
রহমান মুস্তাফিজ
রহমান মুস্তাফিজ, মুক্তমত: করোনা সংক্রমণ রোধে লকডাউনের বিকল্প নেই। তবে লকডাউনের নামে যা হচ্ছে সেটা ইতরামোর পর্যায়ে চলে গেছে।
কিছু মানুষের সুবিধার কথা ভাবলেন। তাদের হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা দিলেন। তাদের প্রতিষ্ঠান খুলে দিলেন। সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর লাখ লাখ শ্রমিক যেভাবে ঢাকায় এলেন সেটা কি করোনা প্রতিরোধে সহায়ক? বরং দেশকে ঠেলে দেয়া হলো গণহত্যার দিকে। যারা ৫ আগস্টের আগে এসব শিল্প কারখানা ও গণপরিবহন চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাদের গণহত্যাকারী হিসেবে বিবেচনায় এনে বিচারের আওতায় আনা হোক।
জীবন ও জীবিকার বিষয়ে বলা হচ্ছে এ দুইয়ে সমন্বয় করে করোনায় নিরাপদ থাকতে হবে। কার জীবিকার কথা বলা হচ্ছে? বলা হচ্ছে মুষ্টিমেয় লোকের জীবিকার কথা। এই শিল্পপতিদের মূলধনের উৎসের তথ্য কখনও নেয়া হয়েছে? হয়নি। হবেও না কখনও। খবরটা যারা নিবেন, তারা বিক্রি হয়ে যান।
যাদের স্বার্থে ঘোষিত লকডাউন মাঝ পথে মুখ থুবড়ে পড়ে জীবিকা শুধু তাদেরই দরকার। বাকিদের মৃত্যুতে কারও কিছু যায় আসে না। কু-তর্কে গিয়ে কেউ হয়তো বলবেন, কারখানা খুলে দিলে লাখ লাখ শ্রমিকের আয়ের পথটা চালু থাকবে। এর উত্তরে দুটি কথা বলা যায়:
১) মূলত মালিক পক্ষের স্বার্থে কারখানা খুলে দেয়া হলো। এখানে শ্রমিক-কর্মচারীদের কোন স্বার্থ নেই। কারখানা বন্ধ থাকলেও এদের বেতন দিতে হবে। এদের চাকরি থেকে ছাঁটাই করা যাবে না। সেই কারণে তাদের (মালিকদের) হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। এরা গাছেরটাও খাবে, তলারটাও কুড়াবে।
২) দেশের মোট জনগোষ্ঠীর মধ্যে পোষাকখাতের এই শ্রমিকেরা সংখ্যায় কত? কত শতাংশ? শুধু এরাই বাংলাদেশ নয়। বাংলাদেশ ১৬ কোটি মানুষের। লকডাউন-লকডাউন খেলায় এই শ্রমিকেরা মূলত গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছেন। এদের মৃত্যুতে কারও কিছু যায় আসে না।
দেশে এখন ভালোভাবে টিকে আছেন তিনটি শ্রেণি। সরকারি চাকুরিজীবী, গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ও করোনা ভাইরাস সংশ্লিষ্ট কোন না কোন ব্যবসার সাথে যুক্ত ব্যবসায়ী। এর বাইরে বাকিরা ধুঁকছেন। মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিলুপ্ত হওয়ার পথে। তবে সুখবরও (!) আছে। দেশে ধনীর সংখ্যা বাড়ছে। এই নব্যধনীক শ্রেণির অধিকাংশই সরকারি চাকুরিজীবী। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) একটু খোঁজ নিলেই বেরিয়ে আসতে পারে ভয়াবহ সব তথ্য।
গেল জুলাই মাসে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব দিতে। কেনা স্থাবর সম্পত্তির অর্থের উৎস জানতে চাওয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এ চিঠিকে মেনে নিতে পারছেন না অধিকাংশ সরকারি চাকুরিজীবী। অথচ এই নিয়মটি নতুন নয়। চাকুরিবিধিমালায় এ বিষয়ে স্পষ্ট করে উল্লেখ আছে। পাঁচ বছর অন্তর এ হিসাব স্বেচ্ছায় দেয়ার কথা। কেউ হিসাব দিচ্ছিলেন না বলে এবার চিঠি দেয়া হলো।
আরও পড়ুন: আক্রান্তের সংখ্যা ১৩ লাখ ছাড়িয়েছে
ব্যবসায়ীরা সুবিধা চান। তাদের সেই সুবিধা দেয়া হয়। সুবিধা যারা দেন, তারা কোন ‘সুবিধা’র বিনিময়ে দেন তা আমার জানা নেই। জানতে এখন আর আগ্রহ বোধ করি না। করার কারণও নেই। রাষ্ট্র জীবন্মৃত মানুষকে পছন্দ করে, লালন করে। কৌতূহলী মানুষ নীতিনির্ধারকদের জন্য সহায়ক নয়। একজন ধর্ষককে রক্ষা করতে ক্ষমতাধররা যখন মরিয়া হয়ে ওঠেন, তখন জীবন্মৃত হয়ে থাকাই ভালো। ধর্ষক যখন পুরস্কার হিসেবে বিদেশে পোস্টিং পান, তখন অন্যদের হতাশা বাড়ে। তাদের মধ্যে অপরাধ করার প্রবণতা তৈরি হয়। এই প্রবণতা কেউ তার শিক্ষা, মনন ও রুচি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, কেউ পারেন না। তবে সততা ও নিষ্ঠায় যাদের জীবন চলে, তারা ভালো নেই। তাদের ভালো থাকতে দেয়া হচ্ছে না। ভালো থাকতে দিবে না।
লেখক পরিচিতি: রহমান মুস্তাফিজ; লেখক, সিনিয়র সাংবাদিক ও নির্মাতা
আর্ট নিউজ ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করতে:















Leave a Reply