মমতার দূর্গে মোদির হানা

মাসুদ করিম

মাসুদ করিম: ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন্ন বাংলাদেশ সফরকালে ওড়াকান্দি যাওয়ার কর্মসূচি আমার মধ্যে বেশ কৌতুহলের জন্ম দিয়েছে। গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানি থানায় ওড়াকান্দি নামক স্থানে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মতুয়া সম্প্রদায়ের তীর্থস্থান অবস্থিত। সেখানে মতুয়াদের নেতা হরিচাঁদ ঠাকুর তার সম্প্রদায়ের অধিকার আদায়ের লড়াই করেছিলেন। তারপর গুরুচাঁদ ঠাকুরও একই লড়াই করেছেন। সেই থেকে মতুয়া সম্প্রদায়ের কাছে ওড়াকান্দি একটি তীর্থস্থান। প্রতিবছর হাজার হাজার পুণ্যার্থী ওড়াকান্দিতে মিলিত হন। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভায় ভোটের আগে মোদির ওড়াকান্দি যাওয়া ভোটের মাঠে কী প্রভাব ফেলবে সেটা এখন বিবেচ্য।

পশ্চিমবঙ্গের ভোটের আগে প্রচণ্ড ঝড় বয়ে যাচ্ছে। বিজেপি ঝড়। সুনামির মতো তার গতি। প্রতিদিন দলে দলে নেতা-অভিনেতা সবাই বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন। অনেকে বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গ গুজরাট নয়। ধর্ম নিরপেক্ষ রাজ্য। বাম রাজনীতির দূর্গ ছিল। সেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি সহনশীল তৃণমূল কংগ্রেস দখল নিতে পারলেও কট্টর হিন্দুদের দল বিজেপি ঠাঁই পাবে না। কিন্তু বাস্তবে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিজেপি জ্বরে কাঁপছে বাংলাদেশের পড়শী রাজ্য। ভোটের আগে আভাস মিলছে প্রচন্ড লণ্ডভণ্ড কিছু একটা ঘটে যাবে। কী ঘটবে তা দেখার উৎকন্ঠিত কৌতুহল আমাকে উত্তেজিত করছে।

আমার মনে আছে, মমতা ব্যানার্জী পশ্চিমবঙ্গ জয় করার পর গোটা বাংলাদেশে সে কি উচ্ছ্বাস! টিভির পর্দা থেকে আমার চোখ আর সরে না! মমতা ব্যানার্জী সমর্থকদের বললেন, হাসিনা’দি ফোন করেছিল। অভিনন্দন জানাল। শেখ হাসিনা প্রতিবার মমতা ব্যানার্জীর জন্য উপহার নিয়ে যান ইলিশ। ছোট বোনের মতো স্নেহ করেন। তিস্তা চুক্তিতে বাগড়া দিয়ে ভালবাসার প্রতিদান দিলেন মমতা।

আমার মনে আছে, তিস্তা চুক্তি চূড়ান্ত। আমি তখন সকালের খবর পত্রিকায় কূটনৈতিক রিপোর্টার। নতুন উদ্যমে প্রকাশের উদ্বোধনী সংখ্যায় আমার খবর লিড। তিস্তার পানির ভাগাভাগির ফর্মুলা দিয়ে রিপোর্ট।

২০১১ সালের ঘটনা। ওই সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং চুক্তি করতে ঢাকায় আসছেন। মমতা ব্যানার্জীও সাথে আসবেন। আগের দিন জানা গেল মমতা এন্টুরেজের তালিকা থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। তিস্তা চুক্তিতে আপত্তি জানিয়েছেন। তবে মনমোহনের সফর বহাল। তিনি কাল আসছেন।

মনমোহনের আগমনের দিনে আমি সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে নাস্তা করছি। গুরুত্বপূর্ণ সূত্রের ফোন। রাত দুইটার সময় ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনারকে এসএমএস করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব। সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এলেন ভারতীয় হাই কমিশনার। তিস্তা চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। তিস্তা না করায় ট্রানজিটের চুক্তি হবে না। বিকাল তিনটায় চুক্তিগুলো সই হওয়ার কথা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে হাই কমিশনার ছুটে গেলেন এয়ারপোর্ট। সকাল ১১টায় নামবেন মনমোহন। তাকে রিসিভ করবেন। আমি সকালের খবরের অনলাইনে খবরটা দিলাম। ফেসবুকে শেয়ার করলাম।

আমার স্নেহভাজন অনুজ সাংবাদিক হাসানুজ্জামান সাকীকে খবরটা জানালাম। সাকী তখন বৈশাখী টিভির চিফ রিপোর্টার। সে স্ক্রল দিল। তিস্তা চুক্তি থেকে সরে যাওয়ায় ঢাকার কড়া প্রতিবাদ। ট্রানজিট চুক্তি করবে না জানাল বাংলাদেশ। দিল্লি থেকে আমার বন্ধু সাংবাদিক স্মিতা শর্মা ফোন করল। খবরটার বিস্তারিত জানতে চায়। ঢাকার টিভি, পত্রিকার সাংবাদিকরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ভিড় করলো। করিডোরে পররাষ্ট্র সচিব মিজারুল কায়েসের কাছে জানতে চায় খবরটা সম্পর্কে বিস্তারিত। কায়েস বললেন, লেট দেম ডিসাইড। ভারতের প্রতি কটাক্ষ।

সকাল ১১টায় মনমোহন নামলেন। বিমর্ষ শেখ হাসিনা রিসিভ করলেন। অতিশয় সজ্জন বিজ্ঞ পন্ডিত মনমোহন সিং দারুন বিব্রত হলেন। বিকাল তিনটায় চুক্তি সই অনুষ্ঠান। আমি যাইনি। সাকি ফোনে জানাল ট্রানজিট চুক্তি হয়নি। আমাদের নিউজ সঠিক। পরের দিন সব পত্রিকার লিড হেডিং, তিস্তায় ডুবল ট্রানজিট।

দুই বন্ধু দেশের সম্পর্ক এতটা নীচে যিনি নামান, মমতা ব্যানার্জি আজ ভীষণ অসহায়। তার দলের সেকেন্ডম্যান শুভেন্দু অধিকারী চলে গেলেন। মিঠুন চক্রবর্তীর কথা নাইবা বললাম। নকশাল দিয়ে শুরু করেছিলেন। তারপর বোম্বে চলে যান। বাম করেছেন। কংগ্রেস করেছেন। তৃণমূল হয়ে এখন বিজেপি। মিঠুন চক্রবর্তীর চরিত্র এমনই। তাই বলে, শুভেন্দু! সবাই ভেবেছিল, দিদির পরে তৃণমূলের মুখ্যমন্ত্রী তিনি হবেন। শুনেছি, টাকা দিয়ে কিনছে বিজেপি। নেতাদের কিনে নিচ্ছে। অভিনেতা নেত্রীদের কিনে নিচ্ছে। জেলের ভয়ও দেখাচ্ছে।

বিজেপি জোয়ারেও ভাসছেন অনেকে। পশ্চিমবঙ্গে টিকে থাকতে হলে বিজেপি ছাড়া গতি নেই। বামদের হটিয়ে একদিন এভাবেই এসেছিলেন দিদি। নিজের ভাগ্যে এখন সেটাই কি হতে যাচ্ছে? একটু অপেক্ষা করতে হবে। নাটকের সবে শুরু। কোথাকার জল কোথায় গড়ায় কে জানে!

দুই.

পশ্চিমবঙ্গকে বিজেপির টার্গেটে এনেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংস্থা সংক্ষেপে আরএসএস। বিজেপি হলো আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন। রাজ্যটিতে ২৫ শতাংশ জনগোষ্ঠী মুসলিম। আরএসএস মনে করছে, মুসলিমের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। সেক্যুলার পরিচয় থাকলে মুসলিমদের আধিপত্যও থাকে। তাই তারা পশ্চিমবঙ্গকে দখলে নেবার ঘোষণা দেয়। কট্টর অমিত শাহকে দায়িত্ব দেয়। তিনি বেশ কিছু পরিবর্তনে সক্ষম হন। ২০১৯ সালের লোকসভার ভোটে সেটা কিছুটা আঁচ করা গেছে। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ১৮টি আসন পেয়ে যায়। ২০১৪ সালের ভোটে বিজেপির আসন ছিল মাত্র দুইটি। তৃণমূলের আসন কমে ২২টিতে নামে যা আগেরবার ছিল ৩৪টি।

বিধান সভায় পশ্চিমবঙ্গে মোট আসন ২৯৪টি। এর মধ্যে ১৪৮টি আসন পেলে সরকার গঠন করা যায়। মমতা ব্যনার্জীর বর্তমানে আসন আছে দুই শতাধিক। আসন্ন ভোটে কী হবে তার ফলাফল জানা যাবে ২ মে। গোটা এপ্রিল মাসে আট ধাপে ভোট হবে। সেখানে ভোটে পাস করার পরও এমপি কেনা যায়। অনেকে বাম থেকে পাস করেছিলেন। তৃণমূল তাদের কিনে নেয়।

বিজেপি মাত্র তিনটে আসন পেয়েছিল। এখন বিজেপির জোয়ার। বস্তা বস্তা টাকা নিয়ে এসেছে বিজেপি। তৃণমূলের নমিনেশন পাওয়ার পরও প্রার্থী কিনছে। ভোটের পর বিজেপি সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে তৃণমূলের মতো কিছু এমপি কিনবে বলে মনে হচ্ছে। আব্বাস সিদ্দিকী নামের একজন নেতা নিজে দল গড়ে মুসলিমদের ভোট নিতে চাইছেন। ফলে মুসলিমদের ভোট একচেটিয়া পাচ্ছে না তৃণমূল। পশ্চিমবঙ্গে চাকরিতে মুসলিমদের সংখ্যা মাত্র এক দশমিক ৬৫ শতাংশ। তবুও মুসলিমরা দিদিকে সমর্থন করে। কারণ দিদি ঘোমটা পরে মুসলমানরদর সাথে মিশতে পারে। ভনিতা জানে ভাল। চাকরিতে মুসলমানদের নেয় না।

আরএসএসের টাকার কোনও অভাব নাই। পশ্চিমবঙ্গে এক হাজার নয়শ’ কোটি টাকা চাঁদা তুলেছে মন্দির বানানোর জন্য। সর্বভারত থেকে কত চাঁদা তোলে তার হিসাব আমার জানা নেই। অবাক কাণ্ড হলো, ২৫/৩০ বছর বাম রাজনীতি করার পরও লোকেরা কট্টর ডানপন্থী বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন। কিছুটা তৃণমূলকে শিক্ষা দেয়া, কিছুটা জোয়ারে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয়, কিছুটা টাকার লোভ, কিছুটা মামলার ভয়।

এত দিন শুনেছি, মমতাকে আস্থায় নিতে বিজেপি মরিয়া। তিস্তার ব্যাপারে দিদিকে মোটেও রাজি করাতে পারেনি বিজেপি। দিদি বলেছেন, রাজ্যের স্বার্থে তিস্তা চুক্তিতে আপত্তি। অথচ তার নিজের করা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম করা বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্রকে দিয়ে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নিলেন। কল্যাণ বলেন, চুক্তি করা দরকার। নদীর পানি আটকে রাখলে আখেরে ক্ষতি হবে। নদী প্রতিশোধ নেবে। হচ্ছেও তাই। দিদি রাজি হলেন না। দিদি সোজা কথার মানুষ। রাজ্যের জন্য জল দরকার।

অথচ গঙ্গা চুক্তির সময় উল্টোটা ঘটেছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু নিজে চেষ্টা তদবির করে চুক্তি করিয়েছেন। জ্যোতি বসু মারা যাওয়ার খবর শুনে শেখ হাসিনা উড়ে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধেও পশ্চিমবঙ্গের বামদের সহায়তা তুলনাহীন। তাদের বাঙালিয়ানার প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা বেশি। কিন্তু বামরা এবারের ভোটের মাঠে টিকতে পারছে না। তৃণমূলও সাংবাদিক জয়ন্ত ঘোষালকে দিয়ে পর্দার আড়ালে বিজেপির সাথে একটা আঁতাত করানোর চেষ্টা করছে। রফা হলে কেন্দ্রে মোদিকে সমর্থন দেবেন দিদি। যদিও মমতাকে মোদি বলেছেন , স্পিডব্রেকার দিদি। মোদি যে করপোরেট উন্নয়নের পথে হাঁটছেন দিদি নাকি সেখানে কাঁটা বিছিয়ে রেখেছেন।

এবারের ভোটে বিজেপি ১০০ আসন পাবেই; ভোটের বিপ্লব হলে ক্ষমতায়ও যেতে পারে। বিজেপি ক্ষমতায় গেলে মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন তার নাম ঘোষণা করছে না। রহস্য করছে। বিজেপি গেলে দ্রুত তিস্তা চুক্তি হবে সন্দেহ নেই। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার যে আগুন জ্বলবে তার মূল্য তিস্তা চুক্তির চেয়ে কম নাকি বেশি?

লেখক পরিচিতি: মাসুদ করিম; চিফ রিপোর্টার, দৈনিক যুগান্তর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *