যে জীবন দোয়েলের…
শারমিন আফরোজ বন্যা
দীপ্ত বসে ছিল দ’ হয়ে, পথের ধারে, খালি পায়ে। গায়ের জামাটা পুরনো। ধুলো, কাঁদা-ময়লায় শার্টের আসল রংটা আর বোঝা যায় না। অনেকগুলো দাঁত পরে গিয়ে, নাকি শুকিয়ে যাওয়ার কারণে, তার গাল দুটো চেপে থাকে ভেতরের দিকে। ছয় ফুট লম্বা মানুষটাকে দেখে বোঝা যায় না, সে কতোটা লম্বা। কতো হবে বয়স? পয়ষট্টি, নাকি সত্তুর?
তবুও পটলচেরা চোখ দুটো এখনো জলজল করে! একসময়ের বুদ্ধিদীপ্ত দুটো চোখ, এখনো যেন মরে যায় নি। কেবল তেজটুকু নাই। একটা অসহায়ত্ব ছেয়ে আছে চোখের মনিতে। এবং সেই অসহায়ত্বটুকু ওয়াটার কালারে আঁকা ছবির মতো, ছড়িয়ে গেছে গালে, কপালে, ঠোঁটে।
লাবন্যর ভেতরটা কেঁপে ওঠে। এতোদিন পর দেখেও বুদ্ধি ভারসাম্যহীন দীপ্ত তাকে চিনতে পারে। খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ালে দীপ্ত বলে, ‘আমাকে দশটা টাকা দিবা?’ খুব ক্ষীণ স্বর, শারিরীক দুর্বলতায় নাকি মানসিক, লাবন্য জানে না।
যার হাতে লাবন্য দশ টাকার পরিবর্তে একটা একশ টাকার নোট দেয়, তার আজ অনেক বড় একজন মানুষ হবার কথা ছিল। একজন সচিব, বা একজন প্রফেসর অথবা রিসার্চার।
লাবন্য ভাবে, কার ভুলে এমনটা হলো? কোন অবহেলায়? মনের যত্নের অভাবে? দীপ্তর বাবা মায়ের দায়িত্ব পালনে ভুল? মনের বিরুদ্ধে জোর করা হয়েছিল কি?
লাবন্যর তাই মনে হয়। কৈশোরে ছেলেমেয়েদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বাবা-মার সাপোর্ট। হয়তো, ঠিক সময়ে মনোযোগ বা ভালোবাসা পেলে আজ দীপ্তর মতো ছেলে পাগল হয়ে পথে পথে ভিক্ষা করে বেড়াত না।
সবচেয়ে প্রথম বিষয়টা নজরে এসেছিল ফুপুর। এক গ্রীষ্মের সকালে দরজায় উদভ্রান্ত দীপ্তকে দেখে তার ফুপু চমকে গেলেন। সতেরো বা আঠারোর লকলকে, বাড়ন্ত এক নবীন! কিন্তু যেন খানিকটা অগোছালো, উদভ্রান্ত!
অস্ফুটে বললেন, ‘আয়, ভিতরে আয়! একদম ঘেমে গেছিস তো!’
অসম্ভব মেধাবী ছাত্র দীপ্ত কেমন বোকা বোকা হাসি দেয়। ফুপুকে বলে, ‘পানি দাও।’
ফুপু পানি দিতে দিতে ভাবেন, ওর কি আজ পরীক্ষা নাই। এইচ এস সি পরীক্ষা চলছে!
মুখে বলেন, ‘হোস্টেল থেকে আসলি?’
দীপ্ত তার বড় বড় ডাগর চোখ দুটো আরো বড় করে তাকায়। খুব অদ্ভুত ঢংয়ে মাথা নেড়ে নেড়ে বলে, ‘হেটে হেটে আসলাম ফুপু। সারা রাস্তায় এই ছোট্ট ছোট্ট গাড়ি! খেলনা গাড়ির মতো, লাত্থি দিলে আসমানে উড়ে যাবে!’ তারপর কেমন বুদ্ধিহীনের মতো হাসে!
ফুপুর মনটা খারাপ হয়ে যায়। চিন্তিত বোধ করেন! তিনি খেয়াল করেছেন, আজকাল দীপ্ত কেমন উল্টাপাল্টা কাজ করে। কথাবার্তাও তার চেনা দীপ্তর মতো নয়।
পানির গ্লাসটা হাত থেকে নিতে নিতে ফুপু জানতে চান, ‘আজ তোর পরীক্ষা নাই?’
প্রশ্নটা শুনে দীপ্ত ব্যস্ত হয়ে ওঠে। ‘আরে হ্যা, তাই তো! আমি তো পরীক্ষা দিতেই যাচ্ছিলাম। হঠাৎ কেন যে এখানে চলে আসলাম।’
অসহায় চিন্তিত ভাবে সে বলে, ‘গতকাল ইংরেজি পরীক্ষায়ও কিছু লিখি নাই, ফুপু! ইদানিং আমার মাথাটা খুব এলোমেলো লাগে! আচ্ছা, দোয়া করো, আমি গেলাম পরীক্ষা দিতে!’
ফুপুরও কেমন পৃথিবীটা ওলোট-পালোট হয়ে যেতে চায়। তিনি দ্রুত একটা বেবিট্যাক্সি দাঁড় করাতে বলে দাড়োয়ানকে। দাড়োয়ানকে বলে সাথে যেতে। তারপর অনেকক্ষণ গেট ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন।
ভাইজানকে শিগগিরই এই কথাগুলো জানানো দরকার। কিন্তু তারা ভাইজানকে খুব ভয় পায়। শ্রদ্ধাবোধ কারো কারো জন্যে ভয়ে পরিবর্তিত হয়। ভাইজান তেমন একজন মানুষ। কিন্তু তিনি বুঝতে পারছেন, ভীষণ একটা পরিবর্তন হচ্ছে দীপ্তর মনোজগতে। এই মুহূর্তে দীপ্তর মানসিক সাহায্য দরকার।
পাঁচ মেয়ের পর যখন একটা ছেলে হলো, দুধে আলতা গায়ের রং, মুখের এ মাথা ও মাথা টানা দুটো চোখ, বোনেরা নাম রেখেছিল দীপ্ত!
নিজের নামকে স্বার্থক করে তুলছিল দীপ্ত। স্কুলে সে বরাবর প্রথম। পাঁচ বোনের পর ভাই। তার ওপর ভীষণ বুদ্ধিদীপ্ত। অসম্ভব মায়াদার দীপ্ত হয়ে উঠল পরিবারের সবচেয়ে আদরের, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মা চোখে হারায়, বোনেরা চোখে হারায়। কেবল বাবার কাছে আস্কারা পায় না। রাশভারী বাবা। পড়ার বাইরে, নিয়ম শৃঙ্খলার বাইরে দীপ্তর সাথে তার কথাবার্তা নাই। বরং এরমধ্যেও বাবার কাছে পান থেকে চুন খসার উপায় নাই। কঠিন কঠিন সব শাস্তি… কখনো নীলডাউন, কখনো একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকা, জোড়া বেত…। দীপ্তরা জানতো, বাবার কথাই শেষ কথা।
মফস্বল শহরের স্কুল। সবার এক্সপেকটেশনের ওপর দিয়ে গিয়ে এসএসসিতে দীপ্ত স্ট্যান্ড করে ফেললো। খুব একটা প্রতিযোগিতা ছাড়াই যখন নটরডেম কলেজে চান্স পেয়ে গেল। তখন একটা ভীষণ মুশকিল হল।
ঢাকায় এসে কোথায় থাকবে? সিটের জন্য চেষ্টা করতেই, আল্লাহর রহমতে হলেও একটা সিট ম্যানেজ হয়ে গেল। যথাসময়ে মায়ের আদরের, বোনদের আদরের দীপ্তকে তার বাবা সাথে করে নিয়ে এসে হলে রেখে গেলেন।
তারপর স্বাভাবিক নিয়মে লেখাপড়া চলছিল। কলেজ, প্রাইভেট পড়া, বন্ধু-বান্ধব, হলের নতুন জীবন!
দূর থেকে দেখে মনে হয়েছিল, সবকিছু ঠিকঠাক। কিন্তু সব আসলে ঠিক ছিল না। দীপ্তর মনের মধ্যে, মগজের মধ্যে কি হয়েছিল আজও অস্পষ্ট। প্রথম প্রথম স্বাভাবিক কথাবার্তার মাঝেমাঝে কিছু অসংলগ্ন কথা বলতে শুরু করলো।
সে বলতো, তার রুমের জানালায় দাঁড়ালে সে পরীর মতো সুন্দর মেয়েদের দেখতে পায়।
পথের গাড়িগুলোকে তার খেলনা গাড়ি মনে হয়।
এইচ এস সি পরীক্ষার সময়, হলে না গিয়ে চলে গেল ফুপুর বাসায়। কোন কোন পরীক্ষার খাতায় কিছুই না লিখে সাদা খাতা জমা দিল।
তখন সবার টনক নড়লো। কিন্তু ততোদিনে তার মনোজগৎ নড়ে গেছে পুরোটাই। লাবন্যর মাঝে মাঝে খু্ব বুঝতে ইচ্ছা করে, মানুষের এই যাকে পাগল হয়ে যাওয়া বলে, সেটা কিভাবে ঘটে! ঠিক কোন পর্যায়ে মানসিক সাহায্য অথবা মেডিসিনের প্রয়োজন হয়?
বড়চাচা দীপ্তকে পাবনা হাসপাতালে ভর্তি করে দিলেন। নিজের দায় অন্যের ঘাড়ে ছেড়ে আসার মতো।
হাসপাতালে দীপ্ত একদম কোঅপারেট করেনি। ওষুধ খেত না। নিয়ম মানত না। খুব দ্রুতই দীপ্ত পুরোপুরি অপ্রকৃতস্থ হয়ে গেল। হাসপাতালে খাওয়াদাওয়ার যত্ন ছিল না। দিন দিন শরীর ক্ষয়ে যাচ্ছিল। তখন দীপ্তকে বাড়ি নিয়ে আসা হলো।
বাড়িতে এনে সবচেয়ে বড় যে ভুলটা হয়েছিল, তাকে আলাদা ঘর তুলে দিয়ে। পাগলের ঘর! তাই সেখানে শুধুই একটা চৌকি পেতে শোওয়ার ব্যবস্থা। লাবন্যর মনে হয়, হয়ত নিজেদের কাছে সবার মতো করে তাকে রাখতে পারলে সে ফিরে আসত স্বাভাবিক জীবনে। অন্ততঃ এতো দ্রুত বদ্ধ উম্মাদ হয়ে যেত না। তখন সে সারাদিন থুতু ছিটাতো, আর হাত নেড়ে নেড়ে দূর দূর করে কাউকে তাড়াতো। মাকে দেখলে খেপে যেত। হাতের নাগালে পেলে একমাত্র মাকেই শুধু মারতো!
মায়ের ওপর একটা প্রচন্ড ক্ষোভ! এটা কি এমন, যে মা ইচ্ছা করলে তাকে এ অবস্থা থেকে বাঁচাতে পারতেন? নাকি মায়ের কাছ থেকে কেন তাকে দূরে সরিয়ে দেয়া হলো, সেই ক্ষোভ?
অনেক বছর পর লাবন্যর মা, যখন নিজেদের একটু সামর্থ্য হয়েছিল, দীপ্তকে নিয়ে এসেছিল নিজেদের কাছে। ততদিনে দীপ্তর পায়ের রগ হাটুর কাছে খিঁচে গেছে, এক জায়গায় বছরের পর বছর বসে থেকে। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। মুঠো করে রাখা হাতের নখ বড় হতে হতে বাকা হয়ে ঘুরে এসে তালুতে প্রায় গেঁথে গেছে। বছরের পর বছর না মাজা দাঁত। গায়ে শ্যাওলার মতো ময়লার পরত।
লাবন্যর মা, মানে দীপ্তর চাচি তাকে একটু একটু করে সহজ করে তুললেন। গোসল করানো, দাঁত মেজে দেওয়া, নখ কাটা, পুষ্টিকর খাবার দেওয়া, নিয়মিত হাটুতে তেল মালিশ করা। লাবন্য তখন ছোট, স্কুলে পড়ে। দীপ্তকে কোনদিনও পাগলামো করতে দেখেনি। এমনকি তাকে দেখে তারা ভয়ও পেত না। উঠানে মা তাকে একটা চেয়ার পেতে রোদে বসাতেন। লাবন্য স্কুল থেকে ফিরলে, দীপ্ত হাসিমুখে লাবন্যকে একটা দুটো ইংরেজি শব্দ বলতো, নামতা পড়তে চেষ্টা করত! সেই ছোট্ট লাবন্য, তার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যেত আনন্দে। বড়দা পারছে, বড়দার স্মৃতিতে এখনো কিছুটা পড়াশোনা বেঁচে আছে।
একসময় বেশ নিজে নিজেই দাঁত ব্রাশ করা, বাথরুম করা, নিজের হাতে খাওয়া দাওয়াটুকু করতে শুরু করলো। চলাফেরা সহজ হলো। বাহ্যিক সিমটমগুলো সব কমে গেল। আর থুতু ছিটায় না, কাউকে তারায় না। শুধু কথা কম বলে। অনভ্যাস। পুরোপুরি স্বাভাবিক আর হলো না।
এখন সে বাঁচে এক অভিমানী জীবনে। কাউকে যন্ত্রণা দেয় না। সেই পাগলের ঘরটা প্রতিষ্ঠিত বোনেরা মেরামত করে দিয়েছে। দেখাশোনার জন্য আছে মাইনে করা লোক।
এখন সে একদম একা। ভোরে বেড়িয়ে পরে ঘর থেকে। গায়ের পথে পথে হেঁটে বেড়ায় সারাদিন। মাঝে মাঝে এর তার কাছ থেকে দশটা টাকা চায়। দোকানের হিসাব সে বোঝে না। মুড়ি কিনে, বা বিস্কুট। কোন কোন দোকানদার তাকে খুচরা ফেরত দেয়। কোন কোন দোকানদার এই অবুঝকেও ঠকায়। দেখাশোনা করার গরীব মানুষগুলোও খুব নিষ্ঠুর হয়। কোন কোন বেলায় হয়ত তাকে খেতেই দিল না। সে তবু কোন ঝামেলাই করে না। কারো ওপর খেঁপে যায় না সে! আর বোধহয় কারো ওপরই কোনো ক্ষোভ নাই তার।
আজ প্রায় দীর্ঘ ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বছর পর, লাবণ্য দাঁড়িয়ে আছে দীপ্তর সামনে। নিজে আজ সে মা। সে মনে মনে নিজের সন্তানের জায়গায় দীপ্তকে বসায়। বুঝতে চেষ্টা করে ভুলটা কোথায়। অভিভাবকের নেগলেজেন্সি!! তাদের দায়িত্ব অবহেলা!! তাদের সঠিক জ্ঞানের অভাব!
বাবা হিসাবে ছেলের পাশে থাকেননি চাচা। চাচার কর্তৃত্বের কাছে চাচি ছিলেন পদানত। দীপ্ত তার বিপদের দিনে, কাউকে পাশে পায়নি। কি বিপদ সেটা লাবন্য জানে না। বোধহয় চাচাচাচিও জানেন না। হতে পারে, বয়সন্ধিকালীন হরমোনাল চেঞ্জেস-কে একা একা এক্সেপ্ট করতে পারে নি সে! হতে পারে, হঠাৎ একা হয়ে যাওয়ার চাপ সে নিতে পারে নি। কেউ তো ছিল না পাশে। তার প্রতিদিনের একটু একটু করে বদলে যাওয়াটুকু অনুধাবনের জন্য।
তারপর যখন সে অপ্রকৃতস্থ, কেউ ভালোবাসে নি, না বাবা-মা, না আত্মীয় বন্ধু। সবাই বিপদ ভেবে দূরে ঠেলে দিয়েছে। অথচ, দীর্ঘ সময় পরও সামান্য যত্নে, মায়া মমতায় সে কিন্তু অনেকটাই ফিরে এসেছিল। যখন তার ভেতরটা বদলে যাচ্ছিল, তখন যদি আপনজনেরা সেটা বুঝতে চাইত, সমাধান খুঁজত, হয়ত ঠেকানো যেত মনোজগতের এই বদল।
আজ তাহলে গায়ের পথে পথে হেঁটে কেটে যেত না একটা জীবন। অমূল্য জীবন!
















Leave a Reply