৫ ডিসেম্বর ১৯৭১, বিজয়ের পথে বাংলাদেশ

৫ ডিসেম্বর ২০২১ (নিউজ ডেস্ক): আজ বিজয়ের মাস ডিসেম্বরের ৫ তারিখ। ১৯৭১ সালের এই দিনে মুক্তিযোদ্ধাদের হামলায় কোণঠাসা পাকিস্তানি বাহিনীর শেষ মুহূর্তের প্রতীক্ষায় সমগ্র বাঙালি জাতি। হানাদার মুক্ত এলাকাগুলোতে উড়ছে নতুন পতাকা। বাংলাদেশের পতাকা।

ঘটনাবহুল এই দিনটিতে জলে, স্থলে, আকাশে সর্বত্র পাকিস্তানি বাহিনী পর্যুদস্ত। ঢাকার আকাশ পুরোপুরি মিত্রবাহিনীর দখলে। ৩ ও ৪ ডিসেম্বরের হামলায় পাকিস্তানের প্রায় সব যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত। বিজয়ের পর ভারতীয় বিমান বাহিনীর দেয়া তথ্যমতে, তেজগাঁও ও কুর্মিটোলার পাকিস্তান বিমানবন্দরে মাত্র ১২ ঘণ্টায় ৫০ টন বোমা ফেলা হয়েছিল। একই সময়ে বিমান হামলায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল পাকিস্তান সেনাবহরের ৯০ সাঁজোয়া যান। এছাড়া ধ্বংস হয় পাকিস্তানি সৈন্য বোঝাই বেশ কয়েকটি লঞ্চ ও স্টিমার। ৫ ডিসেম্বর এক বেতার বার্তায় যৌথ বাহিনী চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে অবস্থানরত বিদেশি জাহাজগুলোকে বন্দর ছেড়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানিদের আসন্ন পরাজয়ের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

পরাজয়ের বিষয়টি বুঝতে পেরে নতুন কূটকৌশলে কূটনৈতিক যুদ্ধ শুরু করে পাকিস্তান। হানাদারদের মুখ রক্ষায় নগ্ন উদ্যোগ নেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত থেকে সৈন্য প্রত্যাহারসহ আবারও জাতিসংঘে যুদ্ধ বিরতি প্রস্তাব পেশ করে দেশটি। সে সময় নিরাপত্তা পরিষদের ১৪ সদস্যের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পোল্যান্ড এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। ভোটদানে বিরত থাকে ব্রিটেন ও ফ্রান্স। ১০টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। চীন পাকিস্তানকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। এমন পরিস্থিতে ভেটো দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। এতে হানাদারদের শেষ প্রত্যাশাটুকুও নিঃশেষ হয়ে যায়। সম্মুখযুদ্ধের পাশাপাশি কূটনৈতিক যুদ্ধেও হারতে থাকে পাকিস্তান।

রণাঙ্গনে ৫ ডিসেম্বর যৌথ বাহিনী ঢাকামুখী যাত্রা শুরু করে। এতে দেশব্যাপী শুরু রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধারা লাকসাম রেলওয়ে জংশন দখল করে। পাশাপাশি বিভিন্ন সড়ক নিয়ন্ত্রণে নেয়ার মাধ্যমে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর এবং সাথে ঢাকার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং যশোরের সাথে নাটোর ও রাজশাহীর যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়।

চৌদ্দগ্রাম, চৌয়ারা, পাকিস্তানিদের শক্ত ঘাঁটি সুলতানপুর মুক্ত করে মুক্তিযোদ্ধারা আখাউড়া অবরোধ করে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৫৭ ডিভিশন মুক্তিবাহিনীর সাথে আখাউড়া যুদ্ধ ক্ষেত্রে যোগ দেয়। মিত্রবাহিনীর সাথে মুখোমুখি যুদ্ধে টিকতে না পেরে আত্মসমর্পণ করে হানাদারেরা।

মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলা ১৯৭১ সালের এই দিনে হানাদার মুক্ত হয়েছিল। হানাদারদের দখল মুক্ত হয় জামালপুরের বকশীগঞ্জ। মুক্ত হয় রংপুরের পীরগঞ্জ; লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা; পঞ্চগড়ের বোদা; দিনাজপুরের ফুলবাড়ী বীরগঞ্জ ও নবাবগঞ্জ। অন্যদিকে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর, দর্শনা ও ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে পাক হানাদার বাহিনী মিত্রবাহিনীর সাথে যুদ্ধে টিকতে না পেরে আত্মসমর্পণ করে।

এদিকে বিচ্ছিন্নভাবে পাকিস্তানি সেনাদের সাথে তুমুল যুদ্ধ হয় যশোরের চৌগাছা ও ঝিকরগাছার জগন্নাথপুর, গরীবপুর, আড়পাড়া, দিঘলসিংহা, ঢেকিপোতা, হুদোপাড়া, কদমতলা, মাশিলা, যাত্রাপুর ও সিংহঝুলি এলাকায়।

৮ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর মঞ্জুরের নেতৃত্বে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধারা জানান, জগন্নাথপুর আম বাগান এলাকায় দুই বাহিনীর প্রচণ্ড গোলাগুলির এক পর্যায়ে উভয় পক্ষের রসদ শেষ হয়ে যায়। মুক্তিকামী মুক্তিযোদ্ধারা তখন খালি হাতেই পাক সেনাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। অস্ত্রের বাট, বেয়নেট, কিল, ঘুষি, লাথি, এমনকি খালি হাতে কুস্তি লড়াই চলে তখন শত্রুকে পরাস্ত করতে।

এদিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত যশোর সেনানিবাস দখলে নেবার জন্য মরণপণ স্থল ও আকাশ থেকে হামলা শুরু করে যৌথ বাহিনী। আক্রমণের তীব্রতায় একপর্যায়ে যশোর সেনানিবাস ছেড়ে পালাতে বাধ্য শুরু করে পাকিস্তানি হানাদাররা।

বিজয়ের মাস/এসকেএম

http://artnewsbd.com

আর্ট নিউজ ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করতে:

https://www.youtube.com/channel/UCC2oLwZJYHIEygcbPX3OsWQ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *