সিদ্ধান্ত

শারমিন আফরোজ বন্যা: কফি শপ টপে আড্ডা ওর ভালো লাগে না। খামোখা টাকা নষ্ট, এমনটাই মনে হয় ওর। কফির ওপর ভেসে থাকা হার্টটার দিকে তাকিয়ে থাকে সে অনেকক্ষণ। পে করা বিলটা সার্ভিং ট্রের পাশে পরে আছে। সে কুন্ঠিতভাবে আড়চোখে দেখে, টাকার সংখ্যাটা চার ডিজিটে। যদিও সে জানে বিল নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনো দরকারই তার নেই। তার বাকি বন্ধুরা এমন হাজার খানেক টাকা নিয়ে মাথা ঘামায় না। কিন্তু তাকে ভাবতে হয়।

ক্রিমসন কাপ কফি শপের ধানমন্ডি শাখাটা বন্ধ। রুবির মোটেই স্বস্তি হচ্ছে না। চারজনে যে টেবিলটা পেয়েছে সেটা রুমের মধ্যখানে। ন্যারো পেসেজটাতেই কিছু লাইট আর কাঠের কাজ করে ছবি তোলার উপযোগী করে তুলেছে। আগের মতো সোজাসুজি দাঁড়িয়ে ছবি তোলার দিন আর নাই। এখন সব বয়সী মানুষেরাই শরীরকে নানা ভঙ্গিতে বাঁকা করে ছবি তোলে। এখানেও তাই চলছে। কে কি ভাবল সেটা নিয়ে কারো মাথা ব্যথা নেই। রুবিরাও ইতোমধ্যে উঠে গিয়ে দু’দফা ছবি তুলে এসেছে। রুবির মানা কেউ শোনে নি। বরং ছবি তুলতে রাজি হচ্ছিল না বলে মিনার কাছে ঝারি খেয়েছে সে।

শুরু থেকেই মিনার মেজাজটা তেঁতে আছে। অফিস থেকে বের হবার আগে তার হাসবেন্ডকে ফোন দিয়ে বলতে চেয়েছিল, তার ফিরতে আজ দেরি হবে… কিন্তু ফোন দিয়ে উল্টো জেনেছে সে ক্লাবে আছে, ডিনার সেরে ফিরবে, মিনা যেন খেয়ে নেয়। ইদানিং ভদ্রলোক সবকিছু খোলামেলাভাবে করছে। ব্যবহারে স্পষ্ট ঔদ্ধ্যত্ব। মিনা দাঁতে দাঁত চেপে নির্লজ্জ হয়ে জানতে চেয়েছে, ‘কে কে আছো?’ সে উত্তর না দিয়ে কুৎসিতভাবে হেসেছে। অন্য কেউ হলে হয়ত বন্ধুদের সাথে আজ আর মিট করত না। কিন্ত মিনা পারে, একসাথে সবকিছু সুচারুভাবে করতে। রাগ, দুঃখ, কান্নাকে চেপে রেখে তারমতো উচ্চকিত হাসি খুব কম মানুষ হাসতে জানে। হাসতে হাসতে তার চোখের কোনায় যে জল জমে, সেটা যে কান্না তা বেশিরভাগেরই অজানা। এখনো সেই সবচেয়ে বেশি হাসছে, একটু পরপর জলিকে ফোন দিয়ে গালাগাল দিচ্ছে, ‘নতুন বর রেখে আর বেরুতে ইচ্ছা করে না বুঝি? সব অফিস থেকে এসে বসে রয়েছি, আর তুই শালা বাড়ি থেকে সেজেগুজে বেরুতেই সন্ধ্যা করে দিলি!’ ফোনে কথা বলতে বলতেই জলিকে ঢুকতে দেখা যায়। পিছনে পিছনে জলির গাড়ির ড্রাইভার আসে একটা মিস্টার বেকার্স এর কেকের বাক্স হাতে।

দ্বিতীয় বিয়ের পর, জলির রুপ যেন ঠিকরে পরছে। ‘দুধে-আলতা গায়ের রং বোধহয় একেই বলে’ মিষ্টি মনে মনে ভাবে। সে নিচু স্বরে বলে, ‘জলিটা বিয়ের পর আরো সুন্দর হয়েছে।’ সুর শুনে মনে হয় মিষ্টি যেন একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস আড়াল করে। মিস্টি গত সপ্তাহে দেশে ফিরেছে, হঠাৎই। স্বামীর সাথে বনিবনা হচ্ছিল না বিয়ের পর থেকেই। অদ্ভুত রোবটিক একজন মানুষ। তার সবকিছু স্বাভাবিক, কেবল শরীরের প্রয়োজন নেই। মিষ্টি খুব চেষ্টা করেছে। মানসিক ভালোবাসা দিয়ে একটা সহজ সম্পর্ক তৈরি করে একটু একটু করে শরীরের কাছে পৌঁছাতে চেয়েছে। কিন্তু সেই মানসিক সম্পর্কটাই কেমন যেন একটা বাণিজ্যিক দূরত্বে থেমে গেছে বার বার। অফিস আর বাড়ি। বাড়ি আর অফিস। মাঝে মাঝে উইক এন্ডে বেড়িয়ে পরা, বন্ধুদের পরিবারের সাথে। খুব হৈ হুল্লোড়, খাওয়া দাওয়া গান বাজনা, পাশাপাশি বসে থেকে বন্ধুর মতো গল্প গুজব। সে সব আড্ডাতেও, সুক্ষভাবে লক্ষ্য করলে বোঝা যেত, অর্থনীতি, কম্পিউটার, সফট্ওয়্যার ইত্যাদি টপিকসে তার সাবলীল অংশগ্রহণ, কিন্তু নারী নিয়ে বন্ধুদের রসিকতায় তার নির্লিপ্ততা। আর বাড়ি ফিরেই একটা মুখোশের আড়াল।  দেখতে দেখতে দুবছর পেরিয়ে গেছে, মাঝে মাঝে মিষ্টির ইচ্ছায় এক হয়েছে তারা। কিন্তু পুরো ব্যাপারটায় ভদ্রলোকের একটা স্পষ্ট ঘেন্না টের পাওয়া যেত। মিষ্টি বিষয়টা নিয়ে অনেকবার সাইকোলজিস্টের কাছে যেতে চেয়েছে, তাকে রাজি করাতে পারেনি। দুজনের সমঝোতায় শেষ হলো এতোদিনের সম্পর্ক। মনটাকে নতুন করে তৈরি করার জন্য একটা পরিবর্তন দরকার ছিল। মিষ্টি তাই একটা ব্রেক নিতেই দেশে এসেছে। এসেই স্কুল জীবনের কাছের বন্ধুদের ডেকেছে কফি ফলোড বাই ডিনারের জন্যে।

চারজন সম্পূর্ণ ভিন্ন মানসিকতা আর পরিবেশের মানুষের এই প্রাণের বন্ধুুত্ব বড় বিস্ময়কর লাগে রুবির। রুবির মনে হয়, স্কুল লাইফের বন্ধুত্ব বোধ হয় এমনই। তখন কে ডাক্তার কে ইঞ্জিনিয়ার, কে প্রতিষ্ঠিত আর কে নয় এসব বিষয়গুলো প্রাধান্য পায় না। মন খুলে গল্প করবার বা খেলবার মিলটাই কাছে টানে। খুব বই পড়ত ওরা চারজনই। এই বই-ই তাদের কাছে এনেছিল। প্রথমে বই আদান-প্রদান, তারপর বোধের। এবং সম্পর্কটার নিয়মিত চর্চার প্রয়োজন হতো না। একটা দীর্ঘ সময় পরপর দেখা হলেও সেই পুরনো ভালোবাসা পরস্পরকে ছুয়ে যেত।

তারা চারজনে কফিতে চুমুক দেয়। টেবলটা নিঃশব্দ। এতোক্ষণে তারা সবাই জেনেছে মিষ্টি কেন তার স্বামীকে ছেড়ে এসেছে। তাদের মধ্যে ডিভোর্স এখনো হয়নি। সেপারেশনের সময়টা চলছে। মিনাই প্রথম নীরবতা ভাঙে, ‘ধুর! এইসব নিয়ে পরে থেকে সন্ধ্যাটা নষ্ট করে লাভ নেই। চল এখান থেকে উঠে পরি। আয় মিষ্টিকে দেখাই বাংলাদেশেও বই পড়ার কতো সুন্দর পরিবেশ তৈরি হয়েছে।’

কেকের বাকি অংশটা ক্যাফের একটা প্যাকে করে নিয়ে বেড়িয়ে আসে ওরা। সবাই জলির গাড়িতে ওঠে, বেঙ্গল শিল্পালয় কাছেই। সবগুলো গাড়িকে টানার দরকার নেই।

গ্যালারিতে ঢুকে ওদের চারজনেরই মন ভালো হয়ে গেল। করোনার কারণে দশজনের বেশি একসাথে ঢোকা যায় না। তাতে আরো মজা হলো। শিল্পী মর্তুজা বশিরের কাজ নিয়ে তিনমাস ব্যাপি প্রদর্শনী। শব্দহীন একসঙ্গে হাঁটার মধ্য দিয়ে হৃদয়ের উষ্ণতা আদান-প্রদান করে চল্লো চারজন। তারা জানে, রুবির বায়িং হাউজ ৩০% বেতন কেটে নিচ্ছে। স্বামী মারা যাওয়ার পর বাচ্চাদুটোকে নিয়ে এমনিতেই টানাটানিতে দিন চলে। ছোট্ট একটা ফ্লাট ভাড়া নিয়ে, বাচ্চাদের সরকারি স্কুলে পড়িয়ে, খাওয়া আর রাস্তাভাড়া চালাতে সে হিমশিম খায়। অফিসের ড্রেসকোড বজায় রাখতে দু’একটা ভালো জামাকাপড় বানাতে হয়, মাঝে মাঝে পার্লারে গিয়ে একটা ফ্যাসিয়াল নেওয়া,  চুলটাকে লেয়ারে কাটা। নাহলে সমাজে বড় অপদস্ত হতে হয়।

প্রায়ই জলি ফোন দিয়ে বলে, ‘রুবি রেডি থাক, তুলে নিচ্ছি, একটু চুল কাটব!’

তারপর রুবিকেও পাশের চেয়ারে বসিয়ে দেয়। চুল কাটা, ভ্রু প্ল্যাক, থ্রেডিং। বিল কাউন্টারে ওকে যেতেই দেয় না। মুখে বলে, ‘দাঁড়া, আমার ডিসকাউন্ট কার্ড আছে।’

মিষ্টি যে কতো কি পাঠায় তার জন্য। কসমেটিক, ভিটামিন, আন্ডার-গার্মেন্টস, জুতা, ব্যাগ!

আজও কেকের অবশিষ্ট গাড়িতে উঠেছে মিনার তদারকিতে, যাবার সময় সেটা রুবির হাতে ধরিয়ে দেওয়া হবে, ‘বাচ্চাদুটাকে দিস!’ বলে।

তাদের পরস্পরের হৃদয়ের সুর পরস্পরের চেনা।

গ্যালারি ঘুরে, বুকশপটা দেখে ওরা রেস্টুরেন্টে এসে বসলো। মিনাই উঠে গিয়ে দুজোড়া সিঙারা আর দুজোড়া আলুর চপের অর্ডার দিল। আর চারটা রং চা। তার কাছে এগুলোকে এখানকার সিগনেচার আইটেম মনে হয়। রুবি আর সে খাবারগুলো নিয়ে টেবিলে ফিরে দেখল জলি আর মিষ্টির মধ্যে ডিভোর্স আর পরবর্তী বিয়ের জীবন নিয়ে কথা চলছে।

জলির বক্তব্য হলো, ‘ভালো থাকবার চেষ্টাতো করতে হবে।’

জলি বলে চলেছে, ‘না, তোরা আমার বিষয়টাই দেখ। সারাজীবন বিত্ত আর বৈভবের মধ্যে বেড়ে ওঠা আমাকে একজন মেধাবী শিক্ষকের কাছে বিয়ে দিল। কি! যে তোমার পয়সা আছে আর ওর শিক্ষা!  কতোবড় ভুল। কাগজের শিক্ষা আর প্রতিদিনের জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে শিক্ষায় যে এতো বড় ফারাক, ওদের সংসারে না গেলে আমি বুঝতে পারতাম না। যৌথ পরিবার বা বড় পরিবারগুলোতে বিবাহিত জীবন শুধু স্বামী-স্ত্রীতে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেখানে প্রত্যেকের দৈনন্দিন অভ্যাসগুলোও অন্যের জীবনকে প্রভাবিত করে। প্রতিদিন, প্রতিটা মুহুর্ত সমস্যা হচ্ছিল। দুজনের একজনও ভালো ছিলাম না।’

মিষ্টি জানতে চাইল, ‘এখন ভালো আছিস?’

জলি কিছুক্ষণ ভাবলো উত্তর দিতে। তারপর অনেকটা স্বগতোক্তির মতো বল্লো, ‘জানি না। এখনও জানি না। তবে দুজনার বেড়ে ওঠার পরিবেশ একরকম, তাই ছোটখাট বিষয়ে অমিল কম। বরং মিলই বেশি। এখন সম্পর্কের সততাটুকু থাকলে হয়ত খারাপ থাকবো না!’

রুবি ওর কথার পিঠে বলে, ‘তুই এটা খুব ঠিক বলেছিস। দেখ আমার বিবাহিত জীবনটা খুব ছিমছাম ছিল। কেন জানিস? জলি যেটা বল্লো। আমাদের দুজনার বেড়ে ওঠার পরিবেশও একরকম ছিল। সাধারন মধ্যবিত্ত। সাথে বাড়িতে পড়াশোনার আবহাওয়া। ছোট পরিবার। খুব সুন্দর গুছিয়ে নিয়েছিলাম। সেই সাথে সম্পর্কের সততার কথা যেটা বল্লি। সারাদিন ভালোবাসার মাখামাখি ছিল না, কিন্তু আমি যেমন ওকে ছাড়া কিছু ভাবতে পারতাম না, ও ঠিক তেমন ছিল। আমার বিশ্বাস সে অর্জন করেছিল। কত রাত পাশাপাশি শুয়ে শুধু গল্প করে কেটে গেছে…!’ রুবির গলা ধরে আসে, গাল বেয়ে টপটপ করে পানি পরে…।

আবার নিঃশব্দতা ঘিরে ধরে।

রুবিই কথা বলে আবার, ‘আমায় আটটা নাগাদ ছেড়ে দিতে হবে। আমি গিয়ে বাচ্চাদের খেতে দেব।’

ওরা উঠে পরে। দু’বার সামান্য খেয়ে সবার পেট ভরে আছে। তাই ওরা একটা সহজ মেনুর খোঁজে ধানমন্ডি সাতাশের রাস্তাটায় গাড়িটা নিয়ে আসে, সিএফসি’র সামনে নেমে পরে ওরা। মিষ্টি ৬টা খাবারের অর্ডার দেয়, দুটো হোম ডেলিভারি, রুবির জন্যে। এসব বিষয়ে রুবিকে এরা কথা বলতেই দেয় না।

টোকেন নিয়ে ওরা ফাঁকা রেস্টুরেন্টের রোডসাইড টেবিলটাতে বসে। টেবিলে বসেই মিনা জানতে চায়,’তাহলে তোরা বলতে চাচ্ছিস সম্পর্কের সততা দাম্পত্য জীবনে মাস্ট?’

রুবি আর জলি দু’জনেই একসাথে উত্তর দেয়, ‘না, সফল দাম্পত্য জীবনের জন্য মাস্ট।’

মিনা বলে, ‘তাহলে একজন মানুষের কি করা উচিত, যখন এই সততাটুকু না থাকবে?’

এবার তিনজনে ইকো হয়, ‘সুযোগ থাকলে সেই সম্পর্ক থেকে অতি দ্রুত বের হয়ে আসা উচিত।’

মিনা বলে, ‘তাহলে আমাকেও বের হতে হবে।’ বলে বন্ধুদের উদ্দেশ্যে হা হা করে হেসে ওঠে।

ওরা তিনজনই চমকে তাকায় মিনার দিকে। মিনা বলতে থাকে, ‘আমিও তো একইরকম পরিবেশের মানুষের কাছে গিয়ে পরেছিলাম। দুজনার বাবাই বড় শিল্পপতি ছিলেন। তাদের রেখে যাওয়া ব্যবসাটা কেবল উপরে বসে দেখছি। শ্বশুর বাড়ির কারো কোন ইন্টাফেয়ারেন্স নাই। পরপর দুটো ছেলে হলো। হায়ার সেকেন্ডারি লেভেলেই তাদের বাইরে পড়তে পাঠিয়ে দিয়ে, আমি তাদের বাবার থেকে তাদের দুরে রাখলাম। কারণ, তিনি খুব ধীরে ধীরে সম্পর্কের সততা ফততাকে অস্বীকার করতে শুরু করলো। প্রথমে বিজনেস ট্যুরে প্রাইভেট সেক্রেটারি সাথে যেত, তারপর ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন স্টাফ এবং এখন নির্দিষ্ট একজন প্রায় কিশোরী বান্ধবী। আমি শুরুতে সরে যাইনি। সমাজের কাছে নিজেকে সুখি, সফল দেখানোর লোভে সব গোপন করতে চেয়েছি, সব মেনে নিয়েছি। এখন কিছুই আর গোপন নেই। এখন নিজেকে পৃথিবী থেকে গোপন করে ফেলতে ইচ্ছা হয় প্রায়ই। শুধু বাচ্চাদুটোর কথা ভেবে…!’

শক্ত মিনা কাঁদে না। কিন্তু চারপাশের বাতাসে কান্নার শব্দ। ওরা চারজন পাথর হয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর মিষ্টি প্রথম কথা বলে।

‘আমি মনে করি না সময় শেষ হয়ে গেছে, বা এটাও মনে করি না তুমি এতোদিন ভুল করেছ। তুমি তোমার মতো করে চেষ্টা করেছ। সম্পদশালী বাবার কাছ থেকে ছেলেদের বঞ্চিত করতে চাওনি। মায়ের স্নেহ থেকেও বঞ্চিত করোনি। তোমার জায়গায় তুমি এখনো ঠিক আছো। কিন্তু এখন বোধহয় নিজেকে তৈরি করা উচিত তোমার। সবক্ষেত্রে ডিভোর্সই একমাত্র সমাধান নয়। তবে এইভাবে চলতে থাকলে, তুমি বাঁচবে না। চিন্তা করো, ছেলেদের নিয়ে বসো, ছেলেরা তোমাকে বুঝবার মতো যথেষ্ট বড় হয়েছে। এখনো সময় শেষ হয়ে যায়নি।’

মিনা জানতে চায়, ‘তোমরা কি মনে করো? আমার কি করা উচিত?’

জলি বলে, ‘তুমি কি তাকে ভালোবাসো এখনো? তুমি কি তাকে ফেরাতে পারবে? তোমাকে ছাড়া তার কি কোন অসুবিধা হবে? এই প্রশ্নগুলো নিজেকে করো। আমার নিজের কথা যদি বলি, সন্তান হয়ে গেলে আমি হয়ত ডিভোর্স নিতাম না। মানিয়ে চলতে চেষ্টা করতাম। সন্তান নাই বলেই চট করে আরেকটা বিয়েও করে ফেললাম। কারণ, আমার নতুন করে হারানোর কিছু নাই। কিন্তু রুবিকে দেখ। রুবি কিন্তু আরেকটা বিয়ে করার কথা ভাবেনি। মনের মধ্যে বেঁচে আছে ভালোবাসার মানুষ, সেই সাথে সন্তানের প্রতি দায়িত্ববোধ। তাই তোমার বিষয়টা তোমাকেই ভাবতে হবে। কতোটা বহন করতে পারবে, সেটার ওপর নিতে হবে পরবর্তী পদক্ষেপ। হয়ত তাকে ছেড়ে আসবার মতো সাহস তোমার নাই, হযত সমাজের বাকা দৃষ্টি সহ্য করার ক্ষমতা তোমার নাই…!’

এতোক্ষণে রুবি কথা বলে, ‘তোমাকে আরো সাহসী হতে হবে মিনা। এই অপমান তুমি নীরবে সহ্য করো না। তুমি শুধু ওর ঘর থেকে বেরিয়ে আসো আগে। ছেলেরা থাকুক বাবার দায়িত্বে। তোমার যোগাযোগের সবরকম সুযোগ তো রইলই। তোমার জন্যে তার ভেতরে যদি সামান্য ভালোবাসাও বেঁচে থাকে, সে হয়ত তোমার কাছে ক্ষমা চাইবে, পাল্টে নেবে নিজেকে, ফিরিয়ে নিতে চাইবে। আর যদি তা না করে, তাহলে পথ দুটো আলাদাই হোক। আমিও মিষ্টির মতোই মনে করি, ডিভোর্স এবং আরেকবার নতুন করে বিয়ে করা একমাত্র সমাধান নয়। বরং যখন তুমি বাচ্চার মা-বাবা, তাদের জীবন যেন নস্ট না হয় সেটা দেখাও ভীষণ জরুরী। পৃথিবীতে তুমিই তাকে এনেছ, নিজের সুখের কথা, তাও যে সুখের নিশ্চয়তা নাই তেমন সুখের জন্য তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে দেওয়ার অধিকার বাবা-মায়ের নাই!!’

কাউন্টারের এনাউন্সমেন্ট শোনা যায, তাদের টোকেন নাম্বার, পার্সেল রেডি। তারা উঠে দাঁড়ায়।

মিনার গাড়িতে রুবিকে তুলে নেয়। পথে ওকে নামিয়ে দিয়ে যাবে সে। সারাপথ চুপচাপ বসে থাকে দুজন। রুবির ডানহাত, মিনার বাঁ হাতের ওপর পরে আছে। বাড়ির কাছাকাছি এসে রুবিকে মিনা বলে, ‘দোয়া করিস। আজ একটা ডিসিশন নিয়ে নিব।’

বাড়িতে ঢুকে মিনা একটা মেসেজ টাইপ করে, কিন্তু সেন্ট করে না। নিজের লাগেজটা গোছায়। মুল্যবান জিনিসপত্রগুলো ঢুকিয়ে আর জরুরী কিছু রইল কিনা ভাবে। তারপর মেসেজটা সেন্ট করে নিজের গাড়ি আর ফ্লাটের চাবি নিয়ে বেরিয়ে আসে!! আজ বোধহয় জ্যোৎস্না! সারা আকাশ জুড়ে পুর্ণচাঁদের আলো চকচক করছে!! আজ বহুদিন পর, সিদ্ধান্ত নিতে পেরে, নিজেকে অনেক ভারশুন্য মনে হয় তার!!

লেখক পরিচিতি:

১৯৮৬ তে বাবার মৃত্যু তাঁর জীবনের প্রথম বাঁক। তারপর টানা দশবছর কেটেছে নানান অনিশ্চয়তায়। মুলতঃ সে সময়টাই লেখককে পরিপুর্ণ করে গড়ে তুলেছে। জীবনের সব পথে হেঁটেছেন সেই-সময়ে। ১৯৯৬ তে নিজের জীবনের মোড় ঘোরাতে সক্ষম হন তিনি। ইডেন কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তিনি বিএসসি (অনার্স-গণিত) তে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। পরে এমএসসি (গণিত) তেও প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। তার চাকরি জীবনও বৈচিত্র্যময়। চাকরি জীবনের শুরু মাস্টার মাইন্ড ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে। এরপর দীর্ঘ পনের বছর ডাচ-বাংলা ব্যাংকে কাজ করেছেন। এসএভিপি এবং অপারেশন ম্যানেজার পদে থাকাকালীন ২০১৩ সালে সেচ্ছাবিরতিতে যান। তারপর তিনবছরের প্রবাস জীবন অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে। সেখানেও তিনি স্কুলে শিক্ষকতা করেন দুবছর। ফিরে এসে নতুন করে ‘এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স’ নিয়ে এমএস করেন এবং ভাইসচ-্যান্সেলর পুরস্কার অর্জন করেন। এরপর ব্রাকের সাথে কাজ করছেন দুবছর যাবত।

ছোটবেলা থেকেই লেখালেখি করেন। সময়ের অভাবে একসময় লিখতে পারেননি, অবসরে এখন নতুন করে লেখালেখির শুরু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *