মাসিকের রক্তের রং লাল, নাকি নীল?

আফরোজা সোমা

আফরোজা সোমা: বয়স ৩৫ পেরিয়েছে। আজো আমার কাছে অন্যতম আতঙ্কের নাম পিরিয়ড বা মাসিক। সেই মুখচোরা ভীতু কিশোরীটির মতই আজো পিরিয়ডের দিনগুলো অসহনীয় লাগে।

প্রথমবার পিরিয়ডের সময় ব্যবহার করা কাপড় প্লাস্টিকের পলিথিনে মুড়িয়ে স্কুলব্যাগের সাইড পকেটে রেখে দিয়েছিলাম!

হ্যাঁ। স্কুলব্যাগের সাইড পকেটে।

পিরিয়ডের লজ্জা-ভয়-আতঙ্কে অপ্রস্তুত ছিলাম। পরিবারে ওইভাবে কেউ ট্রেইন করেনি। আমি নিজেও ছিলাম ভীষণ ইন্ট্রোভার্ট। কারো সাথে এমন ব্যক্তিগত কথাবার্তা বিশেষ হয়নি।

সপ্তাহান্তে স্কুলব্যাগ পরিষ্কার করতে গিয়ে আম্মি ওইসব রক্তমাখা ত্যানা-তুনা আবিষ্কার করেছিল!

প্রথম পিরিয়ড় হয়েছিল নাইনে পড়ার সময়। নাইনের কোনো এক সময়। সারা বছরে ওই একবারই। তারপর টেনে পড়ার সময় এক বছরে মোটে তিনবার।

শুরু থেকেই পিরিয়ড ছিল আতঙ্ক। আজো পিরিয়ডের দিনগুলিতেই একমাত্র আমার জিন এডিট করে নিজের শরীর থেকে পিরিয়ডটা শিফট ডিলিট দিতে ইচ্ছে করে।

আমার মাসিকের বিকল সাইকেল সঠিক চক্রে আনার জন্য একটানা প্রায় ৯/১০ বছর হরমোন রেগুলারাইজ করার পিল খেতে হয়েছে। পিল ছাড়াতে ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার বলেছে ‘বাচ্চা নেন’!

আজিব সমাধান!

সে যাই হোক।

পিরিয়ড নিয়ে সংস্কৃতি অনেক বদলেছে। ‘চুপি চুপি বলো কেউ জেনে যাবে’ টাইপ বিজ্ঞাপন থেকে বেরিয়ে এখন ‘নীরবতা ভেঙে ফেলুন’ ধরণের উৎসাহ ব্যাঞ্জক বিজ্ঞাপন হচ্ছে। এগুলো খুবই ইতিবাচক বিষয়।

তবে, পিরিয়ড আজো ট্যাবু। আজোও বিজ্ঞাপনের প্যাডে ফোঁটায় ফোঁটায় নীল তরল ঢালা হয় টিভির পর্দায়। কিন্তু রক্তের রং নীল নয়, লাল। এমনকি রানী এলিজাবেথের পিরিয়ডের রক্তও লাল, রাজরক্তও নীল নয়।

পিরিয়ডকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে পরিচয় করাতে হবে। এজন্য সমাজের বিভিন্ন স্তরে সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড হাতে নেয়া দরকার। আর এই কর্মকাণ্ডের অতি জরুরি অংশ অবশ্যই হতে হবে পুরুষ।

নারীদের উদ্দেশ্য করে যেমন ক্যাম্পেইন ডিজাইন করতে হবে তেমনি পুরুষদের (কিশোর-যুবা সকল বয়সী) টার্গেট করেও নিতে হবে সুনির্দিষ্ট ক্যম্পেইন পরিকল্পনা।

নইলে, মুখে নীরবতা ভাঙুন বললেও টিভি পর্দায় পিরিয়ডের প্যাডে ঢালা হবে নীল তরল।

লেখক পরিচিতি: আফরোজা সোমা; ফ্যাকাল্টি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *