বিনম্র শ্রদ্ধা, হেলাল ভাই…

ফরহাদ টিটো: এলিফ্যান্ট রোডের প্রাণকেন্দ্রে বেইজিং হোটেল। জনপ্রিয় চাইনিজ রেস্টুরেন্ট। আমার প্রতিদিনের কাজের জায়গা ভোরের কাগজ তখন খুব কাছেই। তখনো, নব্বুই দশকের শুরুতে ফুটবলের জমজমাট দিন বাংলাদেশে। ক্রিকেট দুই নম্বর খেলা।

১৯৮৬ সালে ক্রীড়া জগত ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে গোলাম রাব্বানী হেলাল

হেলাল ভাই বেইজিংয়ের কর্ণধার। মাঝেমাঝে সন্ধ্যার পর বেইজিংয়ের ছাদে জড়ো হতাম দুই চারজন। কিছুক্ষণ আড্ডা দিতাম। হেলাল ভাইর সঙ্গে সবাই ফুটবলের মানুষ। আবাহনী, ধানমন্ডি আর বরিশালের মানুষ।

আমার বন্ধুর মতো আউয়াল চৌধুরী ভুলু যেতেন প্রতিদিন। তিনিও অরিজিনালি বরিশালের। হেলাল ভাইয়ের খুব ঘনিষ্ঠ, ছোট ভাইয়ের মতো। ভুলু ঢাকা আবাহনীর ক্রিকেট ম্যানেজার। ক্লাব ক্রিকেটের চেয়ারম্যান তখন মুস্তাফা কামাল, যিনি এখন অর্থমন্ত্রী।

বেইজিংয়ে তখন আবাহনীর ফুটবলারদের নিয়মিত যাতায়াত। রেহান, মামুনদের দেখতাম প্রায়ই। ফুটবলার রুমি যেতেন, হকিস্টার জুম্মনকেও দেখা যেত। দেখতাম আরো অনেককেই। দেখা হতো ধানমন্ডি ক্লাবের দুঃসাহসী ফুটবল কোচ ঝন্টু ভাইয়ের সঙ্গেও। এদের বাইরেও যাতায়াত ছিলো আরো অন্যান্য ক্লাবের খেলোয়াড়-কর্মকর্তা অনেকের। সোশ্যালাইজেশনের বাইরে আমার যাওয়ার কারণ ছিলো আরো একটা। খবরের একাধিক সোর্সের সঙ্গে কন্টাক্ট রাখা।

পত্রিকার শিরোনামে নাম আসাটা গোলাম রাব্বানী হেলালের জন্য ছিল স্বাভাবিক ঘটনা

প্রশ্ন করতে পারেন… এত এত ব্যস্ত মানুষ, জনপ্রিয় মানুষ কিছুক্ষণের জন্যে হলেও কেন যেতেন বেইজিংয়ে ?

একটাই কারণ ছিলো। গোলাম রাব্বানী হেলালের সঙ্গে সুন্দর একটু সময় কাটাতে। সুদর্শন, বন্ধুবৎসল, হাসিখুশি মানুষটা একসময় ঢাকার মাঠে জনপ্রিয় ফুটবলার ছিলেন। খেলতেন দেশের স্পোর্টসে প্রথম সুপারস্টার সালাউদ্দিনের সঙ্গে একই সময়ে। আবাহনীতে। তখন বাংলাদেশের প্রাণের খেলা ফুটবল। আবাহনী, মোহামেডানের খেলা থাকলে দর্শকের চাপে ভেঙে পড়ে স্টেডিয়াম। সারাদেশ ভাসে ফুটবলের জোয়ারে।

আজকে, কিছুক্ষণ আগেই জানতে পারলাম গোলাম রাব্বানী হেলাল মারা গেছেন। ফেইসবুকে নিউজফিড সয়লাব হয়ে গেছে তার মৃত্যুসংবাদে। করোনাতে মৃত্যু হয়নি তার। হাসপাতালে শয্যাশায়ী ছিলেন অন্যরোগে আক্রান্ত হয়ে।

আশি-নব্বুই দশকে দেখা খুব সৌখিন আর প্রাণবন্ত মানুষটার সঙ্গে আমার দেখা হয় নাই দুই যুগ। সশরীর দেখা হবে না আর কোনোদিন।

কল্পনায় আসবেন হেলাল ভাই। আমার স্মৃতিকোঠায় ঢাকার ফুটবলের অনেক স্মৃতি। সেগুলোর কোথাও না কোথাও আকাশী নীল জার্সিতে হেলাল ভাই আছেন। দৌঁড়াচ্ছেন তিনি মিডফিল্ড থেকে ফরোয়ার্ডে, কখনো লিবেরো থেকে টাচ লাইনে। ঢাকা স্টেডিয়ামের বুকে হাজারও, লাখও মানুষ। একাংশের গগনবিদারী আনন্দ চিৎকার… অনর্গল “আবাহনী… আবাহনী… আবাহনী…”

ভালো থাকবেন প্রিয় হেলাল ভাই… পৃথিবীর অন্য পাড়ে।

লেখক পরিচিতি:

ফরহাদ টিটো; বাংলাদেশে আধুনিক স্পোর্টস রিপোর্টিংয়ের জনক; কানাডা প্রবাসী