বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু, ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং ১৯৪৭ পরবর্তী সর্বভারতীয় রাজনীতির সফলতম বাঙালি প্রণব মুখোপাধ্যায় আর নেই। একদিকে ব্রেইনে রক্তক্ষরণ ও অস্ত্রোপচার, তার ওপর করোনা সংক্রমণের ধাক্কা সামলাতে পারলেন না তিনি। ২১ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে দিল্লির আর্মি হসপিটাল রিসার্চ অ্যান্ড রেফারালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। প্রণব মুখার্জীর মৃত্যুতে উপমহাদেশের রাজনীতিতে একটা যুগের অবসান ঘটলো।
সোমবার বিকেল পৌণে ছয়টার দিকে তার ছেলে অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় ট্যুইট করে এ খবর জানিয়েছেন।
গত ৯ আগস্ট রাতে নিজের দিল্লির বাড়িতে বাথরুমে পড়ে গিয়েছিলেন প্রণব মুখার্জি। পর দিন সকাল থেকে তাঁর স্নায়ুঘটিত কিছু সমস্যা দেখা দেয়। বাম হাত নাড়াচাড়া করতে সমস্যা হচ্ছিল। চিকিৎসকদের পরামর্শে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এমআরআই স্ক্যানে দেখা যায়, তার মাথার ভেতর রক্ত জমাট বেঁধেছে। জরুরিভিত্তিতে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকরা। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পরও অবস্থার উন্নতি হয়নি। ১৩ আগস্ট থেকে তিনি গভীর কোমায় চলে যান।
প্রণব মুখোপাধ্যায় ডায়াবেটিস রোগে ভুগছিলেন। ১০ তারিখ হাসপাতালে ভর্তির পর ধরা পড়ে তিনি কোভিড-১৯ রোগেও আক্রান্ত হয়েছেন। সেই অবস্থাতেই ওই দিন রাতে দীর্ঘ অস্ত্রোপচার হয়। এরপর থেকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছিল।
অস্ত্রোপচারের আগে নিজের করোনা সংক্রমিত হওয়ার খবর নিজেই ট্যুইট করে জানিয়েছিলেন। সেটাই ছিল প্রণব মুখোপাধ্যায়ের শেষ ট্যুইট।
প্রণব মুখার্জি ১৯৩৫ সালের ১১ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার ছোট্ট মিরাটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী কামদাকিঙ্কর মুখার্জি এবং মা রাজলক্ষ্মী মুখার্জী। প্রণব মুখোপাধ্যায় ২০১২ সালের ২৫ জুলাই ভারতের ১৩তম রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ নিয়েছিলেন।
তিনি ১৯৬৯ সাল থেকে পাঁচবার ভারতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ২০০৪ সাল থেকে দুই বার সংসদের নিম্নকক্ষ (লোকসভা) সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ২৩ বছর ধরে কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন।
প্রণব মুখোপাধ্যায় বহু রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে সমকালীন রাজনীতিতে নিজের দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেছিলেন। ভারতীয় রাজনীতিতে দল মত নির্বিশেষে সবার শ্রদ্ধার ছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়।
ইন্দিরা গান্ধীর সাহচর্যে ১৯৬৯ সালে দিল্লিতে তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু। পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনে কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, বাণিজ্য, যোজনা কমিশনের দায়িত্ব পালন করেছেন যোগ্যতার সঙ্গে।
ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর রাজীব গান্ধীর মন্ত্রিসভায় স্থান না পেয়ে হতাশ হয়ে প্রণব মুখার্জি কংগ্রেস ছেড়ে নতুন দল গঠন করেছিলেন। পরবর্তীতে ‘ভুল’ বুঝতে পেরে তিনি সেই দল বিলুপ্ত করে কংগ্রেসে ফিরে আসেন।
যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে না পারায় তার মনে দুঃখ ছিল। কিন্তু সে জন্য দলকে সুপরামর্শ দিতে কখনও কার্পণ্য করেননি। পরে তিনি ভারতের মত বিশাল একটি গণতান্ত্রিক দেশের রাষ্ট্রপতি হয়ে যোগ্যতা ও সম্মানের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।















Leave a Reply