আমরা অবহেলিত বিপনণ যোদ্ধা ও বিক্রয়কর্মী

নজিব আকবর

নজিব আকবর: শ্রমিক, কৃষক, দিনমজুর, কামার-কুমার এক কথায় সর্বস্তরের মানুষের ত্যাগ আর অংশগ্রহণে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে অর্জিত আমাদের এই বাংলাদেশ-আমাদের এই লাল সবুজের পতাকা। জাতির পিতার স্বপ্নে গড়া এই বাংলাদেশে হাজার শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রতিদিন তাদের জীবিকার জন্য ছুটে চলছেন। এই ছুটে চলার মাঝে বর্তমান বিশ্ব মহামারী (কোভিড-১৯) সারা বিশ্বের মত বাংলাদেশকেও সংকটে ফেলেছে। এই মহামারী বাংলাদেশের অনেক শ্রেণি পেশার মানুষকে অর্থনৈতিক ভাবে মারাত্মক সংকটে ফেলে দিয়েছে।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা অনেক পেশার মানুষের জন্য (বিশেষ করে সেবা খাত সমূহ) বিশেষ প্রনোদনা দিয়েছেন। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাত হলো বিক্রয় ও বিপনন খাত! এ খাতে বাংলাদেশে প্রায় ২৫ লাখ দক্ষ লোক কাজ করেন।

বর্তমান বিশ্ব ও বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতিতে শুধু বিক্রয়কর্মী নয়, সকল কর্মজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের অবস্থা অনেক অবহেলিত। বিপনণ ও বিক্রয় যোদ্ধারা সবচেয়ে বেশী অবহেলিত অবস্হায় আছেন। বাংলাদেশে যে সব সেবাখাত আছে তার মধ্যে সরকারিভাবে গত কয়েক মাসে (ব্যাংক সেবাখাত, পুলিশ সেবাখাত, ডাক্তার সেবাখাত নিঃসন্দেহে) অনেক খাতের কর্মীরা সাহায্য সহযোগিতা পেয়েছেন। কিন্তু আরও বড় একটি সেবাখাত আছে পর্দার অন্তরালে সেটা সম্পর্কে আমরা জানি না!!!

আগেই বলেছি বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ২৫ লাখ বিক্রয় ও বিপনণকর্মী আছেন। এই ২৫ লাখ বিক্রয় ও বিপনণ কর্মীর কাজ হলো প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রতিটি হাট বাজার, দোকানে দোকানে ঘুরে মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য, ঔষধ ও নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেয়া। বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে পুড়ে, শীতে কাঁপতে কাঁপতে ও করোনা ভাইরাসের ঝুঁকি নিয়ে এবং কোন রকম নিরাপত্তা ছাড়াই মধ্যবিত্ত ও নিন্ম মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেরা এই কাজ করেন। এই বিক্রয়কর্মীরা দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন । অথচ তাদের প্রতি সরকারের কোন নজর নেই। বর্তমান মহামারীতে অনেক কোম্পানী বন্ধ হয়ে গেছে। এতে করে অনেক বিক্রয়কর্মী বেকার হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক মন্দাভাবের কারণেও অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের বেতন ভাতাও নিয়মিত দিতে পারছেন না। অথবা আংশিক বেতন দিতে পারছেন। এই অবস্হায় পরিবার পরিজন নিয়ে বিক্রয় ও বিপনন যোদ্ধা সবচেয়ে বেশী মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

এর বাইরে দুর্ঘটনায় মৃত্যু, মটর সাইকেল দুর্ঘটনায় পঙ্গু হওয়া এবং কঠিন ও জটিল রোগে আক্রান্ত হলে চিকিৎসার অভাব! সব মিলিয়ে এই পেশার লোকজন এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে জীবন পার করছে। এরপর বড় সমস্যা হলো চাকুরীশেষে অনেক কোম্পানির কর্মীরা শুন্য হাতে বাড়ি ফিরে। ফলে বৃদ্ধ বয়সে তারা পৃথিবীর সবচেয়ে অবহেলিত জীবিত প্রাণীতে পরিণত হয়।

গত এপ্রিল-মে মাসে “আমরা বিপণন যোদ্ধার” পক্ষ থেকে ৯ দফা দাবি সরকারের কাছে জানিয়েছি। এরমধ্যে অন্যতম দাবি হলো- চাকুরীর স্হায়ীত্ব এবং সরকারের সহযোগিতায় সব কোম্পানিগুলোর এক ও অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন, সব কোম্পানিতে বিক্রয় ও বিপণন কর্মীদের জন্য জীবন বীমার ব্যবস্হা বাধ্যতামুলক ভাবে নিশ্চিত করা, প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং গ্র্যাচুয়িটির ব্যবস্হা নিশ্চিত করা, প্রতি মাসে চিকিৎসা ভাতা প্রদান এবং লক্ষ্যমাত্রার অজুহাতে চাকুরীচ্যুত না করা।

প্রধানমন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রীর কাছে আমাদের দাবি এই ২৫ লাখ বিপণন যোদ্ধার দিকে একবার চোখ তুলে তাকান। এই ২৫ লাখ পরিবারকে কষ্টকর ও মানবতার জীবন থেকে মুক্তি দিন।

জাতির জনকের সুযোগ্য কন্যা, মানবতার নেত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনা-ই পারেন এই বিপণন যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়ে, তাদের দিকে একটু করুণার দৃষ্টিতে তাকাতে। স্বাধীনতার এত বছরে কোন সরকারই যা পারেনি তা একমাত্র প্রধানমন্ত্রীর পক্ষেই সম্ভব। কারণ তিনি বঙ্গরত্ন, বঙ্গনেত্রী। সর্বোপরি তিনি জাতির জনকের কন্যা।

আমাদের ১৭ কোটি মানুষের অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী, আমাদের দিকে একবার তাকান। রাস্তাঘাটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই অবহেলিত বঞ্চিত, লাঞ্ছিত, শোষিত, নির্যাতিত, নিষ্পেষিত, পদদলিত, ভাগ্যাহত বিপণন ও বিক্রয় পেশার এ লোকগুলোর ভাগ্য উন্নয়ন একমাত্র আপনার সরকারের পক্ষেই সম্ভব।

সত্যিকারভাবে এখন পর্যন্ত যদিও সরকারি তরফ থেকে এই পেশার লোকজনের জন্য কোন সুযোগ-সুবিধা নাই। তবুও আমরা তাকিয়ে আছি সরকারের আন্তরিকতা ও সহযোগিতার উপর।

লেখক: সভাপতি “আমরা বিপনন যোদ্বা”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *