পরিবর্তন

শারমিন আফরোজ বন্যা: ঘোলা চোখে কাঠের চৌকির এক কোনে বসে থেকে সে আরেকবার জোরে জোরে তার নাতিনকে ডাকে, ‘সুখী, এই সুখী! আয় দাদা! বদনাটায় একটু পানি দিয়া যা! হেই সকালে ফুরাইছে! দে দাদা!’

সুখী তার লম্বা দুটো বেনি দু’দিকে ঝুলিয়ে দিয়ে উঠানে এক্কাদোক্কা খেলছে। খেলা ফেলে সে কিছুতেই এখন নড়বে না! একটু আগেই সে নিজে বদনাটা ভরে দিয়ে এসেছে।

সুখীর মা ডাক শুনে এসে বদনাটা তুলে দেখে সেটা ভরাই আছে। রান্নাঘরে দুনিয়ার কাজ ছড়ানো। হাতে সবজি কোটা চলছিল। সেখান থেকে দৌঁড়ে উঠে এসেছে পানি দিতে, কিন্তু বদনা আসলে ভরাই। সে ধৈর্য্য রাখতে পারে না। সে চিৎকার করে শাশুড়িকে বলে, ‘চোখের মাথা খাইছেন নাকি? বদনা তো ভরা! সারাদিন খালি বদনা ভর্, বদনা ভর্!’

তারপর সেই রাগ খানিকটা গিয়ে পরে মেয়ের পিঠে! দুমদুম, গোটা দুই কিল! সুখী কিছুই বুঝতে না পেরে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে। মুখে খই ফোটে তার, ‘বুঝলাম না! আমাকে কেন মারলা! আমি কি করলাম!’

সুখীর মা ততক্ষণে রান্নাঘরে। চুলায় চাপানো ডাল ছলকে হাঁড়ির গা বেয়ে পরেছে। চুলাটাও নিভে গেছে। তার অসহ্য লাগে সবকিছু। চুলাটার চাবি ঘুরিয়ে প্রথমে গ্যাস বের হওয়া বন্ধ করে। তারপর হাঁড়িটা নামিয়ে রেখে চুলা মোছার ন্যাকড়াটা দিয়ে ঘষে ঘষে চুলা পরিস্কার করে। হাঁড়ির গা’টাও মোছে। তারপর আবার হাঁড়িটা চুলায় চাপিয়ে দিয়ে বটিটা টেনে নিয়ে বসে সবজি কুটতে।

ছুটা বুয়া ঘর মুছে, কাপড় ধুয়ে রান্নাঘরে ঢুকবে। তার আগেই কোটা বাছা সেরে নিতে হবে। নাহলে রান্নাঘরটা ভালো করে মোছা হবে না। সে দ্রুত হাত চালায়। এরমধ্যেই আবার শুনতে পায়, তার শ্বাশুড়ি ডাকছে, ‘বুজি, বুজি! আমারে একটু উঠাইয়া দিয়া যাও। ও বুজি, বুজি!’

বিরক্ত হতে গিয়েও সুখীর মা নিজেকে থামায়। হাতের সবজিটা গামলায় রেখে আবার শাশুড়ির ঘরে আসে। দেখে বুড়ো মানুষটা একাই নেমেছেন চৌকি থেকে। বেডপ্যানে খুব কড়া রঙের প্রস্রাব।

সে আবার চেঁচিয়ে শাশুড়িকে জিজ্ঞেস করে, ‘মা, মগের পানিতো পরে রইছে, পেশাবের রং দেখছেন? আবার কিন্তু পেশাবে ইনফেকশন হইব। এই কয়দিন আগেই জ্বর থিকা উঠলেন।’


এবারের চিৎকারে রাগ নাই। উনি আজকাল একদমই কানে শোনে না বলে জোরে কথা বলতে হয়। তাও বুড়ো মানুষটা ভয় পেয়ে ছেলের বউকে মিনমিন করে কিছু একটা উত্তর দেন। হয়তো বলতে চান তিনি পানি খেয়েছেন। কিন্তু এটাও ভালোই জানেন, সুখীর মার সাথে মিথ্যা কথা বলে পার পাওয়া যাবে না। সুখীর মা ড্যানাটা ধরে তাকে উঁচু করে। উনি আজকাল নিজের গায়ের ভরটুকুও তুলতে পারেন না, যদিও তাঁর পাতলা শরীর।

বিছানায় উঠে বসে তিনি পানির মগের দিকে হাত বাড়ান। বউকে খুশি করতেই বেশ অনেকটা পানি খান। খেতে খেতে বলে, ‘এই এহনই আবার পেচ্ছাব ধরবো নে। হেল্লিগাই পানি খাইতে ইচ্ছা করে না।’
আজকাল তার কিছুই মনে থাকে না। খেয়ে ভুলে যায়, বারবার প্রস্রাব পায়খানা করতে চৌকি থেকে ছেঁচড়াতে ছেঁচড়াতে নামেন। একটু আগেই একবার যে নেমেছিল সেটাও মনে থাকে না। বাথরুম পর্যন্ত যেতে পারে না বলে বেডপ্যানের ব্যবস্থা। অনেক সময় ছেলের বউকে ডাকে। অনেক সময় নিজেই নেমে পরেন। তখন বদনার পানিটুকু সবটাই খরচ করে ফেলেন। তারপর সেটা আবার না ভরানো পর্যন্ত শান্তি নাই তার।

বিঘায় বিঘায় জমি ছিল তার বাবার। সন্তান বলতে এই একটাই মেয়ে। মুখ দিয়ে কিছু চাইবার আগেই তা হাজির করতেন বাপ। তখন চাহিদার তো এতো রকমফের ছিল না। মাঝরাতে জেগে উঠে খেজুরগুড়ের পায়েশ, মেলার সময় চিকণ লালপেড়ে শাড়ি, পায়ে রুপার মল…!

মায়ের ঘরে ছিলই বা ক’দিন! দশ পেরুনোর আগেই বিয়ে হয়ে অন্য ঘরে। পাড়ার মধ্যেই বিয়ে। এক গা গয়না, বাক্স ভর্তি শাড়ি, অনেক হাড়ি পাতিল আর বিঘা বিঘা জমির মালিকানা নিয়ে একঘর থেকে অন্য ঘর। গোলা ভর্তি ধান, পুকুর ভরা মাছ, নাপিত বাড়ি এসে চুল কেটে দিয়ে যায় বাড়ির পুরুষদের। সেগুনকাঠের পালঙ্ক দিয়েছিল বিয়েতে যৌতুক। তাতে বিকালে সে পা ঝুলিয়ে বসত, পা ঘষে ধুয়ে তাতে শিউলি ফুলের বোটার রং জাল দিয়ে পায়ে নকশা আঁকতো। হাত ভর্তি সোনার চুরি আর আঁচলের চাবির শব্দ তুলে উনি উঠানে নেচে বেড়াতেন।

জীবন বদলে গিয়েছিল হঠাৎ করেই। প্রথমে গেল বাপ মা। তার কয়েক বছর পর স্বামী। জমি জিরাত কোথায় কতটুকু ছিল, কিছুই তার জানা ছিল না। বর্গা দেওয়া অনেক জমির হদিসই সে জানত না। ঘরের পাশের ধানীজমির ধান আর পুকুরের মাছ। আর ছেলের লেখাপড়া চালিয়ে নিতে মাঝে মাঝে সেই জমি থেকে কিছু কিছু বেঁচে দেওয়া। ছেলেটা আর পাঁচটা সাধারণ ছেলের মতোই বিএ পাশ করে ফেললো একটানে। তারপর সরকারি স্কুলে চাকরি পেয়ে গায়েই বসত গাড়লো।

উঠানের দু’পাশে নকশা কাটা টিনের চালের দুটো ঘর ছিল। সময়ের সাথে সাথে সেগুলো পুরনো নড়বড়ে হয়ে গেলো। দুটো ভেঙে তখন একটা ঘর তুলেছিল মা আর ছেলে। ইটের গাঁথুনি দিয়ে। সামনে লম্বা বারান্দা। তখন বারান্দাটা খোলাই ছিল। ছেলে বিয়ে করানোর আগে বারান্দার অর্ধেকটা ঘেরা দেওয়া হলো টিন দিয়ে। ছেলে মাকে ভিতরেই থাকতে দিয়েছিল। কিন্তু তারই মনে হয়েছিল, যেমন তেমন করে নিজের একটা জীবনতো গেলই। পরের মেয়েটাকে এনে, তার নতুন জীবনটা সুন্দর করে গুছিয়ে দিতেই ভালো লেগেছিল। ছেলেও সেগুন কাঠের পালঙ্কটা দিয়েই মায়ের শোয়ার জায়গাটা সুন্দর করে গুছিয়ে দিয়েছিল।

সেও আজ থেকে আঠারো বিশ বছর আগের কথা। তখনো সে গোসল সেরে নিয়মিত সিঁথি পাতে চুলে। সাদা থান ভাতের মার দিয়ে শক্ত আর টান টান করে পরে। থানের চিকন পার আধ মাথা ঢেকে দাঁড়িয়ে থাকে টানটান। বিকেলের ঢলে পরা রোদে উঠানে মাদুর পেতে বসে নকশী কাঁথা, বা উল বোনা চলে প্রতিবেশীদের সাথে নিয়ে। কখনো কখনো বউ এসে বসে। পান বানিয়ে দেয়। সাঁঝের আগে আগে শাশুড়িকে জিজ্ঞেস করে, ‘মা চা বানাইতে যাই, আপনের কি রং চা? আজকে ঘন দুধ আছে, দুধ চা দেই?’

আর আজ নিজেকে নাড়ানোর শক্তিটুকুও নাই।

চাহিদাও কিছু নাই, কেবল বারবার বাথরুম পাওয়াটা নিয়ে খুব লজ্জায় থাকেন তিনি। তার ওপর নিজে নিজে নামতে বা উঠতে পারেন না। মাঝে মাঝে নামতে নামতেই প্রস্রাব হয়ে যায়। ভীষণ লজ্জিত হন তখন। খুব মোলায়েম স্বরে বউ কে ডাকেন তখন, ‘ও সুখীর মা, সুখীর মা! তোমার তো কাম বাড়াইয়া দিলাম মা! মড়ার পেশাবটা পইরা গেল!’

সুখীর মা মেয়েটা ভালো। এজমালী সংসারের ভিড় ছেড়ে বিয়ের পর পেয়েছিল ঠাণ্ডা, ছিমছাম নির্ঝঞ্জাট ঘর। খাপ খাওয়াতে একদম সময় লাগেনি তার। শাশুড়ির সাথে ঘুরে ঘুরে উঠান নিকানো, ঘরের চালে লাউ, শিম, কুমড়া বা পুইশাক তুলে দেওয়া। উঠানের একপাশে গাঁদা, রক্তজবা, গোলাপ, হাস্নাহেনার ঝাড়ের সকাল সন্ধ্যা যত্ন। শাশুড়ির মতোই টিপটপ থাকা।

স্কুল থেকে সুখীর বাবা ফিরতেন বিকালে। মাঝে দুপুরে এসে খেয়ে চলে গেলে সুখীর মার একটা ভাত ঘুম। আজকাল বউটার মেজাজ ভালো থাকে না। শরীরটাও নাকি ভালো যাচ্ছে না। রক্ত গিয়ে শরীর ভেঙে যাচ্ছে। আগে নাতনিটা তার কাছে শুতো। এখন প্রায়ই রাতে তার প্রস্রাব হয়ে যায়। ওয়ালক্লথ গড়িয়ে কাঁথা ভেজে কখনো কখনো। সেই পালঙ্কটাও তো আর নাই। সংসারে সব কিছুরই ক্ষয় আছে। অতবড় পালঙ্কটাও উঁইপোকা খেয়ে নিল। তখন ছেলে তার জন্য খাটই কিনতে চেয়েছিল। সে-ই না করেছে। প্রস্রাব পায়খানায় সব নষ্ট! নিজের জগৎটা আজ শুধু এই মাঝারি সাইজের চকিতে সীমাবদ্ধ। চাহিদা শুধু বদনায় একটু পানি। সেইজন্য যে খুব মন খারাপ হয় তাও নয়। এখন কেবল বদনাটায়…।

বেডপ্যানটা চৌকির নীচে একটা খবরের কাগজের ওপর উল্টো করে রাখে সুখীর মা। পানিটা ঝরে গিয়ে কাগজে টেনে নেবে। উঠে দাঁড়ানোর সময় চৌকিতে ভর দেন নিজের অজান্তেই। চৌকি ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে নিজের শরীরের সামর্থ্য সম্পর্কে জানান দেয়। সুখীর মার মনটা ছোট হয়ে যায়। চোখের সামনে জীবনের প্রথম দিকের শাশুড়ির চেহারাটা, শরীরটা ভাসে! কতো শক্ত, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, ভালোবাসায় ভরপুর একজন মানুষ। যার নির্দেশে সংসারের সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো, যার নির্দেশের উপর নির্দ্বিধায় ভরসা করা যেত।

সে শাশুড়িকে কোলে করে বাথরুমে নেয়। হাল্কা কুসুম গরম পানি দিয়ে গোসল করায়। আজ সে উঠানে একটা মাদুর পেতে তাকে বসিয়ে দিয়ে গায়ে তেল মাখায় ডলে ডলে! চিৎকার করে মেয়েকে বলে, ‘সুখী, তুই ঝটপট গোসল করে দাদার কাছে আইসা বয়।’ সুখী না আসা পর্যন্ত সে শাশুড়ির মাথার অবশিষ্ট দু’চার গাছা চুলকেই আঁচড়ায়। দেখে উঁকুন আছে কিনা। তারপর আঙুল দিয়ে পেঁচিয়ে একটা ছোট্ট খোঁপা করে দেয়।

সুখীকে পাশে বসিয়ে দিয়ে তার চৌকিটা পানি ঢেলে ধুয়ে দেয়। ন্যাকড়া দিয়ে মুছে মুছে শুকায়। রোদে নেড়ে দেওয়া তোশকটা এনে পেতে নতুন একটা চাদর দিয়ে ঢাকে। বালিশের ওয়্যারটাও পাল্টায়। মগে পানি দেয়। বদনাটা ভরে। ঘরের ফ্লোরটা স্যাভলন পানি ঢেলে শলার ঝাড়ু দিয়ে কাঁচায়। নালা দিয়ে পানিটা বেরিয়ে যায়।

দুপুরে আজ অনেকদিন পর চারজন একসাথে খেতে বসে। সাধারণত আগে ওনাকে খাইয়ে দেয় সুখীর মা। তারপর নিজেরা খায়। আজ তাকে বারান্দার আরেক পাশে পাতা ডাইনিং টেবিলে বসায়। তার কষ্ট হয় বসতে। পৃথিবীটা আজকাল সবসময়ই দোলে। বিশেষ করে পা ঝুলিয়ে বসলে। তবু সে খুব খুশি হয়ে বসে আজ। চারজন গল্প করতে করতে খায়। সুখীর মা তাকে মাছটা বেছে দেয়। খুব খুশি মুখে খেতে খেতে বলে, ‘ও বউ, আজ কি ইলিশ মাছ নাকি?’

সুখী দেখে দাদীর মুখের পাশে একটা মাছের কাঁটা, সে বা’ হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে কাঁটাটা নেয়। নেওয়ার সময় তুলতুলে গালটায় ইচ্ছা করেই হাতটা বুলিয়ে দেয়। মনে মনে ভাবে বেঁচে থাকলে সেও কি একদিন এতোটাই পরনির্ভরশীল হবে? হতেই হবে, এটাই সত্য, সবার জন্য।