একাকী‌ত্বে শ‌ক্তি!

রাফিজা রহমান

রাফিজা রহমান: একা থাকা। একা পথচলা। একায় জীবন ব‌য়ে নেয়া। একাকী‌ত্বে ডু‌বে যাওয়া। একাকী‌ত্বে অসীম খোঁজা- একেক জনের কা‌ছে এর অর্থ একেক রকম। একাকীত্ব বর‌ণে ক‌ঠিন তপস্যার প্রপ্রয়োজন এটা সত্য। আটপ্রৌঢ় জীব‌নে এর নিগূঢ় সুখ খুঁজে পাওয়া খুব ক‌ঠিন। সাধারণ জ‌নের কা‌ছে একা থাকা ক‌ষ্টের- বোঝার স্বরূপ। মুণী-ঋষী -গুণীজ‌নের কা‌ছে একা- একাকীত্ব আশীর্বাদের মত।

কথায় আছে‌ছে স্হান-কাল-পাত্র ভে‌দে সবই বদ‌লে যায়। শ‌ব্দের অর্থও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই একা একাকীত্ব সাধারণ জ‌নের কা‌ছে ভয়ানক, ক‌ষ্টের। ক্ষ‌ণি‌কের বিশ্রাম হ‌লেও জ্ঞানী জন‌দের কা‌ছে একা’য় শ‌ক্তি, ল‌ক্ষ্যে পৌঁছা‌নো, বিশা‌লে ডুব দেয়া, অদৃশ্যকে খুঁজে পাওয়া। সবটা ব্যক্তিভে‌দে গ্রহণ আর বর‌ণের ওপর নির্ভর ক‌রে।

চলমান জীব‌নে এ নি‌য়ে লো‌কে অনেক কথা ব‌লে। একা পথ চল‌তে হ‌বে‌ ‘কি ভয়ানক’! কেউ বল‌বে, কি কষ্টকর ব্যাপার স্যাপার। একা থে‌কে থে‌কে ক্লান্ত। একাকীত্বকে বহন কর‌তে আর পার‌ছি না। যেন পাগল প্রায়। অথবা মৃত্যুপুরী‌তে চ‌লে গে‌ছি। আবার এমনও শোনা যায়, যাক বাবা একটু একা থাকার সময় পেলাম, নি‌জের জন্য কিছুটা সময়। এই একাকীত্ব কাটা‌তে ঘর ভ‌রে লোক ডাকা। নয়তো দল বেঁধে ঘুর‌তে যাওয়া বা সি‌নেমা দেখায় স্বস্তি আসে।

আবার এমনও শোনা যায়- ওঃ বাবা, কি সাহস একা চল‌ছে! একাই জীবনটা পার ক‌রে দিল! কি সাংঘা‌তিক!! উফ্ কি নিরান্দময় জীবন। আহারে বেচারা, জীব‌নের স্বাদই‌ পেল না।

আমরা যারা সাধারণ জন জীব‌নের দৈনন্দ‌িন চাওয়া পাওয়া থে‌কে নি‌জে‌কে মুক্ত কর‌তে পা‌রি না তা‌দের জ‌ন্যে এই একা থাকা কিম্বা নির্জনতায় বড় আতঙ্ক। অথচ জ্ঞানীজন ব‌লেন, Standing alone don’t mean l am alone. It means I am strong enough to handle things all myself.

জন্ম সময়‌টির কথা ম‌নে কর‌লে দেখুন মানুষ একা একেবারে একা। ভাববাদীরা বল‌বেন, একা এসেছি, একাই যে‌তে হ‌বে… ভয় কি‌সের ভ‌বের মাজা‌রে। এক‌ ক্ষুদ্র বিন্দু থে‌কে আমরা একটু একটু ক‌রে অন্ধকার গহ্বরে একা একা বে‌ড়ে উঠি। আলোয় বে‌রি‌য়ে এসে জীব‌নের পর‌তে পর‌তে শিখি মানুষ সামা‌জিক জীব। মানুষ ছাড়া মানুষ বাঁচ‌তে পা‌রে না। জীব‌নে চল‌তে চল‌তে জানা হয়‌ ঘিরে থাকা, আগলে থাকা, অনেকের সা‌থে থাকায় আনন্দ। এ আনন্দে চলায়, বলায়, সম‌ষ্টি শ‌ক্তির প্রভাব অনেক বে‌শি। তাই মানু‌ষের একায় এত ভয়। কিন্তু এর বিপ‌রীতেও যে একাকী‌ত্বে শ‌ক্তি আছে তা ভ‌েবে দে‌খি না।

জ্ঞানী-গুণী জন‌দের ভাষায়, আসলে একাকীত্ব সঙ্গীর অভাব না, সং‌যো‌গের অনুপস্হি‌তি। এ সং‌যোগ‌ নি‌জের সা‌থে নি‌জের, নি‌জের সা‌থে আত্মার, ‌নি‌জের সা‌থে অদৃশ্য অসী‌মের। নি‌জের মা‌ঝেই র‌য়ে‌ছে সেই সংযোগ স্হল। র‌য়ে‌ছে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড। আমরা তা কখনও খুঁজে দে‌খি না বা খুঁজে দেখার সু‌যোগ হয় না। যে কিনা নি‌জে‌কে ভাল‌বে‌সে‌ছে, নি‌জে‌কে চিন‌তে পে‌রে‌ছে, নি‌জের সা‌থে নি‌জের সং‌যোগ ঘটা‌তে পে‌রে‌ছে সে-ই পায় অসী‌মের সে দেখা। তার কা‌ছে একা- একাকীত্ব – নির্জনতা বিরাট পাওয়া। ‌নি‌জের মা‌ঝে সে সবসময় ভরপুর।

একা থাক‌তে পারা সাহ‌সের ব্যাপার। যে জীব‌নের সহজ চাওয়া পাওয়া‌কে ছিন্ন ক‌রে আত্মার কাছাকা‌ছি পৌঁছা‌তে পে‌রে‌ছে সে আসলে সাহসী। তার ম‌নোশ‌ক্তি সাধারণের অনেক ঊর্ধ্বে। সে একাকীত্বকে বরণ ক‌রেছে। এ একাকী‌ত্বে র‌য়ে‌ছে ত্যাগ। যা এক সময় পারা যেত না, আজ তা ত্যাগ ক‌রে নি‌জের কা‌ছে ফি‌রে আসতে পে‌রে‌ছে। এ পরম শ‌ক্তি। এ শ‌ক্তি জীব‌নে অন্যরকম শা‌ন্তি ও তৃ‌প্তি খুঁজে দেয়। ‌কিম্বা এমন কিছু বৃহৎ অর্জন হয় যা যুগ যুগ ধ‌রে অন্যকে আলোকিত ক‌রে।

তাই ব‌লি, একায় ভয় কিসে? নি‌জের সা‌থে নি‌জের মিতালী করা এইতো! তু‌মি যেমনটি চাও তেম‌নি ক‌রে নি‌তে পারো। যেমন ভাবো তা তোমারই ভাবনার ক‌ষ্টি পাথ‌রে শুদ্ধ হ‌য়ে তোমারই কা‌ছে ফি‌রে আসবে। একায় তুমি দেখ‌তে পা‌বে তু‌মি কতটা উজ্জ্বল। কতটা জ্বল‌তে পারো। স্বেচ্ছা একাকীত্ববরণকারী প্রভাবমুক্ত হ‌য়ে নি‌জের ম‌তো ক‌রে স্বাধীনভা‌বে চিন্তা কর‌তে পা‌রে। বাইরের কোলাহল, চাপ, বাধা তা‌কে স্পর্শ কর‌তে পা‌রে না। একা থাকার ভা‌লো লাগায় হা‌রি‌য়ে গে‌লে নিঃসঙ্গতা আর পা‌বে না। যে নি‌জের সা‌থে নি‌জের সং‌যোগ ঘটা‌তে পে‌রে‌ছে সে আসলে একা না। তার জগৎ সাধারণের ধরা ছোয়ার বাইরে।

একার ডুব সাঁতা‌রে জান‌তে পার‌বে- কে তু‌মি, কি রূপ তোমার, কি চাও তু‌মি, কতটা তু‌মি পারো, কতদূর তু‌মি দেখ‌তে চাও। তাই গুণীজন‌‌েরা ব‌লেন, প্রথ‌মে নি‌জে‌কে ভালবাসো। নি‌জে‌কে চেন, যার সা‌থে তু‌মি বাকী জীবন কাটা‌বে। তারা ব‌লেন, সূর্য ডু‌বে গে‌লে কাঁদ‌বে না। কারণ, চোখের জল তারা‌কে দেখ‌তে দে‌বে না। পাহা‌ড়ের চূড়ায় ওঠো, ভয় পেয়ো না। নয়তো আকাশের বিশালত্ব আর বদ‌লে যাওয়া রঙ দেখ‌তে পা‌বে না। দেখবে ওপর থে‌কে নী‌চে কত নগণ্য, ছোট সব কিছু। ম‌নে হ‌বে কেনই বা মি‌ছে ছুট‌ছি এর পেছন ধ‌রে। চূড়ায় ব‌সে বজ্রপা‌তের বিকট শ‌ব্দে ভ‌য়ে শিউরে উঠো না। সাহ‌সের সা‌থে আলিঙ্গন করো। দেখ‌বে এ বিকট না। এ থে‌কে নতুন শ‌ক্তি জন্ম নি‌চ্ছে। ‌নির্জন রাত‌কে আলিঙ্গন করো। দেখ‌তে পা‌বে বিশাল ব্রহ্মাণ্ডে কতোই না খেলা। রাতে‌র নির্জনতা প্রকৃ‌তির সা‌থে তোমাকে কথা ব‌লি‌য়ে দে‌বে। সৃ‌ষ্টির সা‌থে তৈরী হ‌বে সরাস‌রি সং‌যোগ।

যুগ যুগ ধ‌রে যারা পৃ‌থিবীর বু‌কে পথ দে‌খি‌য়ে গে‌ছেন তাই বু‌ঝি তারা স্বেচ্ছায় একাকীত্ব- নির্জনতা বরণ ক‌রে অর্জন ক‌রে‌ছেন বৃহৎ প্রা‌প্তি, মানব কল্যা‌ণের পথ নি‌র্দে‌শিকা।

একাকীত্বের শ‌ক্তি মানুষ‌কে সৃজনশীল ক‌রে। এর মধ্য দি‌য়ে নি‌জের ভেতরকার আওয়াজ শুন‌তে পাওয়া যায়। আমার আমিত্বকে খুঁজে পায়। যে আমিত্বে কা‌রও কো‌নো প্রভাব প‌রে না। ‌নি‌জের চিন্তা চেতনার এক নতুন রূপ মে‌লে। তাই ম‌নে হয়- Nikola Tesla বল‌ছেন, একা হও- এটাই আবিষ্কারের রহস্য। যখন একা তখনই নতুন চিন্তার জন্ম নেয়।

‌নি‌জের সা‌থে নি‌জের বোঝাপড়ায় একাকী‌ত্বের জু‌ড়ি নাই।‌ কোলাহলমূখর সময়‌ে নি‌জের অস্তিত্ব ব‌লে আলাদা কিছু পাওয়া যায় না। একাকী‌ত্বেই শুধু, নিজ‌ে‌কে না কা‌ছের দূ‌রের প্রতিটি সম্পর্ক‌ের নিগূঢ় রূপ রস খুঁজে পাওয়া যায়।

প্রতিদিনকার অস্থিরতা থে‌কে মুক্ত ক‌রে একাকীত্ব যেন এক বুক ব‌িশুদ্ধ বাতাস টে‌নে নি‌তে সাহায্য ক‌রে। আটপ্রৌঢ় জীব‌নের বাধা ধরা নিয়‌মে দা‌য়িত্ব কর্তব্য, ঘ‌ড়ি ধ‌রে খে‌তে বসা, ঘুমু‌তে যাওয়া ‌থেকে স‌রি‌য়ে নি‌য়ে ব্যক্তিস্বত্তা, উদ্যম, ইচ্ছা, বিশ্বাস‌কে নতুন ক‌রে জা‌গি‌য়ে তো‌লে। নতুন গন্তব্য তৈরী ক‌রে নতুন পৃ‌থিবী উপহার দেয়।

মহামানব, গুণীজ‌নেরা তপস্যার জন্য গুহায় গে‌ছেন। পাহা‌ড়ের চূড়ায় উঠে‌ ধ্যান মগ্ন থে‌কে‌ছেন। সন্ন্যাসী ব্রত পালন ক‌রে‌ছেন। তাই বোধ ক‌রি পাব‌লো পিকা‌সো ব‌লে‌ছেন, Without great solitude no serious work is possible.

একাকীত্ব নি‌জে‌কে অন্যের জায়গায় প্রতিস্হাপন কর‌তে প্রখর শ‌ক্তির জন্ম দেয়। যে শ‌ক্তির ব‌দৌল‌তে বিশা‌লে ডুব দি‌য়ে মানব কল্যা‌ণে এমন উপহার পাওয়া যায় যার দ্যূ‌তির ছটায় আলোকিত হয় বিশ্বা‌লোক।

তাই গৌতম বুদ্ধ বল‌ছেন, ‘য‌দি তু‌মি দৃঢ় শ‌ক্তিশা‌লী হ‌তে চাও তাহ‌লে একার আনন্দে থাক‌তে শে‌খো’।

তাই ব‌লি, একাকীত্ব‌ ‘শ‌ক্তি‌’। জ্বলে উঠুন। আলোকিত করুন চার‌দিক। মানুষ হি‌সে‌বে‌ জন্ম নেবার স্বার্থকতা তখনই খুঁজে পাবেন, যখন আপনি থাক‌বেন না, অথচ পৃ‌থিবীর বু‌কে থে‌কে যা‌বে আপনার সৃষ্ট কল্যা‌ণের চিহ্নটুকু।

লেখক পরিচিতি: রাফিজা রহমান; তথ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা, বেলজিয়াম প্রবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *