শারমিন আফরোজ বন্যা: এমন কথা শোনার জন্য সে মোটেই প্রস্তুত ছিল না।
প্রায় বিশ বছর পর দেখা হতেই আসাদ যখন এমন একটা কথা বললো, অনামিকার ভেতরটা কেমন চমকে গেল!
আসাদ মোটেই ফেলনা ছেলে নয়। বিশ বছর আগে, তাদের সহপাঠীদের মধ্যে সে বরং খানিকটা বেশিই গ্রহনযোগ্য ছিল। তাহলে অনামিকার কেন কিছুই মনে পরছে না। হ্যাঁ, তারা এক ক্লাসে পড়তো। আর পাঁচজনের মতোই তাদের মধ্যেও স্বাভাবিক বন্ধুত্ব ছিল। কই, কোন বিশেষ স্মৃতি, বিশেষ ঘটনা তার তো মনে পরছে না!
আসাদ আবার বললো, ‘তোমাকে খুব মিস করতাম। খুব বলতে ইচ্ছা হতো, তোমাকে ভালো লাগে আমার। কিন্তু মনে হতো তুমি হয়ত এভাবে ভাবছ না।’
অনামিকার অস্থির অস্থির লাগে। একছুটে সেই পুরনো সময়ে ফিরে যেতে ইচ্ছা করে। আসাদের মুখে এই কথাগুলো, সেই সময়ে বসে শুনতে ইচ্ছা করে। কিন্তু আসাদকে সে আর বাড়তে না দিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টে দিতে প্রশ্ন করে, ‘তোমার ছেলেমেয়ে কজন, আসাদ?’
আসাদ আনমনা হয়ে উত্তর দেয়, ‘একজন। তোমার?’
অনামিকা হেসে বলে, ‘চিমটি।’
আসাদ গাঢ় স্বরে বলে, ‘হাসিটা এখনো কিশোরীর মতোই রয়েছে তোমার। বুকের ভেতর মোচড় দেওয়া। একটুও বদলায় নি!’
অনামিকার ভেতরে কি যেন ভাংতে চায়! নদীর পার ভাঙার মতো, যেন ঠেকান দেওয়ার কোন পথ নেই।
নিজেকে সামলাতে অনামিকা বলে, ‘ঢং করো নাতো! আসো, ঐ দিকটাতে যাই।’
হাতের ইশারায় আরো কয়েকজন বন্ধু বসে আছে এমন একটা কর্নার দেখায় অনামিকা এবং নিজের শাড়ির আঁচল গোছাতে গোছাতে উঠে দাঁড়ায়। হাত ভর্তি চুড়িরা রিনরিন করে বেজে ওঠে। গা থেকে ছড়িয়ে যায় মিষ্টি সুবাস।
আসাদ ঘোরলাগা চোখে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বসে থেকেই বাঁ হাতটা বাড়িয়ে চুড়িগুলো ছুয়ে দেয়। বেদনার ছাপ সারা মুখে ছড়ানো, অনামিকার চোখে চোখ রাখতে চায় সে। অনামিকার গা ছমছম করে, চোখ সরিয়ে রাখে অন্যত্র, মনের বিরুদ্ধে।
আসাদ হাল ছাড়ে না। আজ যেন সে বেপরোয়া। একটা চুড়িতে নাড়া দিয়ে, অন্যগুলোতে সুর বাজায়। মুখে বলে, ‘সেই মন কেড়ে নেওয়া ঝঙ্কার! এখনো আগের মতোই কাচের চুড়িই পর?’
অনামিকার অস্বস্তি হয়! আবার মিথ্যে বলা হবে যদি এই স্তুতি ভালো লাগছে না বলে। তবু সে বোঝে, যা হচ্ছে তা স্বাভাবিক নয়! একদমই নয়!
দুই.
অফিস যাওয়ার পথে গাড়িতে বসে মোবাইল ডাটা অন করে অনামিকা। সাথে সাথেই নোটিফিকেশনের তাড়ায় মোবাইলটা কোঁকাতে শুরু করে দেয়।
সে অবাক হয়ে দেখে মেসেঞ্জারে দশের অধিক মেসেজ এসে বসে আছে। মেসেঞ্জারে কেউ তাকে তো খোঁজে না সচরাচর! ভ্রু কুচকে ঢুকে পরে হাতছানির দুনিয়ায়!
তার ভেতরটা কেঁপে ওঠে! গোটা কয়েক ছবি! তার! একক! গতকালের গেট-টুগেদারের! আসাদ পাঠিয়েছে! প্রতিটার সাথে দু’চার লাইন কবিতা! একটা মোবাইল নম্বর! এবং তার নম্বরটা চেয়েছে!
অনামিকার সেভাবে কোন অতীত নাই। সব ছেলে বন্ধুর সাথেই ভালো সম্পর্ক ছিল। কাউকে কাউকে একটু বেশি ভালো লাগতো। কিন্তু বিশেষ সম্পর্ক গড়ে ওঠার ফুরসত মেলেনি।
বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েছে প্রায় বিশ বছর। কার্জন হল, চারুকলার বকুলতলা, কলাভবনের আমতলা, পাবলিক লাইব্রেরীর কেন্টিনে আড্ডা দিয়েছে প্রচুর। কখনো একক কারো সাথে, কখনো দলবেধে। দ্বিতীয় বর্ষেই বাবার পছন্দে বিয়ে। তারপর সংসার, পড়াশোনা, চাকরি, সন্তান- সন্ততি!
সোশ্যাল মিডিয়ার গ্রুপ-গ্রুপ খেলার জীবনের আগে, তার ছিমছাম জীবনটাকে নিয়ে সে একটু ডুব দিয়েই ছিল।
গতকালের গেটটুগেদারে যাওয়াটা ছিল নিছক কৌতূহল! কতোদিন সবাইকে দেখে না! সব প্রিয় বন্ধুদের গায়ের গন্ধ নিতে গিয়েছিল সে। ভেবেছিল, এই একবারই, তারপর আবার নিজের জগতে ঢুকে পরবে।
কিন্তু সারাটা দিন ধরে আসাদ কাল নদীর ঢেউয়ের মতো বারবার তার হৃদয়ে আছড়ে পরেছে।
অচেনা, নতুন কেউ যদি আজ হঠাৎ এসে তার হাত দুটো ধরতে চায়, সে নিশ্চিত সরিয়ে নেবে হাত। সেটুকু দৃঢ়তা তার ব্যক্তিত্বে আছে। কিন্তু আসাদ! সে তো তার লম্বা পাঁচ/ছ’টা বছরের যৌবনকালের চৌকষ সহপাঠী। সে আজ হঠাৎ যখন গাঢ় চোখে তাকায়, পুরনো স্মৃতিকে সামনে টেনে এনে বলে, ‘একটা মুহূর্তও ভুলি নি! তোমার চুড়ির রিনিঝিনি! হুট ফেলা রিকশায় পাশাপাশি! কৃষ্ণচুড়ার ঝরে পরা পাপড়ি কুড়ানো! …’।
ক্ষুদে বার্তায় পাঠানো ছোট ছোট কবিতাগুলো মনের মধ্যে বুদবুদ হয়ে ভাসে!
বুকের ভেতর দুর্বল বেলে মাটির তীর ভাঙে, ঢেউয়ের ধাক্কায়।
তিন.
বেল বাজাতে ঘরের কাজের সাহায্যকারী মেয়েটা দরজা খুলে দেয়। কেউ বাড়ি ফেরেনি। স্কুলের পর, ছেলের প্রায় রোজ তিনই রাত আটটা নটা অবধি কোচিং ক্লাস। তার স্বামীর ফিরতে আজও রাত হবে। মধ্যবয়সের চাকরির রেসপনসেবলিটি!
এই মধ্য বয়সে, খুব স্বাভাবিক কারণেই, সে তাই একটু একা। সেই সুযোগে ঘুনপোঁকা বাসা বাঁধতে চায়। মোবাইলটা টানে। মেসেঞ্জারে আরো ছোট ছোট বার্তা। আজ সারাটা দিন, টুন টুন করে বেজেছে নোটিফিকেশন টোনটা, খানিক বাদে বাদেই। বেহায়া মন, বার্তা দেখেছে, উত্তর দিয়েছে, প্রতিউত্তরে ভালোবাসার ইমোজি! তারপর প্রিয় আবৃত্তির লিঙ্ক! তারপর আবার তার একটা ছবি! এবং সে টের পায়, আসাদ তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চায়!
কিন্তু কেন? কি নাম হবে এই সম্পর্কের? বন্ধুত্ব? আসাদ যে ভালোবাসার কথা সময়ে বলে নি, আজ এতো বছর পর, যখন নিজেকে নিয়ে একটা সুন্দর স্বাভাবিক জীবনে সে খুব ভালো আছে, কেন সেখানে ঢেউ তুলতে চায় সে? তার মনই বা বিষন্ন হয়ে উঠছে কেন? কেন একলা উদাস মন ভাবে, ‘কেন, কেন আসাদ তখন বললা না?’
ভালোবাসার জন্যে, ভেতরে বাইরে দুর্বল একজন মানুষ সে। ঠিক তার মনের মতো একজন মানুষ, কেন আজ এই অবেলায় হাত ধরতে চায়?
তার স্বামীকে সে ভালোবাসে। সে মানুষ হিসাবে ভালো, দায়িত্ববান। সময়ে সময়ে আবেগপ্রবণ ও। কিন্তু তবু, তাদের বিয়েটা তো ভালোবাসার নয়। হিসাব নিকেশ মিলে গিয়ে বিয়ে। আবার এওতো সত্য, পরস্পরের অনেক অমিলকে মেনে নিয়ে ভালোবেসেই ভালো আছে তারা। এখন কেন ঝড় তোলে কেউ, উড়ে এসে?!
তার খুব রাগ হয় আসাদের ওপর। তাকে অবিবেচকও মনে হয়! যে আবেগ সময়ে প্রকাশ করতে পারেনি, তা নিয়ে এই অবেলায় এ কোন আদিখ্যেতা!
তার মন বলে, সুযোগ আছে বলেই সব আবেগ প্রকাশের জন্য নয়। প্রতি মুহুর্তের আবেগকে প্রাধান্য দেওয়া, বা পরিণতিহীন সম্পর্ককে তৈরি হতে দেওয়া অপরাধ বৈ কিছু নয়। সবার সংযম ক্ষমতা সমান নয়। নিজেকে ঠিক সময়ে সামলে নিতে না পারলে, অঘটন অবশ্যম্ভাবী।
আজকাল সমাজে এ এক অদ্ভুত বদল সে টের পায়। একটা নতুন রিলেশনে জড়ানো এবং পুরনোটাকে তুচ্ছ করে নতুনটাকেই অ্যাক্সেপ্ট করে নেওয়াটাতেই সাধুবাদ। এর প্রভাব কোথায় কোথায় পরছে তা নিয়ে কেউ ভাবে না।
এই সহজ মেলামেশার যুগে যেমন প্রচুর নির্মল সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে, তেমনই যেন পরকীয়া হয়ে উঠেছে দৈনন্দিন অভ্যাসের মতো। কেউ কেউ নিজেকে একটা সীমার মধ্যে আটকে রেখে সংসারের পাশাপাশি আরেকটা বাইরের জগত নিয়ে ব্যালেন্স করে চলতে জানে। শক্ত আত্মবিশ্বাস বা সংযম। হ্যা, পরকীয়াতেও সংযম। কিন্তু সবার কন্ট্রোল পাওয়ার এক নয়। সবাই সমান বুদ্ধিমানও নয়, ভালো-মন্দের বিচার বোধ দুর্বল। আবেগপ্রবণ, নীতিহীন এই মানুষগুলো সম্পর্কের একটা পর্যায়ে পরকীয়াটাকেই আসল সম্পর্ক ভাবতে শুরু করে। কখনও কখনও ঘর ভাঙে, কখনোবা আরও করুণ। ভয়াবহ অপরাধের শিকার হয় নিজে বা নিজেই জড়িয়ে যায় অপরাধের সাথে।
ভালোবাসার বিষয়ে সে নিজেও আবেগপ্রবন। কিন্তু পাশাপাশি সে সম্পর্কের সততায়ও বিশ্বাসী। প্রতিটা সম্পর্কের দায়বদ্ধতা আছে বলেই সে মানে। এই যে পরিণত দাম্পত্য জীবন, হুট বলতেই সেখানে কাউকে ঢুকে পরতে দিতে নেই।
কিন্তু একালে, বিবেকের চেয়ে যেন মনের প্রাধান্যই ভয়াবহভাবে গুরুত্ববহ হয়ে উঠছে।
সে মোবাইলটা হাতে নেয়। আসাদকে ব্লক করবার আগে, বুঝিয়ে একটা মেসেজ লিখবে। নিজেকে আপাতত সোশ্যাল মিডিয়ায় ডি-অ্যাকটিভেট করবে কিছুদিনের জন্য!
চার.
অনামিকাকে আরেকটা প্রেমের কবিতার চার লাইন পাঠিয়ে দিয়ে, আসাদ বসেছিল বউয়ের পাশে। মিষ্টি একটা বউ তার। ভীষণ ভালোবাসে বউ তাকে। সেও। নিয়ম করে তারা ছাদে হাঁটে। ফুটপাতে ফুচকা খেতে যায়। বছরে দু’একবার নেপাল-থাইল্যান্ড। অসুখ করলে পরস্পরের শিয়রে রাত জাগা। জোৎস্না রাতে চাঁদের আলোয় রবীন্দ্রসঙ্গীত অথবা সেতার কিংবা কোন ভরাট কন্ঠের আবৃত্তি। আজও মৃদু আলোয় দুজন দুজনার গায়ে হেলান দিয়ে বসে, টিভিতে নেটফ্লিক্সে মুভি দেখছিল। এই সময় আবার টুন করে একটা মেসেজ। একহাতে বউ এর কপালে ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো এলোমেলো করতে করতে অন্যহাতে মেসেঞ্জারে ঢুকে যায় সে! ঠোটের কোনায় লেগে আছে একচিলতে চতুর হাসি।
ভাবে, অনামিকা টোপ গিলেছে!
নিজেকে যাচাই করার নেশা তাকে ছাড়ে না! প্রথম সুযোগেই সে একটা ঢিল ছোড়ে। নিস্তরঙ্গ নদীর জলে। ঝিরঝির বয়ে চলা নদীর শান্ত পানিকে ঢিল ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার এক অদ্ভুত নেশা। সে কেবল এটুকুই করে। এরচেয়ে বেশি দূর এগোয় না। কেবল কানের কাছে পৌঁছে দেওয়া ‘আজো তোমায় ভালোবাসি!’ ব্যাস, তাতেই কাজ হয়। সুখে থাকা, গুছিয়ে নেওয়া মানুষটার জীবনে এক নতুন না-পাওয়ার কষ্ট এসে ভর করে। হয় দুখী হয়ে বাঁচে বাকিটা জীবন, অথবা তৈরি হয় এক্স-প্রেমিক-বন্ধু বলে এক অদ্ভুত সম্পর্ক।
আজকাল এটা একটা নতুন ট্রেন্ড।
মনে তৃপ্তি নিয়ে সে মেসেঞ্জারের পাতায় চোখ রাখে এবং বিস্মিত হয়ে দেখে অনামিকা পিছলে যায়নি। সে বরং শক্ত মাটিতে দাঁড়িয়ে খুব ভদ্রভাবে একজন বিষধর মানুষের কাছ থেকে নিজেকে আলগোছে সরিয়ে নিল। আসাদের মুখের ভেতরটা তেঁতো তেঁতো লাগে।
নিজেকে সামলে নিতে তার একটু সময় লাগবে, নতুন শিকার না পাওয়া অবধি!
















Leave a Reply