জীবন যখন যেমন

শারমিন আফরোজ বন্যা

শারমিন আফরোজ বন্যা: পান্না নিজের পড়ার টেবিল থেকে শুনতে পেল ভাবি ঘুম থেকে উঠেই বিচ্ছিরিভাবে ছেলেমেয়ে দুটোকে বকছে। পান্নার নিজেরও আজকাল মেজাজটা কন্ট্রোলে থাকে না। সে তাই ইদানিং মেডিটেশন শুরু করেছে। মেডিটেশনে খুব একটা কাজ হচ্ছে, তাও নয়। পান্না মুলত স্বভাবগত ভাবেই ভীষণ কন্ট্রোল্ড একজন মানুষ। অন্যের ব্যবহার, পরিবেশ পরিস্থিতির প্রভাব তাকে সহজে তার চরিত্রের বাইরে নিতে পারে না। কিন্তু এই দীর্ঘ লকডাউন তাকেও কেমন অস্থির করে তুলছে। কমবেশি সবারই একই অবস্থা, সে খেয়াল করে দেখেছে। ভাবির অবস্থা সবচেয়ে খারাপ।

সে ভাবিকে নিয়ে মাঝে মাঝে খুব ভাবে। ভাবি কিন্তু খুব চমৎকার একজন মানুষ। শিক্ষিত না বলে, ভাবিকে স্বশিক্ষিত বলা উচিৎ। উনি পড়তে রীতিমতো ভালোবাসেন। যা পড়েন তা থেকে ভালোটুকু বেছে নেওয়ার ঝোঁক তার, এবং সাথে সাথেই জীবনে প্রয়োগ করেন। কত কি নিয়ে যে থাকেন তিনি। একটা স্কুলে চাকরি করেন, পাশাপাশি নিজের বাচ্চা, স্বামী, সংসারে সময় দেয়া। বই পড়ছেন, গাছ করছেন, বন্ধুবান্ধব বা প্রতিবেশীদের সাথে সামাজিকতা, সবমিলিয়ে ভীষণ ব্যস্ত একজন মানুষ। ভাবি বরাবরই মেজাজী মানুষ। ইদানিং সেটা কেমন খিটখিটে ধরনের হয়ে উঠছে। পান্নার সাথে তার লাগে না, আবার খুব গলাগলি ভাবও নয়। বয়সেরও একটা বড় গ্যাপ। তবু ভাবির এই পরিবর্তন পান্নাকে ভাবিয়ে তোলে।

এবার এইচএসসি পরীক্ষাটা হলো না। পান্না খুব মন দিয়ে পড়েছিল। ফেব্রুয়ারিতেও জানতো না পৃথিবীটা এভাবে বদলে যাবে। জীবন নিয়ে তার তেমন মাথা ব্যথা নেই। কেমন একটা অনুভূতি হয় সবসময়ই। মনে হয় জীবনের সব পর্যায়েই নিজের সবটুকু দিয়ে যুদ্ধটা করে যেতে হবে…!

সেই ফেব্রুয়ারী থেকে আজ ৮ অক্টোবর পর্যন্তই সে কিন্তু যুদ্ধটা বন্ধ রাখেনি। নিয়ম করে এইচএসসির পড়াটা চালিয়ে গেছে। সেই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার অনলাইন কোচিং। আজ তার মনটা একটু দমে আছে। যদিও যে সিদ্ধান্ত হয়েছে তাতে তার কোনো ক্ষতি হবে না। তার এসএসসি, জেএসসির রেজাল্ট ভালো। কিন্তু সে আসলে পরবর্তী জীবনে এই সার্টিফিকেট নিয়ে ঠিক কোথায় কোথায় ধরা খাবে, সেটাই ভাবছে।

সামনে ভর্তি গাইড খোলা। সকালের কফির মগে চুমুক দিয়ে চেয়ারটা পেছন দিকে একটু বাঁকা করে হেলান দেয় দেয়ালে। আবার ভাবির চিৎকারের শব্দ পায়। এবার কাজের মেয়েটাকে বকছে। মেয়েটা ভীষণ জ্বালায় ভাবিকে। কিছুতেই ভাবি যেভাবে চায় সেভাবে কাজগুলো করবে না। আবার সে ভাবি কে নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবে।

ভাবির এখনকার এই রাগটা তার কাছে স্বাভাবিক মনে হয় না। একটা কিছু কারণ আছে, শারিরীক বা মানসিক। সে হিসাব মিলাতে চেষ্টা করে। আজকাল প্রায়ই ভাবি বলেন, ওনার রাতে ঘুম হয় না। অনলাইন ক্লাস নেন বলে সকালে একটু দেরিতে ওঠেন। সাধারণ সময়ের মতো প্রতি পিরিয়ডে ক্লাস থাকে না। উনি সকালের নাস্তাটা না করেই ক্লাসে বসে যান। এদিকে বাচ্চাদুটা নিজেদের ল্যাপটপে বসেছে যার যার টেবিলে।

পান্না খেয়াল করেছে, ক্লাসের ফাঁকে সংসারটার দিকে তাকিয়ে ভাবি ঠিক খুশি হতে পারেন না। বাচ্চারা যতক্ষণ ল্যাপটপে থাকে, ভাবি ততক্ষণই বিরক্ত হয়ে থাকেন। লকডাউনে পড়াশোনা পুরোটাই নেট নির্ভর হয়ে গেছে।

রুটিনে চলা একজন মানুষের এখন সবকিছুই অগোছালো। খাওয়া, ঘুম, বাচ্চাদের সাথে সময় কাটানো, ঘরের গোছগাছ, এমনকি নিজের সাজগোজ সব কিছু বদলে গেছে। লকডাউনের শুরুর দিকে একটা রুটিন মেনে চলার ঝোঁক ছিল। এখন সেটা নেই একদমই। সবাই জীবনকে উল্টেপাল্টে নিয়েছে। খাওয়া বা ঘুমের রুটিনও বদলে গেছে। প্রত্যেকেরই একটা গা ছাড়া ভাব।

এটা কি কারণ হতে পারে এই অনিয়ন্ত্রিত মেজাজের? পান্না নিজের চেয়ার ছেড়ে ওঠে। কফি মগটা হাতে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে যায়। দেখে ভাবি রান্না ঘরে দাড়িয়েই নাস্তা খেতে খেতে কাজের মেয়েটাকে নানা ইন্সট্রাকশন দিচ্ছেন। মেয়েটা অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিজের কাজ করতে করতে মাঝে মাঝে হু হা জবাব দিচ্ছে।

পান্নার নিজের আর চা খাওয়ার নেশা নেই এখন। তবুও ভাবিকে জিজ্ঞেস করে, চা খাবে? করি তোমার জন্যও এককাপ?

ভাবি এতক্ষণে পান্নাকে খেয়াল করেন। তার মুখে একচিলতে হাসি ফোটে, কি, খুশি? পরীক্ষা দিতে হচ্ছে না তো! অবশ্য তোমার তো কোনটাতেই সমস্যা নাই, কি বলো?

পান্না নিজের কথা নিয়ে আর বেশি এগোয় না। হাসি মুখে একটা ‘হু’ দিয়ে বলে, চা দেই?

পান্নার মনে হয়, সে হয়তো ভাবির সমস্যাটা বুঝে ফেলেছে। মানুষের সব ব্যস্ততার একটা উদ্দেশ্য থাকে। কখনও সেই উদ্দেশ্য সে নিজেই, কখনও অন্যরা। এখন, এই লকডাউনে কি করছি, কেনই বা করছি, যেন কোনই উত্তর নাই এসব প্রশ্নের। তারপর এই যে আমি, এর সবটাই কি আমি? এর একটা বড় অংশ কি আপনজনদের খুশি করবার জন্যও নয়? আজ সব কেমন ছাড়া ছাড়া! ইয়া নাফসি, ইয়া নাফসি। যেন একা, স্বতন্ত্র একজন মানুষ। বাচ্চাদের স্কুলে বা কোচিং এ আনা নেয়াটাও নাই, তাই ওদের সাথে কাটানো সময়টাও জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। সেই সাথে লকডাউনের কারণে সবরকম বেড়ানো বন্ধ ৬/৭ মাস ধরে। কেউ বেড়াতেও আসে না, নিজেরাও যায় না কোথাও। মেহমান এলে ভাবি খুব খুশি হতেন। ঘর গোছানো, রান্নাবান্না, আপ্যায়ন। কতদিন সবকিছু বন্ধ। ভাবি বোধহয় নিজের যত্নও নেন না আজকাল? একটু মোটাও হয়েছেন। সেই ছিপছিপে গড়নটা আর নাই।

পান্না খুব যত্ন করে দু কাচ চা বানায়। ভাবিকে জিজ্ঞেস করে, তোমার নেক্সট ক্লাস কটায়?
ভাবি বলেন, এই এক্ষুনি। এখন ল্যাঙ্গুয়েজ টেস্ট নিব। তুমি চা’টা নিয়ে এসো, একসাথে খাই। বলতে বলতে দৌঁড়ায় নিজের রুমের দিকে।

পান্নার মনটা খারাপ হয়ে যায়। এতো ভালো একজন মানুষ, অথচ কতো বদলে যাচ্ছে!

চায়ের কাপটা ভাবির হাতে দিয়ে সে বেডসাইড টুলটাকে একটু দুরে ঠেলে দিয়ে এমনভাবে বসে যেন তাকে ক্যামেরায় দেখা না যায়। পান্না দেখে চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে ভাবির চেহারাটায় আবার একটা ভালোলাগা ছড়িয়ে যায়। পান্নার মনে প্রশ্ন জাগে, এটা কি কেবল মনের মতো চা প্রাপ্তির অনুভূতি? তার মনে হয়, এটা হয়ত একজন প্রিয় মানুষকে পাশে পাওয়ার তৃপ্তি!

ক্লাসটা শেষ হলে সে ভাবির সাথে বিছানায় শুয়ে শুয়ে অনেক গল্প করে। ভাবি জানতে চান, পরীক্ষাতো হচ্ছে না, এখন কি করবে তাহলে?

সে বলে, এবার শুরু হবে ভর্তির প্রস্তুতি।

বিরক্ত লাগে না তোমার?- ভাবি জানতে চায়।

পান্না নিজের দৃষ্টিভঙ্গীটা ভাবির সাথে শেয়ার করছে এমন ভাব করে। কিন্তু তার উদ্দেশ্য থাকে, ভাবিকে তার বর্তমান ভুলগুলো থেকে বের করে আনা।
কাজটাকে ভালোবাসতে পারলে, জানো ভাবি, কাজটাও একটা বন্ধু হয়ে ওঠে। আবার এমন হওয়া চলবে না যেন সেই কাজটা না থাকলে আমি ধ্বংস হয়ে যাব। বরং মাঝে মাঝে জোর করেই কাজটা থেকে ছুটি নিতে হবে। আরেকটা বিকল্প কাজে জড়িয়ে রাখতে হবে নিজেকে সবসময়। পাশাপাশি বিনোদন লাগবেই জীবনে। নিজের সাথে খানিকটা সময় কাটানোটাও একটা বিনোদন হওয়া উচিৎ সবার। দিনশেষে নিজেকে প্রশ্ন করাটাও খুব জরুরি। নিজেকে জানাও, কি করলে সারাদিন? কতভাগ সময় কাজে লাগলো? শুধু কি কাজই করলে সারাদিন? সবগুলোই কি পছন্দের কাজ? নাকি অপছন্দের কাজ নিয়েই কেটে গেল সারাদিন? নিজের পছন্দ গুলো কি নিজের যোগ্যতা, নিজের পারিপার্শ্বিকতার সাথে মিলে? যাদের নিয়ে বাস করব তাদের সাথে মেলে কি? না মিললে কিন্তু সেটা আবার একটা সমস্যা হয়ে দেখা দিবে। আবার তারাই যেন সবকিছু হয়ে না ওঠে। আমার আমির যেন মৃত্যু না হয় বেঁচে থেকেই। সবসময়ই জীবনে যা চাই তার সব পেতে হবে, এমনটা ভাবাও অন্যায়, বরং যা পেয়েছি সেটাকেই মুল্যয়ান করে আরো বড় করে তুলি না কেন? আসলে কি জানো, আমরা মানুষরা বড় অদ্ভুত। প্রিয় কাজটাও অপ্রিয় হয়ে ওঠে যখন সেটাই একমাত্র কাজ হয়। একঘেয়েমি মানুষের রক্তে মিশে আছে। নতুনত্ব চাই প্রতিনিয়ত। আর, এই যে লকডাউনে আটকে আছি, অন্যের ইচ্ছায়, এটাই সবচেয়ে অসহ্য। কিন্তু এক্ষেত্রে কি বা করার আছে তোমার বা আমার? সর্বোচ্চ, প্রতিদিনের জীবনটাকে সীমার মধ্যেই নতুন করে সাজানো।

পান্না খেয়াল করে, ভাবি ভীষণ হবাক হয়ে তাকে দেখছে। তারপর হঠাৎ বলে, পান্না, তোমার অনেক বুদ্ধি। তুমি আজ আমার খুব উপকার করলে।

* * *
সন্ধ্যায় পান্না তার ঘরে বসে ঘিয়ে ভাজা পোলাও চালের ঘ্রাণ পায়। সে টের পায় ভাবি মাঝে মাঝে গুনগুন করছে। রান্নাঘরে কাজের মেয়েটার সাথেও টুকটাক গল্প করছে। মেয়েটা একবার খিলখিল করে হাসল। তাহলে কি, মন ভালো নিয়ে কারো পাশে থাকলে মন খারাপের মতো সেটাও ছড়িয়ে পরে?

ভাইয়ের ছেলেটা পোলাও এর ঘ্রাণ পেয়ে রান্না ঘরে ঢুকেছে, গলা শোনা যায়। নতুন গলা, যাই বলে জোরে প্রতিধ্বনি হয়। ছেলেটা জানতে চাইছে, ‘কি রান্না করছ মা?’ মায়ের উত্তর শোনা যায়, ‘এমনিতে তো খবর নাও না, এখন পোলাও এর ঘ্রাণে মায়ের কাছে এসেছ।’ অভিযোগ করলেও গলার সুরে অভিযোগ নাই। পান্নার মনটা খুব প্রশান্ত হয়। সে উঠে রান্না ঘরের দিকে যায়। ডাইনিং টেবলটা সুন্দর করে সাজানো। মিস্টি রঙের একটা চিকণ পাড়ের সুতি শাড়ি পরেছেন ভাবি। পান্নাকে দেখে মিষ্টি করে হাসেন। জিজ্ঞেস করেন, ঠিক আছে?

দরজায় বেল বাজে। ভাইয়া ফিরলেন। ভাবি এগিয়ে যান দরজার দিকে। পদক্ষেপে নতুন দৃঢ়তা, সুন্দর করে বাঁচার, হোক প্রতিকুল কিংবা অনুকূল পরিবেশ!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *