উদ্বেগজনক হারে কমছে প্রবাহমান নদ-নদীর সংখ্যা

মুহাম্মদ আমিরুল ইসলাম (নয়ন মুরাদ): স্বাধীনতার পর দেশে নদ-নদীর সংখ্যা ছিল ১৩০০টি। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭০০টিতে। এর মধ্যে প্রবাহমান নদীর সংখ্যা সাড়ে তিনশ’র বেশি হবে না। তাই ঢাকার আশপাশ এলাকায় মাত্রাতিরিক্ত দূষণ রোধে জরুরি ভিত্তিতে স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার পাশাপাশি তা ১ থেকে ৫ বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করাও জরুরি। নদী রক্ষায় সরকারের কাছে ১৬ দফা সুপারিশ করেছিলো বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলন।

২০১৮ সালে সংগঠনটি এই সুপারিশ দেওয়ার পর এই মধ্যে পাঁচ বছর প্রায় অতিবাহিত হতে চলেছে। কিন্তু সুপারিশের আলোকে নদ-নদী রক্ষায় সরকার কি ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে তা জনসাধারণের কাছে স্পস্ট নয়। তবে নৗ পরিবহন মন্ত্রণালয়ে নিজস্ব কার্যক্রমের আওতায় কিছু খাল, জলাশয় দখলমুক্ত করলেও সেখানে স্বচ্ছ পানির প্রবাহ আনা সম্ভব হয়নি। অধিকাংশই ময়লার ভাগার। দুর্গন্ধে নাক চেপে পাশ দিয়ে যেতে হয়।

নদী বাঁচাও আন্দোলনের স্বল্পমেয়াদি সুপারিশের মধ্যে ছিলো, নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর-কৃত্রিম লেক, সমুদ্রসৈকতে ইঞ্জিনচালিত নৌকার পোড়া মবিল, তেল, গৃহস্থালি বর্জ্য, হাটবাজার, রাস্তাঘাটের ময়লা-আবর্জনা, প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন ইত্যাদি ফেলা বন্ধ কল্পে আইনগত পদক্ষেপ এবং জনসচেতনতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। নদী সীমানা রক্ষায় স্থায়ী সার্ভে কমিটি গঠন করে তিন মাস অন্তর নদীর পাড় সরেজমিনে পরিদর্শনপূর্বক নৌমন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদফতর ও পরিবেশবাদী সংগঠনের কাছে রিপোর্ট জমা দেওয়া এবং অবৈধ দখল থেকে নদী রক্ষায় দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, ‘নদীকে কেন্দ্র করেই পৃথিবীর ইতিহাস গড়ে উঠেছে। প্রাচীনকাল থেকে নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সভ্যতা। নদী ব্যবসা-বাণিজ্যের দ্বার উন্মোচন করে। এই নদীকে রক্ষা করা সবারই কর্তব্য। নদী আমাদের মা। নদী রক্ষার প্রয়োজনে আর একটা যুদ্ধ করতে হবে। নদী আন্দোলন ব্যর্থ হলে দেশের উন্নয়ন ব্যর্থ হবে।’

স্থানীয় সরকার গবেষকদের মতে, স্থানীয় সরকারের তৃণমূলে রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ। ইউনিয়ন পরিষদের আছে ১০টি বাধ্যতামূলক ও এবং ৩৮টি ঐচ্ছিক কাজ। ইউনিয়ন পরিষদের ১০টি বাধ্যতামূলক কাজের মধ্যে, জনগণের সম্পত্তি যথা-রাস্তা, ব্রিজ, বাঁধ, খাল, টেলিফোন, বিদ্যুৎ ইত্যাদি সংরক্ষণ করা অন্যতম। এ ছাড়া ঐচ্ছিক কাজের মধ্যে আছে, ইউনিয়নের পরিচ্ছন্নতার জন্য নদী, বন, ইত্যাদির তত্ত্বাবধান, স্বাস্থ্যকর ব্যবস্থার উন্নয়ন। সরকার ইউনিয়ন পরিষদকে প্রাকৃতিক জলাশয় রক্ষার জন্য যথেষ্ঠ ক্ষমতা প্রদান করেছে। প্রাকৃতিক জলাশয় বিশেষ করে দেশের খাল-বিলগুলো এক শ্রেণির প্রভাবশালী, ভূমিখোর ও আবাসন ব্যবসায়ীদের ভরাট, দখলের কারণে আশপাশের জনবসতিগুলোয় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। জলাবদ্ধতার কারণে রাস্তাঘাট বিনষ্ট হচ্ছে। ময়লা-আবর্জনা ও পয়োবর্জ্য মিশে দূষিত হচ্ছে পানি ও পরিবেশ। ডায়রিয়া, কলেরা ও জন্ডিসের মতো পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলাবদ্ধতার কারণে সৃষ্ট যাটজটের ফলে সৃষ্টি হচ্ছে মানুষের অবর্ণনীয় সমস্যা। এ ছাড়া এক শ্রেণির অতিলোভী শিল্পপতিরা ইটিপি ব্যবহার বন্ধ রেখে শিল্প-কারখানার তরল বর্জ্য সরাসরি নিক্ষেপ করছে নিকটবর্তী খাল-বিলে। এতে খাল-বিলের পানি দূষিত হয়ে মারা যাচ্ছে মাছ, জলজপ্রাণি ও উদ্ভিদ। বিনষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। এসব খাল-বিলের দূষিত পানি বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে পাশের কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে কৃষিজমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। বিপদে পড়ছে গ্রামের নিরীহ কৃষক। জলাশয় ভরাটের কারণে বৃষ্টির পানি দ্বারা ওইসব এলাকার ভূনিম্নভাগ রিচার্জের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে এবং পানির স্তর প্রতি বছরই ক্রমান্বয়ে নিচে চলে যাচ্ছে। এতে সুপেয় পানির সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ভূপৃষ্ঠের নিম্নভাগ থেকেও সুপেয় পানি পাওয়া করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করেন, পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।

এনএম/