অধ্যাপক গাজী সালেহ উদ্দিনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা

৭ আগস্ট ২০২১ (রহমান মুস্তাফিজের মন্তব্য প্রতিবেদন): অধ্যাপক ডক্টর গাজী সালেহ উদ্দিন। বীর মুক্তিযোদ্ধা। শহীদের সন্তান। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষক শুক্রবার রাতে চিরবিদায় নিলেন। অধ্যাপক গাজী সালেহ উদ্দিনের সাথে আমার পরিচয় ২০০৭ সালের নভেম্বরে। গত ১৪ বছরে দেখা হয়েছে অসংখ্যবার। ফোনেও কথা হতো। করোনাকালে যোগাযোগটা বন্ধ হলো।

২০০৭ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রাম গিয়েছিলাম মুক্তিযুদ্ধের ওপর কিছু বিশেষ রিপোর্ট তৈরির কাজে। আমি তখন চ্যানেল আইতে কাজ করি। যাওয়ার আগে কিছু তথ্য সংগ্রহ করলাম। কোন কোন বিষয়ে নিউজ করবো সে বিষয় চূড়ান্ত করলাম। যে বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করবো সেগুলোর সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ কররাম। কনটাক্ট পারসন ঠিক করলাম। তাদের সাথে যোগাযোগ করলাম।

চট্টগ্রামে গিয়ে যে বিষয়গুলো নিয়ে নিউজ করবো বলে ঠিক করলাম,তার একটি ছিল শহীদ বুদ্ধিজীবী আবু করিম হত্যাকাণ্ড। ১৯৭১ সালে আল-বদর বাহিনী এই রেলওয়ে কর্মকর্তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। পাহাড়তলী বধ্যভূমিতে তারা নিরীহ বাঙালিদের জবাই করে হত্যা করার পর গান পাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় মরদেহ।

আবু করিমকে যেদিন হত্যা করা হয়, সেদিন বর্ধভূমির কাছে একটি ট্রেন থামিয়ে যাত্রীদের নামানো হয়েছিল। যাত্রীদের অধিকাংশকেও হত্যা করা হয় তলোয়ার দিয়ে জবাই করে। লাশের স্তুপ জমেছিল বধ্যভূমিতে।

২০০৭ সালের নভেম্বরের সকালে পৌঁছেছিলাম পাহাড়তলী রেল কলোনীতে। সেখানে এক দফা সাক্ষাতকার ধারণ করি অধ্যাপক গাজী সালেহ উদ্দিনের। তারপর যাই বধ্যভূমিতে। বধ্যভূমিতে আরও কিছু কথা ধারণ করা হলো। এরপর ফিরে আসি।

৩৬ বছর কিছু কষ্ট মনের মাঝে লালন করছিলেন তিনি। ক্যামেরার সামনে অকপটে বললেন সেসব কথা। জানালেন, তার বড়ভাই ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে। চাকরি করতেন এয়ারফোর্সে। দেশে এসে আর ফিরলেন না কর্মক্ষেত্রে। যোগ দিলেন মুক্তিযুদ্ধে

সালেহ উদ্দিন জানালেন, প্রথমে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কয়েকজন এলো। তারা বড়ভাইকে না পেয়ে চলে গেল। যাওয়ার আগে বলে গেল বড়ভাই যেন শিগগিরই করাচি গিয়ে কাজে যোগ দেন।

এরপর আল বদররা এলো। তারা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়া বড়ছেলের খোঁজে এসে ধরে নিয়ে গেল বাবাকে। তারপর বাবা আর ফিরে আসেননি। শুনেছি, তাকে বধ্যভূমিতে নিয়ে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে।

তিনি বলে চলেন, বাবাকে হারিয়ে আমরা বিমর্ষ হয়ে পড়ি। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন বাবা। বড়ভাইয়ের ছিল নতুন চাকরি। সেখানেও ফেরার কোন কারণ নেই। চলে গেছেন যুদ্ধে। মা আর ছোট ছোট ভাই-বোনদের নিয়ে খুব দুঃশিন্তা হচ্ছিল। বাবার একজন অবাঙালি বন্ধু পরামর্শ দিলেন, ডবলমুরিং থানায় অজ্ঞাতনামা লাশ আছে। যে কোন একটি লাশকে বাবার লাশ হিসেবে শনাক্ত করলে ক্ষতিপূরণ হিসেবে টাকা পাওয়া যাবে। সে টাকায় কিছুদিন চলবে। ততদিনে অন্যকোন ব্যবস্থা করা যাবে।

প্রথমে মন সায় দেয়নি। কিন্তু অন্য উপায়ও নেই। তাই বাবার সেই বন্ধুকে নিয়েই থানায় গেলাম, বলছেন গাজী সালেহ উদ্দিন। চোখের কোণে ততক্ষণে পানি জমেছে। চোখ মুছে আবার বলতে শুরু করলেন, তিনটি লাশ মেঝেতে রাখা। সবই গুলি খাওয়া। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত। তারমানে এরা স্বাধীনতাবিরোধী। বাবার বন্ধু আর থানার ওসি তাগাদা দিলেন লাশ শনাক্ত করতে। একটি লাশের দিকে হাত তুললাম।

থানা থেকে শনাক্ত করা লাশটি হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হলো। বাবার নামে ডেথ সার্টিফিকেট দেয়ার বিনিময়ে ডাক্তার দুইশ’ টাকা দাবি করলেন। বললাম, টাকা নেই। ক্ষতিপূরণের টাকা পেলে দিয়ে যাবো। তিনি রাজী হলেন। লিখে দিলেন ডেথ সার্টিফিকেট।

অধ্যাপক ডক্টর গাজী সালেহ উদ্দিনের বাবা শহীদ বুদ্ধিজীবী আবু করিমকে নিয়ে প্রামাণ্য নাটকের শ্যুটিংয়ের ছবি। এতে অভিনয় করেন সৈয়দ হাসান ইমাম ও খায়রুল আলম সবুজ-সহ অন্যরা।
ছবি: আর্ট নিউজ

যেহেতু এটা বাবার লাশ না, তাই কলোনীতে আনার ঝুঁকি নিলাম না। কেউ চিনে ফেলতে পারে। হাসপাতালের ডোমকে বললাম গোসল করিয়ে দিতে। ডোম ৫০ টাকা দাবি করলেন। তাকেও বললাম, ক্ষতিপূরণের টাকা পেলে শোধ করবো।

অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির লাশটি কলোনী থেকে দূরেই দাফন করা হলো। তারপর ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে ক্ষতিপূরণের টাকা তুললেন। সেই টাকা থেকে ডাক্তার ও ডোমের বকেয়া ‘ঘুষ’ শোধ করলেন। বাকি টাকা নিয়ে মা আর ছোট ভাই-বোনদের গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। বড়ভাই আগেই মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। তারপর তিনিও তার ছোটভাইকে নিয়ে চলে গেলেন যুদ্ধে।

তিনি যখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন, তখন দু’চোখ বেয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। জানালেন, সব কথা এতোগুলো বছর বুকে চেপে রেখেছিলেন। আরেকজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের সামনে সব বলে হালকা হলেন।

২০১০ সালে শহীদ আবু করিমের অন্তর্ধান ও পরের ঘটনাগুলো নিয়ে একটি প্রামাণ্য নাটক নির্মাণ করি। মূলত, এই কাহিনী শুনে বাংলাদেশ টেলিভিশনের সে সময়ের মহাপরিচালক আবু জাফর সিদ্দিক (প্রয়াত) এটি নিয়ে প্রামাণ্য নাটক নির্মাণ করার অনুরোধ জানান।

বিটিভি মহাপরিচালকের অনুরোধে ‘ক্ষতিপূরণ’ নাম দিয়ে নির্মাণ করি প্রামাণ্য নাটক। তাতে অভিনয় করেন সৈয়দ হাসান ইমাম, খায়রুল আলম সবুজ, লায়লা হাসানের মত বরেণ্য সিনিয়র শিল্পীরা। আরও অভিনয় করেছিলেন ছড়াকার আসলাম সানী ও আবৃত্তিকার শাহাদাৎ হোসেন নিপু। শহীদ আবু করিমের চরিত্রে অভিনয় করেন সৈয়দ হাসান ইমাম। গাজী সালেহ উদ্দিনের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শাহাদাৎ হোসেন নিপু।

এই প্রামাণ্য নাটকটি এখনও আটকে আছে বিটিভি’র প্রিভিউ কমিটিতে। গত ১১ বছরে অনেকবার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, কিন্তু কোন এক অদৃশ্য কারণে এটি আজ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। অধ্যাপক গাজী সালেহ উদ্দিনও চেষ্টা করেছিলেন। কাজ হয়নি। অবশ্য ‘বাড়তি কিছু টাকা খরচ না করলে এটি কখনও আলোর মুখ দেখবে না’ বলে বিটিভি সংশ্লিষ্ট কয়েকজন আকারে ইঙ্গিতে জানিয়েছিলেন।

এই প্রামাণ্য নাটকটির শ্যুটিং হয়েছিল পাহাড়তলী বধ্যভূমি, ১৯৭১ সালে তারা (গাজী সালেহ উদ্দিনের পরিবার) কলোনীর যেই বাসায় ছিলেন সেখানে এবং ডবলমুরিং থানার পুরনো ভবনের সামনেসহ আশপাশের এলাকায়। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত গাজী সালেহ উদ্দিন এবং তার আরেক সহোদর আমাদের সাথে ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে আমার লেখা ‘যুদ্ধ দিনের কথা’ বইয়ে গাজী সালেহ উদ্দিনের জবানিতে তার বাবা শহীদ আবু করিমের নিরুদ্দেশ হওয়ার ঘটনাটি লিখি। সেই বইয়ের প্রকাশনা উৎসব হয়েছিল পরিবাগের সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে। সেক্টরস কমান্ডারস ফোরামের নেতাদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ডক্টর গাজী সালেহ উদ্দিন, কুষ্টিয়ার বীরাঙ্গণা রাবেয়া ও কুমিল্লার লাকসাম রেলওয়ে জংশনের মেকিকেল স্টোরের ক্লিনার ছিদাম দাস।

আরও পড়ুন: বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী সালেহ উদ্দিন আর নেই

এরপরও অধ্যাপক সালেহ উদ্দিনের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তিনি ঢাকায় এলে, অথবা আমি চট্টগ্রাম গেলে আমাদের দেখা হতো। টেলিফোনের যোগাযোগতো ছিলই। কয়েকবার তিনি টকশোতে এসেছিলেন আমার অতিথি হয়ে।

গত কয়েক বছর তিনি জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন খেলাঘরের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। আমৃত্যু তিনি এ পদে দায়িত্ব পালন করে গেছেন নিষ্ঠার সাথে।

তার সন্তানের বিয়েতে দাওয়াত দিলেন। বললেন, আসতেই হবে। এতোটা দাবি নিয়ে কথা বলার মত সম্পর্ক আমাদের মাঝে তৈরি হয়েছিল। তাই আজ সকালে যখন সালেহ উদ্দিন ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদটা পেলাম, বিষন্নতা গ্রাস করেছে। সকাল থেকে দফায় দফায় চেষ্টা করেও সন্ধ্যার আগে লিখতে পারলাম না একটি শব্দও।

যেখানে থাকুক, ভালো থাকুক বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ডক্টর গাজী সালেহ উদ্দিন।

শোকগাথা/এএমএম/রমু

http://artnewsbd.com

আর্ট নিউজ ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করতে:

https://www.youtube.com/channel/UCC2oLwZJYHIEygcbPX3OsWQ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *