নিবু নিবু প্রদীপ হাতে ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন

সালমান মাহমুদ: অনেক সময়, আমি প্রশিক্ষণের বাসটিতে আমার স্কুল ইউনিফর্ম পরে উঠে পড়তাম। যার কারণে আমাকে ভাড়া দিতে হতো না। বাস চালকরা বলতেন, ‘দুঃখী যুবক, এই বাস আপনার বিদ্যালয়ে যাচ্ছে না’। এরপর আমি তাদের কাছে সত্যটা তুলে ধরে বলতাম, ‘আমি স্কুলে যাচ্ছি না, আমি প্রশিক্ষণে যোগ দিতে চাই। আপনি যদি পারেন, আমার স্বপ্নটি বাস্তবায়নে সহায়তা করুন। আমি চিরকাল আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো’। এরপর থেকে তারা আমাকে কখনো দূরে ছুড়ে ফেলেনি। তারা সবসময় আমাকে প্রশিক্ষণে নিয়ে যেতেন। আমি আমার শৈশবের সব চালকদের ধন্যবাদ দিতে চাই।

১৯৯৪ সালে বিশ্বকাপ জয়ের আগে রবার্তো বাজ্জিওর পেনাল্টি যখন গোলবারে প্রবেশ করে তখন সবার উল্লাস দেখেই মাথায় আসে একদিন মাঠে নেমে তিনিও ফুটবল খেলতে চান।

বাবা-মায়ের আর্থিক অনটন সত্ত্বেও সিলভা সবসময় খেলার জন্য এমন একটি উপায় খুঁজে বের করেন। সিলভা দিনের পুরো সময় স্কুল ও খেলার মাঠে ব্যয় করতেন। সিলভার বয়স যখন ১২ বছর, তখন ২ ঘন্টার দীর্ঘ পথ পাড়ি নিয়ে অনুশীলনে যেতেন। কিছু বছর যেতেই বাবাকে হারান সিলভা। এমন কঠিন মুহূর্ত সাথে নিয়ে সংকটকে সঙ্গী করে ছুটে চলা। ছিলো না প্রশিক্ষণে যোগ দেয়ার সামার্থ্য। সিলভার পথ চলা কখনোই সহজ ছিল না। পেশাদার জীবন শুরুর দিকেও তার ব্যতিক্রম ছিলো না।

শুরুর দিকে ব্রাজিলের স্থানীয় দলগুলোতে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। রিও ডি জেনিরোর দরিদ্র অঞ্চলের দ্বিতীয় সারির দলে খেলেছিলেন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে। কিন্তু দলের কোচেরা তার এই পজিশনে খেলা পছন্দ করতেন না। ছোট বেলায় স্ট্রাইকার হওয়ার ইচ্ছে ছিলো। অনুকরণ করতেন রোমারিও, বেবেতোকে। তা আর হয়ে ওঠেনি। কিন্তু কঠোর পরিশ্রম আর শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনের চালচলনে, প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যর্থতার গ্লানি মুছে শিগগিরই জীবন সাফল্যের দিকে মোড় নেয়। প্রথম দিকে ফ্ল্যামেঙ্গোর মত ক্লাবে সুযোগ না পেলেও অবশেষে ২০০২ সালে পর্তুগীজ ক্লাব পোর্তো (বি) ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ইউরোতে কিনে নেয় সিলভাকে। স্বপ্ন ইউরোপের পথে। বছর না ঘুরতেই ২০০৫ সালে ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে রাশিয়ান ক্লাব ডায়নামো মস্কোতে যোগ দেন হালকা গড়নের থিয়াগো।

কিন্তু দূর্ভাগ্য পিছু হটেনি। রাশিয়ার অতিরিক্ত শীতের অস্থিরতার কারণে ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন সিলভা। দুর্ভাগ্যক্রমে যক্ষ্মায় আক্রান্ত সিলভা কাবু হয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন। একসময় ফুটবল মাঠ দাঁপিয়ে বেড়ানো ছেলেটির এই হাল। এমন অসুস্থতায় সিলভা খেতে চাইতেন না। কিন্তু ক্ষুধা অনুভব করতেন। পাশাপাশি আগের চেয়েও ওজন ১০ কেজির বেশি বেড়ে গিয়েছিল।

সিলভার মা জানান, ‘তাকে দেখতে অসুস্থ দেখাতো না। কিন্তু সে চলাফেরা করতে পারতো না’। এমনকি তার শারীরিক অবস্থা এতই করুণ ছিলো, তার একটি ফুসফুস সাদা হয়ে গিয়েছিল।

চিকিৎসকরা তাকে হাঁটতে বের হওয়ার জন্য পরামর্শ দিতেন। কিন্তু অতিরিক্ত অসুস্থতার কারণে সেটি করতেও সক্ষম ছিলেন না সিলভা। রোগটি সংক্রামক হওয়ার কারণে তাকে আলাদা বা বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছিল। তার অসুস্থতা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছিল। প্রতিদিন তিন থেকে চার বার তার শরীরে ইঞ্জেকশন পুশ করা হয়। দিনে ১০-১৫টি ট্যাবলেট তাকে সেবন করতে হতো। দীর্ঘ ৬ মাসের চিকিৎসা শেষে সিলভা জানলেন তার যক্ষ্মা হয়েছিল। তখন তিনি এটাও জানতে পারলেন, তার ডাক্তার বলেছিলেন, ‘এই রোগটি যদি দুই সপ্তাহ পরে ধরা পরতো, তাহলে সিলভা মারা যেতেন।’

৬ মাসের অসুস্থতা থেকে সেরা ওঠার পর চিকিৎসকরা তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন ডান পাশের ফুসফুসের কিছু অংশ কেটে ফেলার। এই অস্ত্রোপচার তার ফুটবল ক্যারিয়ারের অবসান ঘটাতে পারে এবং সিলভাও ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে বিবেচনা করা শুরু করেছিলেন। আর ঠিক সেই মূহুর্তেই ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভাব ঘটে ইসাবেলা সিলভার বা সিলভার স্ত্রীর।

রক্তে মিশে থাকা ফুটবল থেকে ইতি টানার ঠিক আগ মুহুর্তেই সর্বোচ্চ সাহস ও অনুপ্রেরণা নিয়ে উপস্থিত হতে ভুল করেননি ছোটবেলা থেকেই সিলভার পাশে থাকা সেই নারী। ছোট বেলার প্রেম ভালোবাসার হাজারো খুনসুটি, হাজারো সুখকর মুহূর্তের প্রতীয়মান মূর্তির রূপ নিয়ে স্ত্রী ইসাবেলা ডাক্তারের পরামর্শকে উপেক্ষা করার জন্য তাকে উৎসাহিত দিতে শুরু করলেন। বোঝাতে চাইলেন, একদিন যেই ফুটবলের জন্য শত বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে মাঠে ছুটে যেতেন, সেই ফুটবলকে কিভাবে বিদায় বলবে? কিভাবে ফুটবল তোমার শোকেসে শোভা পাবে? বুকে ব্যথ্যা নিয়ে এভাবে তোমার স্বপ্নকে মাটি চাঁপা দিতে পারবে? তোমাকে তোমার স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে যেতে হবে। কোনো বাধাই তোমাকে থামাতে পারবে না। তোমাকে সফল হতেই হবে।

ইসাবেলা বলেছিলেন, ‘কেউ আমার স্বামীকে থামাতে পারবে না। কেউ তার স্বপ্নের অবসান ঘটাতে পারবে না। আমি চিকিৎসক নই। কিন্তু কেউই বিশ্বাস করতে পারছিলো না যে তাকে সার্জারি করতে হবে। ব্রাজিলের জার্সি পরে তাকে আবারও দেখতে পাওয়া আমাদের জন্য একটি বিজয় হিসেবে নির্ধারণ হবে’।

ছোটবেলার স্মৃতি যোগ করে ইসাবেলা আরও বলেন, ‘বিশেষত, যেই দিনগুলোতে তাকে দেখে আমি চিনেছিলাম সেখানে ফিরে যাওয়া একটি বিজয়’। আর ঠিক অস্ত্রোপচারের মত অগ্নিপরীক্ষা থেকে সিলভাকে মুক্ত করলেন ছোটবেলার অনেক সময় পার করা সঙ্গী ইসাবেলা সিলভা।

অগ্নিপরীক্ষা থেকে বাঁচার পরেও সিলভা তার ভবিষ্যতের বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন না, ছয় মাসের বিভীষিকাময় দিনগুলো থেকে ছাড়া পেয়ে সিলভা জানান, ‘এটি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ ছিল’। কিন্তু ক্রমেই তার চিন্তাধারা অবসর নেয়ার সিদ্ধান্তের দিকে ছুটতে থাকে। তাই তিনি ব্রাজিলে ফিরে যান। কিন্তু সিলভার মা তাকে তার সিদ্ধান্তের বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘যদি তিনি ফুটবল খেলতে না চান তাহলে তাকে তার ভাইয়ের সাথে কাজে যোগ দিতে হবে’। যার ফলে সিলভা তার মায়ের অনুরোধে আবারও ফুটবলের বিষয়ে প্ররোচিত হয়ে উঠেন। এরপর আবারও ব্রাজিলের স্থানীয় ক্লাব ফ্লুমিনেন্সের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

এই যাত্রায় ভাগ্য সহায় ছিল। যেই কোচ ২০০৫ সালে সিলভাকে ডায়নামো মস্কোতে নিয়েছিলেন তিনি ফ্লুমিনেন্সের কোচ হয়ে আসেন। সিলভার সেই কোচ “আইভো ওয়ার্টম্যান” ফ্লুমিনেন্সকে বলেছিলেন, তারা যদি সিলভাকে দলে নেয় তাহলেই তিনি তাদের কোচিং করাবেন। মায়ের আর্শিবাদ এবং কোচের মহানুভবতা সাথে নিয়ে ফ্লুমিনেন্সের হয়ে সিনিয়র ক্যারিয়ার শুরু করেন। চমৎকার পারফরমেন্সের কারণে সমর্থকদের কাছে এক প্রতিমা হিসেবে আবির্ভাব হয় সিলভার। যেখানে সমর্থকরা তার ডাক নাম দেন ” O Monstro” যার অর্থ দৈত্য। ২০০৭ সালে সিলভাকে সাথে নিয়ে কোপা দো ব্রাজিল ট্রফি জেতে ফ্লুমিনেন্সে। যার ফলে সে সময়ের ব্রাজিল কোচ দুঙ্গার প্রিলি স্কোডাকে ডাক পেয়েছিল সিলভা। একই বছর ব্রাজিলে হয়েছিলেন সেরা ডিফেন্ডারদের একজন। সেরা তিন ডিফেন্ডারদের মধ্যে নমিনেশন পেয়ে হয়েছিলেন দ্বিতীয়। ২০০৮ সালে ফাইনালে কোপা লিবারতোদরেস ম্যাচে গোলসহ একই বছর ব্রাজিলের ক্লাবগুলো নিয়ে তৈরী সিজনের সেরা একাদশে জায়গা হয় সিলভার। ফ্লুমিনেন্স সমর্থকের কাছে তার জনপ্রিয়তা এতই বেড়ে গিয়েছিল যে ম্যাচ চলাকালে সিলভা হাতের কব্জিতে সাদা বর্ণের একটি ব্যান্ড পরে খেলতে নামতেন। তা পরে ফ্লমিনেন্সের বাচ্চাদের অলিতে গলিতে ট্রেন্ড হিসেবে পরতে দেখা যেত। রিও ডি জেনিরোতো সমর্থকদের ত্রিমুখী সমর্থনের বিপরীতে হয়ে ওঠেন ব্রাজিলের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার।

দারুণ খেলার বদৌলতে ২০০৮ সালে অলিম্পিক দলে হলুদ জার্সি গাঁয়ে জড়ান। একই বছর সিনিয়র দলের হয়ে অভিষেক হয় সিলভার। ধীরে ধীরে ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় ক্লাবগুলোর নজরে আসেন সিলভা। ইন্টার মিলান, চেলসির পাশাপাশি এসি মিলান। তার মধ্যে অন্যতম ছিলো ইতালীর ঐতিহ্যবাহী ক্লাব এসি মিলান। পাঁচ মাসে প্রায় ৪ ঘন্টার আলোচনায় সিলভা মিলানে যোগ দেয়ার ব্যাপারে রাজি হন। তখনই বিশ্ব মঞ্চে নজরে আসে থিয়াগো সিলভার নাম।

২০০৯ সালে ১০ মিলিয়ন ইউরো ও চার বছরের চুক্তিতে মিলানে পাড়ি জমান সিলভা। ফ্লুমিনেন্সের হয়ে শেষ ম্যাচে মারাকানায় প্রায় ৫০ হাজার দর্শক সাক্ষী ছিল সিলভার সেদিনের পারফরমেন্সের।

এরপর মিলানে যোগ দিয়ে মালদিনির মত কিংবদন্তীর কাছ থেকে ডিফেন্ডিং বুদ্ধিমত্তা শেখার সুযোগ হয়েছিল। অপর দিকে ছিলেন কার্লোর মত বুদ্ধিদীপ্ত কোচ। ২০০৯/১০ সিজনে সিলভাকে প্রধান দলে ডাক দেয়া হয়। এর আগে প্রীতি ম্যাচে রসেনেরির হয়ে হ্যানওবারের বিপক্ষে অভিষেক হয়েছিল সিলভার। মিলানের হয়ে প্রথম প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে নেস্তার পাশে খেলে চমৎকার ব্যক্তিগত ফর্ম তুলে ধরেন সিলভা। এরপর মালদিনি বলেছিলেন, ‘চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মত সিলভার শারীরিক ও প্রযুক্তিগত সকল বৈশিষ্ট্য রয়েছে’। মালদিনি আরও বলেন, ‘একমাত্র ডিফেন্ডার যিনি খেলার ফলাফল পরিবর্তন করতে পারেন’।

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি সিলভাকে। বাকি গল্পগুলো ইতিহাসের মতই রূপান্তর হওয়া শুরু করলো। ধীরে ধীরে মিলানের সমর্থকের কাছে জনপ্রিয় নাম হয়ে ওঠে সিলভার নাম। মিলানের সাথে ৩ বছরের ক্যারিয়ারে ২০১০/১১ সালে উঁচিয়ে ধরেন ইতালির সবচেয়ে দামি ট্রফি ইতালিয়ান সিরি এ ট্রফি। ২০১১/১২ সিজনে জেতেন ইতালীয়ান সুপার কাপ। অনবদ্য পারফর্ম করে জায়গা করে নেন ২০১১ উয়েফা টিম অফ দ্যা ইয়ারে। আরো জায়গা হয় ২০১০/১১, ২০১১/১২ সিরি এ টিম অব দ্য সিজনে। ফ্যানদের ভোটে ২০১০/১১ সিজনে ৬৬ শতাংশ ভোট নিয়ে হয়েছিলেন প্লেয়ার অব দ্য সিজন। এছাড়া বিভিন্ন মিডিয়ার প্লেয়ার অব দ্য সিজন নির্বাচিত হয়েছিলেন সিলভা।

২০১১/১২ মৌসুমে চেইভোর বিপক্ষে মিলানের ইতিহাসে ৫০ বছর পর বিদেশি ক্যাপ্টেন হিসেবে আর্মব্যান্ড পড়েন সিলভা। ডিসেম্বরের ১ তারিখে ফিফপ্রোর সেরা একাদশে শর্ট লিস্টেড হয় সিলভার নাম। একই মৌসুমে ১৯৯৪ বিশ্বকাপ জয়ী কোচ ‘কার্লোস আলবের্তো’ বলেছিলেন, সিলভাই ইউরোপে খেলা সেরা ব্রাজিলিয়ান। ইব্রাহিমোভিচ দাবি করেন, ‘যাদের সাথে তিনি খেলেছেন, তাদের মধ্যে সিলভা সর্বকালের সেরা ডিফেন্ডার’।

সিলভার পারফরমেন্সে মুগ্ধ হয়ে মিলিয়ন মিলিয়ন ইউরোর ব্রিফকেস নিয়ে মিলানে উপস্থিত হয় ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেইন্ট জার্মেই। সেসময় ৪২ মিলিয়ন ইউরোর মেগা ডিলের প্রস্তাব করে বসে এই ক্লাব। ইতিহাস সৃষ্টি করে মাত্র ৩ বছরের মিলান ক্যারিয়ারে ইতি টেনে রেকর্ড ট্রান্সফারে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ডিফেন্ডার হিসেবে ২০১২ সালে পিএসজিতে যোগদান করেন থিয়াগো সিলভা।

পিএসজি প্রেসিডেন্ট নাসের আল খেলাইফি বলেন, ‘বিশ্বের সেরা ডিফেন্ডার পিএসজিতে এসেছে’। পিএসজিতে যোগ দিয়ে আনচেলত্তীর অধীনে চ্যাম্পিয়নস লীগের গ্রুপ স্টেজে ডায়নামো কেইভের বিপক্ষে অভিষেক হয় সিলভার। প্রথম ম্যাচেই দলের হয়ে দ্বিতীয় গোল এবং পিএসজির হয়ে নিজের প্রথম গোল করেন সিলভা। রাউন্ড অফ ১৬-তে ভেলেন্সিয়ার সাথে অসাধারণ পারফরমেন্স করে স্প্যানিশ মিডিয়ার অসামান্য সুনাম অর্জন করেন সিলভা। লিগ ওয়ানে মন্টেপেলিয়ের বিপক্ষে ও অন্য দলগুলোর সাথে দারুণ ফর্ম দেখিয়ে ওই মাসের লীগের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। কোয়াটার ফাইনালে বার্সেলোনার সাথে অনবদ্য পারফরমেন্স করে স্প্যানিশ মিডিয়া থেকে পেয়েছিলেন ‘দ্য ওয়াল’ খেতাব।

যার পর কার্লো আনচেলত্তি বলেছিলেন, ‘সিলভা-ই বিশ্বের সেরা ডিফেন্ডার। ব্যালন ডি অর জেতার সব সক্ষমতা তার আছে।’ পিএসজিতে প্রথম সিজনেই মিলানের পারফরমেন্সের ধারা অব্যাহত রেখে আবারও ২০১২ উয়েফা টিম অব দ্য ইয়ারে জায়গা করে নেন সিলভা। প্রথমবারের মত ২০১৩ ফিফপ্রো একাদশে জায়গা পান সিলভা। জায়গা হয় লীগ ওয়ান টিম অব দ্য সিজনে। লীগ ওয়ানের সেরা খেলোয়াড়ের জন্য শর্ট লিসস্টে ছিল তার নাম। এছাড়া প্রথম বছরেই লীগ ওয়ানে সেরা ডিফেন্ডার নির্বাচিত হয়েছিলেন সিলভা।

২০১৩/১৪ সিজনে ঘটে আরো অবাক করা ঘটনা। সিলভার পারফরমেন্স এতই ঊর্ধ্বমুখী ছিল, সিজনের অর্ধেক পার হতে না হতেই ফ্রেন্স ফুটবল সিলভাকে লীগের সেরা ডিফেন্ডার হিসেবে ঘোষণা করে। ব্যাতিক্রম ঘটেনি উয়েফার ক্ষেত্রেও। আগের বছরের মত টানা তৃতীয় বারের মত উয়েফা টিম অব দ্য ইয়ারে জায়গা করে নেন চীনের প্রাচীরের মত দূর্ভেদ্য হয়ে ওঠে সিলভা। একটানা ধারাবাহিক পারফরমেন্সে ডিফেন্স সম্রাট নামেও অনেকে তাকে সম্বোধন করতে ভোলেন না।

২০১৪-তেও ফিফপ্রো একাদশে জায়গা করে নেন সিলভা। আবারও লীগ ওয়ানের সেরা একাদশে জায়গা করে নেন। আবার লীগ ওয়ানের সেরা ডিফেন্ডার নির্বাচিত হন। এমন অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতায় পিএসজি তার সাথে ২০১৮ সাল পর্যন্ত চুক্তি নবায়ন করে।

২০১৪ বিশ্বকাপে ব্রাজিল ইতিহাসের লজ্জাজনক ৭-১ ঘটনার পর থেকেই মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ে সিলভা। যার ফলে সিজনের শুরুতে বাজে পারফরমেন্স করেন। কিন্তু সিজনের মাঝ পথে এসেই আগের মত ধারাবাহিক হয়ে চমৎকার পারফরমেন্স করে যান। ফলে টানা তৃতীয় বারের মত ২০১৫ ফিফপ্রো একাদশেও জায়গা করে নেন এই ডিফেন্ডার। জায়গা হয় লীগ ওয়ান টিম অব দ্য ইয়ারেও।

ম্যাচ রিডিং অ্যাবিলিটি, শান্ত মেজাজের ট্যাকলিং, কৌশলগত দক্ষতা, বল প্লেয়িং এবিলিটি, নেতৃত্ব গুন, ফুটবলের প্রতি আবেগ, উত্সর্গের, উইনিং মেন্টালিটি সব মিলিয়ে যেনো ডিফেন্ডারদের এক পরিপূর্ণ প্যাকেজের বাস্তব চিত্র। ধীরে ধীরে ডিফেন্ডারদের আইডিলে রূপ নেয় সিলভা নামটি। ব্রাজিলের উঠতি ডিফেন্ডাররা স্বপ্ন বোনেন, একদিন সিলভার মত দক্ষতা অর্জন করবেন। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই ডমেস্টিক সব ধরণের ট্রফি অজর্নে সক্ষম হন সিলভা। পিএসজির হয়ে সাত বার জিতেছেন লীগ ওয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ। শৃঙ্খলাবদ্ধ লাল কার্ড দেখেছেন মাত্র ৪ বার। হলুদ জার্সি গাঁয়ে সেলেসাওদের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে জিতেছেন কনফেডারেশন কাপ, কোপা আমেরিকার মত টুর্নামেন্ট। হয়েছেন সাউথ আমেরিকার দশক সেরা ডিফেন্ডার। জায়গা হয়েছে ফিফা ওয়াল্ড কাপ ড্রিম টিম ও অল স্টার টিমে।

ক্লাব ক্যারিয়ারে এত এত সাফল্যের পরেও কেনো যেন কোথাও একটি স্থানে গিয়ে থমকে যেতে হয়। চাওয়াটা যেনো সবার একই। যেমনটা সিলভার খুব কাছে এসে নাড়া দেয়। আর ভাবায়, স্বপ্ন কি সফলতার মুখ দেখবে না? জি ঠিকই ধরেছেন, বলছি সিলভার চ্যাম্পিয়নস লীগ ট্রফির কথা। প্রায় দেড় যুগেরও বেশি সময় ইউরোপে নিজের সর্বোচ্চটুকু উজাড় করে দিলেও মুখ দেখেননি এই মূল্যবান ট্রফির। নিজেকে একজন সর্বোচ্চ ডিফেন্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার অধরা ট্রফি যেন কাছে এসেও দূরে চলে যায়।

১৯৮৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর রিও ডি জেনিরোর দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া ‘থিয়াগো এমিলিয়ানো দ্য সিলভাকে’ না দেখলে এমন একটি জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ এই প্রজন্মের মানুষের দেখার সুযোগই হত না। সিলভা’র চ্যাম্পিয়নস লীগ জয়ের স্বপ্ন নতুন না হলেও বহুকাল ধরে এই ট্রফির স্বপ্ন বুনেই যাচ্ছেন আর বয়সও যেনো পিছু ছাড়তে ছাইছে না। তিনি এই শতকের অন্যতম সেরাদের একজন। তার জন্য এই ট্রফিটা যেনো চাই-ই চাই।

ক্যারিয়ারে ৫ বার চ্যাম্পিয়নস লীগের কোয়াটার ফাইনালে পা রেখেছেন। একবার মিলানের হয়ে, বাকি ৪ বার পিএসজি’র হয়ে। পিএসজিতে থেকেই যেনো স্বপ্ন ছুঁয়েই দিয়েছিলেন ২০১৯/২০ সিজনে। ফাইনালে পৌঁছে সিলভা হয়তো মনে মনে জপেছেন, ‘এবার বুঝি স্বপ্ন ধরা দিবে’। কিন্তু হয়েও হলো না। বায়ার্ন মিউনিখের সাথে হেরে স্বপ্ন ভঙ হলো ৩৫ বছর বয়সি সিলভার। ৩৫ বছরে যখন অনেক খেলোয়াড় নিজ বাসায় থেকে বিশ্রাম করে টিভিতে চ্যাম্পিয়নস লীগ উপভোগ করছেন এই তালিকার তার অনেক সতীর্থও রয়েছেন… আর বিপরিতে সিলভা খেলেই যাচ্ছেন।

ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের ডাকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সময় অতিবাহিত করা পিএসজি থেকে ফ্রি এজেন্টে যোগ দেন প্রিমিয়ার লীগের অন্যতম সফল দল চেলসিতে। কিন্তু তখন জনমনে প্রশ্ন আসে যে ক্লাবের প্রতি সিলভা এত লয়্যাল ক্যারিয়ার শেষে এসে কেনো তিনি ক্লাব ছাড়ছেন? অনেক গণমাধ্যমের মতে, পিএসজি সিলভার বেতন কমাতে চেয়েছিল। অন্যদিকে সিলভা সেই প্রস্তাবে রাজি নয়। তাই ক্লাব ছাড়ছেন। আসলেই কি সত্যটা তাই?

আরও পড়ুন: পেরুকে হারিয়ে ফাইনালে ব্রাজিল

পিএসজি ছাড়ার পর এক সাক্ষাতকারে সিলভা জানান, ‘একদিন লিওনার্দো (পিএসজি স্পোর্টিং ডিরেক্টর) আমাকে ফোন কল করে পিএসজিতে আমার অসামান্য অবদানের জন্য ধন্যবাদ জানান। ফোন কলের শেষে তিনি আমাকে জানান, পিএসজি আর আমাকে রাখতে চায় না, তারা শুধু চ্যাম্পিয়নস লীগ ক্যাম্পেইনের জন্য আমার সাথে তিন মাসের চুক্তি করতে চায়। এ কথা শুনে কিছুক্ষণের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে যাই। পরক্ষণে তার প্রস্তাবে সম্মতি জানাই। কিন্তু আমি লিওনার্দোকে প্রতিউত্তরে বলি, আপনি আমাকে অন্য কিছু প্রস্তাব করতে পারতেন। অথবা, আমি কি চাই সেটা জানতে চাইতে পারতেন।

সিলভা জানান, এরপর আমাকে আবারও আলোচনার টেবিলে ডাকা হয় পিএসজিতে থাকার ব্যাপারে। কিন্তু ইতোমধ্যে আমি চেলসিকে কথা দিয়ে ফেলেছি। তাই আমি জানিয়ে দেই, কথা খেলাপ আমি করতে পারবো না’।

পিএসজির এমন আচরণে সিলভা হতাশাগ্রস্থ হয়ে জানান, ‘আমার বিদায়ে পিএসজি কি পরিচালনা করেছে? তারা আমার প্রতি এতই উদাস ছিল? তারা আমাকে কিছুই দেয়নি, এবং এটাও নয় যে আপনাকে এক ইউরো দিচ্ছি আপনি আমাদের সাথে থাকুন, একেবারে কিছুই নয়। এর চেয়েও খারাপ কিছু আছে কিন্তু… মহামারীর মাঝেও তাদের আমাকে বিদায়ের পরিকল্পনা করতে তিন মাস ছিল, কিন্তু কিছুই করা হয়নি। আমি পিএসজিতে কেবল একটি মৌসুমের বা কয়েক মাসের জন্য ছিলাম না। অধিনায়ক হিসাবে আট বছরের জন্য আমি ক্লাবটিতে থেকে বেশ কয়েকটি ট্রফি জিতেছি। আমি অনেক বেশি শ্রদ্ধার প্রাপ্য। কাভানির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। ক্লাবটি নিয়ে আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। আমরা প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে উঠছিলাম। পিএসজি সবসময় আমার মনে থাকবে’।

মনক্ষুন্ন সিলভার চেলসিতে আসা ছিল খুবই সুন্দর ও মার্জিত। চেলসিতে আসার আগে ল্যাম্পার্ড সিলভাকে ২০১৩ সালে জাতীয় দলের একটি ম্যাচে দুজনের অধিনায়কত্বের সময় হ্যান্ডশেকের দৃশ্যর একটি ছবি পাঠান। যা সিলভাকে খুবই দূর্দান্ত অনুভূতি দিয়েছিল। ল্যাম্পার্ড সিলভার ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে ঠিক কী প্রয়োজন তা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন।

তারপর সিলভা জানান, ‘চেলসি আমার সম্পর্কে আগ্রহী শুনে আমি দুবারও ভাবি নি। কেবল তাদের ইতিহাসের কারণে নয়, বরং উইলিয়ান এবং ডেভিড লুইজ সর্বদা চেলসি সম্পর্কে আমাকে বলেছিল’।

আমি চেলসির প্রস্তাবে সম্মতি দেয়ার পর ক্লাবের পরিচালক আমাকে ফোন করেছিলেন। যদিও আমি তখন ইংরেজি বলতে পারি না এবং তার উচ্চারণটি আমার পক্ষে কঠিন ছিলো। কিন্তু আমি অনুবাদকের মাধ্যমে বুঝতে পারি তিনি বলেছিলেন, ‘থিয়াগো, আপনার নিজের বয়স সম্পর্কে চিন্তা করার দরকার নেই, এটি আমার জন্য উদ্বেগ এর কিছুই নয়। আমি আপনার উপর বিশ্বাস রাখব। আপনি কি বলতে চাচ্ছেন তা শুনতে চাই’। ক্লাবের সবাই আমাকে এমন ভাবে জানেন বা চাচ্ছেন যে আমি সত্যি যেনো চাঁদের উপরে ছিলাম। এখন আমার লক্ষ্য একটাই আমার কাছ থেকে সবাই যা প্রত্যাশা করে তা পালন করা’।

একদিন ল্যাম্পার্ড সিলভাকে কিছু জিজ্ঞাসা না করেই হঠাৎ-ই তার হাতে কাপ্টেন আর্মব্যান্ড তুলে দেন। তখন সিলভা সত্যিই খুব অবাক হয়েছিলেন। তারপর সিলভা জানায় ল্যাম্পার্ড আমার হাতে আর্মব্যান্ড তুলে দিয়ে বলেন, ‘এটি আপনার জন্য’।

আরও পড়ুন: শাস্তির মুখে ব্রাজিলিয়ান কোচ

ধারাবাহিক অসাধারণ পারফরমেন্সে সমোলোচকদের থোঁতা মুখ করে দিয়েছেন ভোঁতা। চলতে চলতে আবারও সেই স্বপ্নের স্বর্গ সিঁড়ির শেষ ধাপের নীল জার্সি জড়িয়ে আবারও ফাইনালে সিলভা। স্বপ্ন পূরণের লড়াইয়ে নেমে পড়লেন সর্বোচ্চ উজাড় করে দিতে। এবার যে ছিনিয়ে আনতেই হবে। কিন্তু ৩৮ মিনিটের মাথায় ইঞ্জুরি নিয়ে মাঠ ছেড়ে গেলেন। এই বুঝি আবারও থমকে যাবে যুগ যুগ ধরে লালিত স্বপ্ন? এই ভাবতে ভাবতেই মিনিট দুয়েক পরেই কাঙ্খিত গোলের দেখা। মুখে এক চিলতে হাঁসি, হাঁসি শেষ হতে না হতেই রেফারির মুখ থেকে বেজে উঠলো, ‘সিলভা তুমি তোমার স্বপ্নকে জয় করতে পেরেছো’। যাও ছুটে যাও তার সাথে হোক আলিঙ্গন। এক জোড়া ঠোঁটের চুমো তার কপালে লেপটে দিলাম। আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠার সময় কই শুধু ভেবেই যাচ্ছি, ‘বয়সটা বেঈমানি করেনি’। মালদিনিকে দেখে ৪০ বছর খেলার ইচ্ছে পোষণে আর শুধু একটি স্বপ্ন ছোঁয়ার বাকি। যে দুটি উদ্দেশ্যে চেলসিতে এসেছেন তার একটি সফল। এখন বাকি রইলো আর একটি। ২০১৪ সালের ৭-১ এর ক্ষত ভুলে সোনালি রঙ এর ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরতে যে হবেই। তা হলে কষ্ট সিলভাকে কুঁকড়ে কুঁকড়ে জ্বালাবে।

বিদায়ের এই অন্তিম লগ্নে তোমার নিকট আমার চাওয়া একটাই, ২০২২ বিশ্বকাপের ট্রফি উঁচিয়ে চিৎকার দিয়ে বলুন, ‘তোমাদের হেক্সা আজ তোমাদের সকলের জন্য উঁচিয়ে ধরলাম। ভুলো না আমায়। আমার স্বপ্নের অবসান ঘটলো, বিদায়’।

থিয়েগো সিলভা/আরএম/রমু

http://artnewsbd.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *