একজন বিরল অভিনয়শিল্পীর মহাপ্রয়াণে শ্রদ্ধাঞ্জলি

স্বীকৃতি প্রসাদ বড়ুয়া: ১৬ নভেম্বর ২০২০ বেলা বারোটার কয়েক মিনিট পর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় চলে গেলেন অমৃতলোকে। করোনা ভাইরাসের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে চলে গেলেন ৪০ দিনের যুদ্ধ শেষে। তিনি শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না, ছিলেন অভিনেতার অভিনেতা। সংস্কৃতির নানা মাধ্যমে সৃজনশীল কর্মের মধ্যদিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির আইডল আইকন।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সাথে লেখক স্বীকৃতি প্রসাদ বড়ুয়া

এই কীর্তিমানের সঙ্গে একদিন দেখা হয়েছিল, কথা হয়েছিল আমার।

তখন এনটিভিতে শুভসন্ধ্যা অনুষ্ঠানের বয়স এক বছর পেরিয়ে গেছে। ২০০৪ এর সেপ্টেম্বরের ৪ তারিখ রোববার তিনি এসেছিলেন এনটিভি স্টুডিওতে, শুভসন্ধ্যার অতিথি হয়ে। সেদিন অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ছিলেন মেহজাদ গালিব। ছিলেন এনটিভির অনুষ্ঠান অধ্যক্ষ মোস্তফা কামাল সৈয়দ। আমাদের স্টুডিওর আধুনিক সেট আপ দেখে তিনি মুগ্ধ। এখনও স্মরণে আছে ‘তিনপুরুষ’ নামের একটি দীর্ঘ ধারাবাহিকে তিনি অভিনয় করেছিলেন। সেই উপলক্ষে শুভসন্ধ্যায় আসা। আমরা তো শুভসন্ধ্যা টিম খুবই উপভোগ করেছিলাম এই কীর্তিমানের সাথে কাটানো মুহুর্তগুলো। সময়ের হিসেবে সেটা আজ থেকে ১৬ বছর আগে। সৌমিত্র বাবুর ব্যবহার, হাঁটাচলা, কথাবলার মধ্যে একটা বাঙালিসুলভ সুন্দর আচরণ ছিল। তারকাসুলভ ভারিক্কি ছিল না। মনে হতো খুবই আপনজন। কবি ছিলেন। বাচিক শিল্পী মানে আবৃত্তিশিল্পী ছিলেন। অভিনেতা ছিলেন, মঞ্চ ও চলচ্চিত্রের। সবচাইতে বড় কথা বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের আবিষ্কৃত এই গুণী অভিনেতা সত্যজিৎ রায়ের সবচেয়ে বেশী চলচ্চিত্রে অভিনয় করে হয়েছিলেন সত্যজিতের সৌমিত্র।

তো সেদিন অনুষ্ঠানে নিয়ে এসেছিলেন তিনপুরুষ ধারাবাহিকের বাংলাদেশের প্রযোজক সাহেব। মোস্তফা কামাল সৈয়দসহ উনাকে বসানো হয়েছিল এনটিভির চেয়ারম্যান স্যারের রুমে। শুভসন্ধ্যায় দুই দিন ধরে উনার কথোপকথন প্রচারিত হয়েছিল। অনেক কথা হয়েছিল উনার শিল্পজীবন নিয়ে। এই একটি দিন ছিল আমার ও আমাদের জন্য একটি অন্যরকম ভালোলাগার দিন।

এনটিভি স্টুডিওতে ২০০৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তোলা ছবি

অভিনেতা অনেকেই আছেন। কিন্তু অভিনয় শিল্পী বলতে গেলে হাতে গোনা। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন একজন টোটাল অভিনয় শিল্পী। মঞ্চ, থিয়েটার, আবৃত্তি, অভিনয়, লেখালেখি সবমিলিয়ে তিনি ছিলেন অন্যতম।

তিনি মনে করতেন ‘সৃষ্টি-সংস্কৃতি-নির্মাণের মধ্যে যে মানুষ নেই সে মৃতপ্রায়। কেবল শারীরিক ভাবে বেঁচে থাকা ছিল তাঁর কাছে মূল্যহীন।’

তিনি সৃষ্টিশীলতা ছাড়া একদিনও বেঁচে থাকতে চাননি। এটাই একজন পেশাদার শিল্পীর অভিপ্রায়।

নিজের সাথে নিজে:

পৃথিবী থেকে সরে যাওয়ার আগে প্রশ্ন রেখেছিলেন নিজের কাছে, ‘এই যে এত কিছু করলে। এ সব কেন? তুমি পাশ দিয়ে গেলে ওই যে ছেলেগুলো আজও চিৎকার করে, দ্যাখ-দ্যাখ, স-উ-মি-ত্র! স-উ-মি-ত্র যাচ্ছে, তার জন্য তো নয়। এটা নিশ্চয়ই লক্ষ্য ছিল না? আমি তো চেয়েছিলাম, আমি হেঁটে গেলে লোকে বলবে, ওই যে যাচ্ছে! ওর মতো অভিনয় কেউ করতে পারে না। আদারওয়াইজ এই জীবনের কী মানে? মানুষের কী উপকার করতে পারলাম? তখন নিজেকে বোঝাই, অভিনয়ের মাধ্যমে যেটুকু আনন্দ বিতরণ করতে পেরেছি, সেটাও তো এক অর্থে মানুষের সেবা। সেটাও তো একটা উপকার।’

একসময় ‘এক্ষণ’ সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনার কাজেও গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন সৌমিত্র । সেই কাজে তাঁর পাশে ছিলেন তাঁর ‘মানসপিতা’ সত্যজিৎ। তবে অভিনয়ই তাঁর রক্তে, স্মৃতিতে, জীবনের রোজনামচায়। বলেছিলেন, ‘সেই শৈশবকাল থেকে আজ অবধি অভিনয় ছাড়া অন্যকিছু ভাবিনি। অভিনয়টা সবসময় বুকের মধ্যে লালন করতাম। অন্য যা কিছু করেছি সবই ছিল ভালোলাগার বহিঃপ্রকাশ।‘

জন্ম ও বেড়ে ওঠা:

জন্ম ১৯৩৫ সালে। কলকাতার মির্জাপুর স্ট্রিটে। ছেলেবেলা কেটেছিল ‘ডি এল রায়ের শহর’ কৃষ্ণনগরে। মা আশালতা চট্টোপাধ্যায়। গৃহবধূ। বাবা মোহিত চট্টোপাধ্যায়। পেশা ওকালতি। নেশা শখের থিয়েটারে অভিনয়। নদিয়া থেকে হাওড়া। হাওড়া জেলা স্কুলে পড়াশোনা। তারপর সিটি কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর। হাইস্কুল থেকেই অভিনয় শুরু। সত্যজিতের সঙ্গে তাঁর মানসপুত্রের আলাপ ১৯৫৬ সালে। যাঁর পরিচালনায় মোট ১৪টি ছবিতে কাজ করেছেন সৌমিত্র। কথিত আছে, সৌমিত্র–সত্যজিতের অভিনেতা–পরিচালকের রসায়ন বিশ্বসিনেমার ক্যানভাসে তোশিবো মিফুনে–আকিরা কুরোসাওয়া, মার্সেলো মাস্ত্রিওনি–ফেদেরিকো ফেলিনি, রবার্ট ডি নিরো–মার্টিন স্করসিসি, লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও–মার্টিন স্করসিসির কেমিস্ট্রির সঙ্গে তুলনীয়।

১৯৫৬ সালে সত্যজিৎ যখন ‘অপরাজিত’ বানাচ্ছেন, তখন সৌমিত্র ২০ বছরের। আলাপ হলেও তখন তাঁর মধ্যে অপুর ‘কৈশোর’ দেখতে পাননি সত্যজিৎ। কিন্তু দু’বছর পর ‘অপুর সংসার’-এ সত্যজিতের ‘অপু’ হলেন তিনি। ‘জলসাঘর’-এর শ্যুটিং–ক্লান্ত বিশ্বম্ভর রায়ের সামনে দাঁড় করিয়ে সটান বললেন সত্যজিৎ, ‘এই হল সৌমিত্র চ্যাটার্জি। আমার পরের ছবির অপু।’ তাঁর চেহারা সম্পর্কে তখন এতটাই মুগ্ধতা ছিল সত্যজিতের, যে বলেছিলেন, ‘তরুণ বয়সের রবীন্দ্রনাথ।’

আড়াইশোরও বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন সৌমিত্র । মনে থেকে যায় ‘সাত পাকে বাঁধা’, ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘ঝিন্দের বন্দি’, ‘একটি জীবন’, ‘কোনি’, ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘দত্তা’। নায়ক হিসেবে তিনি তাঁর সমসাময়িক সব নায়িকার বিপরীতেই সাফল্য পেয়েছেন। সম্ভবত তাই তেমন করে কারও সঙ্গে ‘জুটি’ গড়ে উঠেনি। সুচিত্রা সেনের সঙ্গে ‘সাত পাকে বাঁধা’, ‘দত্তা’ ছবিতে সৌমিত্র হয়ে উঠেছিলেন অনন্য। তেমনই সাবিত্রী, সুপ্রিয়া, অপর্ণারাও সৌমিত্রের সঙ্গে মিশেছেন অবলীলায়।

বাংলা ছবির দর্শকরা এক সময় ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান সমর্থকদের ভাগাভাগির মতো উত্তম–শিবির ও সৌমিত্র–শিবিরে বিভাজিত ছিলেন। যদিও সৌমিত্র নাটকের মঞ্চে থেকে গিয়েছেন নিজস্ব ধারায়। হাতিবাগানের বাণিজ্যিক থিয়েটার এবং গ্রুপ থিয়েটারের পাশাপাশি তৃতীয় একটি স্বতন্ত্র ধারার জনক বলা যায় নাট্যকার ও নাট্য পরিচালক সৌমিত্রকে। সেই পথ থেকে তিনি কখনও বিচ্যুত হননি। সাম্প্রতিক কালের ‘হোমাপাখি’, ‘ছাড়িগঙ্গা’, ‘আত্মকথা’-তেও সেই ধারা স্পষ্ট। ‘কারুবাসনা’-য় সতত আলোড়িত শুধু মঞ্চের বা সিনেমারই থাকেননি। কবিতাও লিখেছেন নিরন্তর। তাঁর ‘দ্রষ্টা’ গ্রন্থের ভূমিকায় কবি শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন, ‘সৌমিত্র নিজে যে দীর্ঘকাল অন্তর্নিবিষ্টভাবে কবিতা লিখে চলেছেন, তাঁর অভিনয় ক্ষমতার আড়ালে সে কথাটা অনেকখানি চাপা পড়ে গেছে’।

পুরস্কার ও সম্মাননা:

২০০৪ সালে ‘পদ্মভূষণ’, ২০০৬ সালে ‘পদক্ষেপ’ ছবিতে জাতীয় পুরস্কারে সম্মানিত সৌমিত্র ২০১১ সালে ভারতীয় সিনেমার সর্বোচ্চ সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পান। ঘটনাচক্রে, তার ছ’বছর পর ২০১৮ সালে তিনি ভূষিত হন ফরাসি সরকারের সেরা নাগরিক সম্মান ‘লিজিয়ঁ দ’নর’-এ। তাঁর মানসপিতা সত্যজিতের ঠিক ৩০ বছর পর।

শেষ কথা:

অতৃপ্তি থেকে অভিনয়ের খিদে, জীবনের অপূর্ণতা থেকে লড়াইয়ের রাস্তা ক্রমশ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে তাঁকে। অন্যচোখে দেখা তাঁকে শুধু অভিনেতাই নয়, একজন শিল্পী করে তুলেছে। যাঁর সবচেয়ে পছন্দের চেহারার হিন্দি সিনেমার হিরোর নাম বলরাজ সাহনি। কারণ, বলরাজের বোধি আর দীপ্তি। এত দীর্ঘসময় কেন অভিনয় করে গেলেন তিনি? আত্মপ্রদর্শনের তাগিদে? না কি গ্ল্যামারের হাতছানিতে? না কি মুদ্রারাক্ষসীর মোহিনী মায়াজালে পড়ে?

কোনওটাই নয়। আসলে তাঁর অভিনয় তাঁর জীবনকে পেরিয়ে গিয়েছিল। যখন অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়। উন্নততর মানুষ হওয়ার সাধনা যাত্রাপথের লক্ষ্য হয়ে উঠতে থাকে। উৎকৃষ্ট অভিনেতা হওয়ার পথ এবং উন্নত মানুষ হওয়ার পথ তখন অভিন্ন হয়ে যায়। সেই যাত্রার প্রধান প্রেরণা একটি চার-অক্ষরি শব্দের মধ্যে অনন্ত শয়ানে এলায়িত হয়ে থাকে। ভালবাসা। চলে গেলেও সৌমিত্র বলে যান—

‘পুরস্কার তিরস্কার কলঙ্ক কণ্ঠের হার

তথাপি এ পথে পদ করেছি অর্পণ,

রঙ্গভূমি ভালোবাসি হৃদে সাধ রাশি রাশি

আশার নেশায় করি জীবন যাপন’।

বিশ্ববরেণ্য অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মহাপ্রয়াণে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও অসীম ভালোবাসা। তিনি আজীবন অভিনয় ও আবৃত্তির মাধ্যমে মানুষের মাঝে বেঁচে থাকবেন। জয়তু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন।

[কৃতজ্ঞতা স্বীকার: সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়রের কিছু তথ্য আনন্দবাজার পত্রিকা থেকে নেয়া।]

লেখক পরিচিতি: স্বীকৃতি প্রসাদ বড়ুয়া, গণমাধ্যমকর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *