চিরনিদ্রায় মিষ্টিমেয়ে কবরী

১৭ এপ্রিল ২০২১ (নিউজ ডেস্ক): চলচ্চিত্রের ‘মিষ্টি মেয়ে’, সাবেক সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা সারাহ বেগম কবরীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। জোহরের নামাজের পর বনানী কবরস্থানে তার নামাজে জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা অভিনয় শিল্পীকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।

বাংলা চরচ্চিত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় জুটি ছিল রাজ্জাক-কবরী জুটি। ফাইল ছবি

বনানী কবরস্থানে শেষবারের মতো কবরীকে বিদায় জানাতে আসেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি সোহানুর রহমান সোহান, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি মিশা সওদাগর, সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খান, অভিনেত্রী সোহানা সাবা-সহ আরও অনেকে। এছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামের পক্ষে প্রয়াত শিল্পীকে ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হয়। শ্রদ্ধা জানিয়েছে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটসহ আরও বেশ কিছু সংগঠনও।

রাজধানীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার রাত ১২টা ২০ মিনিটে শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করেন কবরী। রাতে তার মরদেহ হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়। হিমঘর থেকে তার মরদেহ মোহাম্মদপুরে গোসল করানো শেষে গুলশানের বাসায় শেষবারের মতো নেয়া হয়। সেখানে কিছুক্ষণ রাখার পর কবরীর মরদেহ জোহরের আগেই নিয়ে যাওয়া হয় বনানী কবরস্থান এলাকায়।

কবরী অভিনীত সুপার হিট চলচ্চিত্র সারেং বউ

কবরীর ছেলে শাকের চিশতী জানান, খুসখুসে কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে করোনার নমুনা পরীক্ষা করাতে দেন তিনি। ৫ এপ্রিল দুপুরে পরীক্ষার ফল পজেটিভ আসে। ওই রাতেই তাকে রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ৭ এপ্রিল দিবাগত রাতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা তাকে আইসিইউ-তে নেয়ার পরামর্শ দেন।

৮ এপ্রিল দুপুরে শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে কবরীর জন্য আইসিইউ পাওয়া যায়। বৃহস্পতিবার বিকেলে তাকে লাইফ সাপোর্ট নেয়া হয়।

৭১ বছর বয়সী এ অভিনেত্রী দীর্ঘদিন ধরে কিডনির জটিলতায় ভুগছিলেন। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর তার ফুসফুসও মারাত্মক ক্ষতি হয় বলে জানান শাকের চিশতী।

চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন। ২০০৮ সালে নারায়নগঞ্জ-৪ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সারাহ বেগম কবরী।

গত শতকের ষাটের দশকে সেলুলয়েডের পর্দায় অভিষেক ঘটে কবরীর। ঢাকাই চলচ্চিত্রের মিষ্টি মেয়ে হিসেবে দর্শক হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেন তিনি। পরের অর্ধশতকে কবরী দুই শতাধিক চলচ্চিত্রে দাপটের সাথে অভিনয় করেন।

কবরী অভিনীত সুতরাং ছবির পোস্টার। ফাইল ছবি

ঢালিউডের শীর্ষ পাঁচ নায়কের অভিষেক ঘটে তার সাথে জুটি বেঁধে। ১৯৬৪ সালে সুভাষ দত্তের সুতরাং দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় কবরীর। ১৯৬৫ সালে অভিনয় করেন জলছবিবাহানায়। ১৯৬৮ সালে সাত ভাই চম্পা, আবির্ভাব, বাঁশরি, যে আগুনে পুড়ি। ১৯৭০ সালে দীপ নেভে নাই, দর্পচূর্ণ, ক খ গ ঘ ঙ, বিনিময় ছবিগুলো।

১৯৫০ সালের ১৯ জুলাই চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে জন্মগ্রহণ করেন কবরী। তার আসল নাম ছিল মিনা পাল। বাবা কৃষ্ণ দাস পাল এবং মা লাবণ্য প্রভা পাল। ১৯৬৩ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে নৃত্যশিল্পী হিসেবে মঞ্চে উঠেছিলেন তিনি। তারপর টেলিভিশন ও সবশেষে সিনেমায়। কবরী বিয়ে করেন চিত্ত চৌধুরীকে। সম্পর্ক বিচ্ছেদের পর ১৯৭৮ সালে তিনি বিয়ে করেন সফিউদ্দীন সরোয়ারকে। ২০০৮ সালে তাদেরও বিচ্ছেদ হয়ে যায়। কবরী ৫ সন্তানের মা। তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গি বাজারে। মাত্র ১৪ বছর বয়সে নির্মাতা সুভাষ দত্তের সুতরাং চলচ্চিত্রে অভিষেকের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন কবরী।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি চলে যান তিনি। সেখান থেকে যান ভারতে। কলিকাতায় গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করতে বিভিন্ন সভা-সমিতি ও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেন কবরী।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবারও চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন কবরী। শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। ১৯৭৩ সালে ঋত্বিক ঘটক পরিচালিত তিতাস একটি নদীর নাম সেসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। নায়ক রাজ্জাকের সঙ্গে রংবাজ বেশ জনপ্রিয়তা পায়।

১৯৭৫ সালে নায়ক ফারুকের সঙ্গে সুজন সখী ছাড়িয়ে যায় আগের সব জনপ্রিয়তাকে। এরপর কেবলই এগিয়ে চলা সামনের দিকে। জনপ্রিয় ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে আগন্তুক, নীল আকাশের নিচে, ময়নামতি, সারেং বৌ, দেবদাস, হীরামন, চোরাবালি, পারুলের সংসার

৫০ বছরের বেশি সময় চলচ্চিত্রে রাজ্জাক, ফারুক, সোহেল রানা, উজ্জ্বল, জাফর ইকবাল ও বুলবুল আহমেদের মতো অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। ঢাকার চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় ছিল রাজ্জাক-কবরী জুটি।

অভিনয়ের জন্য পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ বহু পুরস্কার ও সম্মাননা।

কবরী/আরএম/কিউটি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *