ক্ষমা প্রার্থনা কিংবা ব্যক্তিগত উপলব্ধীর নবযাত্রা

নজরুল কবীর: ‘মা’— যাঁর প্রতি নিঃশ্বাসের ছোঁয়ায় আমার বেড়ে উঠা, সেই মা যে একজন নারী; তা কতটুকু উপলব্ধী করেছি এই জীবনে? জরায়ুতে ভ্রুণ হিসেবে ধারণ করা থেকে শুরু করে তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত, তিনি সন্তান হিসেবে আমাকে যে স্নেহ-ভালবাসা-শিক্ষা-শ্রেয়োবোধ-মূল্যবোধ, চেতনার বীজ রোপন করে তা মহীরুহে পরিণত করেছেন কখনো কী সেজন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছি তাঁকে ? না, জানাইনি। আমি এবং আমরা শারীরিক অবয়বে শুধু নয়, মানসিকতায়ও রয়ে গেছি ‘পুরুষ’। পুরুষতন্ত্র আমাদের শিক্ষায়, সমাজে, রাষ্ট্রে সর্বোপরি মগজে জেঁকে বসে আছে। তাই এক সীমাহীন অপরাধ করে চলেছি আমরা শত শত বছর ধরে!

মা, মা-গো…

অজ্ঞানে-সজ্ঞানে অনেক অপরাধ করেছি, আজ এই ক্ষণে হাঁটু গেড়ে ক্ষমা চাই । ক্ষমো মোর অপরাধ, হে জগৎ জননী…

বোন

ছোটবেলায় বাবা-মায়ের পছন্দের শিল্পী মান্না দে’র গান শুনে শুনে বড় হওয়া। সে-ই মান্না দে’র একটি প্রিয় গান ‘সে আমার ছোটো বোন’। অনেকের মতো আমারও এই গানটি মানস চৈতন্যে বোনের জন্য এক মায়াবি অনুভব তৈরি করেছিলো। তো কৈশোরে একমাত্র ছোটো বোনটিকে আবৃত্তি শেখানো, প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করানো, সাঁতার শেখানোর চেষ্টা, দৌড়াতো ভাল, তাই অ্যাথলেট বানানোর চেষ্টা, গানের গলা ছিলো ভাল, তা-ই গান শেখানোর চেষ্টা; কত কী না করেছি! কিন্তু সময়ের আবর্তে যখন আমি ধীরে ধীরে প্রাপ্ত বয়স্ক হচ্ছি (বলা ভাল, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতায় দানা বাধঁছে চৈতন্যে, ‘পুরুষ’ হয়ে ওঠছি ক্রমশ:), তখন যেন একে একে সব চেষ্টা ‘বিফল’ মনে করে নিজ দায়িত্ব ও কতর্ব্য থেকে সরে এসেছি। সে-ই বোন আমার এখন তিন কন্যা সন্তানের জননী। এই শহরে বাস করলেও মাসের মাস দেখা হয় না, বলা ভাল দেখা করা হয় না।

আজ এক্ষণে নিজের বোধের ভেতর শ্লাঘা অনুভব করছি। এই যে এখন লিখছি, মনে হচ্ছে, আসলে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে নিজেই আঁতকে উঠছি। এ তো আমার ভেতরে বাস করা অন্য এক ‘মানুষ’ (যার মান এবং হুশ আছে) দেখছে, চৈতন্যে বয়ে বেড়ানো পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার ‘পুরুষ’কে!

বোন আমার, যে সীমাহীন অপরাধ করা হয়েছে তার জন্য করজোরে তোর কাছে ক্ষমা চাই! দোয়া চাই, যেন বাকীটা জীবন নিজেকে “মানুষ” করে তোলার লড়াইয়ে পুরোটা সক্রিয় থাকতে পারি! ক্ষমা করবি তো বোন?

শিক্ষয়িত্রী

হে মোর বণর্মালা চেনানোর কারিগর। আপনি এবং আপনারা, শিক্ষা জীবনের প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে সব্বোর্চ বিদ্যাপীঠ পর্যন্ত, আপনাদের কাছ থেকে জ্ঞান ও ধ্যানের, যুক্তি ও ভালবাসার যে মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছি; তাঁর জন্য কখনো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়নি। কখনো এমন অনেক আচরণ করেছি, যা হয়তো আপনাদেরকে আড়ষ্ঠ করেছে। আমার অজ্ঞানে-সজ্ঞানে সে সব অপরাধের জন্য আজ ক্ষমা চাইছি। আপনাদের মহানুভবতা আর মনুষত্ব বোধের উদারতায় ক্ষমা করুন হে আমার আলোকবর্তিকাগণ!

প্রেমিকা

প্রেমে পড়িনি বা প্রেমবোধ আসেনি, এ এক মিথ্যা উচ্চারণ।

তুমি কিংবা তোমরা, যাঁর কিংবা যাঁদের প্রতি থরো থরো প্রেমবোধে কাতর ছিলাম অথবা আছি, অকপটে স্বীকার করছি ‘পুরুষতান্ত্রিক’ মানসিকতার প্রেমবোধ থেকে পুরোপুরি মুক্ত ছিলাম এ উচ্চারণ সত্য নয়।

জীবনের পঞ্চাশোর্ধ বছর পেরিয়ে এতটুকু কুন্ঠা নেই বলতে, আমিও পুরুষতান্ত্রিক বোধ ও আচরণ দিয়ে পরিচালিত হয়েছি অনেক মুহূর্তে। সে-ই সব আচরণ হয়তো কখনো কখনো শাস্তিযোগ্য অপরাধও হয়ে থাকতে পারে! কিন্তু হয়তো আমার মতো তুমি কিংবা তোমরা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার এ সমাজ ও রাষ্ট্রের ভ্রুকুটির কারণে, প্রতিকার চাও নি বা নাও নি। কিন্ত আজ এক্ষণে আমি আমার অজ্ঞানে বা সজ্ঞানে সে সব কৃত কর্মের জন্য হাঁটু গেড়ে অবনত মস্তকে ক্ষমা চাইছি তোমার কিংবা তোমাদের কাছে । দূরে কিংবা কাছে থেকে তোমাদেরই কাছে ভিক্ষা চাইছি সে-ই বোধের, যে বোধ দিয়ে বাকীটা জীবন ‘মানুষ’ হিসেবে, ‘মানবিক বন্ধু’ হিসেবে বেঁচে থাকতে পারি তোমাদের পাশে, তোমাদের মাঝে!

বউ

এই শব্দটিই লালন করতে চাই। আভিধানিকভাবে ‘স্ত্রী’, শব্দ হিসেবে আমার কাছে কেন যেন আপন আপন মনে হয় না।

যেদিন কাবিন নামায় স্বাক্ষর করতে হলো, সেদিনই প্রথমবারের মতো পুরো কাবিননামাটি পাঠ করি। সেখানে একটি ধারায় দুটি শব্দ বেশ অশ্লীর মনে হয়েছিল। ‘ভরণ ও পোষণ’। এই দুটি বিষয়ের দায়িত্ব পালনে স্বামী হিসেবে আমি বাধ্য থাকবো তা লেখা ছিলো। কেন জানি নিজেকে খুউব খারাপ কোনো কাজের জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ করছি, এমন মনে হচ্ছিল। কাবিননামা আমার জীবনে বড় কোনো অভিঘাত নিয়ে আসতে না পারলেও, দাম্পত্যে যাপিত জীবনের ধারাপাতে উল্টো দিকে পাতা উল্টালে ভালো’র পাশাপাশি অনেক খারাপ আচরণের চিত্রও সামনে আসছে, এক্ষণে। যখন লিখছি, মনে হচ্ছে কি ‘চরম পুরুষতান্ত্রিক আচরণ’ করেছি আমি! অথচ বউ তোমারই বদানত্যয় আমি পেয়েছি ‘জনক’ হবার স্বাদ । অথছ সে-ই আমি…

বউ আমার, যখন লিখছি, তখন তুমি গভীর ঘুমে! সংসার সমুদ্রের হে প্রিয় সহযাত্রী, তোমার কাছে মাত্রাহীন অপরাধের জন্য সরাসরি কিংবা একান্তে ক্ষমা চাওয়া হয়নি আগে কখনো। আজ এক্ষণে সকলের সামনে এই পাবলিক প্লেসেই, তা-ই শাস্তি স্বরূপ প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইছি; নতজানু এই আমি, ‘ক্ষমো মোর অপরাধ।”

কন্যা

তোর জন্ম আমার জন্য সৌভাগ্যের!

যেদিন তুই জন্মছিলি, সেদিন প্রিয় এই স্বদেশের এক অবিসংবাদিত রাজনীতিক বলেছিলেন, কন্যা সৌভাগ্যের চাবিকাঠি। ভাগ্যে আমার আস্থা বরাবরই ছিলো না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজো পর্যন্ত আমার অন্তর্জগতের যে কোনো শুভ কাঙ্খায় তুই আমার গোপন প্রেরণা। এ তো অন্ততঃ আমার “আমি” জানে। মা’রে তোর প্রতি সব সময় সমানুপাতিক আচরণ হয়তো করা হয় না, তোর ভাইয়ের বিবেচনায়! তবু বলি, ক্ষমা করে দে মা। যেন বাকী জীবনটায়, সমযাত্রায় চলতে পারি, চলতে পারিস, সেই লড়াইটা জারি রাখতে চাই।

সহপাঠী, সহযোদ্ধা, সহকর্মি, বন্ধু-বান্ধব

তুমি এবং তোমরা, আপনি এবং আপনারা, যাঁরা লৈঙ্গিক পরিচয়ে নারী, তোমাদের এবং আপনাদের কাছ থাকে নিয়েছি, নিচ্ছি এবং শারীরিক মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিতেই থাকবো অফুরান ভালবাসা, প্রত্যয়, সাহস আর দৃপ্ততা।

এই পঞ্চাশোর্ধ জীবনে তোমাদের কাছ থেকে সদা ভালো নেয়ার পথে ‘ভালো’ দেয়ার পরিমাণ আমার দিক থেকে যৎসামান্যই! অনেক খারাপ অভিজ্ঞতা হয়তো আমার কাছ থেকে তোমাদের হয়েছে, সে সব অভিজ্ঞতাগুলো বরাবরারের মতো এবারও তোমরা তোমাদের উদার চিত্তে ঝেটিয়ে বিদায় করে আমাকে তোমাদের ভালবাসায় সিক্ত কর! ক্ষমা করে দাও সব অপরাধ। সহায়তা করো ‘মানুষ’ হয়ে উঠার পথে যেন হাঁটতে পারি গ্রীবা উঁচিয়ে, দৃপ্ত পায়ে!

এছাড়া জীবনকে যাপন যোগ্য রাখতে ফুপু, খালা, চাচী, মামী, শাশুড়ি, শালী, ভাবী, অন্যান্য কাজিন, প্রতিবেশিসহ যত নারীর সংস্পর্শে এসেছি- সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে আপনাদের প্রতি জানাই অসীম কৃতজ্ঞতা। এ পৃথিবীকে আমার জন্য বাসযোগ্য রাখতে, যার যার অবস্থান থেকে আপনারা যে ভুমিকা রেখেছেন, রেখে চলেছেন, তার জন্য জানাই টুপি খোলা স্যালুট।

হে নারী, তুমি বুনেছো সভ্যতার বীজ !

তুমিই আগামীর পৃথিবী! আর এই মহাবিশ্বের তুমিই দাও নেতৃত্ব! আমরা তোমার অনুগামী হয়ে থাকবো পাশে।

এই নাও বাড়ালাম হাত! … নেবে তো?!

জয়তু ৮ মার্চ!

( পুনশ্চ: এই ক্ষুদ্র যাপিত জীবনে যে সব নারীর পুরুষতান্ত্রিক আচরণ ও স্বভাবের শিকার হয়েছি আমি ব্যক্তিগতভাবে, তাদের প্রতি এতদিন যেসব রাগ, ক্ষোভ, অভিমান, ঘৃণা ছিলো; তা-ও এক্ষণে আমি মুছে ফেললাম হৃৎ শ্লেট থেকে। তাদের আমিও ক্ষমা করে দিলাম।

আসুন, আমরা সবাই ” মানুষ” ( যাদের মান এবং হুশ আছে) হয়ে ওঠার লড়াইয়ে শামিল হই।

লেখক পরিচিতি: নজরুল কবীর; সিনিয়র সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *