খলনায়ক, নাকি নায়ক…

রহমান মুস্তাফিজের মুক্তমত: খুব তুচ্ছ ঘটনায় রাগ করে চ্যানেল আইতে পদত্যাগ পত্র জমা দিলাম ২০০৯ সালের ৫ মে। ৩১ মে পর্যন্ত অফিস করলাম। টানা কয়েকদিন বিশ্রাম নিয়ে জমে থাকা গল্প আর প্রবন্ধগুলো লিখে শেষ করলাম। পরের বছরের বইমেলার কাজ অনেকটা গুছিয়ে ফেললাম। এর মধ্যেই একদিন ফোন দিলেন শাহ আলমগীর ভাই। বললেন দেখা করার জন্য। তারিখটা ছিল ৫ জুলাই। পরদিন বিকেল ৪টায় যমুনা টেলিভিশন অফিসে দেখা করতে বললেন।

পরদিন সকাল থেকে বৃষ্টি। আমি তখন থাকি সেগুনবাগিচায় বসতি ময়ূরী ভবনে। দুপুর দুইটার দিকে বের হলাম। রিকশা, অটোরিকশা কিছুই পাওয়ার সাধ্য নেই। হাঁটতে শুরু করি। রাস্তায় কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও কোমর ছুঁই ছুঁই পানি। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাই যমুনা ফিউচার পার্ক।

সেদিন মোজাম্মেল বাবু ভাই, শাহ আলমগীর ভাই, নিয়াজ মোরশেদ ভাই, তুষার আবদুল্লাহ আর শাকিল ছিলেন যমুনা টিভির মিটিং রুমে। বাবু ভাই বললেন, রহমান মুস্তাফিজতো আর চাকরির জন্য আবেদন করেনি। তার ইন্টারভিউর দরকার নেই। বরং অনেকদিন পর দেখা। একটু গল্পস্বল্প করি।

চা খেয়ে, গল্প করে ফিরে আসি। ৯ জুলাই রাতে শাকিল ফোন করলো। জানালো, যমুনা টিভি প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স টিম সাজাতে চায়। যমুনা টিভি ম্যানেজমেন্ট চান ডেপুটি এডিটর হিসেবে আমি কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স টিমের হাল ধরি। ১২ তারিখ থেকে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ‘মিডিয়া গুরু’ ১২ দিনের ট্রেনিং শুরু করবে। শাহ আলমগীর ভাই চান আমি টিমে যোগ দেই।

আলমগীর ভাইয়ের সাথে ফোনে কথা বলি। ১২ জুলাই সকালে গিয়ে যোগ দেই যমুনা টিভি’তে। সেদিনই শুরু ট্রেনিংয়ের। ফক্স নিউজ ও সিএনএন-এর এক সময়ের আলোচিত রিপোর্টার রিচার্ড গোসলান প্রথম ৪ দিনের ট্রেনার।

শুরু হলো যমুনা টিভির সাথে পথ চলা। মাসখানেক গেল। প্রতিষ্ঠান প্রধান নুরুল ইসলাম বাবুলকে একদিনের জন্যও অফিসে দেখিনি। প্রথম দেখাটা হঠাৎ করেই। যেহতু অফএয়ার চানেল, তাই রোজার ঈদে বন্ধ পাওয়া গেল তিনদিনের।

ছুটিতে আমার যাওয়ার কোন জায়গা নেই। ততোদিনে বাসা পরিবর্তন করে কুড়িল চলে এসেছি। শুক্রবারও অফিসে যাই। নিজের মত করে কাজ করি। পরদিন টিমমেটদের কাছ থেকে কি কি কাজ আদায় করবো, অনুষ্ঠানের টেকনিক্যাল বিষয় আর স্কুলিং নিয়ে পরিকল্পনা করি। ভাবলাম ঈদের বন্ধটাও এ সব নিয়েই কাটিয়ে দিব।

ঈদের আগের দিন সকালে শাহ আলমগীর ভাই ফোন করলেন। বললেন দ্রুত অফিসে যেতে। তিনিও অফিসের পথে আছেন। আলমগীর ভাইয়ের আগেই অফিসে পৌঁছুলাম। ততোক্ষণে আরও কয়েকজন পৌঁছে গেছেন। ফিসফাস আর নানা বিষয়ের গুঞ্জন।

আলমগীর ভাই জানালেন, বিকেল ৪টায় যমুনা টিভির চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাবুল টিমের সিনিয়র সদস্যদের সাথে জরুরী সভা করবেন।

নির্ধারিত সময়ে আমরা নিচে মিটিং রুমে পৌঁছুলাম। ওই প্রথম সামনা-সামনি দেখলাম নুরুল ইসলাম বাবুলকে। আমাদের বসতে বললেন। চেয়ারম্যানের দুই পাশে বসলেন মোজাম্মেল বাবু ভাই ও শাহ আলমগীর ভাই। আলমগীর ভাইয়ের ডানে শাকিল আহমেদ, মামুনুর রহমান খান। বাবু ভাইয়ের বামে আমি। সব মিলিয়ে আমরা ১৪/১৫ জন।

বাবুল সাহেব সবার সাথে পরিচিত হলেন। তারপর শুরু করলেন কথা বলা। বাবু ভাইকে দেখিয়ে বললেন, বাবু, আমার ভাতিজা। একটা টেলিভিশন পাইসে। তারে ধন্যবাদ দেই। দরকার হইলে, সে মনে করলে সব ধরনের সাহায্য করমু।

বাবু ভাই বললেন, টেলিভিশনের জন্য আবেদন করলাম। প্রধানমন্ত্রী আমারে টেলিভিশন দিলেন। আমারতো টাকা নাই। চাচা, আপনি টাকা না দিলে টিভি চালু করমু ক্যাম্নে?

নুরুল ইসলাম বাবুল জানালেন, বাবু ভাই তাকে আগেই একাত্তর টিভির লাইসেন্স পাওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়ে রেখেছিলেন। ওই দিন সকালে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে ১৭টি টিভি চ্যানেলের অনাপত্তিপত্র পাওয়া বিষয়ে সংবাদপত্রে খবর ছাপা হওয়ার পরও বাবু ভাই বাবুল সাহেবকে ফোন করে জানিয়েছেন। কিন্তু যমুনা টিভির কয়েকজন সময় টিভির অনাপত্তিপত্র পাওয়া বিষয়ে কিছু না জানিয়ে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন। নিয়াজ মোরশেদ ভাই, আহমেদ জোবায়ের ভাই, তুষার আবদুল্লাহ ও আকতার বাবু সকালে লোক মারফত পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন।

এরপর নুরুল ইসলাম বাবুল তার স্বপ্ন, অতীত… নানা কথা বলেন। বললেন, যমুনা টিভিকে আমি দেশের এক নাম্বার চ্যানেল হিসেবে দেখতে চাই। আপনারা কাজ করেন। আমি শুনেছি, নিয়োগের সময় কিছু সমস্যা হইসে। একটা বড়ো টিম তৈরি করতে গেলে এমন হইতে পারে। তুলনামূলক বেশি যোগ্য মানুষটা হয়তো নিচের পদে যোগ দিল, তাই বেতনও কম। এটা নিয়াও ভাবার কিছু নাই। তিন মাস পর পর ইনক্রিমেন্ট সিস্টেম চালু করেন। যোগ্যরা বছর শেষেই যেন তার যোগ্য বেতন নিতে পারেন। আমি লেখাপড়া বেশি শিখি নাই। সাইন করা শিখছি অনেক পরে, আগে টিপসই দিতাম।

প্রায় এক ঘন্টা তিনি কথা বলেন। বললেন, যা ইচ্ছা নিউজ করেন… আমার আপত্তি নাই। সাদারে সাদা বলেন, কালোরে বলেন কালো। সত্য কথা বললে যদি সমস্যা হয়, আমারে জানাইবেন, আমি দেখুম। শুধু মুক্তিযুদ্ধ নিয়া কোন কথা চলবো না। এইটা এক নাম্বারে রাখবেন। বাংলাদেশে লাখ লাখ নুরুল ইসলাম আছে। লাখ লাখ বাবুল আছে। কিন্তু নুরুল ইসলাম বাবুল একজনই আছে। এই নুরুল ইসলাম বাবুল আমি। নৌকা চালাইসি। জীবনে অনেক কষ্ট করসি। যদি মুক্তিযুদ্ধ না হইতো তাইলে আমি ‘বাবুইল্যা’ হইয়াই থাকতাম। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দিবেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়া নিরপেক্ষতা চলবো না। মুক্তিযুদ্ধ থাকবো এক নম্বর আইটেম।

এরপর তিনি যারা চলে গেছেন, তাদের নিয়ে হতাশ না হওয়ার পরামর্শ দেন। সবাইকে উজ্জীবিত করেন তিনি। মিটিং থেকে বের হয়ে আচ্ছন্ন থাকি অনেকটা সময়। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে আমার ভালো লাগাটা ছিল আকাশ ছোঁয়া। মনে হলো প্রকৃত অর্থেই কাজ করা যাবে এমন প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হয়েছি।

এরপর মাঝে মাঝে বাবুল সাহেবকে দেখতাম। হয়তো আগেও দেখেছি, কিন্তু চিনতাম না বলে বুঝিনি। তিনি সকাল দশটা নাগাদ আসতেন অফিসে। হাত দু’টো পিছনে নিয়ে হাঁটতেন যমুনা ফিউচার পার্কের চারপাশ। এই হাঁটাটা তিনি উপভোগ করতেন।

আমরা অনএয়ারে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। প্রস্তুতির সব কিছুই গুছিয়ে, গুটিয়ে আনা হচ্ছে। এক শুভ বিকেল দেখে দিন ঠিক হলো লোগো উন্মোচনের মধ্য দিয়ে টেস্ট ট্রান্সমিশন শুরু করার। লোগো উন্মোচনের আগে তিনি বক্তব্য রাখলেন। গণমাধ্যম ও গণমাধ্যমের ভূমিকা কি হওয়া উচিত তা নিয়ে কথা বললেন। এতো খোলামেলা কথা কোন গণমাধ্যমের মালিকই বলেন না। আমরা শঙ্কিত হলাম।

কিছু দিনের মধ্যেই আমাদের শঙ্কা বাস্তবে রূপ নিল। ১৯ নভেম্বর তিন শতাধিক পুলিশ এলো রাত ১০টার দিকে। দিনটি বিশেষ ছিল বাঙালির জন্য। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ড মামলার আপিল বিভাগে রায় ঘোষণার দিন ছিল সেটি।

যমুনা টেলিভিশনের টেস্ট ট্রান্সমিশন বন্ধ করে দেয়া হয় সেদিন। পরদিন ২০ নভেম্বর। অফিসে নির্ধারিত সময়ের আগে সবাই হাজির হয়। আমরা কয়েকজন রাতে অফিস এলাকাতেই কাটিয়ে দিলাম। সাধারণ সভা হওয়ার কথা। সবাই অপেক্ষা করছেন। এর মধ্যে এই ঘটনার বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়।

সভায় নুরুল ইসলাম বাবুল একাই বক্তা। তিনি পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করলেন। জানালেন, এর আগেও চার দলীয় জোট সরকারের আমলে যমুনা টিভির কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছিল। সাত বছর আইনি লড়াই করে এবার অনএয়ারে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়ার সময় এমনটি ঘটলো। তিনি সবাইকে ধৈর্য্য ও সাহসিকতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলার আহ্বান জানালেন।

শুরু হলো দীর্ঘ আইনি লড়াই। দেশের শীর্ষ স্থানীয় আইনজীবীরা যমুনা টিভির পক্ষে দাঁড়ালেন। মামলার দিনগুলোতে সবাই আমরা হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে সমবেত হই। বাকি দিনগুলোতে আমরা আমাদের প্রস্তুতির কাজ চালিয়ে যেতে থাকি।

মামলার রায় কবে হবে কেউ জানেন না। কিন্তু এর মধ্যেও কয়েকটি টিমকে দেশের বাইরে ও দেশের ভিতর বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হলো। জিভি ফুটেজ ও স্পেশাল নিউজের জন্য টিমগুলো দেশ-বিদেশে ঘুরলো। খরচ হলো লাখ লাখ টাকা।

এমন পরিস্থিতিতে আবার মিটিং ডাকা হলো। নুরুল ইসলাম বাবুল জানালেন, কারও চাকরি যাবে না। সবাই থাকুন। প্রয়োজনে সবাই এক সাথে ডাল-ভাত খেয়ে দিন কাটাবো। এই টিম দিয়েই যমুনা টিভি অনওয়ারে যাবে। তিনি জানালেন, নির্ধারিত সময়েই সবাই বেতন পাবেন।

বাস্তবে হলোও তাই। যমুনা গ্রুপের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের আগে বেতন দেয়া শুরু হলো যমুনা টিভিতে। তিনি তার লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোতে জানিয়ে দিয়েছেন, টেস্ট ট্রান্সমিশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে যমুনা টিভির সবার মন খারাপ। তাই তাদের বেতন দেয়ার পর অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বেতন হবে।

তখন একদিকে চলছে আইনি লড়াই। আরেক দিকে রাজপথের আন্দোলন। প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি পালিত হলো। ততোদিনে আমি যমুনা টিভি ছেড়ে দিয়েছি। বিনা কাজে বেতন নিতে ভালো লাগতো না। তাই ৫ জানুয়ারি ২০১০ তারিখে পদত্যাগপত্র জমা দেই এবং ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত অফিস করি।

তবে কর্মসূচিগুলোতে তখনও নিয়মিত হাজির হই। মামলার তারিখের দিন কোর্টে যাই। এভাবেই চলছিল। হাইকোর্টের বারান্দায় একদিন নুরুল ইসলাম বাবুলের সাথে দেখা হয়ে যায়। তিনি বললেন, যমুনার সব কাজেইতো আপনারে দেখি, চাকরি ছাড়লেন কেন? আমি কোন উত্তর দিলাম না। কারণ, উত্তরটা আমার অন্যান্য সহকর্মীর বিপক্ষে যেত, তাদের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতো। তাই চুপ থাকলাম। তিনি চলে যাওয়ার আগে বললেন, আলমগীর সাবের লগে কথা কন। নইলে অফিসে আসেন একদিন। আপনার কি হইসে শুনি।

অফিসে যাওয়া হয়নি আর। সম্ভবত রোজা শুরুর আগের দিন জাতীয় প্রেসক্লাবের টেনিস কোর্টে আয়োজন হলো প্রতিক অনশনের। সকাল ১০টা মধ্যেই হাজির হলাম ক্লাবে। শুরু হলো অনশন কর্মসূচি। শাহ আলমগীর ভাই বললেন, তুমি বক্তৃতা না দিয়ে যাবা না। বললাম, আচ্ছা।

আলমগীর ভাই শাকিলকে বললেন, ওকে দুপুরে সবাই যখন ঝিমিয়ে পরবে তখন দিবা। সবাইকে জাগিয়ে রাখবে বক্তৃতা দিয়ে। না খেয়ে, গরমে সবাই যখন ক্লান্ত, ঝিমুতে শুরু করেছেন অনেকেই… তখন অলমগীর ভাই শাকিলকে বললেন, এবার ওকে মাইক দাও। আমি তখন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম-সম্পাদক। আমার নাম ঘোষণা হলো। বক্তৃতা দিতে উঠতে যাবো, আলমগীর ভাই বললেন, লম্বা বক্তৃতা দাও। আমি না বলা পর্যন্ত থামবে না।

আলমগীর ভাইয়ের কথায় লম্বা বক্তৃতা দিলাম। কখনও যুক্তি দিলাম, কখনো প্রাসঙ্গিক কৌতুক বলে হাসালাম, আবার কখনও বাস্তবতার কথায় শ্রোতাদের কাঁদালাম। প্রায় আড়াই ঘন্টা বক্তৃতা দিলাম একটানা। বাংলাদেশ প্রতিদিনের নঈম নিজাম ভাই এসেছিলেন সংহতি জানাতে। তিনি চলে যাবেন বলে আমাকে থামতে হলো।

পরে জেনেছি, আমার এই বক্তৃতার তিনটি ল্যুপ তৈরি হয়েছিল। একটি ল্যুপে ছিল পুরো বক্তৃতা। একটি ল্যুপে বক্তৃতার উল্লেখযোগ্য অংশ। আরেকটি ল্যুপে ছিল সবাইকে উজ্জীবিত করার মত কথাগুলো। এই ল্যুপগুলো ডিভিডি করে দেয়া হয়েছিল নুরুল ইসলাম বাবুলকে। তিনি এগুলো প্রায়ই শুনতেন নিজের রুমে বসে। হতাশা বা মনের কষ্ট দূর করতে তিনি আমার বক্তৃতা শুনতেন।

যমুনা টিভি যখন পরে আবার আসার প্রস্তুতি নেয়, তখন ডাক পরেছিল। কিন্তু টিভিতে থাকা আমাদেরই কয়েকজন সহকর্মী পুরনো অনেকের জন্য যাওয়ার পথ (যোগ দেয়া) বন্ধ করেছিলেন। বাবুল সাহেবের সাথে যেন দেখা না হয় সে ব্যবস্থাও তারা করেছিলেন।

যমুনা টিভির অনেকেই চ্যানেল টোয়েন্টি ফোর, একাত্তর, সময় ও মাছরাঙা টিভিতে যোগ দেন। এদের কেউ কেউ যমুনা টিভিতে পদত্যাগপত্র জমা দেননি। নানা জালিয়াতি (কার্ড পাঞ্চ ও ফিঙ্গাগারিংয়ে হাজিরা দেয়ার ক্ষেত্রে) করে মাস শেষে যমুনা টিভি থেকে বেতন নিয়েছেন মাসের পর মাস। ওসব ধরা পরার পর ব্রডকাস্ট ডিপার্টমেন্টে জনা বিশেক-কে রেখে বাকিদের বিদায় দেয়া হয়।

এর আগে একবার লে-অফের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। বার্তাকক্ষে শাহ আলমগীর ভাই, নাজমুল আশরাফ ভাই ও শাকিল তাদের বক্তব্য দেন। সবশেষে নুরুল ইসলাম বাবুল ওঠেন তার বক্তৃতায় লে-অফের ঘোষণা দিবেন বলে। তিনি বক্তৃতা দিতে উঠে সবাইকে দেখলেন। সবার থমথমে মুখ দেখে নিজের চোখ মোছেন। আবেগী কণ্ঠে বললেন, লে-অফ ঘোষণা করতে আসছিলাম। আপনাদের দেখে মনে হলো, এতোগুলা মানুষ কই যাবে? কি করবে? কি খাবে?… তাই লে-অফ ঘোষণা করলাম না। আমি ডাল-ভাত খেলে আপনারাও খাবেন। তবে কেউ যদি অন্য কোথাও চাকরি পান, যেতে পারেন। আমার কোন দাবি থাকবে না। তবে আবার ডাকলে চলে আসবেন। আমরা সবাই মিলে এই যমুনা টিভিরে দেশের এক নাম্বার চ্যানেল বানামু।

তিনি তার কথা রেখেছিলেন। যতোদিন যমুনা টিভিতে সবাই ছিলেন, মাসের সাত তারিখের মধ্যে বেতন পেয়েছেন। বন্ধ প্রতিষ্ঠানে ঈদে উৎসব ভাতা দিয়েছেন।

অনেকেই নুরুল ইসলাম বাবুলকে ভূমিদস্যূ বলেন। তার সম্পর্কে বাজারে অনেক নেতিবাচক কথা প্রচলিত আছে। যারা আবাসন খাতের ব্যবসা করেন তাদের সবার সম্পর্কেই এমন কথা যানা যায়। এর অনেকাংশ সত্য বলে আমিও মনে করি।

নুরুল ইসলাম বাবুল সম্পর্কে আরেকটি প্রচলিত কথা আছে। তিনি সাংবাদিকদের গায়ে হাত তোলেন, গালাগালি করেন। আমি যতদিন যমুনা টিভি-তে ছিলাম, ততোদিন এমন কিছু দেখিনি। তবে এটা মানি, তিনি সাংবাদিকদের হয়তো শারীরিকভাবে লাঞ্চিত করেছেন, গালাগাল করেছেন। কাদের করেছেন, কেন করেছেন সেটাও জানা দরকার। শুধু সাংবাদিক নয়, যে কোন চাকুরিজীবীই যদি নিজের সততা ও ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দেন… তবে নুরুল ইসলাম বাবুল কেন, যে কোন মালিকই তার সুযোগ নিবেন।

বরং একটা তুলনামূলক উদাহরণ দেয়া যাক। দুই জন টিভি মালিকের মধ্যকার পার্থক্য এটি। একজন নিরক্ষর (লোকশ্রুতি) মালিক ও আরেকজন সম্ভ্রান্ত সংস্কৃতিমণা পরিবারের উচ্চ শিক্ষিত মালিক…।

যমুনা ফিউচার পার্কের পাশে পাওয়ার হাউজের কাজ চলছে তখন। আগেই বলেছি, প্রতিদিন প্রকল্প এলাকা ঘুরে ঘুরে দেখতেন নুরুল ইসলাম বাবুল। তিনি নিজে ধুমপান করতেন না এবং তা তার সাম্রাজ্যে নিষিদ্ধ ছিল।

স্তূপ করে রাখা ইটের আড়াল থেকে সিগারেটের ধোঁয়া উড়তে দেখে তিনি সেদিকে এগুলেন। দেখলেন একজন শ্রমিক সিগারেট টানছেন। তিনি জানতে চাইলেন, এখানে সিগারেট খাচ্ছে কেন। শ্রমিকের সরল উত্তর, বাবুল সাব সিগারেট পসন্দো করেন না বইলা লুকায়া খাই।

বাবুল সাহেবকে ওই শ্রমিক চিনে কিনা জানতে চাইলে শ্রমিক জানান, তিনি চেনেন না। বাবুল সাহেব বললেন, ঘোর। শ্রমিক ঘুরে দাঁড়ালেন। বাবুল সাহেব তার (শ্রমিকের) পিছনে একটা লাথি দিয়ে বললেন, চিনে রাখ, আমিই বাবুল সাব। এরপর তিনি শ্রমিককে কাজে পাঠালেন।

এবার সংস্কৃতিমণা উচ্চ শিক্ষিত মালিকের ঘটনা। ইনিও দেশের অন্যতম বৃহত্ত শিল্প গ্রুপের মালিক। বাবুল সাহেবের মত ইনিও অধূমপায়ী। ২০১০ সালের দিকে তার টেলিভিশন চ্যানেলটির অফিস ডেকোরেশনের কাজ চলছে। তিনি কাজের অগ্রগতি দেখতে একদিন অফিসে গেলেন। তার জন্য যে রুমটি তৈরি হচ্ছে সে রুমে ঢুকে দেখলেন একজন শ্রমিক সিগারেট খাচ্ছেন। মালিক জানতে চাইলেন, এখানে সিগারেট খাচ্ছো কেন? শ্রমিকের স্বীকারোক্তি, অফিস বিল্ডিংয়ে সিগারেট খাওয়া নিষেধ। এমডি স্যারের রুমে কেউ আসেন না, তাই তারা এখানেই লুকিয়ে সিগারেট খান। ব্যবস্থাপনা পরিচালক শ্রমিককে শার্ট-প্যান্ট খুলতে বললেন। শ্রমিক তার জামা কাপড় খুললেন। সাথে থাকা সিকিউরিটি গার্ডকে পোষাকগুলো নিয়ে শ্রমিককে গেটের বাইরে দিয়ে আসতে বললেন। শ্রমিক অপমানিত হয়ে চোখের পানি ফেলে অফিস ত্যাগ করলেন।

দুই জনই মালিক। একজন শ্রমিকের পিছনে লাথি মেরে কাজে পাঠালেন। আরেকজন শ্রমিককে চরম অপমান করে কর্মচ্যুত করলেন। এ ঘটনা দু’টিই সত্যি। গণমাধ্যমের অনেকেই জানেন। কে ভালো, কে খারাপ সে বিচারে গেলাম না। শুধু উদাহরণ দুইটি সামনে আনলাম মাত্র।

দোষে-গুনেই মানুষ। নুরুল ইসলাম বাবুলের অনেক সমালোচনা আছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে তার আপোষহীন মনোভাব আর শ্রমিক-কর্মচারি-কর্মকর্তার পেটে অযথা লাথি না মারার গুনটি আমাকে টেনেছে। তিনি নায়ক, নাকি খলনায়ক সে বিচারে যাবো না। কোন মানুষের মূল্যায়নই খণ্ডিতভাবে করা উচিত নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *