ইক্যুইটি

শারমিন আফরোজ বন্যা

শারমিন আফরোজ বন্যা: নুপুর তার ডান হাতটাও এবার ছেড়ে দিয়ে আরো ডান দিকে চেপে গিয়ে সিটে বসে থাকা মাঝবয়েসী মহিলার গায়ের সাথে চেপে দাঁড়ালো। সে টের পাচ্ছে তার ডান উরু বেয়ে চিকন স্রোতটা নেমে আসছে। আজ ২৫ তারিখ। সকালেই দু’পিস স্যানিটারি ন্যাপকিন ফেলেছে সে স্কুল ব্যাগে।

তিনদিন আগেই প্রস্তুত থাকে সে। কমবেশি সব মেয়ে বা মহিলাই প্রতিমাসে এইরকম একটা অনিশ্চিত মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করে। তবুও শতকরা একশজনই জীবনে কোন না কোন সময় অপ্রস্তুত অবস্থায় পরে। গতমাসে ২৮ তারিখ রাতে ব্লিডিং শুরু হয়েছিল। সে হিসাবে আজ থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখা। সাধারণত এক বা দু দিন আগেই তলপেটের চিনচিনে ব্যথাটা শুরু হয় অথবা পা দুটো ব্যথায় ভেঙে আসতে চায়। তখন সাধারণত, এক/দুদিন আগেই প্যাড পরেই বাইরে বের হয় নুপুর। আজ কিন্তু তেমন কোন বোধ ছিল না। না শারিরিক, না মানসিক। সকাল থেকে মনটাও ফুরফুরেই ছিল। খুব মজা করে একমগ চায়ের সাথে একটা পরাটা আলু ভাজি দিয়ে খেয়েছে। এমন কি ডিম খাওয়া নিয়েও মা কোন জেদাজেদি করেননি।

খেয়েদেয়ে বাবার সাথে বেরিয়েছিল আজ। বাস স্টপেজ বাসা থেকে হাঁটা পথ। বাবা একটা মহিলা সিটে তাকে বসিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর নিজে পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন। এরমধ্যেই হুড়মুড় করে কিছু স্কুলগামী ছেলেমেয়ে, তাদের অভিভাবক আর অফিসগামী লোক উঠে বাসটা নিমিষেই ভরে ফেলল। মেয়ে বা মহিলাদের জায়গা ছেড়ে দিতে বাবা দু’কদম পিছনে গেছেন।

ভিড়ের মধ্যে এই খালা উঠেছিলেন। বয়স্ক, ভারি। সিট পাননি। তার পাশেই সিট ধরে দাঁড়িয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছিলেন। সে তখনও কোন অস্বস্তি বোধ করেনি। বাড়ির শিক্ষা অনুযায়ী লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াতে একবিন্দুও দ্বিধা করেনি। বলেছিল, ‘খালা, আপনি বসুনতো। সামনেই আমার স্কুল। আমিতো পরের স্টপেজে নেমেই যাব।’ নিরাপত্তা হিসাবে সামনে পিছনে রয়েছেন আরও দু/চার জন মহিলা অভিভাবক। কিন্তু দাঁড়ানোর পরই বিপত্তিটা ঘটলো।

খুব বেশি দিন তো নয়, বছর খানেক। তারমধ্যে নিয়ম অনিয়ম মিলে সম্ভবত সাত কি আট বার। এতদিনে এটা সে বুঝে গেছে যে এর বেগটা অদ্ভুত। বড় বা ছোট বাথরুম পেলে একটা সার্টেন সময় পর্যন্ত নিজের মধ্যে ধরে রাখা যায়। কিন্তু মিন্সট্রেশনের ব্যাপারটা কেমন বেপরোয়া। বেরিয়ে আসবার সময় হয়ে গেলে একে তুমি কিছুতেই আটকাতে পারবে না। এমনও হয়েছে, মাগরিবের আজানের আর মাত্র ৫/৭ মিনিট বাকি। মায়ের সাথে দাঁড়িয়ে ইফতার সার্ভ করছে, বা হয়তো সার্ভ করাও শেষ। টের পেয়েছে তলপেটের ভেতর ছোট একটা মাছের মতো রক্তপিণ্ড নড়ে চড়ে বেরিয়ে আসছে। আর ৫টা মিনিটও চেপে রাখার উপায় নাই। এসব সময়গুলোতে নুপুরের উড়ু বেয়ে নামা রক্তের সাথে চোখ ফেটেও রক্ত নামে। শারিরিক কষ্টের গল্পগুলোতো দীর্ঘ। মানসিক কষ্টটাও তার চেয়ে কোন অংশে কম নয়। এই সারাদিন শেষে রোজাটা ভেঙে গেল!!

এইতো কিছুদিন আগে, খুব ধবধবে সাদা একটা গাউন পরে, পিঠময় কালো লম্বা চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে, কানে একটা নিজের বারান্দায় ফোঁটা টকটকে পাঁচ পাপড়ির লাল জবা গুজে দিয়ে একদমই না সেজে একটা বিয়ে বাড়িতে গিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করে দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মা এসে পাশে দাঁড়ালেন। ফিসফিস করে বল্লেন, ‘একটু বাথরুমে চলো।’ সারা গা কেঁপে উঠেছিল। কিছু কি অন্যায় হলো তার চলাফেরায়। ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি রক্তের দাগ লেগে গেছে তার গাউনে।

মায়ের ব্যাগে প্যাড ছিল। মায়েরা এমনই হয়, এক আশ্চর্য নির্ভরতা। কিন্তু সেই দাগ ধুয়ে, গাউন শুকিয়ে, সে যখন ফিরেছিল- সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। পৃথিবীর কোন পুরুষকে কোনদিন এই বিব্রতকর পরিস্হিতির শিকার হতে হয় না। তাই তারপক্ষে কোনদিনও সে কোন সুবিধাজনক অবস্থায় জন্মগত ভাবেই এগিয়ে আছে, বুঝবে না। সম্ভব নয়।

তলপেট ছিড়ে যাওয়া ব্যথার অনুভূতি। দুটো পা ব্যথায় মুচড়ে আসা। প্রচন্ড মাথা ব্যথা। মুড সুইং… এসব তো অনেক দূর। শুধু এই কখন হবে, যে কোন সময় হতে পারে, যদি হয় তাহলে কিভাবে মোকাবেলা করবো… স্বয়ং একজন মহিলা প্রেসিডেন্টকেও সেটা ভাবতে হয়। একবার দুবার নয়, মেনোপজ না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত।

বাসের প্রিভিল্যাজড সিটটাও মেয়েদের দিতে গিয়ে প্রতিদিন কোন না কোন পুরুষ উড়ো শব্দ ছুড়ে দেয়, ‘মুখে মুখেই যত সমান অধিকারের কথা। বাসের সিটের বেলায় ঠিক নিজের অধিকার।’ তর্ক করতে ইচ্ছা হয় ওর, কিন্তু ঘেন্না লাগে। তার খুব অবাক লাগে, এদের সবার মা আছে, কারও কারও বউ আছে, কারও কারও মেয়ে। কমবেশি সবাই বিষয়টা জানে। কিন্তু বিষয়টার ভেতরে কেউ যায় না। মাঝে মাঝে হিংসা করতেও দেখেছে সে। ‘কি মজা, তোমার রোজা করতে হবে না। কদিন তো মজাই হল, নামাজ পড়তে হল না।’

তার মায়ের ধরণটা ভিন্ন। পাগলাটেও বলা যায়। খাওয়ার টেবিলে বসেই বাবাকে বলবে, ‘নুপুরের প্যাড শেষ হয়ে গেছে। কাল অফিস থেকে ফেরার পথে নিয়ে এসো।’ ঠিক যেন আপেল ফুরিয়েছে, নিয়ে এসো। বাকি ভাইবোনদের বলবে, ‘এই দু’তিন দিন আপুনি কোন কাজ করতে পারবে না। স্কুলের ব্যাগ গোছানো, টিফিন, পানি ভরে দেবে।’ মায়ের নিজের শরীর খারাপের সময়ও বাসায় একই নিয়ম। মা তখন সকালে-বিকালে টেবিলে বসা কাজগুলো করবেন। বাবা রান্না ঘরের আর দৌঁড়ানোর কাজগুলো।

খোলামেলা আলোচনার বিষয়টাও মা এমন একটা সীমায় আটকে দিতেন, ‘তুমি কি তোমার অন্তর্বাস নিয়ে সববন্ধুর সাথে আলাপ করো? করো নাতো! বাছাই করা বন্ধু থাকে। মেয়ে বন্ধু হয়েও অনেকে অতোটা কাছের নয়। এটা তার চেয়েও সেনসেটিভ। এটা ফেসবুক পোস্ট দেয়ার বিষয় নয়।’ থেমে নিয়ে বলতেন, ‘আবার এটাই সিভিয়ার একটা ডিজিজের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদি তোমার প্যাড দরকার হয়, ওভার ফ্লোর কারণে মেডিসিন দরকার হয়, প্রি-ডিপ্রেশনের জন্য দুদিন ছুটির দরকার হয়, ফ্লো চলাকালীন বেডরেস্ট দরকার হয়, একবিন্দুও লজ্জিত হবে না, একফোঁটাও অপরাধ বোধে ভুগবে না, সাহসের সাথে শালীনতা বজায় রেখে স্পষ্ট উচ্চারণ চাই তখন। আপাতত প্রয়োজন ‘ভয়েজ রেইজ করা।’ মানুষের মানসিকতায় পরিবর্তন, ‘সেটা কেবল একটু সময়ের ব্যাপার’। মনে রেখো, এর কোনটাই তুমি কোন বাড়তি সুবিধা নিচ্ছ না। সৃষ্টিকে টিকিয়ে রাখতে এর বিকল্প নাই। তাই এই ক্ষেত্রে equality র কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে, তখন equity এর প্রশ্ন। একজন ইমপ্লয়ার নারীকে বেতন তো সমান দেবেই, উল্টো মাসে তিন/চার দিন স্পেশাল ফেবারও দেবে হাসি মুখে। অন্য পুরুষ কলিগরাও সেটা মেনে নেবে স্বাভাবিক মানবিকতায়। কোন প্রশ্ন হবে না এসব নিয়ে। শুধু মেয়েদের মনে রাখতে হবে, এটা কোন দয়া নয়। এর নামই ন্যায্যতা। সমতার তর্ক হবে সমান সমান অবস্থানে। অসম অবস্থানে সমতা চাই না, চাই ন্যায্যতা। সৃষ্টিগত ভাবে যে দুর্বলতা, সেটা পুষিয়ে দেয়ার অসংখ্য সম্ভাবনা নারীর মধ্যেও রয়েছে, প্রয়োজন শুধু যার যার টুকু খুঁজে বের করা, কাজে লাগানো, প্রমান করা। যে ন্যায্যতা টুকু তোমায় দেয়া হলো, সেটুকু আবার কড়ায় গন্ডায় মেধা দিয়ে পুষিয়ে দেয়ার আন্তরিকতা থাকা চাই নিজের ভিতরে।’

মায়ের সব কথা নুপুর সবসময় বোঝে না। কিন্তু মনের গভীরে তার একটা ভিত তৈরি হয়, তার উপর পলি জমে নিজের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার। জানে, বিচার বুদ্ধি তৈরি হবে সেই মাটিতেই। দোঁআশ মাটি, তাতে পুষ্ট বীজের বপন। বৃক্ষ ঠিক তারই পরিচয় বহন করবে। বাসটা থামতেই হুড়মুড় করে স্কুলের বাচ্চাগুলো সব নেমে গেল। নুপুর বাবার জন্য একটু থেমে আছে। এ মুহূর্তে তার একটা আপন হাত দরকার। বাবা কাছে আসতেই সে নিচু স্বরে বল্লো, ‘বাবা, আমার ব্যাগটা নাও। নেমে একটা রিকশা নিও, এই এখন আমার শরীর খারাপ হয়ে গেল। হেঁটে রাস্তা পার হতে পারব না।’

দ্বিধাহীন ভাবে বাবার শক্ত করে ধরে থাকা হাতে হাত রেখে বাসের দরজার দিকে আগায় নুপুর। এ অনাকাঙ্খিত যুদ্ধ তার একার নয়। প্রতিটা মেয়েকে তার জীবনে প্রতিনিয়ত লড়তে হয়। পেছনে সমান অধিকারের দাবি তোলা যুদ্ধক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকা পুরুষেরা বাসের মহিলা সিট নিয়ে তর্কে মেতে ওঠে, ন্যায্যতা আজ লজ্জিত হয়। কিন্তু নুপুর বিশ্বাস করে বদলে যাওয়া দিন বেশি দূরে নয়!!

গল্প/বন্যা/রমু

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *