স্মৃতিতে অম্লান মান্না দে

রহমান মুস্তাফিজের মুক্তমত: মান্না দে। কালজয়ী সঙ্গীত শিল্পী। ২০১৩ সালের ২৪ অক্টোবর ভারতের বেঙ্গালুরুতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আজ এই মহান শিল্পীর সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী।

১৯৯৬ সালে মান্না দে ঢাকা এসেছিলেন বাংলাদেশ-ভারত সাংস্কৃতিক চুক্তি বিনিময়ের অংশ হিসেবে। সাথে ছিলেন শীলা ভার্মা (শীলা’র পূর্ব পুরুষও যথারীতি এপাড় থেকে ওপাড়ে যাওয়া)। তখন আমি সদ্য চালু হওয়া বার্তা সংস্থা ইউএনবি বাংলা সার্ভিসে প্রথম রিপোর্টার হিসেব যোগ দিয়েছি। আমার নিউজ এডিটর ১৫ দিন আগেই বলে রাখলেন মান্না দে-র সাক্ষাতকার লাগবে।

সে সময়ে ভারতীয় হাই কমিশনের ফিন্যান্স মিনিস্টার মিজ মানজু আর প্রেসের দায়িত্বে থাকা রঞ্জন মণ্ডলের সাথে আমার দারুণ বন্ধুত্ব। তাই নিশ্চিন্তে অফিসে বলে দিলাম সময় মতো সাক্ষাকতার জমা দিব, চিন্তা করার কিছু নেই।

প্রথম অনুষ্ঠান হলো ওসমানি স্মৃতি মিলনায়তনে। মান্না দে একটানা ৫/৬টা গান গাইলেন একাই। শীলা ভার্মা-কে মাইক্রোফোন দিয়ে খানিকটা বিশ্রাম নিতে গ্রীণ রুমে আসার আগে গাইলেন জনপ্রিয় ‘কফি হাউজের আড্ডা’ গানটি।

তিনি গ্রীন রুমে ঢুকতেই সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ইজি চেয়ারে বসার আগেই প্রশ্ন করলাম। নিজের এখনকার কণ্ঠ সম্পর্কে আপনার কোন ধারণা আছে? এমন হেড়ে গলায় গান করেন কেন?
মান্না দে: আপনি সাংবাদিক? জানেন না কি ভাবে প্রশ্ন করতে হয়? আপনাদের ম্যানার শেখানো হয় না?

র মু: এ সব অবান্তর কথা বাদ দিয়ে বলুন আপনি কফি হাউজের গানটা এমন ভাঙা কণ্ঠে কেন গাইলেন? আপনার লাখ লাখ ভক্ত এ গানের কারণে। ক্যাসেটে তারা আপনার যে কণ্ঠ শোনেন তার কিছুই আজ আর নেই। তারা হতাশ।

এরপর মান্না দে আয়োজকদের ডেকে বললেন আমাকে মিলনায়তন থেকে বের করে দেয়া না হলে তিনি আর গাইবেন না। আমি তাকে আরো ২/৩ মিনিট উত্যক্ত করে চলে এলাম। পরদিন সকাল ৯টার দিকে ঘুম ভাঙলো রঞ্জন মণ্ডলের ফোনে। জানালেন, ১১টার সময় মান্না দে বেইলী রোড যাবেন শপিং করতে।

আমি তৈরি হয়ে হাজির বেইলি রোডে। টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরে তিনি ঢুকলেন যখন তখন তার মাথায় বিখ্যাত টুপিটা নেই। সেলসম্যানের সামনে দাঁড়িয়ে বললাম, আপনি মাথায় টুপি পরেননি বলে কী মনে করেছেন কেউ আপনাকে মান্না দে বলে চিনতে পারবেন না?

আমার কথায় সেলসম্যানদের ভীড় জমে গেল। আস্তে আস্তে আশপাশের দোকান থেকে শুরু করে পথচারিদের ভিড় জমে গেল। তাঁর আর শপিং করা হলো না। তিনি রেগে গেলেন। আবারও বেশ বকাঝকা করলেন। এর ফাঁকে তাকে রাগাতে আরো কিছু কথা বললাম। তিনিও ক্ষেপে সমানে পাল্টা কথা বলতে লাগলেন।

সেদিন বিকেলেই গেলেন বঙ্গবাজারে। বেইলি রোডের ঘটনার পুনরাবৃত্তি সেখানেও। পরদিন সকালে তার হোটেলে হাজির হলাম। হোটেল পূর্বানী’র সিকিউরিটি সমস্যা করলো না রঞ্জন মণ্ডলের বদন্যতায়।

বলে রাখা ভালো, আমার সে সময়কার কাজের স্টাইলটা রঞ্জন মণ্ডল বেশ উপভোগ করতেন বলে তার সাহায্যের হাত সব সময়ই বাড়ানো থাকতো আমার দিকে। হোটেলে বিনা অনুমতিতেই তার রুমে হাজির হই। রুমে ঢুকে প্রথমেই প্রশ্ন, আপনার মতো একজন ব্যক্তিত্বের এমন অভদ্র আচরণ মানুষকে ব্যথিত করে, এটা আপনি বোঝেন, নাকি সে বোধটুকুও আপনার নেই?

আমার কথা শুণে তিনি আক্ষরিক অর্থেই আমাকে ধাক্কা দিয়ে রুম থেকে বের করে দিলেন। রুম থেকে বের করতে করতে বললেন, বাংলাদেশ সম্পর্কে তার আবেগের কথা। সেই বাংলাদেশের একজন ‘অসভ্য সাংবাদিকের’ কাছ থেকে তিনি বাকি কয়েকটা দিন রেহাই চান।

রাতে রওনা হলাম চট্টগ্রামে। পরদিন মান্না দে’র অনুষ্ঠান সেখানে। সকালে আমাকে হোটেলের লবিতে দেখে নিজেই এগিয়ে এলেন। স্বেচ্ছায় দায়িত্ব নিলেন ম্যানার শেখানোর। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত সাংবাদিকরা তাঁর সাথে কেমন ব্যবহার করেছেন সেগুলো জানালেন। সবশেষে হুমকি দিলেন, তাকে যদি আবার বিরক্ত করার চেষ্টা করি তাহলে আমাকে পুলিশের হাতে তুলে দেবেন।
এদিকে মান্না দে’র সাক্ষাতকারের কপি হাতে না পেয়ে বিরক্ত বার্তা সম্পাদক। চিফ সাব-এডিটর শান্তণু দা (শান্তণু চৌধুরী, বর্তমানে ডিবিসি’র বার্তা সম্পাদক) বার্তা সম্পাদক জুহুরুল ইসলাম টুকু ভাইকে (পরে দৈনিক মুক্তকণ্ঠ ও খোলা কাগজের সম্পাদক) বুঝিয়ে শান্ত রাখার চেষ্টা করলেন।

সে সময় কালচারাল বিটে আর যারা কাজ করতেন তারা কেউ না পারলেও আমি ঠিকই সাক্ষাতকার নিতে পারবো বলে শান্তণু দা বিশ্বাস করতেন। ঢাকায় ফেরার পরদিন আমি সাক্ষাতকারটা (ন্যারেশন আকারে ছিল) কম্পিউটার সেকশন ইনচার্জ সিরাজ ভাইকে (বিরলজাতের ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন) কম্পোজে দিলাম। পরদিন বেশ কয়েকটি পত্রিকায় প্রথম পৃষ্ঠাতেই বক্স আকারে ছাপা হলো তা।
সেদিন বিকেলেই মান্না দে দিল্লী রওনা হবেন। সকাল ৭টা কি সাড়ে ৭টার দিকে রঞ্জন মণ্ডল ফোন করলেন। বললেন, এক্ষুনি পূর্বানীতে যান, মান্না জী আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।
আধঘন্টার মধ্যে হাজির হলাম হোটেলে। রুমের দরজায় নক করতেই বেরিয়ে এলেন মান্না দে। দু’চোখ জুড়ে টলমল করছে পানি। জড়িয়ে ধরলেন বুকে। সরাসরি ‘তুই’ করে সম্বোধন করলেন। বললেন, তোর সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছিরে, তখন বুঝিনি তুই আমাকে এতো ভালোবাসিস। এরপর অনেক কথা। এক সাথে নাস্তা খাওয়া। গল্প করতে করতেই বললেন, সবাই প্রশংসা করে সাক্ষাতকার ছাপায়, কেউ নিন্দে করে। এর আগে কেউ আসল মান্না দে-কে খোঁজার চেষ্টা করেনি।

ফেরার আগে আমি তার সাথে উল্টো পাল্টা প্রশ্ন আর বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা চাইলাম। মাথা আর ঘাড়ে গাট্টা মেরে বললেন, এমন অসভ্যতা তার সাথে আগে কেউ করেনি, আবার এমন সাক্ষাতকার দেয়ার অভিজ্ঞতাও তার হয়নি কখনও।

দিল্লী গিয়ে চমৎকার একটা ধুতি পাঠিয়েছিলেন মান্না দে। নিউজের জন্য আমার জীবনের সেরা স্বীকৃতি সেই ধুতি।

চীরঞ্জীব মান্না দে- লাল সালাম।

স্মৃতি/রমু/কিউটি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *