যুদ্ধ জাহাজের কমিশনিং

০৫ নভেম্বর ২০২০ (ডেস্ক নিউজ): স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এবং সমুদ্র সম্পদ রক্ষায় নৌবাহিনীকে সবসময় প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেছেন, সরকার সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনাকে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে চায়।

বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নৌবাহিনীর নতুন পাঁচটি আধুনিক যুদ্ধ জাহাজ কমিশনিং করেছেন। সেই অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি জাহাজের কমিশনিং করেন।

এই কমিশনিং-এর ফলে বাংলাদেশের জলসীমা সুরক্ষায় এবং নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করে অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু করলো নতুন দু’টি আধুনিক ফ্রিগেট বানৌজা ওমর ফারুক, আবু উবাইদাহ ও একটি করভেট যুদ্ধজাহাজ প্রত্যাশা এবং দুইটি জরিপ জাহাজ বানৌজা দর্শক ও তল্লাশী।

এ সময় তিনি বলেন, বাংলাদেশ নৌবাহিনী তার ক্রমাগত অগ্রযাত্রায় আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। দিনটি শুধু বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য নয়, সমগ্র দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত গৌরবের।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধুমাত্র সমুদ্রসীমা অর্জন নয়, এই সমুদ্র সম্পদকে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে। এ জন্য আমরা সুনীল অর্থনীতি পদক্ষেপ বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিয়েছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশাল এই সমুদ্রের সম্পদ আহরণ এবং তাকে কাজে লাগানোই আমাদের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য নিয়েই সরকার কাজ করছে। জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে সমুদ্রসীমা রক্ষায় নৌবাহিনীকেও শক্তিশালী করে আমরা গড়ে তুলছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের নৌবাহিনীর সদস্যরা প্রতিনিয়ত লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে অনেক প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা মোকাবেলা করেন। তারা সমুদ্র এলাকার সার্বিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান করছেন, যা প্রশংসার দাবিদার।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা কারও সাথে যুদ্ধ করতে চাই না। জাতির পিতা আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে বলেছেন- ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরীতা নয়’। আমরা সেই নীতিতেই বিশ্বাস করি। কিন্তু যদি বাংলাদেশ কখনও অন্য দেশের দ্বারা আক্রান্ত হয়, তাকে মোকাবেলা করার মত সক্ষমতা আমরা অর্জন করতে চাই।

সরকার প্রধান বলেন, আমাদের সুশৃঙ্খল সশস্ত্রবাহিনী দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আজ আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও বিপুলভাবে প্রশংসিত পেশাদার একটি বাহিনী।

তিনি বলেন, গত ২০১০ সাল থেকে ভূ-মধ্যসাগরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের অংশ হিসেবে আমাদের যুদ্ধজাহাজ সার্বক্ষণিকভাবে অংশগ্রহণ করছে। এই বছরের আগস্ট মাসে আমরা সেখানে পাঠিয়েছি আমাদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির একটি করভেট বানৌজা ‘সংগ্রাম’, যা বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে। এছাড়া দক্ষিণ সুদানেও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কন্টিনজেন্ট অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শান্তিরক্ষা মিশন ছাড়াও এ বাহিনী নিয়মিতভাবে বহুজাতীয় এক্সারসাইজ, বঙ্গোপসাগরে ‘কোর্ডিনেটেড প্যাট্রল’ ও কূটনৈতিক সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের ‘মেরিটাইম সিকিউরিটি’-কে সুসংহত করে চলেছে।

তিনি বলেন, মালদ্বীপে যখন সুপেয় পানির অভাব হয়েছিল তখন আমরা আমাদের নৌবাহিনীর জাহাজ দিয়ে সুপেয় পানি সেখানে পাঠাই। তাদের সহযোগিতা করি। এভাবেই দেশে এবং প্রতিবেশী দেশেও বাংলাদেশ নৌবাহিনী নানাভাবে সহযোগিতা দিয়ে যাওয়ায় তিনি এই বাহিনীকে ‘কর্মমুখর’ আখ্যায়িত করে ধন্যবাদ জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার কেবল নৌবাহিনী নয়, বঙ্গবন্ধুর ১৯৭৪ সালে করে যাওয়া ‘প্রতিরক্ষা নীতিমালা’র আলোকে ‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’ প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন শুরু করেছে। সেদিক লক্ষ্যেই সরকার নৌবাহিনীকে আধুনিক ও শক্তিশালী একটি বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার পদক্ষেপ নিয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের সরকার নৌবাহিনীতে বর্তমান প্রজন্মের উন্নত সাবমেরিন, যুদ্ধ জাহাজ, মেরিটাইম পেট্রোল এয়ারক্র্যাফট, হেলিকপ্টার ও বিশেষায়িত বাহিনী সংযোজন করেছে। এর মাধ্যমে ‘একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ’ মোকাবেলায় আমরা একটি ত্রি-মাত্রিক নৌবাহিনী গঠনের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছি।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা বলেন, কমিশনপ্রাপ্ত নতুন জাহাজগুলো নৌবাহিনীকে আরও শক্তিশালী, দক্ষ ও বেগবান করবে বলেই বিশ্বাস করি।

তিনি বলেন, আধুনিক সমরাস্ত্র সজ্জ্বিত দুইটি ফ্রিগেট ও একটি অত্যাধুনিক করভেট এবং আমাদের নিজস্ব খুলনা শিপইয়ার্ডে তৈরী দুটি আধুনিক জরিপ জাহাজ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নৌবাহিনীর ক্ষমতাকে আরও জোরদার করবে। এ ছাড়াও নিজস্ব ইয়ার্ডে জাহাজ তৈরীর সক্ষমতা আমাদের আত্মবিশ্বাসকে বলিয়ান করেছে।

তিনি বলেন, আমরা ভবিষ্যতে অন্য দেশের জন্য জাহাজ তৈরী করে সরবরাহ করতে সক্ষম হব, ধীরে ধীরে সেই সক্ষমতাও আমরা অর্জন করবো। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে খুলনা শিপইয়ার্ড এবং ড্রাইডককে নৌবাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন বলেই আজ দেশের যুদ্ধ জাহাজ নির্মান সম্ভব হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমেই আমাদের নৌবাহিনীর যাত্রা শুরু। নৌবাহিনীর সাহসী সদস্যদের মাধ্যমে পরিচালিত ‘অপারেশন জ্যাকপট’ আমাদের নৌযুদ্ধের ইতিহাসের এক অনন্য বীরত্বগাঁথা।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুণর্গঠনকালেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার লক্ষ্যে সশস্ত্রবাহিনী গড়ে তোলেন। তিনিই এর আধুনিকায়নেও পদক্ষেপ নেন। এরআগে জাতির পিতা তার ৬ দফা প্রস্তাবেও বাংলাদেশেই নৌবাহিনী ঘাঁটি করার উল্লেখ করেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর আন্তরিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারি বন্ধুপ্রতীম দেশ ভারত থেকে সংগৃহীত ২টি পেট্রোল ক্রাফট ‘পদ্মা’ ও ‘পলাশ’ নিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যাত্রা শুরু হয়।

তিনি বলেন, সমুদ্র সীমায় বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ১৯৭৪ সালেই জাতির পিতা সমুদ্রসীমা আইন প্রণয়ন করেন, যদিও জাতিসংঘই তা অনেকে পরে করেছে।

জাতির পিতাকে হত্যার পর যারা ক্ষমতায় এসেছিল তারা এসব ব্যাপারে কোন চিন্তা বা উদ্যোগ কিছুই গ্রহণ করেনি উল্লেখ করে বলেন, এর মাঝেই একুশ বছর পার হয়ে যায়। আর ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারে এসেই এ ব্যাপারে প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ নৌবাহিনী শান্তিকালীন বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশবাসীর আস্থা ও প্রশংসা অর্জন করেছে।

প্রধানমন্ত্রী কোভিড-১৯ মোকাবেলায় সরকারের নেয়া কার্যক্রম বাস্তবায়নেও নৌবাহিনী যথাযথ ভূমিকা রাখায় তাদের ধন্যবাদ জানান। বলেন, যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগেও নৌবাহিনী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং যথাযথভাবে তাদের সাহায্য করেছে।

করোনা ভাইরাসের মধ্যেও দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে সরকার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। আশা প্রকাশ করে বলেন, ভবিষ্যতে এই করোনা ভাইরাস থেকে বাংলাদেশ ও বিশ্ব মুক্তি পাবে।

এর আগে, চট্টগ্রামে বানৌজা ঈসা খান নৌ-জেটিতে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম শাহীন ইকবাল জাহাজগুলোর অধিনায়কদের হাতে কমিশনিং ফরমান তুলে দেন। পরে প্রধানমন্ত্রী নৌবাহিনীর রীতি অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে নামফলক উন্মোচন করেন।

অনুষ্ঠানে নৌবাহিনীর একটি সুসজ্জিত চৌকষ দল প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন।

গণভবন প্রান্তে প্রধানমন্ত্রী নিরাপত্তা উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিক, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ডক্টর আহমদ কায়কাউস-সহ পিএমও এবং গণভবনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

 

পিএম/এসকেএম/রমু

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *