রূপপুরকে ঘিরে বাংলাদেশ–রাশিয়া অংশীদারত্বের নতুন অধ্যায়

: রহমান মুস্তাফিজ

বাংলাদেশ–রাশিয়া সম্পর্কের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠিত এই সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের গণ্ডি পেরিয়ে জ্বালানি, বাণিজ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো নানা ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে। আর এই অংশীদারত্বের সবচেয়ে বড় দৃশ্যমান প্রকল্পগুলোর একটি হলো পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মিত বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র—রূপপুর।

দুই ইউনিটে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতাসম্পন্ন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে একটি বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটমের সহযোগিতায় নির্মিত এই প্রকল্পে আধুনিক প্রযুক্তি, প্রকৌশল দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রকল্পটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনে নয়; নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ শিল্প, বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শেষ হলেই তার যাত্রা শেষ হয় না। নিরাপদে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় পারমাণবিক জ্বালানি সময়মতো দেশে পৌঁছানো, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ধাপে ধাপে কমিশনিং—সবই এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। সাম্প্রতিক সময়ে রূপপুরের ইউরেনিয়াম পরিবহনকে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে।

সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে রূপপুরের জ্বালানি সরবরাহে সাময়িক জটিলতা তৈরি হয়। প্রথমে ২৪ সেপ্টেম্বর ইউরেনিয়ামের চালান বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু রাশিয়া থেকে আসা কার্গো বিমানটি নির্ধারিত পথে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি সময়মতো না পাওয়ায় সেই যাত্রা পিছিয়ে যায়। বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছিলেন, নির্ধারিত রুটে কয়েকটি দেশের আকাশসীমা অতিক্রম করতে হয় এবং পাকিস্তানের অনুমতি না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে চালানটি আসতে পারেনি।

ঘটনাটি নিয়ে অবশ্য দুই পক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য ছিল। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে বিমান চলাচলের কারিগরি ও প্রক্রিয়াগত বিষয় হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। দেশটির ঢাকাস্থ হাইকমিশনের এক লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, কূটনৈতিক ফ্লাইট ও ওভারফ্লাইটের অনুমতিগুলো নির্ধারিত নিয়ম ও বেসামরিক বিমান চলাচল প্রটোকল অনুযায়ী প্রক্রিয়াকরণ করা হয় এবং রুট ও আকাশসীমা সংক্রান্ত সমন্বয়ের কারণে কখনও কখনও ফ্লাইটের সময়সূচিতে পরিবর্তন হতে পারে।

এই বিলম্ব অবশ্য শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়নি। বিকল্প রুট ও নতুন সময়সূচির মাধ্যমে চালান আনার ব্যবস্থা করা হয়। রোসাটম জানায়, রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

অবশেষে ২ অক্টোবর রাতে বিশেষ কার্গো বিমানটি ঢাকায় পৌঁছে। ৩ অক্টোবর সকালে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে তিনটি লরিতে করে ইউরেনিয়াম পাবনার রূপপুর প্রকল্প এলাকায় নেওয়া হয়। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য সাতটি এবং প্রথম ইউনিটের পুনরায় জ্বালানি সরবরাহের জন্য দুটি—মোট নয়টি চালান ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

এই ঘটনাটি রূপপুর প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে—পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন একটি আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বনির্ভর প্রক্রিয়া। শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নয়, এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে জ্বালানি উৎপাদন ও পরিবহন, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল, নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং বিভিন্ন দেশের অনুমোদন। ফলে একটি দেশের অভ্যন্তরে থাকা প্রকল্পের কার্যক্রমও কখনও কখনও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

রূপপুরের অর্থনৈতিক গুরুত্বও এখানেই। দুই ইউনিটের মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এই কেন্দ্র বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় নতুন একটি উৎস যুক্ত করবে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে শিল্প ও বাণিজ্যের জন্য বিদ্যুতের সরবরাহ আরও বৈচিত্র্যময় হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে পারমাণবিক প্রযুক্তি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে বাংলাদেশি প্রকৌশলী ও কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশ–রাশিয়া সহযোগিতার পরিধি অবশ্য রূপপুরেই সীমাবদ্ধ নয়। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ, ব্যবসায়ী পর্যায়ে যোগাযোগ বৃদ্ধি, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ও সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। রূপপুর সেই বৃহত্তর অংশীদারত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ভিত্তি।

বিশেষ করে মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই সহযোগিতার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনার দাবি রাখে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য যে বিশেষায়িত জ্ঞান ও দক্ষতা প্রয়োজন, তা বাংলাদেশের প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের মধ্যে তৈরি হলে ভবিষ্যতে দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পরিধি আরও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে, রাশিয়ায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং দুই দেশের সাংস্কৃতিক বিনিময় জনগণের পর্যায়ে সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করছে। ফলে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব ধীরে ধীরে সামাজিক ও জ্ঞানভিত্তিক অংশীদারত্বের সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছে।

রূপপুরের সাম্প্রতিক ইউরেনিয়াম সরবরাহের ঘটনাটি তাই কেবল একটি জ্বালানি চালান বিলম্বের ঘটনা নয়। এটি দেখিয়েছে, একটি বড় জাতীয় অবকাঠামো প্রকল্পকে বাস্তবায়ন করতে হলে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সমন্বয়, নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা এবং কূটনৈতিক ও পরিবহন সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের জন্য রূপপুরের সাফল্য শেষ পর্যন্ত শুধু কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হলো, তার হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকবে দেশে কতটা নতুন দক্ষতা তৈরি হলো, প্রযুক্তিগত জ্ঞান কতটা স্থানান্তরিত হলো, শিল্প ও অর্থনীতিতে কতটা নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ যুক্ত হলো এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব থেকে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা কতটা বাড়ল—তার হিসাবও।

রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের এই অংশীদারত্ব তাই একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের গল্পের চেয়ে বড়। এটি প্রযুক্তি, জ্বালানি, বাণিজ্য, শিক্ষা ও মানুষের দক্ষতা বিনিময়ের মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার কাঠামো গড়ে ওঠার গল্প। আর রূপপুরের ইউরেনিয়াম চালান শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে পৌঁছানোর ঘটনাটি সেই অংশীদারত্বের বাস্তব চ্যালেঞ্জ ও তা অতিক্রম করার সক্ষমতা—দুটিকেই একই সঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে।