“চৈত্রবনে রূপকথা হয়ে ঘুরে বেড়াবো”

ভোরের কাগজের রিপোর্টার আসলাম রহমান মারা গেছেন করোনা ভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে। অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে নেয়া হয়েছিল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিত্রও ভিন্ন কিছু নয়। অনেকটা সময় তাকে চিকিৎসা দেয়া হয়নি। পরে জানালো, পথেই মারা গেছেন আসলাম। সময় মত চিকিৎসা পেলে, অক্সিজেন পেলে আসলাম হয়তো বেঁচে যেতেন। এতিম হতো না তার ছোট্ট দুই বাচ্চা। আসলামকে নিয়ে ফেসবুকে নিজের টাইমলাইনে লিখেছেন সিনিয়র সাংবাদিক কামরুল হাসান দর্পন:

কামরুল হাসান দর্পন

প্রিয় আসলাম, তোমার সাথে আমার যে সম্পর্ক, তাতে অনায়াসে ‘তুই’ বলা যেত। আমি ‘তুই’ বলিনি। কারণ, আমি আমার সবার ছোট ভাইকে কখনো ‘তুই’ বলিনি। যেমনটি আমি আমার গুরু মরহুম রবি আরমানকে দিয়ে ‘আপনি’ থেকে ‘তুই’ দূরে থাক, ‘তুমি’তে নামাতে পারিনি। তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন আগে অনেকটা জোর করে ধরে অভিমান নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, গুরু, আপনি কেন আমাকে ‘তুই’ করে বলেন না? তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, আপনাকে কেন আমি ‘তুই’ বলি না, আপনি বলি, তার কারণ, আমি আপনাকে সন্তানের মতো দেখি। আমার সন্তানের সম্মান যাতে সবসময় উঁচুতে থাকে এবং অন্য সবাই যাতে দেখে ভাবে, রবি আরমান দর্পণকে কত সম্মান করে! আপনি করে ডাকে! তার জবাব শুনে কোনো কথা বলতে পারিনি। গুরু গত হয়েছেন এক যুগ হয়েছে। গত ১৮ মার্চ তার মৃত্যুবার্ষিকী ছিল।

আসলাম, তোমার জীবন সংগ্রাম আমার চেয়ে আর কে বেশি জানে! পৃথিবীতে তুমি, তোমার ছোট ভাই ও বোন মিলে এতিম ছিলে। ভাই-বোনকে নিয়ে শেখ সাহেব বাজারে ছোট্ট একটি বাসায় থাকতে। সংসারের হাল তুমি ধরে রেখেছিলে। শুধুমাত্র গানের টিউশনি করে দুই ভাই-বোনকে নিয়ে সংসার চালাতে। তোমার রেখে যাওয়া স্ত্রী তোমারই গানের ছাত্রী। গানের প্রতি তোমার দুর্বার আকর্ষণ ছিল। অনেক গানও লিখেছ, শুদ্ধ ব্যাকরণ মেনে। আমাকে দিয়েও গান লিখিয়েছ।

জীবনে একটি গানই লিখেছিলাম। যত দূর মনে পড়ে গানের কথাগুলো ছিল এরকম, ‘যখনই আকাশটা দেখবে, দেখবে তারারা ভাসছে, ওতো তারা নয়, তোমাকে ঘিরে জ্বেলে রাখা আমার সুখ প্রদীপ, চুপিচুপি তোমাকে ডাকছে।’ গানটি অনেক যত্ন করে তুমি গেয়েছিলে। এটাই ছিল তোমার প্রথম রেকর্ড করা গান। মরহুম আলী আকবর রূপুর সুর করা গানটি ইস্কাটনস্থ প্রমিক্স স্টুডিওতে রেকর্ড করা হয়েছিল। যেদিন রেকর্ড করা হয় সেদিনও ঠান্ডায় তোমার গলা বসেছিল, তারপরও গানটি রেকর্ড করা হয়। তুমি সন্তুষ্ট ছিলে না। আমি বলেছিলাম, বাদ দাও। তুমি বাদ দাওনি। কষ্টের মধ্যেও টাকা জোগাড় করে আবার গানটি রেকর্ড করেছিলে।

গানে তুমি প্রতিষ্ঠা পেতে চেয়েছিলে। সবকিছু হার মানে বাস্তবতার কাছে। বাস্তবতা চেয়েছে অন্যকিছু। এর মধ্যে ছোট বোনটিকেও বিয়ে দিয়েছ। আমরা যখন এলাকায় (আজিমপুর) দুর্নিবার আড্ডা দিতাম, তুমি অত্যন্ত নীরবে এসে যোগ দিতে। ছোট ভাই বলে চুপ করে বসে থাকতে। তুমি যে দুঃখপিন্ড হয়ে চলতে, তা কখনো বুঝতে দিতে না। তোমার চেহারায় কখনোই তার রেখাপাত হতো না। আমি নিশ্চিত, মৃত্যুর মুহূর্তেও তুমি তোমার চেহারায় দুঃখচিত্র ফুটে উঠতে দাওনি। হাসি দিয়েই চোখ বুঁজেছো।

’৯৮ সালের শুরুর দিকে আনোয়ার (অরণ্য আনোয়ার) তোমাকে সাপ্তাহিক পূর্ণিমায় গুরুর কাছে নিয়ে এলো। আমি নিয়ে যাই আতাহার ভাইয়ের (নির্বাহী সম্পাদক) কাছে। পূর্ণিমায় বিনোদনে কন্ট্রিবিউটর হিসেবে শুরু হয় তোমার সাংবাদিকতা। আশা ছিল, এর মাধ্যমে তোমার গানের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে। তা হয়নি। সে অনেক ব্যাখ্যার বিষয়।

আসলামকে বলেছিলাম, সাংবাদিকতায় মন দাও। ও তাই করল। পূর্ণিমা থেকে তারকালোক, মানবজমিন, দিনের শেষে হয়ে ভোরের কাগজ। কালচারাল বিট চেঞ্জ করে ক্রাইম বিট। প্রথমবারের মতো ওর মধ্যে কিছুটা স্বস্তি দেখি।

২০০২-৩ সালের দিকে ও আর আমি প্রতি শুক্রবার সকাল দশটা-এগারটার দিকে রমনা পার্কে চলে যেতাম। দুজনে বসে গল্প করতাম। গল্পের ফাঁকে ও গাইত। একটা গান খুব ভালো লাগত ‘চৈত্রবনে চাঁদের দিনে তুই যে আমার রূপকথা, বাতাস এসে কানে কানে আমার সাথে কয় কথা।’ গানটি এক সময়ের জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী রাকিবের অপ্রকাশিত গান, যা আজও প্রকাশিত হয়নি। আসলামের ভেতরটা সুরে বাঁধা ছিল। সুরের ফল্গুধারা ওর মধ্যে বইতো। পাহাড়ের কোনো দুর্গম ঝর্ণার মতোই অচেনা থেকে শুকিয়ে মরে যাওয়ার মতোই ও মরে গেছে।

আসলাম চিন্তা করো না, যেখানে তোমার উৎপত্তি, সেখানেই তুমি ফিরে গেছ। ডোন্ট ওরি, দেখা হবে। ‘যখনই আকাশটা দেখব, দেখব আসলাম হাসছে।’ কিংবা চৈত্রবনে রূপকথা হয়ে আমরা ঘুরে বেড়াব। টিল দ্যান গুডবাই।

প্রিয় আসলাম, আমি সুনিশ্চিত, তুমি ভাল থাকবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *