কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ: আদর্শ ও সংগ্রামের দীপ্ত প্রতীক

বিকাশ সাহা; মুক্তমত:

কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ ছিলেন বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতির এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র, যিনি আজীবন লড়াই করেছেন শোষণ-বৈষম্যহীন ও ন্যায্য সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। তাঁর চিন্তা, জীবনযাপন ও রাজনীতির প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল সাধারণ মানুষের মুক্তির জন্য উৎসর্গীকৃত। তিনি ছিলেন একাধারে রাজনীতিবিদ, লেখক, সংগঠক এবং দূরদর্শী চিন্তাবিদ। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) একজন শীর্ষ নেতা হিসেবে তিনি তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক— উভয় দিক থেকেই বাম রাজনীতিকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ছিলেন একজন তাত্ত্বিক, সাংগঠনিক দক্ষতায় পরিপূর্ণ নেতা এবং অগ্রজদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সহযোদ্ধাদের প্রতি আন্তরিক কমরেড।

১৯৩৮ সালের ৫ জুলাই পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় জন্ম নেওয়া মোহাম্মদ ফরহাদ ছাত্রজীবনেই বামধারার রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হন এবং ছাত্র-আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ষাটের দশকে ছাত্র ও সংস্কৃতি কর্মীদের মধ্যে বামপন্থী চিন্তা ও রাজনীতির উত্থানে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি প্রবাসী সরকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও মতামত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলাবাহিনী গঠনে তিনি অনন্য ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রগতিশীল নেতৃত্বের মধ্যে কমরেড ফরহাদ ছিলেন অন্যতম কণ্ঠস্বর, যিনি মুক্তিযুদ্ধকে শুধু সামরিক বিজয় নয়, একটি গণমুখী সমাজ বিনির্মাণের সুযোগ হিসেবে দেখতেন।

স্বাধীনতার পর কমরেড মনিসিংহের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থাভাজন নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক ভ্রাতৃত্বের অনন্য দৃষ্টান্ত।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) অন্যতম কাণ্ডারি হিসেবে সংগঠনের বিকাশে মনোনিবেশ করেন। কমরেড মণি সিংহের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল ভ্রাতৃত্বপূর্ণ, পারস্পরিক শ্রদ্ধানির্ভর ও রাজনৈতিকভাবে দৃঢ়। তাঁদের যুগল নেতৃত্ব সিপিবিকে আদর্শগতভাবে সুদৃঢ় ও সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করে তোলে। দুজনেই বিশ্বাস করতেন জনগণের মধ্যে ভিত্তি গড়ে না তুললে সমাজতন্ত্রের পথে এগোনো সম্ভব নয়। মণি সিংহ-ফরহাদ যুগল নেতৃত্ব সিপিবিকে ৭০ ও ৮০’র দশকে সুসংগঠিত করতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

তিনি ১৯৮৬ সালে পঞ্চগড় থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদে তিনি ছিলেন বামপন্থার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। গরীব, শ্রমজীবী ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার রক্ষায় শক্ত অবস্থান ছিল তাঁর রাজনীতির অন্যতম ভিত্তি। তার জনপ্রিয়তা কেবল দলীয় রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না— তিনি ছিলেন সকল প্রগতিশীল চিন্তাধারার অভিন্ন মুখ।

তাঁর কিছু স্মরণীয় বক্তব্য:

🔹 “মুক্তিযুদ্ধ কেবল ভৌগোলিক স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়, এটি ছিল অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলন।”

🔹 “আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন নিয়ে— শুধু পতাকা তুলতেই নয়, শোষণহীন সমাজ

গড়তে।”

🔹 “সত্যিকার সমাজতন্ত্র গড়ে তোলা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পূর্ণতা পাবে না।”

🔹 “জনগণের ভরসা ও ভালোবাসা ছাড়া কোনো বিপ্লব টিকে না।”

🔹 “রাজনীতি যদি জনগণকে শিক্ষা না দেয়, তবে সে রাজনীতি আপোসের, মুক্তির নয়।”

🔹 “যে রাজনীতি জনগণের সঙ্গে মেলে না, সে রাজনীতি ক্ষণস্থায়ী।”

কমরেড ফরহাদ ১৯৮৭ সালের ৯ অক্টোবর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজধানী মস্কোতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মাত্র ৪৯ বছর বয়সে তাঁর এই অকালপ্রয়াণ দেশের প্রগতিশীল আন্দোলনের জন্য ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর আদর্শ, চিন্তা ও সাহসী নেতৃত্ব আজও আমাদের পথ দেখায়।

আজকের বাংলাদেশে বৈষম্য, শোষণ ও স্বার্থান্বেষী রাজনীতি যখন আমাদের ক্লান্ত করে তোলে, তখন কমরেড ফরহাদের মতো নেতার জীবন আমাদের নতুন করে সাহস জোগায়। যখন গণতন্ত্র, ন্যায্যতা ও সমতার প্রশ্নগুলো আবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, তখন কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদের মতো দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতার জীবনচর্চা নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে।

কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ বেঁচে থাকবেন সংগ্রামী মানুষের হৃদয়ে।

ভবিষ্যতের মুক্তিকামী সমাজ বিনির্মাণে তাঁর আদর্শই হোক আমাদের অনুপ্রেরণা। কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ বেঁচে থাকবেন আমাদের সংগ্রামে, আমাদের স্বপ্নে।

লাল সালাম, কমরেড।

লেখক পরিচিতি: বিকাশ সাহা; সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, সূত্রাপুর থানা

 

আরও খবর পড়তে:  NRB365.com

আর্ট নিউজ ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করতে: ART News BD Plus

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *