চলচ্চিত্র শিল্পকে রক্ষা করতে হবে

২২ জুলাই ২০২১ (রহমান মুস্তাফিজের মন্তব্য প্রতিবেদন): করোনা ভাইরাসজনিত রোগ সংক্রমণের কারণে সরকার স্বাস্থ্যবিধির নির্দেশনা জারি করেছে। ফলে লোক সমাগম হয় এমন সব স্থান রয়েছে নজরদারিতে। বন্ধ রয়েছে রেস্টুরেন্ট, পার্কসহ সব ধরণের প্রতিষ্ঠান। নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বিয়ের অনুষ্ঠান করার ক্ষেত্রেও। একই কারণে বন্ধ আছে দেশের সব সিনেমা হল। যার কারণে টানা চারটি ঈদে নতুন কোন চলচ্চিত্র মুক্তি পায়নি।

বুধবার উদযাপিত ঈদুল আযহা উপলক্ষেও আলোর মুখ দেখেনি নতুন কোন চলচ্চিত্র। প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ থাকার কারণে স্বভাবতই সিনেমা মুক্তি দেয়ার মত কারণ ঘটেনি।

করোনাকালের আগে প্রতি ঈদেই মুক্তি পেত একাধিক চলচ্চিত্র। এমনও বছর গেছে, যখন একেক ঈদে ১৩/১৪টি করে নতুন সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। বিগ বাজেটের সিনেমাগুলো ঈদের অপেক্ষায় থাকতো। প্রযোজকরা চাইতেন, ঈদে নতুন ছবি মুক্তি দিয়ে প্রথম সপ্তাহের টেবিল মানি দিয়েই লগ্নির অধিকাংশ টাকা তুলে আনতে।

পূরবী সিনেমা হলের কাউন্টার। সেখানে বাসা বেধেছে মাকড়সা। ছবি: আর্ট নিউজ

শিল্পীরাও অপেক্ষা করতেন ঈদের জন্য। যে শিল্পী অভিনীত চলচ্চিত্র যত বেশি সংখ্যায় মুক্তি পেত, তার কদর ততো বেশি ছিল।

কিন্তু বৈশ্বিক অতিমারী করোনা সব বদলে দিল। মাসের পর মাস সিনেমা হল বন্ধ রয়েছে। নতুন ছবি মুক্তি পাচ্ছে না। আটকে আছে ছবি নির্মাণ। ফলে এই শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত হাজার হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন। সরকার শিল্পীদের জন্য কল্যাণ তহবিল গড়েছে, প্রেক্ষাগৃহের মালিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রণোদনা দিয়েছে… কিন্তু তাতে কি স্থায়ী কোন সমাধান হয়েছে? হয়নি। হওয়া সম্ভব না। কল্যাণ তহবিল থেকে যে পরিমাণ অর্থ সহায়তা দেয়া হয় বা হচ্ছে তাতে একটি পরিবারের জন্য খুব বেশি টাকা নয়। তাতে কতোদিন আর চলা যায়। তারপর? তারপর আবার অভাব।

দেশে এক সময় এক হাজারেরও বেশি সিনেমা হল ছিল। এখন তা নেমে এসেছে চারশো’রও কমে। নতুন চলচ্চিত্র নির্মাণ বন্ধ। এমন পরিস্থিতিতে নাভিঃশ্বাস উঠেছে এই শিল্পের সাথে জড়িত মানুষদের। কতোদিন আর চলা যাবে এ অবস্থায়, সে উত্তর জানা নেই কারও।

ফেরা যাক শুরুর কথায়। কুরবানির ঈদের দিন সন্ধ্যা বা রাতের শো’তে কিছু দর্শক হতো। কিন্তু ঈদের পরদিন দর্শক উপচে পরতো সিনেমা হলগুলো। কালোবাজারির কাছ থেকে ৪/৫ গুন বেশি দামে হলেও টিকেট কিনে হলে ঢুকতেন বিনোদনপ্রিয় মানুষেরা। অথচ সেই হলগুলোতে এখন ভূতুরে পরিবেশ। বরং বন্ধ থাকতে থাকতে প্রজেকশ মেশিনগুলোও নষ্ট হওয়ার পথে।

ঈদের পরদিন ঘুরতে ঘুরতে গিয়েছিলাম রাজধানীর পূরবী সিনেমা হলের সামনে। এটি আমার বাসার কাছেই, মাত্র কয়েকশ’ গজ দূরে। হলের প্রধান গেইট বন্ধ অনেকদিন ধরেই। লোহার গেইটের কয়েক জায়গায় মরচে পড়েছে। বন্ধ টিকেট কাউন্টারগুলো ঢাকা পড়েছে মাকড়সার জালে। তাতে রাজত্ব করছে মাকড়সা। কোন কর্মচারিও নেই এখন। সব শুনশান। অথচ করোনার আগে এই হলের সামনে দুপুরের পর থেকেই কম-বেশি ভীড় থাকতো। দর্শক, হলের কর্মচারী আর কালোবাজারিদের ভীড় থাকতো শো শুরু হওয়ার অন্তত ত্রিশ মিনিট আগে থেকে। অথচ সব এখন অতীত।

আরও পড়ুন: চলচ্চিত্র শিল্পী কল্যাণ ট্রাস্ট আইনের সুবিধা পাবেন টিভি শিল্পীরাও

করোনা পরিস্থিতি কিছু স্বাভাবিক হলে প্রেক্ষাগৃহের মালিকদের মেশিনপত্র চালু করতে বাড়তি অর্থ খরচ করতে হবে। পরিবর্তন করতে হবে চেয়ারসহ আনুষাঙ্গিক জিনিসপত্র। মাসের পর মাস জমানো টাকা খরচ করে সংসার চালাতে হয়েছে যে মানুষদের, তারা নতুন করে বিনিয়োগ করবেন কী করে? ফলে পরিস্থিতি খানিকটা স্বাভাবিক হলেও অনেকে চালু করতে পারবেন না প্রেক্ষাগৃহ। এর অর্থ হচ্ছে, করোনা ছোবলে বন্ধ হয়ে যাবে দেশের অর্ধেকেরও বেশি প্রেক্ষাগৃহ। প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হলে তার প্রভাব পড়বে পরিবেশকদের ওপর। প্রত্যক্ষভাবেই ক্ষতির শিকার হবেন চলচ্চিত্র প্রযোজক, নির্মাতা, শিল্পী ও কলাকুশলীরা।

আরও পড়ুন: সালমান শাহ, আজিজ মোহাম্মদ ভাই এবং…

তাই এখনই সময় পরিকল্পনা করার। এখনই ভাবতে হবে দেশের এই শিল্পখাতকে কিভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায় সে বিষয়ে। নয়তো এই শিল্প পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। ধ্বংস হবে দেশের গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় খাতটি। নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর আগে নির্ভর হতে হবে বিদেশি চলচ্চিত্রের ওপর। কারণ, দর্শক নতুন সিনোমা দেখতে চাইবে। তাই এই শিল্পের সাথে জড়িত মানুষদের বাঁচিয়ে রাখতে সরকারকে এখনই নানা ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে।

লেখক পরিচিতি: রহমান মুস্তাফিজ; লেখক, নির্মাতা ও সিনিয়র সাংবাদিক

http://artnewsbd.com