অর্থনীতির চাকা সচল রয়েছে

২২ নভেম্বর ২০২০ (নিউজ ডেস্ক): আওয়ামী লীগ সরকারে এসে সারাদেশে ব্যাপক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছে বলেই এখনও দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেছেন, আরও অনেক কাজ আমরা শুরু করেছি সেগুলোও সম্পন্ন করবো। বলেছেন, দারিদ্র্য সীমা যেমন আমরা কমিয়ে এনেছি, মাথাপিছু আয় আমরা বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছি, মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে। গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত মানুষের জীবন মান যে উন্নত করা যায় সেটাও আমরা প্রমাণ করেছি।

রোববার সকালে মাগুরা, নারায়ণগঞ্জ এবং যশোরে তিনটি সেতু এবং পাবনায় একটি স্বাধীনতা চত্বরের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তিনি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করা এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করার সুযোগ, বিদেশ থেকে বিনিয়োগ আনার ব্যবস্থা, সর্বোপরি অর্থনীতির চাকাটা যাতে সব সময় সচল থাকে সে সব দিকে বিশেষভাবে নজর দিয়েই সরকার পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং উন্নয়নের কাজ বাস্তবায়ন করছে।

তিনি বলেন, ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর ধারাবাহিকভাবে সরকারে আছি বলেই আজ আমরা দেশের মানুষের উন্নতি করতে পারছি।

প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে বলেন, আমরা কিন্তু হঠাৎ করেই কিছু করিনি। আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে তখনও কিন্তু আমাদের পরিকল্পনা ছিল। কেননা, জাতির পিতা আমাদের যে সংবিধান দিয়ে গেছেন সেখানে দেশের মানুষের উন্নয়নের কথা, মৌলিক চাহিদাগুলো বাস্তবায়নের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। কাজেই, যখনই সরকারে এসেছি পরিকল্পিত উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছি এবং যার সুফল এখন দেশের মানুষ পাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী মাগুরা জেলার মোহম্মদপুর উপজেলার মধুমতি নদীর উপর এলাংখালী ঘাটে ৬০০ দশমিক ৭০ মিটার দীর্ঘ শেখ হাসিনা সেতু, নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলাধীন মুড়াপাড়া ফেরিঘাট রাস্তায় শীতলক্ষ্যা নদীর উপর ১০ হাজার মিটার চেইনেজে ৫৭৬ দশমিক ২১৪ মিটার দীর্ঘ বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম দস্তগীর গাজী (বীর প্রতীক) সেতু এবং যশোর জেলার অভয়নগর উপজেলায় সড়ক ও জনপথের যশোর-খুলনা সড়কের ভাঙ্গাগেট (বাদামতলা) হতে আমতলা জিসি ভায়া মরিচা, নাউলী বাজার সড়কে ভৈরব নদীর উপর ৭০২ দশমিক ৫৫ মিটার দীর্ঘ সেতু উদ্বোধন করেন।

এছাড়া, পাবনায় ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল স্বাধীনতা চত্বরেরও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।

উদ্বোধন করা সেতু প্রসঙ্গে বলেন, এই তিনটি সেতু মোহম্মদপুর, রূপগঞ্জ এবং অভয়নগরবাসীর জন্য মুজিববর্ষের উপহার।

তিনি এ সময় করোনার সেকেন্ড ওয়েভ সম্পর্কে জনগণকে পুনরায় সচেতন করে দিয়ে মাস্ক ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে গণভবনের সঙ্গে সচিবালয় থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, মাগুরা, নারায়ণগঞ্জ ও যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এবং পাবনার বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল স্বাধীনতা চত্বর সংযুক্ত ছিল।

অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এলজিআরডি ও সমবায় মন্ত্রী তাজুল ইসলাম এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেলাল উদ্দিন এবং পাবনা প্রান্ত থেকে স্বাধীনতা চত্বর বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক এবং স্কয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মুক্তিযোদ্ধা অঞ্জন চৌধুরী বক্তৃতা করেন।

এলজিআরডি ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টচার্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রান্তে এবং নারায়ণগঞ্জ প্রান্তে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, বীর প্রতীকসহ স্থানীয় সংসদ সদস্যগণ, জনপ্রতিনিধি এবং জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা এবং উপকারভোগী জনগণ নিজ নিজ প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন।

গণভবন প্রান্ত থেকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ডক্টর আহমদ কায়কাউস অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।
অনুষ্ঠানে নির্মিত তিনটি সেতু এবং ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল স্বাধীনতা চত্বর’ এর ওপর দুটি পৃথক ভিডিও চিত্র প্রদর্শিত হয়।

প্রধানমন্ত্রী ’৭৫-এর হত্যাকান্ডের পর ছয় বছর প্রবাস জীবন কাটাতে বাধ্য হয়ে ’৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হলে জোর করে দেশে ফিরে আসেন।

সে সময়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, বাবা-মা, ভাই সব হারিয়ে নিঃস্ব, রিক্ত হয়ে বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলাম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আকাঙ্খার ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মুক্ত এবং উন্নত সোনার বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণ করবো বলে।

তিনি বলেন, একটাই সিদ্ধান্ত ছিল এ দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতেই হবে। যা আমার বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আন্তরিক ভাবে চেয়েছিলেন এবং দেশের মানুষকে উন্নত জীবন দেয়ার জন্য নিজের জীবন তিনি উৎসর্গ করেছিলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, প্রকৃতপক্ষে ’৭৫ এর পর বাংলাদেশ অন্ধকারে ছিল। তবু, ১৯’৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর একটু আলোর ঝলকানি পেয়েছিল। তবে, আমরা একটা চক্রান্তের কারণে পুনরায় ক্ষমতায় আসতে না পারায় আবারো অন্যায়, অত্যাচার, নির্যাতন আর অন্ধকারে দেশ ডুবে যায় এবং বাংলাদেশের মানুষের জীবন থেকে আরো ৮টি বছর চলে যায়।

তিনি তিনটি সেতু নির্মাণের কারণে স্থানীয় জনগণের জীবন মানে যে পরিবর্তন ঘটবে বলে সরকার আশা করছেন তার একটি খতিয়ান তুলে ধরে পাবনার বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুলের জীবনের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, রফিকুল ইসলাম বকুল একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন। তিনি (শেখ হাসিনা) যখন ১৯’৮১ সালে প্রবাস জীবন থেকে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দেশে ফেরেন তখন বারবার বাধার সম্মুখীন হন। তখন যে কয়েকজন তার পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং সাহসে ভর করে সে কঠিন অবস্থার মোকাবেলা করেছেন তার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল অন্যতম।

স্মৃতি রোমন্থনে বহু বছর আগে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অভিযাত্রায় এই রফিকুল ইসলাম বকুলের সঙ্গে একটি স্মরণীয় ঘটনা অনুষ্ঠানে তুলে ধরে-কি প্রতিকূলতার মধ্যে তাকে রাজনীতি করতে হয়েছে তারও একটি নমুনা উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী।

বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, বাংলাদেশের আসার পর থেকে বার বার আমি বাধাগ্রস্ত হতাম। বিএনপি প্রতিটা ক্ষেত্রে আমাকে বাধা দেয়। কোঁপাকুপি, বোমা হামলা, গাড়ি আক্রমণ, মঞ্চ পুড়িয়ে দেয়া, জনসভায় হামলা… সবই চলতো।

তিনি বলেন, ‘আমি যখন খুলনা থেকে রাজশাহী রওনা হলাম পথিমধ্যে হাজারো মানুষের ঢল। ভীড় ঠেলে যেতে অনেক সময় লেগে গিয়েছিল। ঈশ্বরদী পৌঁছাতেই রাত প্রায় ১১টা বেজে যায়। সেখানে পৌঁছে শুনলাম আমাদের নাটোরের জনসভার মঞ্চ ভেঙে দিয়েছে। সেখানে আমাদের নেতা-কর্মীদের ওপর আক্রমণ করে তাদের কুঁপিয়েছে, গুলি করেছে। আমাকে সেখানে যেতে দেবে না। সেখানেই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমি পিছিয়ে যাবো না। আমি যাবোই।

প্রধানমন্ত্রী স্মৃতি রোমন্থনে বলেন, আমরা তখন তাকে বকুল মামা (মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল) বলে ডাকতাম। তাকে বললাম, আমার সাথে আপনার কর্মী দিতে হবে এবং ট্রাক ভাড়া করতে হবে যেহেতু অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে মঞ্চ পুড়িয়েছে, বিএনপি আমাদের ঢুকতে দেবে না, কিন্তু আমরা ঢুকবোই। সেখানে ৪০/৫০ জন কর্মী ও একটি ট্রাক ভাড়া করে বকুল মামা আমাদের সাথে ছিলেন।

তিনি বলেন, আমাদের গাড়ি ছিল না। খুলনার লাইনের একটা বাস ভাড়া করে আমরা যাচ্ছিলাম। মানুষের চাপে সে বাসের কয়েকটি গ্লাসও ভেঙে যায়। নাটোরে ঢোকার মুখের রেল ক্রসিংয়ে প্রচন্ড বোমাবাজি শুরু করলো বিএনপি। বকুল মামা তার লোকজন নামিয়ে আক্রমণকারীদের ধাওয়া দিলেন। যদিও সেখানে বিএনপি সেদিন একটি ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। তবু, আমরা সেখানে আহতদের উদ্ধার করে একটি অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে ট্রিপ করে করে অসংখ্য আহত নেতা-কর্মীকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে রাস্তার ওপরই একটা জনসভা করে আসলাম।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘সেই চরম দুঃসময়ে এই রফিকুল ইসলাম বকুল আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

তিনি বলেন, এই পাবনা ছিল সর্বহারাদের একটা জায়গা। আর স্বাধীনতার পর পর সব স্বাধীনতা বিরোধী পাকিস্তানের দোসররা আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। যার জন্য একদিকে যেমন ছিল আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টি, অন্যদিকে জামায়াতের একটা বিরাট ঘাঁটি। একাত্তরের বিজয়ের পরপরই আল্ট্রা লেফটিস্ট পার্টি, রাজাকার, সর্বহারারা সব একসাথে জুটে গেল সেখানে। যে কারণে সেখানে সব সময়ই একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি ছিল এবং আমাদের বহু নেতা-কর্মীকে সেখানে হত্যা করা হয়।

সেখানে দলের গ্রুপিং থাকায় মুকুল মামাকে এক সময় দলত্যাগ করতে হলেও সে গ্রুপিং এখন নেই বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ‘একটা মানুষ চলে যেতে পারে। কিন্তু একটা মানুষের যে অবদান আমি সেটাকে কখনও অস্বীকার করি না এবং আমি তা করবো না। তার অবদানটা আমাদের মনে রাখতে হবে। কারণ, তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা।’ তার নামে এই চত্বরটি করায় তিনি অঞ্জন চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান।

প্রধানমন্ত্রী/এএমএম/আরএম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *