জাতির উদ্দেশে যা বললেন সিইসি

নিইজ ডেস্ক: দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল। শনিবার (৬ জানুয়ারি) সন্ধ্যা ৭টায় নির্বাচন কমিশন ভবনে তিনি এই ভাষণ দেন। তার পূর্ণাঙ্গ ভাষণ তুলে ধরা হলো-

প্রিয় দেশবাসী, আসসালামু আলাইকুম।

শুরুতেই দেশের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। গণতান্ত্রিক আশা-আকাঙ্খা ও মূল্যবোধসমৃদ্ধ আবেগ ও চেতনা থেকেই মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, সংবিধান এবং গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন হয়েছিল ১৯৭২ সালে। সংবিধানে দেশের জনগণকে রাটের মালিক ঘোষণা করা হয়েছে। সেই মালিকানা প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হচ্ছে সংসদ নির্বাচন। রাত পোহালে আজ বাদে কালই সেই নির্বাচন। ২২ মাস পূর্বে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব আমরা গ্রহণ করেছি।

বিশ্বাস করি আলাপ-আলোচনা ও গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতায় উপনীত হয়ে যে কোনও রাজনৈতিক সংকটের নিরসন সম্ভব। নির্বাচন বর্জনকারী দলসমূহ সহিংস পন্থা পরিহার করে কেবল শান্তিপূর্ণ পন্থায় জনগণকে নির্বাচন বর্জনের আহ্বান জানাবে মর্মে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে। এতে জনমনে আস্থা সঞ্চারিত হয়েছিল। ঘোষিত হরতাল অবরোধের মধ্যে সহিংসতা ও নাশকতার ঘটনা দৃশ্যমান হচ্ছে। ট্রেন, যানবাহন, নির্বাচন কেন্দ্রে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। কারা দায়ী সেটি আমাদের বিবেচ্য নয়। তবে নাশকতা ও সহিংসতার কতিপয় সাম্প্রতিক ঘটনায় আমরা উদ্বিগ্ন। তারপরও অলংঘনীয় সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে জনগণকে অনুরোধ করছি আপনারা সকল উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও অস্বস্তি পরাভূত করে নির্ভয়ে আনন্দমুখর পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে এসে অবাধে মূল্যবান ভোটাধিকার প্রয়োগ করে মূল্যবান নাগরিক দায়িত্ব পালন করবেন।

প্রিয় দেশবাসী, এবারে দেশে নোট ভোটার প্রায় ১২ কোটি। ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা প্রায় ৪২,০০০। মোট ২,৬২,০০০ বুথে ভোট গ্রহণ করা হবে। ৮ লক্ষ সরকারী কর্মচারী ভোটকেন্দ্রে ভোট গ্রহণের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবেন। প্রায় ৩০০০ নির্বাহী ও বিচারিক ম্যাজিষ্ট্রের পাশাপাশি, সেনাবাহিনীসহ আইন- শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ৮ লক্ষাধিক সদস্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও জননিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবেন। জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন একটি বিশাল, কঠিন ও জটিল কর্মযজ্ঞ। আইন ও বিধি-বিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কারের পাশাপাশি অনলাইন পদ্ধতিতে নমিনেশন দাখিলের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ব্যবস্থাটি আগামিতেও বহাল থাকবে। সবশেষ স্মার্টফোনের মাধ্যমে ভোটার সাধারণ ও সর্বসাধারণের জন্য দিনব্যাপী কেন্দ্র ও কেন্দ্রের পোলিং সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণের সুবিধাসম্বলিত দুটি ডিজিটাল অ্যাপস কমিশন সম্প্রতি চালু করা হয়েছে। দৃশ্যমানতার মাধ্যমে নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ফুটিয়ে তোলা গেলে নির্বাচনের বিশুদ্ধতা ও নিরপেক্ষতা প্রশ্নে জনমনে আস্থা সৃষ্টিতে তা সহায়ক হয়। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা প্রণিধানযোগ্য। তাই দেশি ও বিদেশি গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকদের সহযোগিতা আমরা একান্তভাবে কামনা করছি। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে প্রায় ২৩০০০ দেশি এবং প্রায় ২০০ বিদেশি পর্যবেক্ষক কাজ করবেন। পর্যাপ্ত সংখ্যক দেশি ও বিদেশি সংবাদকর্মীও নির্বাচন পর্যবেক্ষণ এবং চিত্র ও তথ্য সংগ্রহে মাঠে অবস্থান করবেন।

প্রিয় দেশবাসী, সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় সবার সমন্বিত সহযোগিতার মাধ্যমেই কেবল নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হয়ে থাকে। রাজনৈতিক দলগুলো গণতান্ত্রিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনে কার্যকরভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে, নির্বাচন অধিক পরিশুদ্ধ ও অর্থবহ হয়। তাতে জনমতেরও শুদ্ধতর প্রতিফলন ঘটে। নির্বাচন প্রক্রিয়া ক্রমান্বয়ে সংহত ও টেকসই হয়। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির উৎকর্ষ-সাধন হয়। কিন্তু নির্বাচনের প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিগত প্রশ্নে মত-বিরোধের কারণে এবারের নির্বাচনে কাঙ্খিত সেরকম রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে না। নির্বাচনী সার্বজনীনতা প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি। তারপরও ২৮ টি দল নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করছে। সর্বমোট ১৯৭১ জন প্রার্থী ২৯৯ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ফলে নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন ও অংশগ্রহণমূলক নয় মর্মে আখ্যায়িত করা যাবে না।

উৎসবমুখর পরিবেশে উৎসাহ ও উদ্দিপনার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী প্রচারদা শেষ হয়েছে। এখন কেবল ভোট গ্রহণ শুরুর অপেক্ষা। অংশগ্রহণকারী সব প্রার্থী ও ভোটার সাধারণকে নির্বাচন বিষয়ক বিধি-বিধান অনুসরণ করতে হবে। নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত সব কর্মকর্তাকেও আইন ও বিধি- বিধান যথাযথভাবে অনুধাবন, প্রতিপালন ও প্রয়োগ করে সততা ও নিষ্ঠার সাথে নির্বাচন পরিচালনার সার্বিক বিষয়ে আরোপিত দায়িত্বপালন করতে হবে। দায়িত্ব পালনে অবহেলা, শৈথিল্য, অসততা ও ব্যত্যয় সহ্য করা হবে না। নির্বাচন বিষয়ক আইন ও বিধি-বিধান বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যগণ ভোটকেন্দ্রসমূহের পারিপার্শ্বিক শৃঙ্খলাসহ প্রার্থী, ভোটার, নির্বাচনি কর্মকর্তাসহ সর্বসাধারণের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন। কোনো প্রার্থী বা প্রার্থীর পক্ষে জাল ভোট, ভোট কারচুপি, ব্যালট ছিনতাই, অর্থের লেনদেন ও পেশিশক্তির সম্ভাব্য ব্যবহার কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে। তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রার্থিতা তাৎক্ষণিক বাতিল করা হবে। প্রয়োজনে কেন্দ্র বা নির্বাচনী এলাকার ভোট গ্রহণ সামগ্রিকভাবে বন্ধ করে দেয়া হবে। জনগণকেও ঐক্যবদ্ধ হয়ে সব প্রকারের নির্বাচনি অনিয়ম- অনাচার প্রতিহত করার উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।

প্রিয় দেশবাসী, অবাধ, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও উৎসবমুখর নির্বাচনের জন্য কাঙ্ক্ষিত অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ প্রয়োজন। কিন্তু অনস্বীকার্য যে, নির্বাচন প্রশ্নে, রাজনৈতিক নেতৃত্বে মতভেদ রয়েছে। মতভেদ থেকে সংঘাত ও সহিংসতা কাম্য নয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় নাশকতা ও সহিংসতা একেবারেই হচ্ছে না তা বলা যাচ্ছে না। রাষ্ট্রীয় ধন-সম্পদের ক্ষতিসাধনের পাশাপাশি মানুষ আহত-নিহত হচ্ছে। নির্দোষ, নিরীহ, নিষ্পাপ শিশু, নারী, পুরুষের মর্মান্তিক ও মর্মন্তুদ মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। চলমান এহেন পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান ও অবসান প্রয়োজন। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এ বিষয়ে আন্তরিকভাবে উদ্যোগী হতে হবে। আজকে না হলেও ভবিষ্যতের জন্য। আমরা সবসময় প্রিয় দেশবাসী ও সম্মানিত ভোটারবৃন্দ, সম্মানিত সব ভোটারকে পরিশেষে আমি আরেকবার আহ্বান জানাচ্ছি আপনারা আগামিকাল অনুষ্ঠেয় দীর্ঘ প্রতিক্ষিত জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনে উৎসবমুখর পরিবেশে উৎসাহ ও উদ্দীপনা সহকারে ভোটকেন্দ্রে এসে নির্বিঘ্নে স্বাধীনভাবে আপনাদের মূল্যবান ভোটাধিকার প্রয়োগ করে পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত করে সংসদ ও সরকার গঠনে নাগরিক দায়িত্ব পালন করবেন। ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে গমানাগমনের সুবিধার্থে মোটরসাইকেল, মাইক্রবাস, ট্যাক্সিক্যাব, ট্রাক ব্যতীত অন্য সব প্রকার যানবাহন উন্মুক্ত থাকবে। ভোট আপনার। ভোট প্রদানে কারো হস্তক্ষেপ বা প্ররোচনায় প্রভাবিত হবেন না। কোনও রকম বাধার সম্মুখীন হলে অবিলম্বে কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসারকে অবহিত করবেন। প্রিসাইডিং অফিসার যে কোনও মূল্যে যে কোনও অপচেষ্টা প্রতিহত করে ভোটারের ভোটাধিকার প্রয়োগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আইনতঃ দায়িত্বপ্রাপ্ত ও বাধ্য। প্রিজাইডিং অফিসারকে সহায়তা করতে পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেট নিকটেই অবস্থান করবেন।

সম্মানিত প্রার্থীগণ

নির্বাচনের অন্যতম অনুসঙ্গ হচ্ছে কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কেন্দ্রে কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সাহসী, সৎ, দক্ষ ও অনুগত পোলিং এজেন্ট নিয়োগ করে প্রার্থী হিসেবে আপনাদের নিজ নিজ অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষার প্রাণান্ত চেষ্টা কার্যত: আপনাদেরকেই করতে হবে। প্রতিটি কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পোলিং এজেন্ট না থাকলে সম্ভাব্য ভোট কারচুপি কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব নাও হতে পারে। নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত সকল কর্মকর্তা সৎ, নিরপেক্ষ ও অবিচল থেকে আইন ও বিধি-বিধান অনুসরণ করে দায়িত্ব পালন করবেন। অন্যথা হলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমাদের বিশ্বাস স্ব স্ব অবস্থান থেকে সংশ্লিষ্ট সকলের দায়িত্বশীল আচরণ ও আবশ্যক আইনানুগ ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ হবে। দেশে ও বহির্বিশ্বে প্রশংসিত ও বিশ্বাসযোগ্য হবে। দেশের জনশাসনে জনগণের জনপ্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। গণতন্ত্র সুসংহত হবে। সংসদ, সরকার ও সংবিধানের কাঙ্খিত ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন থাকবে।

নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সব রাজনৈতিক দল ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীসহ আপামর জনগণের আন্তরিক অংশগ্রহণ ও সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করছি। আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সফল ও ফলপ্রসু হোক। মহান আল্লাহ্ আমাদের সহায় হউন।

খোদা হাফেজ। বালাদেশ চিরজীবী হোক।

সিইসি/এমএএম

আরও খবর পড়তে: artnewsbd.com

আর্ট নিউজ ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করতে: ARTNews BD

https://www.youtube.com/channel/UCC2oLwZJYHIEygcbPX3OsWQ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *