তবুও তুষারের দেখা পেলাম!!

রাফিজা রহমান:

পর্ব – ১

২০২১ সাল। পেলাম নতুন আরেকটি বছর। আমরা সৌভাগ্যবান। কারণ এখনও বেঁচে আছি। মহান শ্রষ্টার কা‌ছে ভীষণভা‌বে কৃতজ্ঞ। নতুন বছর সব দুর্দশা দূর ক‌রে সুখ শা‌ন্তি আর সমৃ‌দ্ধির দ্বার উন্মুক্ত কর‌বে এই প্রাথর্না।

আজ শুক্রবার। পয়লা জানুয়ারি ২০২১ সাল। ‌লি‌য়ে‌জের বড় ভাই লিটন ভাই ও প‌লি ভাবীর ওখা‌নে সকা‌লের নাস্তার দাওয়াত পেলাম । দাওয়াত ‌ছিল ৩১ বিদায় উদযাপন আর পয়লা বরণ। আ‌মি হাজির হই সকা‌লবেলা। হা‌জির হই বল‌লে ভুল হ‌বে, শি‌রিন আপা আর মঞ্জু ভাবী এ‌সে তু‌লে নিলেন। পৌঁছা‌তে পৌঁছা‌তে একটু বেলা হ‌য়ে গেল। তাই আর ভ‌নিতা না ক‌রে সোজা ব‌সে পড়লাম নাস্তার টে‌বি‌লে। এক এক ক‌রে লিটন ভাই, প‌লি ভাবী, তা‌দের মে‌য়ে নীলা, মিলা, আর শি‌রিন আপা, লুৎফা ভাবী (মঞ্জু ভাবী), জসীম ভাই যোগ দি‌লেন।

নানা দেশীয় খাবা‌রে টে‌বিল ছিল ভরা। ভাবী নিজ হা‌তে তৈরী ক‌রেছেন মাটন ভুনা, খাস্তা পরোটা, ডাল পুরী, সিঙ্গারা, হাত সেমাই, পা‌টি শাপটা আর নার‌কে‌লের বড়া। সা‌থে ভাই‌য়ের আনা বি‌শেষ কেক। ‌বেল‌জিয়া‌মের বিখ্যাত পেস্ট্রি jean pirre এর গাঢ় চক‌লেট কেক। যার মাথায় ছিল ২০২১ লেখা। তার দু পা‌শে গোল্ডেন স্টার আর ছোট এক পাপা ন‌য়েল বসা। অপূর্ব! ছিল ‘তাক্ত ও আ‌ব্রি‌কো। গোলাকৃ‌তি চক‌লেট ক্রীম ‌কেক । গোল এই কে‌কের ওপর ছড়া‌নো ছিল মজাদার মি‌ষ্টি তুষার। বাহ্ ভারী সুন্দর দেখা‌চ্ছিল। ‌ছিল সাদা লাল ফিতায় মোড়া গতকাল‌কের বিদায়‌ বেলার প্রায় নিঃ‌শেষ দু‌টি মোম।

‌বছ‌রের প্রথম দিন হওয়া‌তে দিন‌টি ছিল সরকারি ছু‌টি। ‌কোন তাড়া ছিল না। ছিল না কা‌জে ছু‌টে যাওয়ার ব্যস্ততা। এ‌কেবা‌রে গা ছে‌ড়ে দি‌য়ে সবাই নাস্তার টে‌বি‌লে। চলল নাস্তা। সা‌থে জম্পেস আড্ডা। আমরা একটু ক‌রে সব চে‌খে দেখ‌ছিলাম। পুরীর সাথে মাটন ছিল এ ক্লাস। খাস্তা পরোটা সে তো মু‌খে দি‌তেই মি‌লি‌য়ে যাচ্ছি‌ল। খে‌তে খে‌তে গল্প চল‌ছিল। দেশ, রাজনী‌তি, নিজ গ্রাম, আমাদের ছে‌লে‌বেলা, ছেলে মে‌য়ে‌দের নানা কথা, বাবা মা কেউ যেন বাদ পড়‌ছিল না।

বাদ যায়‌নি মজাদার সব খাবা‌রের কথাও। নাস্তা শেষ হ‌তে হ‌তে চা এ‌সে হা‌জির। মু‌খে স্বাদ লে‌গে থাকার মত ঘন দু‌ধের চা। চা খে‌তে যে‌য়ে ম‌নে পড়ল রাজশাহীর মালাই চ‌য়ের কথা। ‌পিআই‌বি‌তে কাজ করার সময় একবার রাজশাহী‌তে সাংবা‌দিক‌দের প্র‌শিক্ষণ দি‌তে গেলাম। ছোট ভাই প্রদীপ (বিশ্ব‌বিদ্যাল‌য়ের শিক্ষক) এবং তার বউ তন্বী বিখ্যাত সে চা খাওয়া‌তে নি‌য়ে গিয়েছিল। আমি আজও ভু‌লি‌নি। এককাপ চা খাওয়ার জন্য লম্বা লাইন। এক ভদ্র‌লোক বড় এক ডেকচিতে খাঁটি গরুর দু্ধ জ্বাল দিচ্ছেন। তা‌তে ঘন হলুদ সর পড়‌ছে। ‌সেটা তু‌লে নি‌য়ে চা বানাচ্ছেন। আমরা খেলাম এক কাপ না, পরপর ক‌য়েক কাপ। সে স্বাদ আজও মু‌খে লে‌গে আ‌ছে। ভাবীর করা চা সে স্বাদ ম‌নে ক‌রি‌য়ে দিল। ধন্যবাদ ভাবী।

তখনও নাস্তা চল‌ছে। এর মা‌ঝে ভাবী প্রস্তাব দি‌লেন বি‌কে‌লে যাওয়ার আ‌গে বেশ অ‌নেকটা সময় হাতে। কিছু একটা করা যায়। ঘ‌রে ব‌সে কাটাবো না‌কি বাই‌রে কোথাও যাব? তখনও আ‌য়ে‌সি আড্ডা চল‌ছিল। তাই কেউ কেউ সায় দিচ্ছি‌ল না। ভাই বল‌লেন, চলুন তুষারপাত দে‌খি‌য়ে আ‌নি। কথায় কথায় অ‌নেক বেলা হলো। দুপুর প্রায় একটা। সিদ্ধান্ত যে‌হেতু হলো। এবার ঝটপট তৈরী হবার পালা।

নতুন বছর নতুন অ‌ভিজ্ঞতা আর আনন্দে ভ‌রে উঠ‌বে, বেশ লাগ‌ছিল। শু‌নে‌ছি ই‌চ্ছে ডানায় ভর করলে না‌কি সব পাওয়া যায়। আমরা প‌লি ভাবী আর লিটন ভাই‌য়ের ই‌চ্ছে ডানায় ভর ক‌রে দেখ‌তে যাচ্ছি তুষারপাত আর প্রকৃ‌তির তুষারাবৃত শ্বেত শুভ্র সৌন্দর্য্য।

‌বের হবার আ‌গে খা‌নিকটা সময় গেল সাজ পোষা‌কের প্র‌স্তুতি‌তে। তুষার এলাকা বাড়‌তি কাপড় চাই। তাই সবাই প‌ড়ে নিলাম লম্বা হাতা জামা, সো‌য়েটার, কোট, মাফলার। কা‌লো আর লাল র‌ঙে সবাই ছিল কড়া সা‌জে। অ‌নেকটা পাপা‌ নো‌য়ে‌লের লাল সাদার জায়গায় লাল কা‌লো। ত‌বে জু‌তো ছিল হরেক রক‌মের। ‌কেউ বুট, কেউ কেডস, ‌কেউ স্যু, কেউ বা পাম্প স্যু।

পর্ব – ২

তখন দুপুর দুইটা বা‌জে। আমরা বে‌রি‌য়ে পড়লাম। দু‌টো গাড়ী‌তে ৭ জন ছুটলাম বর‌ফের দে‌শে।‌ বের হ‌তে হ‌তে ভাব‌ছিলাম গেল ডি‌সেম্বরের শুরু থে‌কে তাপমাত্রা উঠ‌ছে নাম‌ছে। ‌কিছু‌তে শূন্য বা মাইনাসে নাম‌ছে না। ভীষণ মন খারাপ হচ্ছি‌ল। এম‌নি‌তে ইউ‌রো‌পে এ সময়টা তুষার ঢাকা থা‌কে।‌ শীত বে‌ড়ে‌ছে । কনক‌নে ঠান্ডা মাংস ভেদ ক‌রে হাড় স্পর্শ কর‌ছে । তুষারের দেখা মিল‌ছিল না। প্রতি‌দিন ভে‌বে‌ছি এই বু‌ঝি ঘুম ভেঙে উ‌ঠে দেখবো সাদা ধবধ‌বে শহর। সবাই ব‌লে‌ছে এবার নির্ঘাত হোয়াইট খ্রিস্টমাস হ‌বে। পাপা ন‌য়েল সাদা লাল পোষাক প‌রে তুষার ভেদ ক‌রে লাল পুটলী ক‌রে উপহার নি‌য়ে আস‌বে। ত‌বে দুঃখ নেই, উপহার পে‌য়ে‌ছি। উপহা‌রের জন্য প‌লি ভাবী, মঞ্জু ভাবী, শি‌রিন আপাকে ধন্যবাদ। তুষার এখন ইউ‌রো‌পে সোনার হ‌রিন! ‌কেন এমনটি হচ্ছে? এ‌কি জলবায়ু প‌রিবর্ত‌নের বিরূপতা? হয়তো হ‌বে। গত চার পাঁচ বছর ধ‌রে এম‌নি চল‌ছে। ম‌নে এম‌নি নানা প্রশ্ন নিয়ে বে‌রি‌য়ে‌ছি।

ত‌বে লো‌কে যাই বলুক, ঘ‌রের পা‌শে তুষার পর‌ছে না তো কি? পাহাড় পবর্ত নেই? অ‌পেক্ষা না ক‌রে আমরা ছুটলাম দূর পাহাড়ী এলাকায়। ‌লি‌য়েজ আর লু‌ক্সেমবা‌র্গের মাঝামা‌ঝি এক‌টা জায়গা। লি‌য়েজ থে‌কে ৫০ কি‌লো‌মিটার দূ‌রে। এখা‌নে ‌ডি‌সেম্বর থে‌কে এ‌প্রিল পু‌রো সময়টা ১০/১২ কি‌লো‌মিটার পথ বর‌ফে ঢাকা থা‌কে। গাছপালা ঘড়বাড়ী পাহাড় জলাভূ‌মি উপর থে‌কে নীচ সব বর‌ফে ঢাকা থাকে। আমা‌দের গন্তব্য Baraque de Fraiture আর Baraque de Michel. বেল‌জিয়া‌মের সবচে‌য়ে উঁচু জায়গা। উঁচু ব‌লেই এখানটায় শীত, গ্রীষ্ম, বসন্ত সব আ‌গে আ‌গে আ‌সে। তাই এর রূপ এ‌কেক সময় অপরূপা হ‌য়ে দেখা দেয়। পর্যটক‌দের ভীড় তাই এখানটায়।

এই দু‌টো প‌য়েন্ট নি‌য়ে একটু ব‌লি। Baraque de Fraiture- এ‌টি বেল‌জিয়াম এবং লু‌ক্সেমবার্গ প্র‌দে‌শের সব‌চে‌য়ে উঁচু জায়গা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ৬৫২ ‌কি‌লোমিটার (২ হাজার ১৩৯‌ ফিট)। এ‌টি Vielsalm মিউ‌নি‌সিপ্যাল‌টি‌তে অব‌স্থিত। ই‌তিহাস বল‌ছে, দ্বিতীয় বিশ্বযু‌দ্ধের সময় যখন বেল‌জিয়া‌মে যুদ্ধ ছ‌ড়ি‌য়ে যায় তখন জায়গা‌টি জার্মানরা নি‌য়ে নেয়। মিউজ নদী দি‌য়ে Dinant এ পার হবার উ‌দ্দেশ্যে তারা এ‌টি ব্যবহার ক‌রে। এখা‌নে স্কী করার জন্য তিন‌টি pistes আ‌ছে। আ‌গে তা বছ‌রে ২০ দিন ব্যবহা‌রের জন্য খোলা থাকতো। এখন ৬০ দিন খোলা থা‌কে। শোনা যায়, এই প‌য়েন্টের নাম‌ রাখা হ‌য়ে‌ছে বেল‌জিয়া‌মের বিখ্যাত খাবার ফ্রি‌তের (‌ফিঙ্গার চিপস) অনুসর‌ণে। ‌সে সময় ক্যারাভ্যানে ক‌রে এক ধর‌নের ফ্রিত হতো যার বাড়‌তি তেল মু‌খে লাগত না কিন্তু অসাধারণ সুস্বাদু। ফ্ল্যা‌মিস আর ওয়ালু‌নিয়ার ছোটটরা খুব পছন্দ করত… তাই এ নাম দেয়া হ‌য়ে‌ছে।

Baraque de Michel- এটি বেল‌জিয়াম আর জার্মান অং‌শে প‌ড়ে‌ছে। বেল‌জিয়া‌মের প‌শ্চিম পা‌শে ১৯১৯ সা‌লে এটাই ছিল সব‌চে‌য়ে উঁচু প‌য়েন্ট। এর উচ্চতা ৬৭৪ মিটার (২ হাজার ২১১ ফুট)। এটাকে তৃতীয় উঁচু জায়গা বলা হয়। ১৮১১- ১৮১৩ সালের দি‌কে Michel Schmits এ জায়গা খুঁ‌জে পান।‌সে সময় ভ্রম‌ণের জন্য জায়গাগু‌লো দুর্গম ছিল। শোনা যায়, অ‌নে‌কে এ‌সে হা‌রি‌য়ে যেতেন। তখন ঘন্টা বা‌জাতো উদ্ধার করার জন্য। এছাড়া ও এ জায়গা‌ Eupen & Malmedy সা‌থে যোগা‌যো‌গের জন্য ব্যবহার করা হতো। বর্তমা‌নে এখানটায় বেশ উঁচু এক‌টি টাওয়ার তৈরী করা হ‌য়ে‌ছে। ‌যেখান থে‌কে দু‌দে‌শের অ‌নেকখা‌নি দেখা যায়। পর্যটক‌দের জন্য অসাধারন এক‌টি জায়গা।

পর্ব -৩

স্বপ্ন পূর‌নের যাত্রা শুরু। আমরা লি‌য়েজ সেন্টার ছা‌ড়ি‌য়ে গিমা রেল স্টেশন হ‌য়ে পথ চল‌তে শুরু করলাম। গা‌ড়ির গ‌তি মাঝা‌রি। শহর থে‌কে বে‌র হ‌য়ে দু‌টো গা‌ড়ির গ‌তি বাড়‌তে শুরু করল। ‌কোথাও গ‌তি বাড়‌ছে কোথাওবা কম‌ছে। পাশ কা‌টি‌য়ে চল‌ছি। যে পথ ধ‌রে যাচ্ছি তা পাহাড়ি। একটানা রাস্তা। পাহাড়ি রাস্তার স্ব‌র্পিলতা নেই। সমতল রাস্তা দ্রুত পে‌রি‌য়ে আবারও বাড়ল গ‌তি। আমরা Beaufays পার হলাম। টানা লম্বা ব্রীজ, ‌ক্যানেল, কং‌ক্রি‌টের পীচ ঢালা রাস্তা টে‌নে গন্ত‌ব্যে ছুট‌ছি। আমা‌দের উৎসুক চোখ দুপা‌শে জানালা দি‌য়ে এদিক ও‌দিক কর‌ছে। বু‌ঝি এই বর‌ফের স্তুপ দেখ‌তে পাব। না !না পাচ্ছি না যে। অ‌পেক্ষার রজনী না‌কি দীর্ঘ হয়। ঠিক তাই ঠেক‌ছে। আমা‌দের অস্থির মন ভেবেছে প‌থে নাম‌তেই বরফ পাব! প্রায় ১২ কি‌লো মিটার টে‌নে যাওয়ার পর হঠাৎ দূর ‌থে‌কে ধবধ‌বে সাদা চো‌খে পড়ল। উল্লাস বে‌ড়ে গেল। সবার চোখ এক‌যো‌গে পা‌শের কাঁচ ভেদ ক‌রে স্থির হ‌য়ে গেল। দুধারের রাস্তায় নী‌চে যেন পু‌রু সাদা কা‌র্পেট বিছা‌নো। দুপা‌শে দাড়া‌নো হাজার হাজার সাদা খ্রিস্টমাস ‌ট্রি। সা‌রি‌বে‌ধে যেন সাদা পিরা‌মিডগু‌লো গা‌য়ে গা‌য়ে লে‌গে দাঁ‌ড়ি‌য়ে আ‌ছে। একই ভঙ্গী‌তে একই রকম সাদা পোষা‌কে আমা‌দের যেন স্বাগত জানা‌চ্ছে। আমরা ছু‌টে চ‌লে‌ছি সাদায় ঘেরা পু‌রো জঙ্গল যেন আমা‌দের সা‌থে ছুট‌ছে। মুগ্ধ হ‌য়ে দেখ‌ছি। ‌কি অপূর্ব স্রষ্টার সৃ‌ষ্টি! সাদা সাদা কেবলই সাদা!!

