প্রতিক্ষায় আমি
আলপনা শাহীন
আমাকে আজকাল আমারই বড় অচেনা লাগে;
বড় অপরিচিত মনে হয়।
মনে হয়-আমার ভিতর বাস অন্য এক সত্ত্বা!
আমার অস্তিত্বের শিকড়ে অন্য কারো বাস!
এই আমি তার কোন এক অপরাহ্নের ছায়া!
কোথা থেকে আসা আমার, কোথা গন্তব্য- কিছুই জানিনা!
অমাবস্যার অন্ধকারে ডুবে যাই হঠাৎ হঠাৎ!
আবার শুকতারা হয়ে দেখা দিই ভোর বেলা;
খবরের কাগজে যেমন বাসি খবরগুলো ছাপা হয়
তেমনি আমিও পরিত্যক্ত অতীত শ্যাওলা ভেসে চলি স্রোতের তোড়ে…
কখনো বিলে কখনো বদ্ধ জলাশয়ে,
কখনো মরা গাঙ্গের জমে থাকা জলে।
আমাকে আমার বড় অচেনা মনে হয়!
মনে ভাবি স্মৃতি হারানো কোন মনোরোগী মানুষ কি আমি!
আমার অতীত নেই, বর্তমান নেই,
ভবিষ্যতের কোন স্বপ্ন নেই!
স্বপ্ন ছাড়া কোন মানুষ কখনো কি নিজেকে মানুষ দাবি করতে পারে?
বেওয়ারিশ লাশের মতো পড়ে থাকি পৃথিবীর কোণে।
আমার কোন ঘরবাড়ি নেই কারোর ভেতরে!
গুমরে গুমরে মরে বিস্মৃত সব অতীত;
আমার কি অতীত আছে কিংবা ছিল কখনো?
আরশোলা উল্টে গেলে কখনো পারে কি উঠে দাঁড়াতে?
আমার নিজেকে আরশোলার মতো ঘিনঘিনে মনে হয়!
মাকড়সার মতো আটপেয়ে প্রাণীও ভাবি!
কারো সাথে মিলাতে পারিনা আমার আমিকে!
তবে কি ল্যাবরেটরির গিনিপিগ আমি?
আমাকে অন্য কেউ এক্সপেরিমেন্টের জন্য ব্যবহার করছে প্রতিক্ষণ!
যখন ঘুমাতে চাই ঘুমের মাসিপিসিরা থাকে অন্যসব কাজে মহাব্যস্ত।
যখন ইচ্ছেঘুড়ির ডানায় ভর করে সাধারন ইচ্ছেগুলোর খই ফুটাতে চাই;
তারা ছটফট করে না ফোটার যন্ত্রণায়!
সংসার সে তো এক দাসত্ব!
জীবনের পরতে পরতে ময়লা, আবর্জনার স্তুপ।
বিশ্বাসের বেলুন চুপসে গেছে অবিশ্বাসের ধর্ষণে, ঘর্ষণে!
প্রেম আর ভালোবাসা নামের
সোনার কাঠি আর রূপোর কাঠি হাইজ্যাক হয়ে গ্যাছে সেই কবে!
ধর্মের আফিম খাইয়ে চলছে অধর্মের সাপুড়ে খেলা,
নদী পাড় হতে দেখি কুমিরের পীঠে ভাসিয়েছি ভেলা।
আপনজনদের কাছে কুড়িয়েছি স্বার্থপরতার শীল-পাটা!
রাজনীতিতে দেখি বেলেল্লাপনা!
চরিত্রহীনের কাছ হতে নিতে হয় চরিত্রবানদের চারিত্রিক সনদ!
আপনজনের বুকে মাথা রেখে চেয়েছি যন্ত্রণাকাতর মনের উপশম!
পরিবর্তে খেয়েছি নাগিনের বিষাক্ত ছোবল!
রাষ্ট্র সমাজ ধর্ম ঠকায় বারবার আমায়।
আমি ক্ষয় হতে হতে, আমি ধ্বংস হতে হতে হারিয়েছি আমার বোধ,চিন্তন–সব।
আমি কষ্ট পাওয়া ভুলে গেছি।
হাসতে গিয়ে হাসি মেকি রোবটীয় হাসি!
আবেগের নৌকো চালাতে গিয়ে আটকে পড়ি নিরাবেগের চরে।
ঘর করতে গিয়ে দেখি আমি পড়ে আছি বেঘোরে,
অন্ধকার চৌকাঠে,বালাপোষে।
উল্টো আরশোলার মতো চিৎ হয়ে দেখি পৃথিবীর রূপ,
সম্পর্কের যতসব কদর্য স্বরূপ।
কৃত্রিম সব কলকব্জায় ঠাসা মানবিক বোধ!
জীবন নেয় জীবনের শোধ,
দ্বৈত সত্ত্বায় বিভোর মগজসব
আমার অস্তিত্বের ভেতর যাদের চাষবাস-
তাদের মনেহয় জীবন্ত লাশ!
আচ্ছা পৃথিবী কি মুমূর্ষূ কোন কঠিন অসুখে?
নাকি আমিই জ্বরাগ্রস্ত অবসাদ রোগী?
হলুদ চশমার ভেতর দেখি পৃথিবীর বুকে নিজের প্রতিচ্ছবি!
এভাবে আর কতদিন?
আর কতদিন সরিসৃপ হয়ে বুকে ভর দিয়ে চলতে হবে?
আর কতদিন লোনাজল খেয়ে বাঁচতে হবে নির্জন দ্বীপে?
আর কতকাল পর আমার একান্ত আকাশে উঠবে ঝকঝকে সোনালী রোদ্দুর?
আলোহীন, অন্ধ প্রকোষ্ঠে পেঁচার মতো লুকিয়ে সয়ে যাবো বিপরীত স্রোত?
আমার মুক্তি কি নেই? কীসে মুক্তি চাই?
চারদিকে শৃংখলিত আমি।
আমার নিজস্ব ভাবনার জগত নেই!
নেই কোন আপনজন!
চারদিকে আমার নিঃসঙ্গ এক নিরুদ্বিগ্ন বন।
একা হেঁটে ক্লান্ত আমি উদ্দেশ্যহীন পথ পাড়ি দিয়ে হবো নিরুদ্দেশ।
কোথায় বসত বাটি আমার কোথায় আপন দেশ?
কোথায় সে জন!
যার স্পর্শে জেগে উঠবে আমার কাম, অভিমান, আদিমতা সারি সারি।
কখন আসবে সে সময়?
আমার জগত সাতরঙা আলোয় নেচে উঠবে গেয়ে উঠবে?
কালের পরিক্রমায় অস্তিত্বের শ্বেত বিন্দু দিয়ে গড়বো আমার আপন সিন্ধু।
আমি প্রতীক্ষায় আছি, প্রতীক্ষায় থাকি।
হে অনাগত ভবিষ্যত; দোহাই তোমার,
আমায় দিওনা আর ফাঁকি।
















Leave a Reply