করোনাকালীন একটি ঈদ: কান্তা মোরশেদ

একটি মন খারাপ করা ঈদ এসেছে।

ছোটবেলার ঈদের উল্লেখযোগ্য স্মৃতি হচ্ছে, আব্বার বোনাসের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করা + বোনাস এলে আব্বা আম্মা দাদি ফুপু চাচা… প্রত্যেকের নাম লিখে লিখে টাকা ভাগ করা নতুন কাপড় কেনার জন্য + সেই টাকা হাতে আম্মা আর ফুপুর সাথে নিউমার্কেট ঘোরা। মনে আছে, আমাকে প্রতি ঈদে বাটা থেকে জুতা কিনে দেওয়া হতো। ফুপুর কিছুতেই শাড়ি পছন্দ হতো না। সারা মার্কেট ঘুরেও শাড়ি কেনা শেষ হতো না।

আম্মার জন্য খুব কিছু কেনা সম্ভব হতো না। আব্বার জন্যেও। প্রায় সময় দেখা যেতো, আব্বা আম্মা তাদের ভাগের টাকা দিয়ে আমাকেই ভালো জামা কিনে দিয়েছেন।

ঈদ মানে দাদির হাতের মোরগপোলাও। আম্মার পায়েস, মুরগির কোর্মা। কিন্তু ঈদের সবচেয়ে বড় আনন্দ যে মানুষজন… এতে কমতি ছিলো। আব্বা আম্মার পরিজনদের চাইতে বন্ধু সংখ্যা বেশী… আর ঈদে যে যার পরিবারে। কাজেই, ঈদের দিনে কোথাও যাওয়া নেই। মাঝে মাঝে দুই একটা ঈদ অবশ্য আব্বা বাইরে নিয়ে গেছেন বড় ফুপুর বাসায়, আব্বার অন্যান্য বন্ধুদের বাসায়!

আরেকটু পরে, যখন ক্লাস এইট/নাইনে পড়ি, আব্বার সাথে ঢাকার তখনকার বুটিকগুলোতে যেতাম। যা পছন্দ হোতো আব্বা তাই কিনে দিতেন। পকেটে যতক্ষণ টাকা আছে আব্বা কোনোদিন না বলতেন না।

বিয়ের পর, সারাদিন শ্বশুরবাড়ি। মার চার ছেলে দুপুরে একসাথে বাবা-মার সাথে খাবে। এরপর সন্ধ্যায় আব্বার বাসায় রাতে খাওয়া। সন্ধ্যা পর্যন্ত আব্বা আম্মা জানালায় তাকিয়ে বসে থাকতেন। আমি গেলে ওবাসা ব্যস্ত, বিজি, জামাইকে খাওয়ানো… বাসায় ঈদ।

২০১২ তে আম্মার হাত ভেঙে যায়। জোড় করে একা থাকতে না দিয়ে আমার বাসায় নিয়ে এলাম। এরপর থেকে আমার বাসায় ঈদ শুরুর সময় ২৭ রোজায়।

পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার বাতিক আছে আমার, দোষ স্বীকার করছি। এই উপলক্ষে বাসার প্রতি কোণাও আমার নজর এড়ায় না। সন্ধ্যায় চাঁদ ওঠার পরে আক্তার, নাভীদ এক রাশ ফুলে আমার ঘর ছেয়ে দিতো। সুগন্ধে মৌ মৌ করতো চারপাশ… উৎসবের আয়োজন। সকালে বাবা ছেলে নামাজ থেকে ফেরে সকল প্রতিবেশীদের নিয়ে, তার আগেই খাওয়ার টেবিল রেডি। এই দফা শেষ হওয়ার পর দুপুরে খাওয়া… আমার বাসা অথবা মুক্তা ভাবির বাসা অথবা বড় ভাবির বাসা। তিনভাইয়ের বাসায় ঘুরে ঘুরে। যখন যে বাসায়, সে বাসায় সকলেই। সুতরাং বিজি ঈদ।

দুপুরের পর্ব শেষ হলে সন্ধ্যার পর বন্ধু বান্ধবের তৃতীয় দফা। ধাপে ধাপে খাওয়া চলছেই আর প্রীতি বিনিময়। ঈদের দিনের এতো ব্যস্ততায় শরীর ভেঙে এলেও মন থাকে তরতাজা। সবকিছু ভালো লাগে।

এইরকম ঈদ প্রতি ঘরে ঘরে। বিজিনেস, খাওয়াদাওয়া, নতুন জামা। আনন্দ তৈরি করতে হয় না। পরিবেশ আনন্দিত করে তোলে।

মাঝেমাঝে বিরক্ত হয়ে নিজেকে বলেছি, বিয়ের আগের ঈদগুলোই ভালো ছিলো। তখন আমি ঘুমাতে পারতাম। ইস্! একমাস রোজার পরে আমার একটুও ছুটি নাই… ঈদের দিনেও বিজি!?

মনের আশা নাকি অপূর্ণ থাকে না।

এবার হচ্ছে, ঈদ। জন-মানুষবিহীন। কোথাও কোনো বিজিনেস নাই। কাউকে কিছু কিনে দেওয়া নাই। ঘরবাড়িতে হাতও দেই নাই। এই ঈদ প্রথম, যেদিন আমার বাড়িতে কোন ফুলের সুবাস নেই। যেদিন নির্ধারিত ঈদের দিন… সে দিন বাবা ছেলের জন্য অল্পকিছু রান্না করবো। হয়তো ভিডিওকলে পরিজন বন্ধুদের সাথে অল্পকিছু কথা বলা হবে!!!

এই অসহ্য অসহায় নিরানন্দ ঈদ আমি চাইনি। শুধু একটু ঘুমাতে চেয়েছিলাম। এতো সময় ক্যানো পেলাম যে… দিনে রাতে জেগে থাকি, একবিন্দুও ঘুম আসে না!?

অন্ধকার চলে যাক। আলো আসুক।

অন্তত, সামনের দিনগুলো কালো….. আরও কালো না হয়ে ওঠে সেই প্রত্যাশা আমি এবং প্রত্যেকের মনে কাজ করছে।

“একদিন সূর্যের ভোর / একদিন স্বপ্নের ভোর / আসবেই……………… একদিন।। ”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *