এমন দিন আর না আসুক

ইতিহাসের ভয়াবহতম গ্রেনেড হামলার ১৬তম বার্ষিকী আজ। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস বিরোধী শান্তি সমাবেশে নারকীয় গ্রেনেড হামলা চালানো হয়।

অবিস্ফোরিত গ্রেনেড। চারদিকে লাশ আর আহতের আর্তনাদ…

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব শূন্য করতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকার রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে নৃশংসতম গ্রেনেড হামলা চালায়।

মোহাম্মদ হানিফের নেতৃত্বে মানব ঢাল তৈরি করে জীবন রক্ষা করা হয় শেখ হাসিনার

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও সে সময়ের বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতা সেদিন এই ভয়াবহ হামলা থেকে বেঁচে যান। তবে মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বেগম আইভি রহমানসহ ২৫ জন এতে নিহত হন। ওই হামলায় অন্তত ৪শ’ জন আহত হন। আহতদের অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন।

দিবসটি উপলক্ষে আওয়ামী লীগ এবং তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

একুশে আগস্টের শান্তি সমাবেশে শেখ হাসিনার বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে আচমকা গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটে। ঢাকার তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ হানিফ এবং শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত দেহরক্ষীরা তাৎক্ষণিকভাবে মানব ঢাল তৈরি করে শেখ হাসিনাকে গ্রেনেডের হাত থেকে রক্ষা করেন। স্পিন্টার

মেয়র হানিফের মস্তিস্কে রক্তক্ষরণজনিত অস্ত্রোপাচার করার কথা ছিল। কিন্তু গ্রেনেডের স’প্লিন্টার শরীরে থাকায় অস্ত্রোপাচার করা সম্ভব হয়নি। পরে তিনি ব্যাংককে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এদিকে, শেখ হাসিনা গ্রেনেডের আঘাত থেকে বেঁচে গেলেও শ্রবণ শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

জীবন্মৃত অবস্থায় আইভি রহমানকে নেয়া হয় হাসপাতালে

এই বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলায় নিহতদের মধ্যে ছিলেন- আইভি রহমান, শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী অবসরপ্রাপ্ত ল্যান্স কর্পোরাল মাহবুবুর রশীদ, আবুল কালাম আজাদ, রেজিনা বেগম, নাসির উদ্দিন সরদার, আতিক সরকার, আবদুল কুদ্দুস পাটোয়ারি, আমিনুল ইসলাম মোয়াজ্জেম, বেলাল হোসেন, মামুন মৃধা, রতন শিকদার, লিটন মুন্সি, হাসিনা মমতাজ রিনা, সুফিয়া বেগম, রফিকুল ইসলাম (আদা চাচা), মোশতাক আহমেদ সেন্টু, মোহাম্মদ হানিফ, আবুল কাশেম, জাহেদ আলী, মোমেন আলী, এম শামসুদ্দিন এবং ইসাহাক মিয়া।

আহত হয়েছিলেন শেখ হাসিনা, আমির হোসেন আমু, আব্দুর রাজ্জাক (প্রয়াত),সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত (প্রয়াত), ওবায়দুল কাদের, মোহাম্মদ হানিফ (প্রয়াত), অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন (প্রয়াত), এ এফ এম বাহাউদ্দিন নাছিম, নজরুল ইসলাম বাবু, আওলাদ হোসেন, মাহবুবা পারভীন, অ্যাডভোকেট উম্মে রাজিয়া কাজল, নাসিমা ফেরদৌস, শাহিদা তারেক দিপ্তী, রাশেদা আখতার রুমা, হামিদা খানম মনি, ইঞ্জিনিয়ার সেলিম, রুমা ইসলাম, কাজী মোয়াজ্জেম হোসেইন, মামুন মল্লিকসহ ৪শ’রও বেশি নেতা-কর্মী।

ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা পাঁচটি গ্রেনেড ধ্বংস করে প্রমাণ নষ্ট করার চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ আছে। এছাড়া এই হত্যাকান্ডের বিষয়ে তৎকালীন বিএনপি সরকার নির্লিপ্ত ভূমিকা পালন করেছিল। এমনকি হামলার সাথে জড়িতদের রক্ষায় সরকারের কর্মকর্তারা ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে। সাজানো হয় জজ মিয়া নাটক। এছাড়া সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মন্তব্য করেন, বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা তার ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে সমাবেশে গিয়েছিলেন।

পরে নতুন করে তদন্ত শুরু হলে বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ঘটনার সাথে তারেক রহমান জড়িত আছেন বলে দাবি করে। তিনি জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাধর বড় পুত্র তারেক রহমান ‘এ হামলার ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলেন।’

হামলার সাথে জড়িত ব্যক্তি অথবা গোষ্ঠীর সন্ধানদাতার জন্য সে সময় বাবর এক কোটি টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন। হামলার পর বাবরের তত্বাবধানে একটি তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় এবং এতে জজ মিয়া নামে এক ভবঘুরে, একজন ছাত্র, একজন আওয়ামী লীগের কর্মীসহ ২০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তী তদন্তে তাদের কারও বিরুদ্ধেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।

হামলায় আহত ও নিহতদের কয়েকজন

ওয়ান ইলেভেনের সরকার এ হামলার নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশ দেয়। এতে সাড়ে তিন বছর পর বিলম্বিত পুলিশ চার্জ শিট নথিভুক্ত করা হয়। অথচ বিএনপি’র একাধিক নেতা ও সংসদ সদস্য এই জঘন্য হামলাকে আওয়ামী লীগের পরিকল্পিত হামলা বলে দাবি করেছিলেন।

পুনরায় তদন্তে পুলিশ এই হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ২১ জনকে চিহ্নিত করে। এর আগে ব্রিটিশ স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড, ইউএস ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) এবং ইন্টারপোল বাংলাদেশী তদন্তকারীদের সাথে যোগ দিলেও বিএনপি সরকার তাদের সহযোগিতা করেনি বলে এসব প্রতিষ্ঠান অভিযোগ করেছিল।

চাঞ্চল্যকর এ মামলায় বিচারিক আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে প্রধান কৌসুলি সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, ‘এ মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে সাক্ষ্য তথ্য প্রমাণে দেখেছি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগে গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার জঙ্গি গোষ্ঠীর সহায়তা নিয়ে ইতিহাসের জঘন্যতম এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

‘তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি সংঘবদ্ধ হয়ে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব শূন্য করা এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যাই ছিল ভয়াবহ ওই গ্রেনেড হামলার লক্ষ্য। ‘যুদ্ধে ব্যবহৃত সমরাস্ত্র দিয়ে নিরস্ত্র মানুষ এবং কোন রাজনৈতিক দলের সমাবেশে হামলার ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার অভিযুক্তরা

একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিএনপি নেতা লুৎফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদন্ড এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ডের আদেশ দিয়ে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর রায় দেন বিচারিক আদালত।

এই রায়ের বিষয়ে হাইকোর্টে আপিল মামলা শুনানীর অপেক্ষায় আছে। বর্তমানে শুনানীর জন্য পেপারবুক তৈরীর কাজ চলছে।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা মামলার বিচারিক আদালতের রায় বিষয়ে আপিল ও ডেথ রেফারেন্স শুনানি উচ্চ আদালতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হবে।

তিনি জানান, মামলাটির গুরুত্ব উল্লেখ করে অগ্রাধিকারভিত্তিতে শুনানির আবেদন করা হবে। যেন শুনানির জন্য একটি বেঞ্চে পাঠানো হয়। বিচারিক আদালত আসামিদের যে সাজার রায় প্রদান করেছেন তা যেন বহাল থাকে উচ্চ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের সে প্রচেষ্টা থাকবে বলেও জানান তিনি।
সুপ্রিমকোর্টের মুখপাত্র ও বিশেষ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুর রহমান জানিয়েছেন, একুশে আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ঘটনায় মামলার পেপারবুক সুপ্রিমকোর্টে যাচাই বাছাইয়ের কাজ চলছে।

এর আগে ১৬ আগস্ট এ পেপারবুক সুপ্রিমকোর্টে পৌঁছে জানিয়ে তিনি বলেন, একুশে আগস্টের ঘটনায় দায়েরকৃত হত্যা মামলায় ১৩ ভলিউমে মোট ৫৮৫ টি পেপারে বুক এসেছে যা সাড়ে ১০ হাজার পৃষ্ঠা। মোট আপিল ২২ টি ও জেল আপীল ১২ টি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *