
মাঈন উদ্দিন আব্বাসী
মাঈন উদ্দিন আব্বাসী:
দৃশ্যপট ১: ভদ্রলোক জিপারের ব্যবসা করেন। সাভারের এক গার্মেন্টসে যাচ্ছিলেন জিপারের স্যাম্পল নিয়ে। গাবতলী চেক পয়েন্টে মেজিস্ট্রেট মোটরসাইকেল আটকালেন। তিনি জানালেন, আমি না গেলে গার্মেন্টসে ব্যবসায় ক্ষতি হবে। প্রয়োজনে আপনি মালিকের সাথে কথা বলতে পারেন।
মালিককে ফোন দেয়া হলো। মালিক বললেন, ছেড়ে দেন, উনি আমার কাছে আসছেন।
মেজিস্ট্রেট বললেন, আমরা ছাড়তে পারব না। আপনি এসে ওনাকে নিয়ে যান।
গার্মেন্টস এর মালিক আসতে পারবেন না। অগত্যা মামলা নিয়ে চলে এলেন সাপ্লায়ার ভদ্রলোক।
সংশ্লিষ্টরা খুশি হলেন সরকারের রাজস্ব আদায় করতে পেরেছেন ভেবে!

লকডাউন সফল করতে রাজধানীর একটি পুলিশ চেকপোস্ট
দৃশ্যপট ২: বিজয় সরণি। একটি মোটরসাইকেলের গতিরোধ করলেন দায়িত্বরত পুলিশ। জানতে চাইলেন, লকডাউন চলাকালে কেন বের হলেন।
ভদ্রলোক জবাব দিলেন, আমি বায়িং হাউজে কাজ করি। জরুরী প্রয়োজনে অফিসে যেতে হবে। তাই বের হয়েছি। পুলিশ কাগজপত্র চেক করে মোটরসাইকেল রেখে দিলেন। চাবি ফেরত দিয়ে বললেন, ৬ টার পরে এসে গাড়ি নিয়ে যাবেন।
দৃশ্যপট ৩: গার্মেন্টসের পণ্য মোড়কজাতের কাজে ব্যবহৃত কয়েকটি কাঁচামাল ব্যাক বোর্ড, পেপার ট্যাগ বানানোর বোর্ড, পেপার টিস্যু। এর বড় জোগানদার নয়াবাজারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো। একজন ব্যবসায়ী দোকান খুলতে গেলেন পেপার বোর্ড বের করতে। ক্রেতার ডিজাইন অনুযায়ী বোর্ডগুলিকে কাটিং করতে হবে। পুলিশ দোকান খুলতে দিলো না।
ব্যবসায়ী বোঝানোর চেষ্টা করলেন। বললেন, এ কাঁচামাল ছাড়া গার্মেন্টস শিপমেন্ট হবে না। কিন্তু পুলিশ সোজা বলে দিলো, লিস্ট অনুযায়ী আপনাদের প্রতিষ্ঠান খোলার অনুমতি নেই!!
…
বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের নীতিনির্ধারক এবং মেজিস্ট্রেটসহ মাঠপর্যায়ে যারা লকডাউন কার্যকরে কাজ করছেন, তাদের অনেকেই হয়তো জানেন না গার্মেন্টস শিল্প শুধু কাটা এবং সেলাই করাই না। এর সাথে আরও অনেকগুলি শিল্প জড়িত। বায়িং হাউজ, ব্যাংক, বীমা, অসংখ্য রকমের ফেব্রিক্স, সুইং থ্রেড, জিপার, বাটন, ইলাস্টিক ব্যান্ড, ড্র-কর্ড, টুইল টেপ, ওভেন লেবেল, প্রিন্টেড লেভেল, বিভিন্ন ধরনের স্টিকার, পেপার ট্যাগ (হ্যাং ট্যাগ নামে পরিচিত), গামটেপ, কার্টুন, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, শিপিং লাইন্স, ডাইং, ওয়াশিং, অ্যামব্রয়ডারি, স্ক্রীন প্রিন্ট ছাড়াও রপ্তানী যোগ্য পোশাক প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত একাধিক কাঁচামাল প্রস্তুতকারী একসাথে চলমান থাকলেই গার্মেন্টস শিল্প চলবে।
গার্মেন্টস শিল্পের একাধিক কাঁচামাল সদরঘাট, নয়াবাজার, বংশাল, ফকিরাপুল, আরামবাগ, মিরপুরসহ রাজধানীর কয়েকটি মার্কটে পাওয়া যায়। গার্মেন্টস খোলা রেখে যদি আনুষাঙ্গিক কাঁচামালের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান খুলতে দেয়া না হয় তবে এটা হবে অদূরদর্শিতার সামিল। অনেকটা “গাড়ী চলবে, কিন্তু গাড়ীতে যাত্রী থাকতে পারবে না। কিংবা পেট্রোল পাম্প বন্ধ থাকবে”! বলা যায়, হাত পা বেঁধে দিয়ে দৌড়ানোর নির্দেশ দেয়ার মত ব্যাপার!
সম্ভব হলে সব কিছু বন্ধ করে লকডাউন কার্যকর করতে হবে। কিন্তু গার্মেন্টস খোলা রাখতে হলে এর সাথে সম্পর্কিত সব সহায়ক প্রতিষ্ঠান খুলতে হবে। নয়তো জগাখিচুড়ি পরিস্থিতিতে গার্মেন্টস খোলা থাকবে। গার্মেন্টস শিল্পের মালিকরা প্রতিষ্ঠান খুলে রেখে খরচ বাড়াবেন, কিন্তু শিপমেন্ট করতে পারবেন না। এতে শেষ পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে বড়ো খাতটি ধ্বংসই হবে না, লক্ষ-কোটি টাকার বাজেটও সাফল্যের মুখ দেখবে না।
লেখক পরিচিতি: মাঈন উদ্দিন আব্বাসী; ব্যবসায়ী।















Leave a Reply