চলচ্চিত্র শিল্পের কফিনে শেষ পেরেক: কিছু প্রশ্ন

সালাহ্ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরী

সালাহ্ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরী: সাফটা চুক্তির অধীনে বাংলাদেশের সিনেমা হলগুলোয় আগামী ছয় মাসের মধ্যে বলিউডের হিন্দি সিনেমা মুক্তি পাবে। মানে, দর্শকদের এবার হিন্দি সিনেমার দিকেই টানা হবে। ফলে বাংলাদেশে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো পড়বে এক অসম প্রতিযোগিতার মুখে। এমনিতেই আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের করুণ অবস্থা। তার উপর এই সিদ্ধান্ত যেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের কফিনে শেষ পেরেক।

আন্তঃদেশীয় সাফটা চুক্তির উপর ভর করে হিন্দি সিনেমা আমাদের সংস্কৃতির বুকে চেপে বসলেও একই চুক্তির অধীনে হিন্দি কিংবা ইংরেজী ভাষায় ডাবিং করা বাংলাদেশি সিনেমা ভারতের সিনেমা হলগুলোয় মুক্তি দেয়ার সুযোগ কি দেবেন সেদেশের হল মালিকরা? নাহ্, এটা ওরা কখনোই দেবেন না। যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের ক্যাবল নেটওয়ার্কে ভারতীয় টিভি চ্যানেল আমরা দেখছি টাকা খরচ করে। প্রতিমাসে লাখ লাখ ডলার চলে যাচ্ছে এ খাতে। কিন্তু, নানা অজুহাতে বাংলাদেশের কোনো টেলিভিশন চ্যানেলই ভারতের কেবল নেটওয়ার্কে দিচ্ছে না সে দেশের কেবল অপারেটররা। দেবেও না কখনও। এ নিয়ে আমাদের দেশের টেলিভিশন চ্যানেল মালিক কিংবা ওই সেক্টর সংশ্লিষ্টদের সামান্যতম মাথা ব্যথা আছে বলে মনে হয় না। অথচ, ভারতের কেবল নেটওয়ার্কে আমাদের চ্যানেলগুলো সংযুক্ত হলে বিজ্ঞাপন থেকে আয় বাড়বে বহুগুণে। ফলে আমাদের দেশের নাটকের বাজেটও বাড়ানো সম্ভব হবে।

কেউ কেউ বলে বেড়ান আমাদের দেশের নাটকের বাজেট কম। এই বাজেটে ভালো নাটক নির্মাণ সম্ভব না। ইত্যাদি। বিনয়ের সাথেই ওদের প্রশ্ন করবো, শুধু বাজেট বাড়ালেই কি নাটকের মান ভালো হয়ে যাবে? ভালো নির্মাণের জন্যে ভালো গল্প চাই, নির্মাতার দক্ষতা চাই, শিল্পী ও কলাকুশলীদের আন্তরিকতা চাই। দ্বিতীয়ত, একটা নাটক থেকে প্রযোজকরা বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ডিং ইত্যাদি থেকে সর্বোচ্চ কতো টাকা পান এটা কি নাটকে বেশী বাজেট দাবীকারীদের ধারণা আছে? বেশ ক’জন অভিনয় শিল্পী এখন নাটক নির্মাণ এবং প্রযোজনায় এসেছেন। আগামীতে আরও আসবেন। ওনাদের কাছেই বিনয়ের সাথে প্রশ্ন রাখবো, আপনারা নিজেদের নাটকগুলোয় বাজেট বাড়িয়ে দেখান না! তখনই টের পাবেন, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো কতোটা চ্যালেঞ্জের মুখে এখনও এই সেক্টরে বিনিয়োগ করে যাচ্ছে। নাটক প্রযোজনা কোনো সৌখিন কাজ নয়। এখানে কেউ টাকা লোকসান দিতে আসবে কেনো?

ফিরে যাই চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে। অনেকেই বলছেন বাংলাদেশের সিনেমা আর দর্শক টানতে পারছে না। কিন্তু কেউই কারণটা খুঁজছেন কি? আমাদের চলচ্চিত্রের জন্যে সবচাইতে বড় বাধা হলো তুঘলকি সেন্সর আইন। এরপর আছে আধুনিক প্রযুক্তির অভাব। এবং সবার শেষে বিপণন পলিসির দারিদ্র্য। ভারতে চলচ্চিত্রে যে ধরনের অত্যাধুনিক ক্যামেরা, এডিটিং এবং যান্ত্রিক সুবিধাগুলো বিদ্যমান, সেটা কি আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পে আছে? ভারতের চলচ্চিত্র প্রযোজক ক্রমাগত আন্তর্জাতিক বাজার ধরার নানা কৌশল খাটাচ্ছেন। ওরা বিভিন্ন ভাষায় ডাবিং করে ওদের চলচ্চিত্রের দর্শক পরিধি সম্প্রসারিত করছেন। নেটফ্লিক্স, আমাজন, টুবিসহ বিভিন্ন অটিটি প্ল্যাটফর্মে ভারতীয় চলচ্চিত্রের উপস্থিতি হু-হু করে বাড়ছে। পক্ষান্তরে আমরা, অর্থাৎ বাংলাদেশি চলচ্চিত্র পিছিয়ে পড়ছি নিজেদের নির্বুদ্ধিতার কারণে।

আমি জানি, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের করুণ দশা দেখে আমাদেরই অনেকে প্রকাশ্যে কিংবা আড়ালে ঠাট্টা-মশকরা করেন। ওদের বক্তব্য- বাংলাদেশের সিনেমাগুলো ভীষণ বাজে মানের। গাটের টাকা খরচ করে এসব দেখতে কেউ হলে যান না। সিনেমা হল মালিকরা তো এ ধরনের কথা বলছেন অনেক বছর ধরেই। ওনাদের কাছেই প্রশ্ন রাখবো, বেশ ক’বছর আগে কথিত যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত বাংলা সিনেমাগুলো কি হলে চলেনি? ওগুলো কি দর্শক টানেনি? তাহলে খুঁজে বের করতে হবে মূল সমস্যাটা কোথায়। ভালো চলচ্চিত্র পেলে বাংলাদেশের দর্শকরা অবশ্যই বাংলা সিনেমাই দেখবেন। এটাই বাস্তবতা।

বাংলাদেশের সিনেমা হলে বলিউড সিনেমার দানব ভর করতে যাচ্ছে। এটা নিয়ে যারা উচ্ছ্বসিত তাদের উদ্দেশ্যেই বলবো, ভিনদেশি সিনেমা নির্ভর হয়ে হল মালিকরা না হয় মুনাফা গুনবেন, কিন্তু একারণে আমাদের ফি বছর কতো কোটি ডলার বিদেশি প্রযোজকদের হাতে চলে যাবে, একবারও কেউ ভেবে দেখেছেন?

শুনেছি বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোয় ভারতীয় সিরিয়াল চালানোর তোড়জোড় চলছে। হিন্দি মেগা সিরিয়ালগুলোয় বাংলায় ডাবিং করে চালানো হবে, আগামী বছর থেকেই। আজ না হয় বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের শব মিছিলের প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু আগামীতে যখন বাংলাদেশি নাটকের বুকেও ভিনদেশী নাটকগুলো চেপে বসবে তখন ব্যাপারটা কেমন হবে?

জানি না আমার কথাগুলো কারও ভালো লাগবে কিনা। কিংবা আদৌ এসব নিয়ে কারো মাথা ব্যথা আছে কিনা!

লেখক পরিচিতি: সালাহ্ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরী; সিনিয়র সাংবাদিক, লেখক ও গীতিকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *