ফিচার । রহমান মুস্তাফিজ
অফিস টাইম। ব্যস্ত সড়কে বাসে ভিড়ে ঠেলে ওঠার চেষ্টা করেন একজন কর্মজীবী নারী। প্রতিদিনই কয়েক মিনিটের এই যাত্রা তার অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভিড়ের মধ্যে অস্বস্তি, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ এবং প্রতিবাদ করলে আরও বিব্রত হওয়ার আশঙ্কা। তাই অনেক নারী প্রয়োজনীয় কাজেও বের হওয়ার আগে ভাবেন, কখন বের হবেন, কোন পথে যাবেন এবং কীভাবে নিরাপদে ফিরবেন।
আরেকটি ঘটনা স্কুলগামী শিশুকে ঘিরে। স্কুল ছুটির পর অভিভাবকের সঙ্গে দেখা না হওয়া পর্যন্ত সে রাস্তার পাশে অপেক্ষা করছিল। চারপাশে যানবাহন, ফুটপাতে দোকান ও মানুষের ভিড়। শিশুটির জন্য একটি নিরাপদ রাস্তা শুধু স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয় নয়; এটি তার শিক্ষা, চলাচল ও নিরাপদে বেড়ে ওঠার অধিকারের সঙ্গে যুক্ত।
ফজিলাতুর রহমানের বয়স ৮৩ বছর। ২০১১ সালে ফজরের নামাজ শেষে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন। সড়কের পাশ দিয়ে চলা ফজিলাতুর রহমানকে ধাক্কা দিয়ে চলে যায় একটি টেম্পো। ১৫ বছর ধরে তিনি শয্যাশায়ী।
দৃশ্য তিনটি আলাদা হলেও প্রশ্নটি একই, শহরের পথ কি সত্যিই সবার জন্য সমানভাবে নিরাপদ?
ফজিলাতুর রহমান বললেন, ভোরের ওই সময়টায় রাজধানীর শাজাহানপুরের ফাঁকা সড়কে টেম্পোটি বেপরোয়াভাবে চলছিল। অপরিণত বয়সের চালকের গতিময়তা তার জীবনের কর্মক্ষমতা ও ১৫টি বছর কেড়ে নিয়েছে।
অফিসগামী নারী (নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক) জানালেন, সপ্তাহে অন্তত তিনদিন তিনি বাসে ওঠা বা নামার সময়, এমনকি দাঁড়িয়ে থাকার সময় শরীরে অবাঞ্চিত স্পর্শ অনুভব করেন। তিনি বললেন, এটি নানান বয়েসী মানুষেরা করে। তরুণদের চেয়ে বরং চল্লিশোর্ধ্ব মানুষের মধ্যে বরং নারীকে হেনস্থা করার প্রবলতা বেশি।
Dhaka Transport Coordination Authority (DTCA) প্রকাশিত এক জরিপ প্রতিবেদনে জানানো হয়, গণপরিবহনে ৯৪ শতাংশ নারী কোনো না কোনো ধরনের হেনস্থার শিকার হয়েছেন, যা নারীর নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ চলাচলের অধিকার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
অন্যদিকে, ২০২২ সালে আঁচল ফাউন্ডেশনের জরিপে কিশোরী ও তরুণীদের ৬৩ দশমিক ৪ শতাংশ গণপরিবহনে বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছিল। অর্থাৎ, ৪ বছরে গণপরিবহনে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ।
নারীর নিরাপদ চলাচলের প্রশ্নকে অনেক সময় ব্যক্তিগত সতর্কতার বিষয় হিসেবে দেখা হয়। কখন বের হবেন, কী পরবেন বা একা যাবেন কি না… এসব প্রশ্ন সামনে আসে। অথচ প্রশ্ন হওয়া উচিত গণপরিবহনে নারী কতটা নিরাপদ সেই প্রসঙ্গে অনেক সময় নিরাপত্তার প্রশ্নে নারীদের পোশাক, চলাফেরার সময় কিংবা একা বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। চালক, সহকারী ও যাত্রীদের আচরণ কতটা দায়িত্বশীল সেই প্রসঙ্গ চাপা পড়ে যায়।
একইভাবে শিশুর নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও শুধু অভিভাবকের সতর্কতার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। নিরাপদ ফুটপাত, রাস্তা পারাপারের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আলো, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি সহায়তার সুযোগ একটি শিশুবান্ধব শহরের অপরিহার্য অংশ।
হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী একজন মানুষ যদি ফুটপাত বা বাসে সহজে প্রবেশ করতে না পারেন, তবে শহরের অবকাঠামোতে তার অংশগ্রহণের অধিকারকে সীমিত করছে। একজন প্রবীণ যাত্রীর জন্য বাসে ওঠার অসুবিধাও একইভাবে নাগরিক মর্যাদার প্রশ্ন।
একটি ন্যায়ভিত্তিক শহর এমন হবে, যেখানে একজন নারী নিরাপদে কর্মস্থলে যেতে পারবেন, একটি শিশু নিরাপদে স্কুলে পৌঁছাবে, একজন প্রবীণ বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বাধাহীনভাবে গণপরিবহন ব্যবহার করতে পারবেন। কারণ নিরাপদে চলাচল কোনো বিশেষ সুবিধা নয়—এটি মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও সমান অংশগ্রহণের ভিত্তি।
জেন্ডার-সংবেদনশীল গণমাধ্যমচর্চার এখানেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গণমাধ্যম যখন প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতাকে সম্মানের সঙ্গে দৃশ্যমান করে এবং একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন একটি প্রতিবেদন কেবল ঘটনার বর্ণনা হয়ে থাকে না; তা পরিবর্তনের দাবি তৈরি করতে পারে। গণমাধ্যমই প্রতিষ্ঠা করতে পারে এই শহরে সবারই সমান অধিকার আছে।
নারী/কিউটিটি/এএমএম














