শিশুদের সাথে কাটানো উচ্ছ্বসিত মুহূর্তগুলো

তাহমীন সুলতানা স্বাতী: সে দিনটি ছিল ১৯৭৫ সালের ১৭ মার্চ, সম্ভবত মঙ্গলবার। বঙ্গবন্ধুর জীবনের শেষ জন্মদিন। জীবনে সেই প্রথম এবং শেষ দেখা আমার বঙ্গবন্ধুর সাথে। মাঝখানে পার হয়ে গেছে অনেক বছর। তাও মনে হয় এই তো সেদিনের কথা।

জাতির পিতার ৫৫তম জন্মদিন পালন করতে, জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন খেলাঘর, কচিকাঁচার মেলা, গার্লস গাইড আর স্কাউটের ছোট ছোট শিশু-কিশোররা মিলিত হয়েছিলাম, আসাদগেটের গণভবনের বিস্তৃত অঙ্গন, লেকের পার ঘেঁষা সবুজ ঘেরা প্রান্তরে। শুধু একবারই, এক্কেবারে সামনে থেকে দেখেছিলাম বঙ্গবন্ধুকে।

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি, অবিসংবাদিত নেতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তার জীবনের এ শুভ দিনটিতে পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে হাত মেলালেন বাংলার ভবিষৎ, বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ, শিশু-কিশোরদের সাথে- আমাদের সাথে।

আগের দিন, ১৬ মার্চের রাত থেকেই বঙ্গবন্ধুকে দেখতে পাব, এ উত্তেজনায় ঘুম ছুটে গিয়েছিল আমাদের নয়াপল্টন পাড়ার, সৃজনী খেলাঘর আসরের সদস্যদের। আমি এবং আমার ছোট বোন শারমীন সুলতানা দীপু কেডস জুতোটাকে ধুয়ে শুকিয়ে, চক পাউডার দিয়ে সাদা রঙ করে নতুন করে তুলেছিলাম।

লোহার ইস্ত্রিটা চুলায় গরম করে নিয়ে, খেলাঘরের সাদা পোশাক, আর রক্ত লাল স্কার্ফটা, পরিপাটি করে আয়রন করে রেখে দিয়েছিলাম।

১৭ মার্চ সকাল না হতেই আমরা দুই বোন দ্রুত খেলাঘরের পোশাক পরে নিয়ে, নাস্তা সেরে নিলাম। সৃজনী খেলাঘর আসরের নির্বাচিত, নির্দিষ্ট ক’জন সদস্যসহ, আমরা পৌঁছে গেলাম তোপখানা রোডের বাংলাদেশ পরিষদের সামনে (প্রেসক্লাবের উল্টো পাশে) । সেখানে আমাদের নেয়ার জন্য আগে থেকেই বাস দাঁড়িয়েছিল।

খেলাঘরের প্রায় ৩০০ শিশু-কিশোর প্রতিনিধি ভিন্ন ভিন্ন বাসে উঠে গেলাম। ঢাকা শহরের বিভিন্ন পাড়ার খেলাঘর আসর ছাড়াও কুমিল্লার সবুজ কুঁড়ি ও ফুলকলি খেলাঘর আসর এবং গোদনাইলের ঝিলিমিলি খেলাঘর আসর থেকেও ভাইবোনেরা এসেছিল বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে অংশ নিতে। পথ থেকে তুলে নেয়া হলো ঢাকার মনিপুরী পাড়ার বালার্ক খেলাঘরের ভাইবোনদের।

বড় ভাইদের নির্দেশনা মোতাবেক, গণভবনের সামনে যেয়ে, সারিবদ্ধ ভাবে মার্চ করতে করতে, সকাল ৯টায় বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন পালন করতে, আমরা প্রবেশ করলাম গণভবনের বিস্তৃত প্রাঙ্গণে।

আমাদের সাথে খেলাঘরের গাইড ও অভিভাবক হিসেবে ছিলেন খেলাঘর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতিমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য-বিশিষ্ট সাংবাদিক, বঙ্গবন্ধুর প্রিয়ভাজন আমাদের শওকত আনোয়ার ভাই, খেলাঘর কেন্দ্রীয় কমিটির তুখোড় সম্পাদক আবদুল আজীজ ভাই এবং খেলাঘর ঢাকা মহানগর ও সংস্কৃতিক দায়িত্বপ্রাপ্ত খেলাঘর কেন্দ্রীয় কমিটির তৎকালীন গুণী সদস্য সাজ্জাদ জহির বাচ্চু ভাই।

গণভবনের বিস্তৃত প্রাঙ্গনে প্রবেশের সাথে সাথে, আমাদের লজেন্স-চকলেট দিয়ে স্বাগত জানানো হলো। গণভবনের দরজা আজ খুলে দেয়া হয়েছে হাজারও শিশুর জন্য।

প্রাণের সারা পরে গেছে আজ গণভবনের প্রাঙ্গণে। সারিবদ্ধ ভাবে আমাদের কয়েকটি সারিতে দাঁড় করালেন বড় ভাইয়েরা। আকাশ-বাতাস মুখরিত হতে থাকল খেলাঘর আর কচিকাঁচার মেলার ছোট ছোট শিশুদের কলরব, গান আর স্লোগানে। আমরা স্লোগান দিতে থাকলাম, ‘শুভ শুভ শুভ দিন, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন’। ‘আজ কিসের দিন, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন’।

গানে গানে মুখরিত হয়ে উঠল গণভবন চত্বর। আমি তখন অষ্টম শ্রেণী থেকে মাত্র নবম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছি। কৈশোরের সেই- আমার, সে মুহূর্তে কেন জেন শুধু মনে হতে লাগল, বঙ্গবন্ধু শুধু আমাদের- শুধু শিশু-কিশোরদের সবচাইতে কাছের মানুষ, সবচাইতে আপনজন। আমাদের সবার সত্যিকারের-জাতির পিতা। এ বোধ এবং অনুভবটা সেদিন সেখানে আমার মতো হয়তো অনেকেরই হয়েছিল।

আমরা আমাদের খেলাঘরের প্রিয় গানগুলো, বঙ্গবন্ধুকে শোনানোর জন্য, বারবার করে গাইতে শুরু করলাম। সেদিন যে গানগুলো আমরা করেছিলাম, তার মধ্যে ছিল-

‘আমরাতো সৈনিক শান্তির সৈনিক, অক্ষয় উজ্জ্বল সূর্য, / সৃষ্টির লক্ষ্যে আমাদের যাত্রা, আমরাতো জীবনের তূর্য’

‘আমরাতো গড়ব, হাসি গানে ভরা এক, শান্তির অপরূপ বিশ্ব, / থাকবে না যেখানে যুদ্ধ ও ধ্বংস লাঞ্ছিত বঞ্চিত নিঃস্ব।’

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সাথে মিলে যায় বলে, উপরের গানের শেষ লাইন দুটো, বারবার করে গাইতে বলে দিয়েছিলেন খেলাঘরের বড় ভাইয়েরা।

আমরা আরও গাইলাম-

‘মানুষে মানুষে, জাতিতে জাতিতে, সেতু গড়ি, চল সেতু গড়ি, / হেই- হিংস্র দানোর সঙ্গে লড়াই ধরি, চলো সেতু গড়ি।

যে গানটা বঙ্গবন্ধু মনে হয় সবচাইতে বেশি পছন্দ করেছিলেন সেটা ছিল- ‘আমরা সোনার দেশের, সোনার মানুষ, গড়ব সোনার দেশ, মোরা দুঃখ জরা, মৃত্যু ভীতি, করব রে সব শেষ, ও ভাই গড়ব সোনার দেশ, ও ভাই গড়ব সোনার দেশ’।

অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, প্রিয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু প্রবেশ করলেন প্রাঙ্গণে। আনন্দের বন্যা ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। হঠাৎ বিস্মিত হয়ে দেখলাম, জাতির পিতা কয়েকটি সারি অতিক্রম করে, আমাদের গানের কথা ও সুরে মুগ্ধ হয়ে, খেলাঘরের শিশু-কিশোরদের সারির দিকে এগিয়ে আসছেন।

বঙ্গবন্ধুকে খেলাঘরের লাল স্কার্ফ পরিয়ে দিল ঝিলিমিলি খেলাঘর আসরের এক ছোট্ট বোন। যে কিনা ছিল গোদনাইলের ঢাকেশ্বরী মিলের একজন শ্রমিকের সন্তান।

শওকত ভাই জাতির পিতার সাথে দেশের গর্ব শ্রমিকের সন্তান, ছোট্ট বোনটির পরিচয় করিয়ে দিলেন।

জাতির পিতা একে একে হাত মিলালেন সবার সাথে। কারও মাথায় স্নেহমাখা হাত দিয়ে আদর করে দিলেন, কারও নাম জিজ্ঞেস করলেন, কারও সাথে দুষ্টমি করলেন।

হাত মেলানোর একপর্যায়ে, আমরা সমবেত কণ্ঠে একটি গান শোনানোর পর, বঙ্গবন্ধু নয়াপল্টনের সৃজনী খেলাঘর আসর এবং চামেলীবাগের চামেলী খেলাঘর আসরের ভাইবোনসহ খেলাঘরের সদস্যদের সাথে গল্প করা শুরু করলেন। বঙ্গবন্ধু সৃজনী খেলাঘরের পারভীন লাইলা লুসীর (১৯৯৭-এ জিমন্যাস্টিকস এ জাতীয় পদক প্রাপ্ত, বর্তমানে চট্টগ্রাম সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত) মাথায় তার স্নেহের হাতটা রেখে কথা বলছিলেন।

চারপাশে জাতির পিতাকে ঘিরে ধরেছিলাম আমরা। সৃজনী খেলাঘর আসরের চিত্রা সুলতানা (তৎকালীন সময়ের বিশিষ্ট শিশু শিল্পী এবং বতর্মানে বিশিষ্ট সংগীত ও চারুশিল্পী), চামেলী খেলাঘর আসরের মনু, সৃজনী খেলাঘর আসরের রেজীনা আক্তার, ফিরোজা সুলতানা, তসলিমা জাহান শিখা, খুকী, শারমীন সুলতানা দীপু (সংগীত শিল্পী), আমি তাহ্মীন সুলতানা স্বাতীসহ খেলাঘরের একঝাঁক শিশু-কিশোর।

যতটুকু মনে আছে, বঙ্গবন্ধু আমাদের বিভিন্ন কথার মাঝে বলেছিলেন, আজকের এ দিনটা শিশু-কিশোরদের মাঝে উনার অনেক অনেক আনন্দে কাটছে। দেশটাকে শিশু-কিশোরদের সবাইকে অনেক বেশি করে ভালোবাসতে হবে।

তিনি বোঝাচ্ছিলেন- শিশুরাইতো দেশের ভবিষ্যৎ, মানে আমরাই দেশের ভবিষ্যৎ। চিত্রা সুলতানা বঙ্গবন্ধুকে হেসে হেসে আশ্বস্ত করছিল। আর বঙ্গবন্ধু যেন, বুকভরা স্নেহ-ভালোবাসা-আশা নিয়ে খেলাঘরের শিশুদের কাছ থেকে আশ্বাস বাণীগুলো শুনছিলেন।

একে একে জাতির পিতা সমবেত সহস্রাধিক শিশু-কিশোরদের সাথে হাত মেলালেন। এরই মাঝে আমাদের হাতে এসে পৌঁছাল লোভনীয় খাবারের প্যাকেট। যতটুকু মনে পরে তাতে ছিলো স্যান্ডউইচ, কলা, আপেল, কেক, বিস্কিট ইত্যাদি। শুরু হয়ে গেল হৈহৈ, রৈরৈ।

ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু সমবেত শিশুদের উদ্দেশে ঘোষণা করে দিলেন- আজ এই গণভবন তোদের, তোরা মুক্ত হয়ে যেখানে খুশি ঘুরে বেড়া। যেই না শোনা এ কথা আমাদের আর পায় কে, বাধাই বা দেয় কে। সে মুহূর্তে মনে হলো আমরা সবাই যেন এদেশের রাজা, দেশের প্রধান।

আমরা গান শুরু করে দিলাম- ‘আমরা সবাই রাজা, আমাদের এই রাজার রাজত্বে’।

আমরা লাফিয়ে লাফিয়ে ঘোরাঘুরি শুরু করলাম। শিশুদের মধ্যে যারা একটু বড় ছিল তারা তো রীতিমতো দুরন্তপনা করা শুরু করল। আমার এখনও চোখে ভাসে, বঙ্গবন্ধুর পাশে গান ও স্লোগানরত বালার্ক খেলাঘরের সুরমা আপার আবেগী প্রাণোচ্ছল চেহারাটা।

কেউ কেউ লেকের জলে পর্যন্ত নেমে পড়ল। বঙ্গবন্ধু এ সময় বারবার তার বডিগার্ডকে, তাকে গার্ড না দিয়ে শিশুদের যাতে কোন দুর্ঘটনা না ঘটে তা দেখতে বলছিলেন। বারবার বলছিলেন, শিশুদের গার্ড দিতে। এর পরপরই জাতির পিতা, নিজেই সবাইকে নিয়ে ছুটলেন, লেকের পারে মাছ দেখাতে। যেখানে বঙ্গবন্ধু মাছদের নিয়মিত খাবার দিতেন। আমরা সবাই হুড়োহুড়ি করে, দৌড়ে দৌড়ে ছুটছি জাতির পিতার পিছু পিছু। সামনে বঙ্গবন্ধু, যেন এক হ্যামিলনের বংশীবাদক। পেছনে ছুটে চলেছে শিশুরা। লেকের পারে যেয়ে বঙ্গবন্ধু হাততালি দিতেই মাছেরা যেন ম্যাজিকের মতো ঝাঁক বেঁধে চলে এল, খাবারের আশায়। জাতির পিতা সবাইকে প্রশ্ন করলেন- বলতো তোরা মাছ খায় কে? সবাই চিল্লিয়ে বলে উঠল, বক মাছ খায়।

তারপর বঙ্গবন্ধু বললেন- আমি বক মানে বগাকে ফান্দে ফেলেছি যাতে বগা মাছ খেতে না পারে। এরপর সুর করে করে, বঙ্গবন্ধু বলতে লাগলেন- ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দেরে। তিনি সবাইকে তার সাথে গলা মিলাতে বললেন। চারিদিকে শুরু হয়ে গেল সুরময় ছন্দের কলকাকলী- ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দেরে’। সেই সাথে হৈহুল্লোড় আর দ্রিম দ্রিম নাচ। হাসতে হাসতে আমাদের পেটে খিল প্রায়। আনন্দের বন্যা বয়ে চলল বাতাসের হিল্লোলে।

কি যে আনন্দ হচ্ছিল সবাই মিলে একসাথে। মনে হলো আজ আমরা সব কিছু পেয়ে গিয়েছি। এ বাংলাদেশটা বোধহয় শুধু নির্ঘাত শিশুদের রাজ্য হয়ে যাবে।

হঠাৎ শুরু হয়ে গেল মুষলধারে বৃষ্টি। আমাদের আনন্দ যেন আরও বেড়ে গেল। বৃষ্টির পানি, লেকের পানি আর শিশুদের খুশি যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।

প্রায় ৩ ঘণ্টা গণভবনে কাটিয়ে, বঙ্গবন্ধুকে শিশুদের অকৃত্রিম, প্রকৃত বন্ধু হিসেবে চিনে নিয়ে ফিরে এলাম নয়াপল্টনের নিজ বাড়িতে। মনে মনে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে, জাতির পিতাকে ভালোবেসে, দেশের জন্য নিজেকে গড়ার প্রত্যয় নিয়ে, অপেক্ষায় রইলাম বঙ্গবন্ধুর পরের জন্মদিনের জন্য- যেদিন আবার আমাদের প্রিয় বঙ্গবন্ধুর সাথে, আমাদের জাতির পিতার সাথে আমাদের সাক্ষাৎ হবে। আজও প্রতীক্ষায় আছি।

লেখক পরিচিতি: তাহমিনা সুলতানা স্বাতী; সাবেক সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *