নের আকাঙ্খা ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, ১০ই জানুয়ারির এই দিবসে, মহাকালের সেই সংগ্রামী প্রতিবাদী, স্বাধীনতাকামী তিতুমীর, নূরলদীন, মাস্টার দা সূর্যসেন, ক্ষুদিরামসহ তিরিশ লাখ শহীদের আত্মা এক যোগে আনন্দে আপ্লুত আবেগে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বঙ্গবন্ধুরই কণ্ঠে যেন বলে উঠছে ‘আজ আমার দেশ স্বাধীন, আমি আজ মুক্ত, আমার আত্মত্যাগ বিফলে যায়নি, আমার স্বপ্ন আজ পূরণ হয়েছে।’
লেখক পরিচিতি: হাসিব চৌধুরী; সাধারণ সম্পাদক, সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী সোসাইটি, যুক্তরাজ্য।















Leave a Reply