গাড়ী চল‌ছে। ‌দেখ‌ছি। গুচ্ছাকা‌রে লাগা‌নো খ্রিস্টমাস ‌ট্রি, পাইন গাছ অজানা আরও কত গাছ । সবই সাদা তু‌লায় মোড়ান। একটু পর পর সাদা মা‌ঠের মত দেখ‌তে পেলাম। যতদূর চোখ যায় ধবধ‌বে সাদা চাদ‌রে মোড়া। প্রকৃ‌তি নিজ হা‌তে টানটান ক‌রে ‌বি‌ছি‌য়ে রে‌খে‌ছে সাদা চাদর। দূ‌রের ঘরগু‌লো সাদা কাভার ক‌রে রক্ষা কর‌ছে। ‌কোথাও প‌থি‌কের বিশ্রা‌মের জন্য রাখা কা‌ঠের বেঞ্চগু‌লো‌কে যেন সয‌ত্নে সাদা নরম তুলতু‌লে উষ্ণ কুশন পে‌তে আহ্বান জানাচ্ছে।

একটু এগু‌তে পা‌শে সা‌রিবদ্ধ সাদা পাহা‌ড়ের মেলা। একসা‌থে সাদা কম্বল গা‌য়ে টে‌নে যেন পাহাড়ি বেষ্টনী তৈরী ক‌রেছে। ওপারে লুকা‌নো সম্পদ দেখ‌তে দে‌বে না। প্রকৃ‌তির এক অপূর্ব শিল্পকর্ম। শীতের রৌদ্রজ্জ্বল আকাশ। এক চিল‌তে সূর্যের আ‌লো থোকা মেঘ স‌রি‌য়ে উঁকি ‌দি‌চ্ছিল। তার আলোচ্ছটায় পাহা‌ড়ের মাথাগু‌লো চকচক কর‌ছে। মুগ্ধ আমরা। অপলক দৃ‌ষ্টি‌তে চে‌য়ে আছি। ভেতর থে‌কে নিস্তব্ধতা ভেঙে প‌লি ভাবী ব‌লে উঠলেন, নে‌মে ছ‌বি তুলবো। ‌ফি‌রে এ‌সে এ জায়গা আর পাব না যে। সাম‌নের গা‌ড়ির গ‌তি বেশ চড়া তাই অনুসরণই কর‌ছি। ছ‌বি তোলার জন্য তখনও থামা হলো না।

টে‌নে যে‌তে যে‌তে একপা‌শে চো‌খে পড়ল চৌ‌কো‌নো একটা ভূ‌মি হয়ত ছিল সবুজ ঘা‌সের কা‌র্পেট।‌সে‌টি এখন সাদায় মোড়া। তা‌তে দু‌টো শিশু মা‌য়ের সা‌থে বরফ ছোড়াছু‌ড়ি ক‌রে খেল‌ছে। সাম‌নে জঙ্গল, গাছগু‌লোর গা‌য়ে কে যেন আল‌তো ক‌রে সাদা তুলার জামা প‌রিয়ে‌ছে। ম‌নে হচ্ছি‌ল প্রকৃ‌তি গা‌ছে‌দের নগ্ন অবয়ব নিজ হা‌তে ঢে‌কে‌‌ছে। আপ্লুত । ভীষণ আপ্লুত আমরা।

