চেনা মানুষ

শারমিন আফরোজ বন্যা

শারমিন আফরোজ বন্যা: রাত বাড়তে থাকে, চাঁদনির ব্যস্ততাও বাড়ে। ছোট্ট সেল ফোন সেটটার দিকে বারবার চোখ যায়, মিস কল হয়ে রইলো কি? গাড়িটা গ্যারেজে রেখে লোকমান ফোন দেয় রোজই। তারপর ২০/২৫ মিনিটের হাঁটা পথ। এর মধ্যে গামছা, লুঙ্গি, সাবান বিছানাটার উপর রাখে সে। দৌঁড়ে দেখে আসে, কলঘরে ভিড় আছে কেমন। বড় লাল প্লাস্টিকের বালতিটায় আগেই পানি ধরে রাখে। লোকমানের রাগ খুব বেশি। পান থেকে চুন খসার উপায় নেই। প্রায়ই সে যখন বাড়ি ফেরে, তার চোখ দুটো টকটকে লাল জবার মতো হয়ে থাকে। চাঁদনি লোকমানকে ভীষণ ভয় পায়। কিন্ত তবু লোকমানকে সে ভালোও বাসে। কেমন যেন, তার অল্প বুদ্ধিতে মনে হয়, লোকমানের ভেতরটায় অসততা নেই। তাকে সচারাচর চুরি ছ্যাচরামো, ঝগড়া বিবাদের মধ্যে পাওয়া যাবে না। আবার সে ঠিক ভালো মানুষও নয়। কারণে অকারণে বউ পেটায়। যেন এর মধ্যেই পুরুষত্ব। বাড়িতে আধপেটা খেয়ে না খেয়ে, ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকা বাপ-মায়ের জন্যও তার কোন দায় নেই। কেমনধারা একটা মানুষ, চাঁদনির এতো ছোট মাথায় সব কথা খেলেও না।

মাসকাবারি বেতন পেয়ে প্রথমে ঘরের ভাড়া, তারপর মুদি দোকানের বাকিটা শোধ করা, আর সেদিন একটু ভালোমন্দ বাজার। এরপর প্রায় প্রায়ই মদ গিলে বাড়ি ফেরা। মদেরও নানান রকম। কোন কোন দিন মদ গিলে ফেরে যেন বাদশা, আর কোন কোন দিন একটা প্রচণ্ড হিংসুক! সেদিন সারা পৃথিবীর সব মানুষ খারাপ। তার মা-বাপ খারাপ, বউ খারাপ। কপালে ভালো কিছুই জুটলো না! অন্যদিন মনটা উদাস। এই রকম একটা জীবনের আসলে কি মানে! না মা-বাপকে খাওয়াতে পারছে, না নিজেদের দুটা জীবন কোন পরিণতির দিকে এগুচ্ছে।

মদ ছাড়া রাতগুলোতে দু’জনে একসাথে মাদুর পেতে খেতে বসে। চাঁদনি আগে লোকমানকে খাওয়ায়, তারপর নিজে খায়। ভালো দিনগুলোতে লোকমান বউকে বলে, ‘তুইও বইয়া পর, দেরি করস কেন।’ দুজনে খেতে খেতে, অথবা কোন কোন দিন এক কাঁথার নীচে পরস্পরের স্পর্শে, নানান ছোট ছোট গল্প হয়। চাঁদনি সারাদিন তিন বাড়িতে ছুটা কাজ করে আজকাল। স্বামীকে বলে, ‘এখন থিকা আমি ঘর ভাড়াটা দিমু। আপনি বাড়িতে কয়টা টাকা পাঠায়েন। বুড়া মানুষ দুইজন, কি খায় না খায়!’ লোকমানের খুশি গলার আওয়াজে বোঝার উপায় নাই, সে চাঁদনিকে আরো একটু কাছে টানে, মুখে শুধু বলে, ‘তুই খুব ভালো মেয়ে।’

আজ সময় পেরিয়ে গেছে, কিন্তু ফোন আসেনি। রোজকার মতো সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে সে বসে আছে প্রায় ঘন্টাখানেক। সে নিজে কল করেছে কয়েকবার। ফোনটা সুইচড অফ বলছে। দুঃশ্চিন্তায় তার কপাল ঘামতে শুরু করেছে। দেরি হলে রোজই তার মন কু ডাকে। তখন নিজে ফোন দেয়। গলাটা শুনলে জানে পানি আসে। আজ ফোনটা বন্ধ। চিন্তারা কতোদূর যে গড়ায়। সে অস্থির হয়ে বাইরে বেরিয়ে পরে। গ্যারেজটা সে চিনে না। এলাকায়ও তারা নতুন। কার সাহায্য নেবে? সে মনের মধ্যে খোঁজ করতে করতে এগোয় পাশের ঘরের দিকে।

আজ সারাদিন হরতাল। পুরা শহর সুনসান। রাস্তায় কোন গাড়ি নেই। লোকমান সবসময়ই গাড়ি চালায় সিনেমার নায়কের মতো। আজ ফাঁকা রাস্তা পেয়ে তার হাত পা নিশপিশ করে। কোথাও কোন ট্রাফিক পুলিশ নাই। তাই সিগন্যালের কোন ব্যাপার স্যাপার নাই আজ। কার সিগন্যাল গ্রীন, সেটা নয়, যে আগে কেটে যেতে পারবে যাবে। লোকমান গাড়ি চালায় মতিঝিল টু ক্যান্টনমেন্ট রুটের। জাহাঙ্গীর গেটে ঢুকেই কিন্তু সে আবার বিড়াল হয়ে যায়। স্পিডমিটার, লাল হলুদ সবুজে ইঞ্চি মেপে চলা সব তখন ঠিকঠাক। আজ সারা রাস্তায় কেবল দু’চারটা রিকশা চলছে।  ছাপোশা- অফিস ফেরত লোকদের নিয়ে। কোন প্রাইভেট কার নেই। আজকাল হরতালে পিকেটারও চোখে পরে না রাস্তায়। বিজয় স্মরণীর চার রাস্তার মোড়টা দূর থেকে চোখে পড়ছে। ফাঁকা। লোকমান ডানে বামে একবার দেখে নেয়। সংসদ ভবনের দিক থেকে তেজগাঁও ফ্লাইওভারে ওঠার সিগন্যাল হলুদ হয়ে গেছে। এক্ষুনি সবুজ হয়ে যাবে। আরেকটু জোরে টানলেই সে বেরিয়ে যেতে পারবে সিগন্যালটা। সে বাসে কয়েকজন অফিস ফেরত যাত্রী নিয়ে মতিঝিল থেকে আসছে। ক্যান্টনমেন্ট পেরিয়ে মানিকদী পর্যন্ত যাবে। টান দিয়েই আড় চোখে দেখতে পেল তার সমান গতিতেই ফ্লাইওভারের দিকে ধেয়ে  আসছে আরেকটা বাস…।

৯০ ডিগ্রী অ্যাঙ্গেলে পরস্পরকে ধাক্কা মারার একমুহূর্ত আগেও ড্রাইভার দু’জনই হয়তো ভেবেছিল, এইটা কোন ব্যাপারই না।

কিন্তু দুর্ঘটনাটা ছিল মারাত্মক। স্পটেই একজন ড্রাইভার মারা গেল। অন্য বাসের ধাক্কায় অথবা নিজের স্টিয়ারিং এ বাড়ি খেয়ে তার মৃত্যু হয়। অন্য ড্রাইভারও আহত হয় ভয়ানকভাবে।

বাসের সামনের দিকের কাঁচ ভেঙে আহত হলেন মহিলা প্যাসেঞ্জাররা। এল সেইপে মুখোমুখি ধাক্কার কারণে বাসের মুল বডিতে বসা মানুষগুলো নিরাপদ ছিল। বাস দু’টি ধাক্কা খেয়ে উল্টো দিকে ঘুরে গিয়ে সোজা হয়েই থেমে গিয়েছিল আইল্যান্ডের সাথে। কাঁচ ভেঙে আহত মানুষগুলো চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বাস থেকে নেমে এলেন।

মুক্তা অফিস থেকে ফিরছিল। বাসের মহিলা সিটে বসা ছিল সে। কাঁচ ভেঙে তার ডান দিকের গাল কাটলো অনেকটা। কিন্তু দরদর করে রক্ত পরছে না, তাই একটু সাহস পেল। হয়ত খুব ডীপ হয়ে কাটেনি। বারবার নিজেকে ধিক্কার দিল, রিকশা না নিয়ে কেন সে বাসে উঠতে গেল। ব্যাগ থেকে টিস্যু পেপার বের করে ডানহাতে রক্তটা চেপে ধরে রেখে সে ড্রাইভারের মুখের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠল। ড্রাইভার বেঁচে নেই, মারা গেছে। বুকটা স্টিয়ারিংয়ের ওপর। মাথাটা ডান উইনডোর গ্লাসে বাড়ি লেগে মোটা দাগে ফেটেছে। খানিকটা মগজ ছিটকে পরেছে জানালার গ্লাসে। মুক্তা সইতে পারছে না। খু্ব আপন কাউকে হঠাৎ হারানোর  বেদনার মতোই বোধ হচ্ছে। সে কিছুক্ষণ নিজের সিটে বসে নিজেকে স্ট্যাবল হতে সময় দিল। বসে থেকেই সে দেখল এই হরতালেও কিছুকিছু আগ্রহী মানুষ দৌঁড়ে আসছে। একটা পুলিশের বাইকও এসে গেল প্যাঁ-পো শব্দ করতে করতে। হুড়মুড় করে তার বাসের সব লোকজনই নেমে পরেছে ইতোমধ্যে। উৎসাহী লোকজন দরজায় উঁকি দিচ্ছে। পুলিশ দু’জন একটা ভ্যানগাড়ি যোগাড় করেছে। তাতে নীল পলিথিন।  একজন পুলিশ বাসের ভেতর মাথা গলিয়ে তাকে দেখতে পেল, ‘ম্যাডাম, কোন সমস্যা? সাহায্য লাগবে? নামতে পারছেন না?’ সে ডানে বামে মাথা ঝুলিয়ে তাকে আশ্বস্ত করতে চাইলো। পুলিশটি আদৌ কি কিছু বুঝল? সে অন্যদিকের ব্যস্ততার কারণে দ্রুত চলে যেতে যেতে বললো, ‘নেমে পরুন ম্যাডাম। আমাদের লাশটা নামাতে হবে। গাড়ি ক্লোজ করতে হবে!’

মুক্তা কিন্তু নামল না। সে ড্রাইভারটার মুখের দিকে তাকিয়ে বুদ্ধিহীনের মতো বসে বসে সড়ক দুর্ঘটনার হাজারটা ফেক্টর নিয়ে ভাবতে শুরু করল। কতো গবেষণা, অসামঞ্জস্যপূর্ণ সড়ক পরিকল্পনা, সঠিক ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ না থাকা, অতিরিক্ত মুনাফার জন্য বাসে বাসে গতির প্রতিযোগিতা, ট্রাফিক পুলিশ স্বল্পতা, তাদের দুর্নীতি পরায়নতা, সবশ্রেণি পেশার মানুষের আইন মানতে না চাওয়া, পথচারীর অসাবধানতা, ইত্যাদি ইত্যাদি।

অথচ আজ এই চোখের সামনে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাটা তাকে রিসার্চ পেপারের বাইরে ছুড়ে ফেলল। পুরো ব্যাপারটা তার চোখের সামনে ঘটল। এক মিনিট আগেও পুরো পরিস্থিতি এমন একটা ঘটনার সামন্যতম ইঙ্গিতও বহন করেনি।

চোখের সামনে মরে পরে থাকা ড্রাইভারটা তার চিন্তাকে নাড়া দিচ্ছে সম্পূর্ণ অন্যদিকে। তার মনে হচ্ছে বেশিরভাগ সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ হয়ত ড্রাইভারগুলোর নিজের জীবনের প্রতি মায়া না থাকা।

তাদের জীবনে চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে থাকে বিস্তর ফারাক। বাড়িতে যে প্রয়োজন তার পথ চেয়ে আছে তা মিটানোর সাধ্য তার নাই। তাই, তার বেঁচে থাকা না থাকায়, তার নিজের কোন ক্ষতি বৃদ্ধি নাই। তাই একটা অ্যাক্সিডেন্টে নিজের মৃত্যুর কথা সে ভাবে না। নিজের মৃত্যু নিয়ে যে নির্বিকার, অন্যের মৃত্যু তাকে কেন চিন্তিত করবে?

এইসব ভাবতে ভাবতে সে দেখে, শ্রমিকমতো দেখতে কয়েকজন মানুশ লাশটাকে নামিয়ে নিল। তবু মুক্তা বেশ খানিকটা সময় ড্রাইভারের খালি সিটটার দিকে তাকিয়ে বসে রইল এবং তখনই তার চোখ আটকে গেল ড্রাইভারের নেমে যাওয়ার দরজাটার দিকে। দরজাটা খুললেই মোবাইলটা পরে যাবে এমন একটা অবস্থায় একটা ছোট্ট মোবাইল সেট আটকে আছে। সাতপাঁচ কোন কিছু না ভেবেই সে মোবাইলটা হাতে নিল। চার্জ নাই। অন্ধকার কালো স্ক্রিন। তারপর একজন পুলিশ এসে তাকে তাড়া দিয়ে নামিয়ে দিল। সে নেমে দেখল, লাশটাকে নীল পলিথিন দিয়ে প্যাকেট করা হয়েছে। সে আরো অনেকক্ষণ বোধহীনভাবে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর একটা রিকশা ডেকে উঠে বসল।

বাড়ির কাছাকাছি এসে সে রিকশার ভাড়া দিতে গিয়ে খেয়াল করলো ড্রাইভারের মোবাইলটা তার হাতে রয়ে গেছে।

দু’রকম অনুভতি হলো তার একই সাথে। ড্রাইভারটার কাছের মানুষগুলোকে তার জানাতে ইচ্ছা করছিল ভীষণভাবে। মোবাইলটা তাকে সে সুযোগ করে দেবে। পাশাপাশি মনে হচ্ছিল, একটা ভুল হয়ে গেল ঘোরের মধ্যে। মোবাইলটা যদিও খুব দামী নয়, কিন্তু তবু বর্তমান পরিস্থিতিতে এটা একটা চোরাই মাল। পুলিশি জটিলতায় সে একটু ভীতু। সে ঠিক করে, আজই মোবাইলটা ঠিক হাতে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করবে সে।

ঘরে ঢুকেই ছেলেকে বলে পুরো বিষয়টা। আগে মোবাইলের একটা চার্জার খুঁজে দিতে বলে। একপিনের একটা চার্জার ছিল কোথাও, ছেলেটা এসবের খোঁজ রাখে, সে পেয়েও গেল। মোবাইলটা চার্জে দিয়ে সে প্রথমে ফ্রেশ হলো। গালের আঘাতটা ডীপ নয়। চামড়া ছড়ে গেছে। আর লম্বায় চিকন করে কেটেও গেছে বেশ কিছুটা। সেলাই দরকার নেই, সেটুকু বোঝা যায়। ঠিক করে, যখন মোবাইলটা নিয়ে বের হবে তখন পথে তাদের নিয়মিত ডাক্তারকে একটু দেখিয়ে নেবে। তারপর সে রাতের ডিনারের মতো ভারি খাবার খেয়ে নেয়। উঠে গিয়ে মোবাইলটা অন করে, কল লিস্টে ঢুকতেই আবার ফোনটা অফ হয়ে যায়। ছেলেকে বলে, ‘দেখ যদি রিস্টার্ট দিয়ে শুধু টপ কল লিস্ট থেকে প্রথম দু’একটা নাম্বার কাগজে লিখে দিতে পার!’ তারপর ছেলের কাছে ফোনটা রেখে সে বিছানায় নিজেকে ছেড়ে দিল এবং অতিরিক্ত স্ট্রেসের কারণে বা ব্যথার অষুধটা ব্যথা বোধশুন্য করে দেওয়ায় তার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এলো।

যখন ঘুম ভাঙলো তখন রাত ন’টা বেজে গেছে। বাকিদের খাওয়া দাওয়া হয়ে গেছে। মোবাইলটা অন করা যায়নি। অ্যাক্সিডেন্টের সময় জোর বাড়ি খেয়ে ব্যাটারিটা ফেটেছে। ছেলে সেটা নিয়েই পরে আছে। কাগজ, টেপ, পেন্সিল নানান ভাবে ব্যাটারিটা জায়গা মতো বসানোর চেষ্টা চলছে। সে তাই আজ আর নম্বর পেলেও বের হওয়া যাবে না। এটুকু ধরে নিয়ে, নিজের ঘরোয়া পোশাক পরে নিয়ে রাতের শেষ কাজগুলো সারল। ততক্ষণে ১০ পারসেন্ট চার্জ করে ছেলে দু তিনটা নম্বর বের করে নিতে পেরেছে। যার মধ্যে একটা মেয়ের নাম। সে ঠিক করল মেয়ের নম্বরটাতেই প্রথমে কল দেবে।

চাঁদনির সাথে তার যখন দেখা হলো, পরদিন বেলা দশটা নাগাদ, উদ্ভ্রান্তের মতো সে তখনো কাঁদছে। শুধু বাংলাদেশের মানুষেরাই বোধহয় শোক প্রকাশের জন্য এমন হায় মাতম জুড়ে দেয়। সে কখনো গড়িয়ে পরছে, কখনো সুর করে লোকমানের নানান স্মৃতিচারণ করছে। কখনো বেহুঁশ হয়ে যাচ্ছে। টিনশেডের ছোট এক রুমের বাসিন্দারা তাকে দেখে নিজেদের থেকে আলাদা এটুকু বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি একজন কেউ একটা চেয়ার আনে। আরেকজন চাঁদনিকে ডাকে। বলে, ‘দেখ, আফা আইছে।’

চাঁদনির হাতে মোবাইলটা, কিছু টাকা, আর নিজের একটা ভিজিটিং কার্ড দিয়ে বলে, ‘আমি আসি। যদি ঢাকায় আবার ফিরে আসো বা বাড়ি থেকেও যে কোন প্রয়োজনে এই নাম্বারে আমার সাথে যোগাযোগ ক’রো।’

পথে নেমে আজ তার আর অফিসে যেতে ইচ্ছা করে না। সে সিনিয়রকে একটা সিক কল দিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দেয়। সারা পথ, এইসব মানুষগুলো তার মাথাটা চেপে ধরে থাকে। তার মনে হয়, স্বপ্ন দেখার শিক্ষা দেওয়াটা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পরেছে। বাধ্যতামুলক প্রাইমারি শিক্ষার একটা বড় অংশ হওয়া উচিৎ ‘নিজেকে মুল্যায়নের শিক্ষা, নিজেকে কাজে লাগানোর শিক্ষা, নিজেকে নিজের সর্বোচ্চ পর্যায়ে গড়ে নেওয়ার শিক্ষা।’

সমাজের কতো বড় একটা অংশ দারিদ্র সীমার নিচে বাস করে। সেই সব মানুষগুলোকে নিয়ে কাজ করা দরকার। তাদের মনোজগতে, তাদের সামাজিক অবস্থান, তাদের জীবন টাকেই ভালোবাসার শিক্ষা দেওয়া দরকার। প্রত্যেকটা জীবনের রঙিন দিক থাকে। কেবল দরকার সেটা চিনে নিতে সাহায্য একটু সাহায্য। সে কিন্তু জেলের ছেলেকে জেলে বা ড্রাইভারের ছেলেকে ড্রাইভার হতে বলে না। জীবনের নানান উত্থান পতনের কারনে জীবন জীবিকার নানান পথ তার হাঁটা। সব পথে গোলাপ ফোটানো নাই, কিন্তু সব পথের স্বতন্ত্র সৌন্দর্য রয়েছে। শুধু সেটুকু খুঁজে নিতে জানতে হবে। জ্ঞান, শক্তি, অর্থনৈতিক এবং পারিবারিক সামর্থ্য অনুযায়ী স্বপ্ন হতে হবে ভিন্ন ভিন্ন। একটা ক্লাসের সবকজন ছাত্রই একটা বয়স পর্যন্ত ডাক্তার হতে চায়। অথচ সে জানেই না সেই পেশায় পৌছানোর পথ টুকু তার জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা। সে জানে না অনেক কষ্টের পর সফল হয়েও, সে হয়ত ব্যর্থ বা অতৃপ্ত রয়ে যেতে পারে জীবনে।

মুক্তা খুব অনুভব করে, প্রথম শ্রেণি থেকেই প্রতিটা ক্লাসে মনোবিজ্ঞান পড়ানো উচিত। যেখানে সুখি হতে বা বেঁচে থাকার উৎসাহ তৈরিতে, নিজেকে সর্বোচ্চ কাজে লাগাতে, হিংসা না করতে, প্রতিযোগিতায় না নামতে, তারচেয়ে ছোট হয়ে থাকা মানুষগুলোকে সাহায্য করার মত বিষয়গুলো প্র্যাকটিকাল ক্লাসের মাধ্যমে শেখানো হবে।

একটা জীবনকে অন্য জীবনে পাল্টে নেওয়াটাই একমাত্র সফলতা নয়। বরং নিজ মাটিতে, নিজ বাস্তবতায়, নিজের পারিপার্শ্বিকতায় সুখটুকু চিনতে পারলেই সত্যিকারের সুখি হবে সবাই। অন্তত নিজের জীবন বা অন্যের জীবন নিয়ে এমন বেপরোয়া তো হবেই না। মুক্তার ভেতরটা ছটফট করে। ১৬ কোটির চেয়েও বেশি মানবসম্পদ, কেন তাদের সম্পদে পরিণত করা যায় না?

পাদটীকা:

প্রায় বছর দুয়েক পর একদিন একটা অচেনা নাম্বার থেকে ফোন পেল মুক্তা। চাঁদনি ঢাকায় এসেছে। দেখা করতে চায়। এরই মধ্যে তার আরেকবার বিয়ে হয়েছিল। তারই বয়েসি ছেলেমেয়ে আছে এমন এক বৃদ্ধের সাথে। গোয়াল ঘর, রান্নাঘর আর বুড়ার দেখাশোনাই ছিল তার কাজ। তাও সে সেই জীবনটাকে মেনে নিয়েছিল। কিন্তু গেল শীতে খুব কফ জমে বুড়োটা মরে গেল। ছেলে, ছেলের বউয়েরা কাজের লোকের মতো থাকতে দিতে চেয়েছিল। তার ভালো লাগলো না। আপার কার্ডটা ফেলে নাই সে। একটা জাদুর চেরাগের মতো রাখা ছিল গোপন বাক্সে। আজ তাতে ঘষা দিয়ে দেখল, কাজ হচ্ছে।

মুক্তা এরকম অনেক মেয়ের পাশে দাঁড়িয়েছে এ জীবনে। আজও কিছু না ভেবেই উত্তর দিয়েছে, ‘চলে এসো আমার কাছে।’

মুক্তা কেবল তাকে শেখাবে সে একজন মানুষ। তার অনেক সীমাবদ্ধতা ছাপিয়ে তার নিশ্চয়ই রয়েছে কোন বিশেষত্ব। সেটা আমৃত্যু কাজে লাগাতে হবে। আয় করতে হবে। নিজের জন্য ব্যয় করতে হবে। সঞ্চয় করতে হবে। নিকটাত্মীয়কে সাহায্য করতে হবে। অনাত্মীয়কে ভালোবাসতে হবে। সবকিছু করতে হবে নিজের সীমাকে লঙ্ঘন না করে। বেঁচে থাকার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বেঁচে থাকতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *