রহমান মুস্তাফিজ: ২০১৪ সালের ১৫ জুন। সরদার ফজলুল করিম স্যার সেদিন যাত্রা করেছিলেন অনন্তলোকে। স্যারের মৃত্যু সংবাদ যেন বুকে বিঁধেছিল। স্যারকে নিয়ে টুকরো টুকরো কিছু স্মৃতি:
১. ১৯৮৯ সাল। সরদার স্যারের মগবাজারের বাসায় গেলাম। যাওয়ার পথে আমার অরিয়েণ্ট ঘড়িটা হারালাম তাড়াহুড়ো করতে যেয়ে, কারণ স্যার সময় মেপে চলতে পছন্দ করতেন। এ অনুষ্ঠানকে ঘিরেই স্যারের কল্যাণে সান্নিধ্য পেয়েছিলাম বাংলা সাহিত্যের আরেক জ্যোতির্ময় মানুষ “অধ্যাপক কবীর চৌধুরী”র।
২. ১৯৮৯ সাল। স্যার দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় উপসম্পাদকীয় লিখলেন আমাদের তিনজনকে নিয়ে। উপাধি দিলেন- “সাহিত্যের প্রত্নতাত্ত্বিক”।
৩. ১৯৯৬ সালে স্যারকে সোমেন চন্দ পদক দেয়া হলো। অনুষ্ঠান বিকেল ৪টায়। এর কিছুদিন আগে স্যারের পা ভাঙলো। তাই স্যার সময় মতো আসতে পারলেন না। কিন্তু স্যারের সময়ানুবর্তিতাকে সম্মান জানাতে অনুষ্ঠান ঠিক ৪টাতেই শুরু করলাম। তখন মিলনায়তনে উপস্থিত সভার সভাপতি হেনা দাস (প্রয়াত), আমি ও মাইকম্যান। স্যার এসে খুব খুশী হয়েছিলেন সময় মতো অনুষ্ঠান শুরু হওয়ায়।
সোমেন পদকের টাকাটা চেক-এ দেয়া হয়েছিল। ভুল করে সম্মানির টাকা অন্য একটা অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছিল। স্যার কিছু বলেননি, কিন্তু দুঃখ পেয়েছিলেন।
৪. প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ (১৯৩৯ সালে প্রতিষ্ঠিত, ১৯৪৭-এর পরেও কিছুদিন এর কার্যক্রম ছিল) নিয়ে কথা বলতে স্যার খুব পছন্দ করতেন। গল্প করতে খুব পছন্দ করতেন। রমেন মিত্র (কমরেড ইলা মিত্রের স্বামী, নাচোলের জমিদার বংশের উত্তরাধিকারী), রণেশ দাশগুপ্ত, সত্যেন সেন-দের কথা বলতেন খুব আবেগ নিয়ে।
৫. এমন অসংখ্য স্মৃতি আজ মনে পরে। গতকাল প্রথম স্যারের অসুস্থতার কথা শুনে হাসপাতালে ক্যামেরা পাঠিয়েছিলাম। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বোঝেনি তারা কী থেকে বাঙালি জাতিকে বঞ্চিত করলো, তাদের নিয়মের বেড়াজালে আটকে শেষ দিনটির কোন প্রামাণ্য দলিল রাখা গেল না। এ ক্ষত বাকি জীবন বয়ে বেড়াতে হবে।
৬. স্যারকে তখন অবসরে যাওয়ার কথা কি ভাবে বলবেন ভেবে পাচ্ছিলো না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। অথচ, কাগজপত্রে তিনি তখন অবসরে। সময় মতো ক্লাসে হাজির হন। দর্শন বিভাগের জাদরেল সব অধ্যাপক ক্লাস নিতে এসে দরজায় দাড়িয়ে থাকেন। কথা বলার সাহস নেই তাদের। কারণ, তিনি অধ্যাপক, কিংবা সহযোগী অধ্যাপক যা-ই হোন না কেন, তিনি নিজে এবং তার অনেক শিক্ষকই সরদার স্যারের ছাত্র। শেষ পর্যন্ত স্যার কে অন্য একটা দায়িত্ব দেয়া হলো। বসতে হয় রেজিস্টার বিল্ডিং-এ। এমন এক সময়ে স্যারের কাছে গেলাম পঞ্চাশের দশকের কিছু তথ্য জানার জন্যে। আমাকে পেয়েই স্যার সব রাগ আমার ওপর ঝাড়লেন। বললেন, তোমরা সাংবাদিকরা কি করো? এই যে আমার মতো একজন মানুষকে অকারণে বসিয়ে বেতন দেয়া হচ্ছে, এতে রাষ্ট্রের কতো টাকা ক্ষতি হচ্ছে জানো? মাথা নাড়লাম দু’দিকে। দেখলাম, স্যার একটা কাগজে হিসেব করে বের করেছেন সরকারের কতো টাকা ক্ষতি হয়েছে; তার সঙ্গে যোগ করেছেন, শিক্ষার্থীরা কি ভাবে বঞ্চিত হচ্ছে তার ক্লাস না পেয়ে। শিক্ষার্থীরাও এতে আর্থিক ভাবে যে ক্ষতির শিকার হচ্ছেন তারও হিসেব আছে তাতে।
এমন শিক্ষক আর কয়জন আছেন আমাদের এ দেশে?
লেখক পরিচিতি: রহমান মুস্তাফিজ; সিনিয়র সাংবাদিক, লেখক ও নির্মাতা















Leave a Reply