
কাজী তামান্না: বাংলাদেশে গণমাধ্যমের ইতিহাস খুব পুরনো নয়। কিন্তু বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এর ইতিহাস দুই হাজার বছরেরও বেশি। সবচেয়ে প্রাচীন সংবাদপত্র হলো রোমের ‘অ্যাক্টা দিউরনা’। প্রকাশিত হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৫৯ অব্দে। জনগণকে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাবলী অবহিত করতে জুলিয়াস সিজার প্রধান শহরগুলোতে সংবাদ পাঠানোর ব্যবস্থা করতে চাইলেন। বিশাল সাদা বোর্ডের এই ‘অ্যাক্টা’ সরকারের স্ক্যান্ডালস, মিলিটারি ক্যাম্পেইন অথবা বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের সংবাদ লিখে প্রদর্শনের জন্য রাখা হতো বাথের মতো জনবহুল শহরগুলোতে। তবে প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয় অষ্টম শতাব্দীতে, চীনে। হাতের লেখা সংবাদ-সম্বলিত কাগজ বিলি হতো বেইজিংয়ে।
১৪৪৭ সালে জোহান গুটেনবার্গ ছাপাখানা আবিষ্কার করার সাথে সাথেই সূচিত হয় সংবাদপত্রের আধুনিক যুগ। গুটেনবার্গের এই যন্ত্র, চিন্তার অবাধ আদান-প্রদান ও জ্ঞান বিস্তৃতিতে ভূমিকা রাখে। এই সময়ে, নিউজলেটারগুলো উঠতি বণিকদের ব্যবসা-বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রদান করতো। পঞ্চদশ শতকের শেষ দিকে জার্মানির শহরগুলোতে সার্কুলেশন হতো ম্যানুসক্রিপ্ট বা হাতের লেখা নিউজশিটস্।
আধুনিক সংবাদপত্র প্রথম প্রকাশিত হয় পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলোতে। জার্মানিতে ১৬০৫ সালে, বেলজিয়ামে ১৬১৬ সালে, ফ্রান্সে ১৬৩১ সালে ও ইংল্যান্ডে ১৬৬৫ সালে।

আমাদের দেশের ‘রঙ্গপুর বার্ত্তাবহ’, ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’, ‘রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা’, ‘সমাচার দর্পণ’, ‘প্রবাসী’… নামক পত্রিকাগুলোর নাম আমরা জানি। এ পত্রিকাগুলোর পথ ধরে নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে সংবাদমাধ্যম সমাজ ও রাষ্ট্রে নিজের স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। এই পথ চলায় যুগে যুগে এসেছে এর নানামুখী পরিবর্তন।
বাৎসরিক, ষান্মাসিক, ত্রৈ-মাসিক, মাসিক পত্রিকা পাঠকের চাহিদা বিবেচনায় এক সময় প্রকাশিত হলো পাক্ষিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে। শুরু হলো অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকার যুগ। প্রতি তিনদিন অন্তর প্রকাশিত হতো। কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা-ও ছিল অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা। তাতেও পাঠকের মন ভরে না। তারপর পাঠকের চাহিদা বা মনের ক্ষুধা মেটাতে এলো দৈনিক পত্রিকা। সকাল হলেই তরতাজা খবর নিয়ে পাঠকের হাতে পৌঁছে যায় দৈনিক পত্রিকা। দৈনিক পত্রিকায় দেশ-বিদেশের খবর জানতে অপেক্ষা করতে হয় পরদিন সকাল পর্যন্ত।
দুনিয়া গতিময় হয়েছে। এই গতির সাথে তাল মিলিয়ে পত্রিকা জগতেও এলো পরিবর্তন। প্রকাশ হলো বৈকালিক বা সান্ধ্য দৈনিক। প্রযুক্তির কারণে, বিশেষত ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ার পর চালু হলো অনলাইন নিউজ পোর্টাল। ঘটনা ঘটার পরপরই পাঠকের সামনে সব তথ্য হাজির। থাকছে ঘন্টায় ঘন্টায় সেই সংবাদের আপডেট। সংবাদ বিশ্লেষণের জন্যও আর এক বা দুই দিন অপেক্ষা করার দরকার নেই।
পত্রিকার মেজাজ, বিশেষত তার আকৃতি, সংবাদ উপস্থাপনা ও ভাষায় পরিবর্তন আসে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের সাথে সাথে সংবাদ উপস্থাপনায় ধরণ পাল্টায়। তবে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন, বিশেষত আধুনিকতায় সবশেষ ছোঁয়া লাগে ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের পর। প্রায় এক যুগ লাগে এই পরিবর্তন সম্পন্ন হতে।
১৯৯১ সালে দৈনিক আজকের কাগজ সংবাদ উপস্থাপনায় পরিবর্তনের ধারা শুরু করে। একই সাথে ফিচারকেও হাজির করে নতুনভাবে। এই পরিবর্তনের ধারা ১৯৯২ সালে প্রকাশিত ভোরের কাগজ পত্রিকার মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। প্রথম আলো প্রকাশের পর এর বিস্তৃতি ঘটে। কার্যত সংবাদপত্রে আধুনিকতার ছোঁয়াটি আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ হয়ে প্রথম আলো বিস্তৃতি ঘটায়। গত দুই দশকে তার আর উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। সেই ধারাটিই নানা আঙ্গিকে অন্যরা নিজেদের মত করে সাজিয়েছেন। ২০০০ সালের পর আসা কোন সংবাদপত্রেই মৌলিক কোন পরিবর্তন আসেনি।
অনলাইন গণমাধ্যমেও সংবাদের ভাষায় কোন পরিবর্তন নেই। গতানুগতিকভাবেই চলছে সংবাদপত্রের এই কনিষ্ঠ মাধ্যমের উপস্থাপনা।
প্রায় দুই যুগ ধরে আমাদের গণমাধ্যম একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। যখনই নতুন কোন টেলিভিশন, পত্রিকা বা অনলাইন নিউজ পোর্টাল নিজেকে প্রকাশের প্রস্তুতি নেয়, তখনই তারা বলে, ‘আমরা অন্যদের মত হবো না। আমরা নতুন কিছু দিব।’

বাস্তবতা হলো, কেউ নতুন কিছু দেয় না। সব আগের মতই। নতুন কিছু দেয়ার সামর্থ্য অনেকেরই হয়তো আছে। কিন্তু সিদ্ধান্ত যারা নেন তারা ঝুঁকি নিতে চান না। বিনিয়োগকারীদের প্রায় সবাই যখন গণমাধ্যমের বাইরের মানুষ, তারাও বলে দেন অমুক পত্রিকার মত একটা পত্রিকা করতে হবে। এই অমুক পত্রিকার গণ্ডির বাইরে তারা যেতে চান না। আবার যারা পত্রিকাটি সন্তানের মত করে গড়ে তুলবেন তারাও লগ্নিকারকের সিদ্ধান্তের বাইরে যান না বা যেতে চান না দুর্মূল্যের বাজারে বেকার হওয়ার ভয়ে। এই চক্রে নতুনত্বের দেখা পাওয়া যায় না।
তবে এতো মন্দা বাজারেও ‘আর্ট নিউজ বিডি ডট কম’ অথবা ‘আর্ট নিউজ ডট কম ডট বিডি’-এর কথা আলাদাভাবে বলতেই হবে। তাদের সংবাদে খানিকটা হলেও নতুনত্বের ছোঁয়া আছে। তবে সব সংবাদে না। গৎবাঁধা ভাষার মিশেল সেখানেও আছে। প্রতিদিন কয়েকটি সংবাদ উপস্থাপনায় বা ভাষায় নতুনের ছোঁয়া থাকে। বাকিগুলো সেই অন্যদের মতই। হতে পারে পাঠকের রুচির পরিবর্তনের জন্য এই প্রয়াস। পাঠক হঠাৎ করে পাওয়া পরিবর্তনটা গ্রহণ নাও করতে পারেন। তাই একটু একটু করে নতুনে অভ্যস্ত করানোর চেষ্টা। একটা সময় হয়তো সব সংবাদের উপস্থাপনাই হবে নতুন মোড়কে, নতুন ঢংয়ে।
আর্ট নিউজ নতুন প্রতিষ্ঠান হয়েও এই পরিবর্তনের সাহসটা কোথায় পাচ্ছে? ইনফর্মাল ভাষার ফর্মাল উপস্থাপন। একই সাথে শিরোনামে নতুনত্ব। ধারণা করা যায়, একক লগ্নীকারক না থাকায় আর্ট নিউজ এই দুঃসাহস দেখাতে পারছে। প্রতিষ্ঠানটি সামাজিক মালিকানার পথে হাঁটার কারণে একক লগ্নীকারকের মন জোগানোর দায় নেই। বরং একটি পেশাদার বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ছোট ছোট পুঁজির সমাবেশ ঘটানো এবং গণমাধ্যমকর্মীদেরই মালিকানার তত্ত্বটি এই খাতে নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি করবে।
সামাজিক মালিকানার এই পথটি যদি প্রতিষ্ঠানটি মসৃণ করতে পারে, বড় পুঁজির ধাক্কা সামলাতে পারে তবে বাংলাদেশের গণমাধ্যম জগতে আরেকটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন খুব দূরে নয় বলে ভাবা যেতেই পারে। নিজস্ব মালিকানায় যখন সংবাদকর্মীরা কাজ করবেন তখন এর ভাষা, সংবাদ উপস্থাপনার ঢং… সব কিছুতেই আরও পরীক্ষা নিরীক্ষা করা তাদের জন্য সহজ হবে। একই সাথে লগ্নীকারকের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে চাপ সামলাতে না হলে পেশাদারিত্বের মুন্সিয়ানা দেখানোও সহজ হবে। এখন যারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ইচ্ছা করলেও শব্দ নিয়ে, নিউজ ট্রিটমেন্ট নিয়ে খেলা করতে পারছেন না, নিরীক্ষামূলক কিছু করতে পারছেন না… তাদের জন্য একটি বড় প্ল্যাটফর্ম হতে পারে এটি।
লেখক পরিচিতি: কাজী তামান্না; গণমাধ্যমকর্মী ও গবেষক















Leave a Reply