২৩ ডিসেম্বর ২০২১ (নিউজ ডেস্ক): সুরের বরপুত্র শহীদ আলতাফ মাহমুদের ৮৮তম জন্মদিন আজ। ১৯৩৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর বরিশালের মূলাদি থানার পাতারচর গ্রামে তার জন্ম। জন্মের পর পরই মা কদবানু মানসিক ভারসাম্য হারালে মায়ের আদরবিহীন সংসারে বাবা এএম নেজাম আলির আদরে বেড়ে ওঠেন পরিবারের একমাত্র পুত্র ঝিলু, আমাদের আলতাফ মাহমুদ। একটু বড় হতেই তিনি সুরের মাঝে আনন্দের খোঁজ পান। গান বাঁধেন, গেয়ে বেড়ান গ্রাম গ্রামান্তরে। ১৪ বছর বয়সে নির্বাচনের জন্য গান বেঁধে সেই বয়সেই নিজের রাজনৈতিক সচেতনতার পরিচয় দেন।
১৯৪৮ সালে বরিশাল জেলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাশ করে ব্রজমোহন কলেজে ভর্তি হন। এইচএসসি পাসের পর তিনি কলিকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হন।
১৯৫০ সালে আলতাফ মাহমুদ ঢাকায় এসে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন ধুমকেতু শিল্পী সংঘে যোগ দেন। পরবর্তীতে তিনি এ সংগঠনটির সংগীত পরিচালক পদে আসীন হন।
১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের জনমত গঠনে ১৯৫০ সাল থেকেই মাঠে প্রান্তরে গণসঙ্গীত গেয়ে মানুষকে সংগঠিত করেন আলতাফ মাহমুদ। তিনি আবদুল গাফফার চৌধুরীর লেখা কালজয়ী কবিতা ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’তে প্রাণস্পর্শী সুরারোপ করেন। তার এই সুর বাংলার মানুষের এক শাশ্বত পরিচয়। অমর সুরস্রষ্টার এই কালজয়ী সুর পরবর্তীতে চলচ্চিত্রকার শহীদ জহির রায়হান তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’য় চিত্রায়িত করেন।
১৯৫৪ সালে ‘ভিয়েনা শান্তি সম্মেলনে’ আমন্ত্রণ পেয়ে করাচি যান। সেখানে তার পাসপোর্ট আটক করা হয়। ফলে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত তিনি করাচিতে অবস্থান করেন। সেসময়ে তিনি উচ্চাঙ্গসংগীতের তালিম নেন ওস্তাদ আব্দুল কাদের খাঁ- এর কাছে। তিনি নৃত্য পরিচালক ঘনশ্যাম এবং সঙ্গীত পরিচালক দেবু ভট্টাচার্যের সহকারী হিসেবে কাজ করেন। ঢাকায় ফিরে সে সময়ের ব্যবসাসফল প্রায় সব চলচ্চিত্রে তিনি সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। ১৯টি চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। বহু জনপ্রিয় গানের সুরস্রষ্টা শহীদ আলতাফ মাহমুদ।
মুক্তিসংগ্রামের জন্য যে সাংস্কৃতিক আন্দোলন হয় পঞ্চাশের দশক থেকেই তার পুরোধা ব্যক্তিত্ব আলতাফ মাহমুদ। হাটে মাঠে ঘাটে কখনও হেঁটে, কখনওবা নৌকায় চড়ে তিনি সহযোদ্ধাদের সাথে চষে বেড়িয়েছেন বাংলার প্রতিটি জনপদ। আলতাফ মাহমুদ, নিজামুল হক আরও বিপ্লবী সংস্কৃতজন ছিলেন এই দলে।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সম্প্রচার শুরু হলে আলতাফ মাহমুদ গান রেকর্ড করে স্পুলগুলো গোপনে সেখানে পাঠাতেন। তার সুরারোপিত অনেক গানই তখন প্রচারিত হলেও আলতাফ মাহমুদের নাম সেখানে উল্লেখ করা হয়নি।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ক্র্যাক প্লাটুনের মূল পরিকল্পনার অন্যতম ব্যক্তি ছিলেন আলতাফ মাহমুদ। তিনি যোদ্ধাদের নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেন। অস্ত্র লুকিয়ে রাখা এবং সরবরাহ করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন নিজের ও পরিবারের জীবনের ঝুঁকির বিষয় তোয়াক্কা না করেই। এক সহযোদ্ধা পাকিস্তানি আর্মির নির্যাতনের মুখে বলে দেন আলতাফ, রুমি বদিসহ অন্যান্য সহযোদ্ধাদের নাম ও অবস্থান।
সেই ব্যক্তিকে সাথে নিয়ে ৩০ আগস্ট ভোরে আলতাফ মাহমুদকে দিয়ে বাসার পিছনের মাটি খুঁড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য লুকিয়ে রাখা অস্ত্র বের করে আলতাফ মাহমুদসহ সারা আরা মাহমুদের পাঁচ ভাইকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। ভাইয়েরা ছাড়া পেলেও ছাড়া পাননি আলতাফ মাহমুদ। অকথ্য নির্যাতনেও একটি কথাও বলেননি তিনি। বলেননি কোনও সহযোদ্ধার নাম, ঠিকানা বা কোনও পরিকল্পনা। ফ্যানে ঝুলিয়ে পেটাতে পেটাতে চোখ আহত করে ফেলে। নখ উপড়ে ফেলে। ভাত খেতে গিয়ে নখের রক্তে ভাত হয়ে যায় লাল। সেই রক্ত লাল ভাতের সাথে তিনি সবুজ কাঁচামরিচ চেয়েছিলেন। সেদিন সেই কনসানট্রেশন ক্যাম্পেও রচিত হয় লাল সবুজের বাংলাদেশ। হারিয়ে যান আলতাফ মাহমুদের সাথে শত সহস্র মুক্তিযোদ্ধা। তাঁদের খোঁজ পাওয়া যায়নি। তাঁরা আজও সেই টগবগে তরুণই রয়ে গেছেন আমাদের হৃদয়ে।
আলতাফ মাহমুদ ও তার সঙ্গীরা হারিয়ে গেছেন বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্য। তাদের রক্তে আঁকা আমাদের লাল-সবুজের পতাকা।
অমর সুরস্রষ্টা আলতাফ মাহমুদের জন্মদিনে আর্ট নিউজ পরিবারের পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধা।
আলতাফ মাহমুদ/টিটি/আরএম
আর্ট নিউজ ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করতে:
















Leave a Reply