আমা‌দের গাড়ী এ প‌থে ঢোকার সা‌থে সা‌থে অনুভূত হচ্ছিল ভেতরটা ক্রমশ ঠান্ডা হ‌য়ে আস‌ছে।‌হিটার পু‌রোদ‌মে চল‌ছে। কিন্তু হিম হ‌য়ে যাচ্ছি। হঠাৎ মঞ্জু ভাবী জানালা খু‌লে ভি‌ডিও কর‌ছিলেন। জানালা খুল‌তেই সাঁই ক‌রে এক কুশ ঠাণ্ডা হাওয়া মু‌খের প‌রে ঝাপটা মারলো। ভেতরটা কেঁ‌পে উঠল। ড্রাইভিং সিট থে‌কে শি‌রিন আপা বল‌লেন, ভেতর ঝাপসা হ‌য়ে আস‌ছে, কাঁচ বন্ধ কর‌তে হ‌বে যে। অগত্যা ভেতর থে‌কে চল‌ছে ‌ভি‌ডিও ছ‌বি তোলা। অন্য গাড়ী‌টি‌তে বাবা মে‌য়েরা ভি‌ডিও লাইভ দি‌য়ে চ‌লে‌ছে তার সা‌থে সা‌থে আমা‌দের ভাবী লাইভে এ‌কের পর এক মন্তব্য লি‌খে চলে‌ছেন। অদ্ভূত এক উ‌ত্তেজনা সবার মা‌ঝে। আমরা গন্তব্যের কাছাকা‌ছি।

এরই মা‌ঝে আমরা Houffalize ক‌মিউ‌নের ছোট্ট এক গ্রাম Les Tailles ঢু‌কে পড়ে‌ছি। চার‌দিক বরফে আচ্ছা‌দিত। একজন ব‌লে উঠলো, ওই দেখুন এখা‌নে অনেক মানুষ। তাই‌তো। এখা‌নে টু‌রিস্টদের থাকার জন্য ছোট ছোট কা‌ঠের ঘর আ‌ছে। এগু‌লো‌কে জেটি বলে। অনে‌কে এখনটায় বাড়ী কি‌নে রা‌খে। শীত মৌসুমে ঘুরতে আসে। এখা‌নে বেশ কিছু রেস্টু‌রেন্ট দেখা গেল। এখনটায় ছে‌লে মে‌য়ে বু‌ড়ো বু‌ড়ি বাচ্চা দেখা গেল। দূর থে‌কে ঘড়বাড়ীগু‌লো‌কে ইগলু হাউ‌জের মত লাগ‌ছিল। পু‌রো এলাকাজু‌ড়ে এক অ‌বি‌চ্ছিন্ন সাদা আবরণ। রঙ বের‌ঙের টুপী, পোষাক প‌রে বড় ছোট সবাই উল্লাস কর‌ছে। চাকা লা‌গি‌য়ে ক‌য়েক‌টি ‌ছে‌লে রোলার চালাচ্ছে। বরফ পড়‌তে দেখা, বরফ নি‌য়ে খেলা করায় বাচ্চা‌দের কত আনন্দ!

এবার আমরা সবাই জ্যা‌কে‌টের বোতামগু‌লো গলা অব‌ধি লা‌গি‌য়ে নিলাম। তীব্র শির‌শি‌রে বাতাস সূঁচ ফোটার মত লাগ‌ছিল। ‌দেখ‌তে দেখ‌তে মুগ্ধ আমরা। এতো সাদা ভাব‌তে পার‌ছি না। ম‌নে হচ্ছে সবাই নিশ্চুপ ঘুমাচ্ছে। আমরা বাঁক ঘুরে সাদা খ্রিস্টমাস বাগা‌নের ভেতর দি‌য়ে কোলাহল মুখর জায়গাটিকে পাশ কা‌টি‌য়ে এ‌সে পৌঁছুলাম ৬২৫ মিটার উপ‌রে সমতল এ‌ক জায়গায়। আমরা গাড়ী থে‌কে নে‌মে পরলাম। তখনও ভাই ধারা বর্ণনা দিয়ে চলছেন। পা নী‌চে রাখ‌তে অনুভব করলাম খুব বে‌শি সময় হয়‌নি তুষারপাত থেমে‌ছে। নরম তুলার ম‌তো। ‌যে‌দিক তাকা‌চ্ছি কেবল সাদা আর সাদা। দুপা‌শে ঘন সাদা গা‌ছের জঙ্গল। অন্য পা‌শে খোলা সাদা মাঠ। ‌যে জায়গায় দাঁড়ালাম সে‌টি দি‌য়ে টুরিস্টদের গাড়ী La Roche ,Chabrehez, Colas প‌থে চ‌লে যাচ্ছে।

আমরা লোকালয় ছা‌ড়ি‌য়ে আরও ভে‌তে‌রে ঢুক‌ছি তো ঢুক‌ছিই। কোলাহলহীন নীরব শুভ্র নিস্তব্ধতা।‌কেবল আমা‌দের কন্ঠ শোনা যা‌চ্ছিল। আমা‌দের হাঁটার পথে চার পাচ ইঞ্চি পুরু বরফ। আমা‌দের পা গু‌লো নরম পেজা বর‌ফের তু‌লোয় ‌কেবল ডু‌বে যা‌চ্ছিল। হাঁটার ভঙ্গী এমন ছিল‌ যেন চাঁ‌দে হাঁটছি। পা তু‌লে তু‌লে ‌টি‌পে ‌টি‌পে। সাদা নরম তুষা‌রে নি‌জে‌দের পা‌য়ের ছাপ নি‌চ্ছিলাম। ম‌নে হচ্ছি‌ল রে‌খে গেলাম পদ‌চিহ্ন। সবাই যার যার পছ‌ন্দের জায়গায়, নানা ভ‌ঙ্গি‌তে মোবাইল ক্যমেরা ক্লিক ক্লিক করে চ‌লে‌ছে। প্রকৃ‌তির কা‌ছে মানুষ কেমন শিশু হ‌য়ে যায়। আমরাও যেন তাই। আমরা এক‌কেটা লম্বা পাতার মাথা ধ‌রে যেই না নাড়া দি‌চ্ছি‌‌ অম‌নি ঝরঝর ক‌রে বরফ কু‌চি পোষা‌কে মাথায় পড়‌ছিল। হালকা ঝাড়া ‌দি‌তে নিঃশ‌ব্দে মা‌টি‌তে মি‌লি‌য়ে গেল। সবাই হে‌সে সারা। নাকগু‌লো ঠাণ্ডায় ‌কেমন গোলাপী হ‌য়ে উ‌ঠে‌ছে । কেমন ক্লাউ‌নের না‌কের ডগা যেন। ‌কি হাস্যকর!

নীলা ‌মিলা দু’‌বোন আন‌ন্দে ছুটোছু‌টি কর‌ছিল। কখনও দৌঁ‌ড়ে ভেতর অব‌দি চ‌লে যাচ্ছে। আবার সাদা গাছগু‌লো না‌ড়ি‌য়ে সাদা তু‌লো জামা গ‌ড়ি‌য়ে দিচ্ছে। ‌মে‌য়ে দু‌টো নিঃশ‌ব্দে প‌ড়ে যাওয়া তুষা‌রের মত শান্ত স্বভা‌বের। ওরা বরফ ছোড়াছ‌ড়ি কর‌ছিল না। কিন্তু মু‌ঠি ভ‌রে বরফ তু‌লে দুহা‌তের তালু‌তে চে‌পে বল বানা‌চ্ছিল। ‌অল্প সম‌য়ের মা‌ঝে একটা বরফ মানব বা‌নি‌য়ে ফেলল। তার সা‌থে নানা ভা‌বে ছ‌বি তু‌লে চ‌লে‌ছে। রাস্তার একধা‌রে চৌকোনা একটা জায়গা মনে হচ্ছি‌ল সাদা দিঘী। তা‌কে ঘিরে আ‌ছে যে বে‌ষ্টনী তারা সবাই মাথায় গা‌য়ে সাদা টু‌পি জামা প‌ড়ে হাত ধরাধ‌রি ক‌রে যেন পাহারা দিচ্ছে, কখন রাত হ‌বে আর চাঁ‌দের আ‌লোয় তুষার কন্যা ডুব সাঁতা‌রে যা‌বে। আমরা ‌পে‌য়ে‌ছিলাম সূ‌র্যের শেষর‌শ্মি। কেমন ক‌রে নীল আকা‌শে অপরূপ শোভা তৈরী ক‌রে‌ছে তা অপলক দৃ‌ষ্টিতে দে‌খে চলছিলাম। আকাশ আর শ্বেতশুভ্র ভূ‌মি একাকার হ‌য়ে আ‌ছে। আর দেরী না। চললো ক্লিক ক্লিক। এক‌টি নয়, দু‌টি নয়… অগ‌ণিত। ভ‌রে গেল মন । উজ্জ্বল সবার মুখ।

প্রকৃ‌তির এই অপরূপ শোভা দু‌চোখ ভ‌রে দেখা যায়, তা বর্ণনার ভাষা কারই বা আ‌ছে? আমরা ফিরছি। গা‌ড়ির জানালা দি‌য়ে সবার দৃ‌ষ্টি বাই‌রে। পাহাড়ি উঁচু পথ ধ‌রে নাম‌ছি। আনন্দ আর বেদনা যে পাশাপা‌শি বেলা শে‌ষে সবাই যেন তা অনুভব কর‌ছে। তুষা‌রের সাথে খা‌ণিক সম‌য়ের মধুর মিতালী হ‌য়ে‌ছিল। তা ফে‌লে যে ফি‌রে আস‌তে মন চায় না।

বিদায় তুষার তোমায়। তোমারই শ্বেত শুভ্রতায় প‌রিশুদ্ধ কর পু‌রো পৃ‌থিবী ।

পর্ব – ৪

এবার আমরা একটু একটু ক্ষুধা অনুভব কর‌ছি। তুষার নিঃশ্বাসে ভেতর যে খা‌লি। ভাব‌ছিলাম এখনকার বিখ্যাত ফ্রিত আর হট চক‌লেট ক‌ফি হ‌লে মন্দ হতো না। বলার আ‌গেই স্মরণ ক‌রি‌য়ে দিলেন বি‌কে‌লে শান্ত‌শিষ্ট, স্বল্পভাষী, মিশুক জু‌বিলী ভাবীর ওখা‌নে বি‌কে‌লের দা‌ওয়াত। আমরা যখন দরজায় তখন রাত ৮টা বা‌জে। বেল বাজা‌তে ছু‌টে এলেন ভাবী, আক্কাস ভাই আর তা‌দের দুই ছে‌লে।‌ টে‌বিল তৈরী ছিল। ক্ষুধাও ছিল। তাই দেরী না ক‌রে সবাই ব‌সে পড়লাম। স্ক্রাম্পী, প‌টে‌টো স্টেক, পাকোড়া, ডাল পু‌রি, স‌সেজ আর দেশী দই; সা‌থে দুধ চা দিয়ে টে‌বিল ভরপুর । খুব মজা ক‌রে খেলাম। ক্ষুধা ছিল, তাই সবাই একটু বে‌শিই খেল ম‌নে হয়। ক্ষুধা কোন দি‌কে তাকাই‌নি। এবার দেখলাম।

প‌রিচ্ছন্ন, ‌হালকা রু‌চিশীল আসবা‌বে ঘরটি ভারী অভিজাত্যে ভরা ‌ছিল। ভীষণ প‌রিপা‌টি, গোছা‌নো। এখা‌নেও চললো নানা ভঙ্গী‌তে ছবি তোলা। চললো গল্প আর আড্ডা। আবা‌রো রা‌তে ভুনা খিচুরী, কসা‌নো মাটন, ইলিশ ভাজা আর চিং‌ড়ি ভুনা দি‌য়ে খে‌য়ে রাত ১০ বিদায় নিলাম।

‌সুস্বাগতম ২০২১। বছ‌রের প্রথম‌দিনটি বেশ কাটলো। সারা‌দি‌নের আ‌য়োজক আর সাথী সবাই‌কে শুভেচ্ছা আর একরাশ ভালবাসা।

https://www.facebook.com/messenger_media/?thread_id=734186668&attachment_id=1002248016966640&message_id=mid.%24cAAAAAABrs3x9FOZ4Fl246Ebi-EdM

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *