
রহমান মুস্তাফিজ: আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। ১৯৫২ সালে ছিলেন ঢাকা কলেজের ছাত্র। পড়তেন ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসে। রাজনীতি সচেতন হিসেবে তিনি ভাষা আন্দোলনে ছিলেন সক্রিয় কর্মী। লেখালেখিতে হাতেখড়ি আগেই। লিখতেন গল্প-কবিতা। এরই ধারাবাহিকতায় রচনা করলেন কালজয়ী কবিতা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী’ কবিতাটি। তখন বয়স মাত্র ১৮ বছর।
বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি। শহীদ রফিকউদ্দিন আহমদ রফিকের লাশ পড়েছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আউটডোরের বারান্দায়। খবর পেয়ে গাফ্ফার চৌধুরী সেখানে যান। লাশ দেখে কবিতার একটি লাইন মনে এলো। কিছুক্ষণ পর পথে দেখা বন্ধু সৈয়দ আহমদ হোসেনের সঙ্গে। তাকে কবিতার প্রথম লাইনটির কথা জানালেন। সৈয়দ আহমদ লাইনটি শুনেই তা লিখে ফেলার জন্য গাফ্ফার চৌধুরীকে অনুরোধ করলেন।
কবিতার কথাগুলো মন থেকে হারিয়ে যেতে পারে। তাই শিগগিরই লিখে ফেলতে হবে। দ্রুত কলেজ হোস্টেলে যেতে বন্ধুকে নিজের সাইকেলটি দিলেন সৈয়দ আহমদ হোসেন।
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী তখন ঢাকা কলেজের হোস্টেলে থাকেন। দ্রুতই হোস্টেলে গেলেন। কিন্তু বিধি বাম। ভাষা আন্দোলন ঠেকাতে ছাত্রদের হল-হোস্টেল ছাড়া করার সিদ্ধান্ত ততোক্ষণে নিয়ে ফেলেছে প্রশাসন। গাফ্ফার চৌধুরীর পক্ষে সম্ভব হলো না হোস্টেলে গিয়ে কবিতাটি লিখে ফেলা।
হোস্টেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পথে নামলেন। উঠলেন বন্ধুর বাসায়, আরমানিটোলায়। সেখানেই তিনি লিখলেন ত্রিশ পঙ্ক্তির এই কবিতা। ‘কবিতাটি লিখলেন’ যত সহজে বলা গেল, ব্যাপারটা ততো সহজ নয়। বায়ান্নর সেই উত্তাল দিনে একজন কিশোর সারাক্ষণ বাসায় থেকে লেখা শেষ করেছেন, বিষয়টি এমন নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা বা রাজধানীর এখানে সেখানে যাওয়া, মিছিলে অংশ নেয়ার মত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো ফেলে ঘরে বসে থাকা যায়? যায় না। তাই কবিতাটি এক বসায় শেষ করা যায়নি। এটি লিখতে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর তিনদিন লেগেছিল।
বন্ধু সৈয়দ আহমদ হোসেনের অনুপ্রেরণায় কবিতাটি লেখা হলো। এটি প্রকাশিতও হলো সৈয়দ আহমদ হোসেন সম্পাদিত ভাষা আন্দোলনের প্রথম ইশতেহারে। ভাষা আন্দোলন নিয়ে প্রকাশিত দ্বিতীয় সংকলন ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সম্পাদনা করেন হাসান হাফিজুর রহমান (অনেকে এটিকেই ভাষা আন্দোলনের প্রথম সংকলন বলে থাকেন)।
হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত সংকলন থেকে কবিতাটি সংগ্রহ করেন বরেণ্য সুরকার আবদুল লতিফ। কবিতার প্রথম ছয় পঙক্তিতে তিনি সুরারোপ করেন।
আবদুল লতিফের সুর করা গানটি শোনেন আরেক কিংবদন্তী সুরকার আলতাফ মাহমুদ। তিনি নতুন কওে এতে সুরারোপ করেন। তার সর করা গানটি জহির রায়হান ব্যবহার করেন ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে। চলচ্চিত্রে গানটি ব্যবহারের পর এটি আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা পায়।
বর্তমানে আলতাফ মাহমুদের সুর করা গানটিই গাওয়া হয়।
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু গড়ায়ে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
আমার সোনার দেশের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।।
জাগো নাগিনীরা জাগো নাগিনীরা জাগো কালবোশেখীরা
শিশু হত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা,
দেশের সোনার ছেলে খুন করে রোখে মানুষের দাবী
দিন বদলের ক্রান্তিলগ্নে তবু তোরা পার পাবি?
না, না, না, না খুন রাঙা ইতিহাসে শেষ রায় দেওয়া তারই
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।।
সেদিনও এমনি নীল গগনের বসনে শীতের শেষে
রাত জাগা চাঁদ চুমো খেয়েছিল হেসে;
পথে পথে ফোটে রজনীগন্ধা অলকনন্দা যেন,
এমন সময় ঝড় এলো এক ঝড় এলো খ্যাপা বুনো।।
সেই আঁধারের পশুদের মুখ চেনা,
তাহাদের তরে মায়ের, বোনের, ভায়ের চরম ঘৃণা
ওরা গুলি ছোঁড়ে এদেশের প্রাণে দেশের দাবীকে রোখে
ওদের ঘৃণ্য পদাঘাত এই সারা বাংলার বুকে
ওরা এদেশের নয়,
দেশের ভাগ্য ওরা করে বিক্রয়
ওরা মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শান্তি নিয়েছে কাড়ি
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।।
তুমি আজ জাগো তুমি আজ জাগো একুশে ফেব্রুয়ারি
আজো জালিমের কারাগারে মরে বীর ছেলে বীর নারী
আমার শহীদ ভায়ের আত্মা ডাকে
জাগো মানুষের সুপ্ত শক্তি হাটে মাঠে ঘাটে বাটে
দারুণ ক্রোধের আগুনে আবার জ্বালবো ফেব্রুয়ারি
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।।















Leave a Reply