সময়

শারমিন আফরোজ বন্যা

শারমিন আফরোজ বন্যা: আজ সারাদিনে অরুণ ডেলিভারি করেছে পনেরটার মতো। এর বেশির ভাগই ঈদের পোশাক। কোনটায় শাড়ি, কোনটায় পাঞ্জাবি। কোন কোন পার্সেলে একাধিক জামা। স্টিচ বা আন-স্টিচ। দামি, কমদামি। নতুন এবং পুরনো!

কোন পার্সেলে কি আছে, তা তার জানার কথা নয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রোডাক্টটা ডেলিভারি করার পর ক্রেতা সেটা তার সামনেই খোলেন। তখন ভিন্ন ভিন্ন রিঅ্যাকশনগুলো তাকে আজকাল আর ততো প্রভাবিত করে না- বরং সে দেরি হতে থাকলে অস্থিরতায় ভোগে! যত তাড়াতাড়ি একটা ডেলিভারি শেষ হবে, ততো তাড়াতাড়ি আরেকটা দিতে যেতে পারবে সে!

আজ সারাদিনে পনেরটা ডেলিভারি করে তার মনটা ফুরফুরে হয়ে আছে। মাসের আজ ২৫ তারিখ। এখনো বাসার ভাড়ার টাকাটা দিতে পারেনি তারা। লকডাউনের কারণে মেজপার বেতন হয়নি এখনও। যে দোকানে সে সেলসের কাজ করে সেখানে সচরাচর ১৫ তারিখে বেতন হয়। এবার ১৪ তারিখ থেকে লকডাউন শুরু হলো। সাত দিনের ঘোষণা ছিল শুরুতে, তারপর সেটা হলো ২৮ তারিখ পর্যন্ত। আজ মার্কেট খুলেছে, হয়ত আজ মেজপার বেতন হতে পারে। না হলেও, তার আজকের টাকাটা মিলিয়ে, বাড়ি ভাড়ার টাকাটা হয়ে যাবে। ভাড়া বাকি পরলে, বাড়িতে ঢুকতে তার মাথা নিচু হয়ে যায়।

পৃথিবীটা একদম বদলে গেল, একদম। তবু অরুণ নিরাশ হয় না। সব পরিস্থিতির সাথেই থাকে নানা সম্ভাবনা। শুধু সেটাকে চিনতে পারা, ঠিক সময়ে সেই স্কোপটুকু কাজে লাগানো!

বাড়ি ফিরতে আজ তার বেশ একটু দেরি হয়। ফিরেই বাথরুমে ঢুকে যায়। বালতিতে গরম পানি দেয়া আছে। গুড়া পাউডারের ফেনা তুলে তাতে গায়ের সব কাপড়চোপড় ডুবিয়ে দিয়ে, নিজের সারা শরীরটাকেও ফেনা দিয়ে ভোরে তোলে। কিছুক্ষণ ফেনাটাকে শরীরে রাখার উদ্দেশ্যে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে শ্বাসের ব্যায়ামটা করে নেয় মিনিট দুয়েক। নাক দিয়ে খুব জোড়ে শ্বাস নিয়ে মুখ দিয়ে ছেড়ে দেয়া। তারপর গরম পানিতে বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে গা ধুয়ে সে যখন বেরিয়ে আসে, সারাদিনের ক্লান্তিটুকু পিছে পরে থাকে।

দুই রুমের ফ্লাটের একটা রুম তারা দুই ভাইবোন সাবলেট নিয়েছে তাদের এক আত্মীয়ের সাথে। দুই রুমের মাঝে টয়লেট আর রান্নাঘর। তাতে দুটো রুমের প্রাইভেসি বেড়ে গেছে অনেকটাই। তাদের রুমের সাথে ছোট্ট একটা বারান্দা। একপাশে তারা একটা টেবিল পেতেছে, দুটো চেয়ার। ধুসর আর কালো চেকের পর্দা দিয়ে বারান্দার অর্ধেকটা ঘিরে নিয়েছে। যেন একটা রেস্টুরেন্টের ছোট্ট কর্নার। অন্য পাশের দেয়ালে বড় একটা আয়না। তাতে বারান্দাটার আয়তন ঠিক ডাবলের মতো বোধ হয়। বারান্দার খোলা অংশটুকুর আনুমানিক তিন ফিট বাই পাঁচফিট গ্রিল জুঁড়ে তার ঝুলন্ত বাগান।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একটু পরিপাটি করে নেয় অরুণ। ততক্ষণে আপা টেবিলে খাবার দিয়েছেন। গরম ভাতের গন্ধে পেটের ভেতর ক্ষুধাটা জানান দেয়। অরুণ লক্ষ্য করে, আজকাল তরকারির গন্ধের জন্য মন অস্থির হয় না। একথালা ভাত, একটা কোন ভাজি-ভর্তা আর ডাল। শুধু একটু গরম হলেই ভীষণ তৃপ্তি নিয়ে খেয়ে নেয় দুই ভাইবোন।

এই রাতের খাওয়ার সময়টুকু তারা খুব সযতনে সবরকম না পাওয়ার গল্পগুলো এড়িয়ে যায়। বেতন হওয়া-না হওয়া, বাজার-হাট, করোনা-লকডাউন, পড়াশোনা-ভবিষ্যৎ সব, সবকিছু…! তখন ওরা কোন একটা নতুন স্বপ্ন, নতুন সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলে।

বেগুন ভর্তা দিয়ে ভাতটা মেখে নিতে নিতে রেহনুমা বলে, ‘তোর গাছের বেগুন!’

অরুণের মনে পরে, সবজির গাছগুলো সে কিনেছিল ‘গাছ বিনিময়’ করে এমন একটা গ্রুপ থেকে। এলোভেরা, থাই লিলি আর কুঞ্জলতার বিনিময়ে সে নিয়েছিল বেগুন আর কাঁচা মরিচের চারা। এই গ্রুপগুলো তার ভীষণ ভালো লাগে। আজও সে এরকমই একটা গ্রুপ থেকে একটা সেকেন্ড হ্যান্ড সালোয়ার কামিজ অর্ডার করেছে মেজপার জন্য। খুব সুন্দর সাদার মধ্যে সোনালি জরির কাজ। একদম নতুনের মতোই। এক, কি দুবার ব্যবহার হয়েছে হয়তো। যে বিক্রি করছে, সে মূলত করোনায় যারা হঠাৎ অর্থনৈতিকভাবে বিপাকে পরেছে, কিন্তু হাত পেতে নিতে পারেন না, তাদের জন্য নামমাত্র মূল্যে দিচ্ছে। মোটেই ব্যবহার হয় না এমন কাপড়গুলো দিচ্ছে।

অরুণ তার নিজের প্রজন্মের মানুষগুলোকে যত অবজার্ভ করে ততো বিস্মিত হয়। এরা উড়নচণ্ডী, এরা ভোগবাদী, এরাই ইনোভেটিব, এরাই মানবিকতার উদাহরণ।

এই যে তাদের ছোট্ট একটা সংসার… এর সবকিছু, সব পুরনো জিনিস, তারা দু’-ভাইবোন বিভিন্ন পেইজ থেকে কিনেছে, খু্বই কমদামে।

খাওয়া শেষে অরুণের একটা সিগারেট ধরাতে ইচ্ছা করে। কিন্তু মেজপার অনুমতি নাই। খেতে হলে, ছাইপাঁশ বাইরে থেকেই সেরে আস! বাড়িতে প্যাকেট ঢুকবে না। কি করে এইসব মূল্যবোধগুলো ওদের মধ্যে এখনও রয়ে গেছে, অরুণ প্রায়ই সেটা নিয়ে ভাবে। এই যে, আপার কথা মানতে হবে, এইটুকু আজকাল খুব রেয়ার। কেউ কাউকে মানতে রাজি নয় মোটেই, যেন মানলেই ছোট হয়ে যাওয়া, যেন আমার আমিত্বটুকু গেল!!

অথচ, এই যে সে মন চাইছে সিগারেট, অথচ আপার কথা ভেবে খাচ্ছে না, কই রাগ হচ্ছে না তার। বরং একটা মায়া! স্নেহটুকু চিনতে পারাটা খুব ইম্পর্টেন্ট, সে ভাবে।

দশ বাই দশ মাপের একটা রুমের মাঝ বরাবর দুপাশে দুটো দরজা। একটা ঢুকবার অন্যটা বারান্দায় যাবার পথ। দরজার দু’পাশে দুটো সিঙ্গেল খাট। তাতে ভারি সুন্দর দু’টো ঝকঝকে পরিস্কার ছাপার চাদর। মিল করে বালিশের কভার। চাদরের ফুলের রঙের সাথে মিলিয়ে কোলবালিশের কভার। খাটের পায়ের কাছে মাল্টি পারপাজ কেবিনেট। বোর্ডের। তার নিচের অংশে তিনটা ড্রয়ার, সেখানে কাপড় থাকে। মাঝে টেবিল টপ। তাতে একটা ল্যাম্প রাখা। পাশে সৌখিন কলমদানি, পড়ার বই খাতার সাথে একটা গল্পের বই। টেবিলের উপরের অংশে বুককেস। সেখানেও যতটাই পড়ালেখার বই খাতা ঠিক ততটাই গল্পের বইয়েরা দখল করে আছে।

তার মনে হয়, এই বই তাদের এমন অনেক কিছু শিখিয়েছে, যা সহজলভ্য নয়।

থালাবাটিগুলো ধুয়ে রেখে, যে বইটা পড়ছিল সেটা হাতে নিয়ে, নিজের বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে অরুণ। মেজপাও ততক্ষণে রাতের কাজগুলো সেরে বিছানায় উঠে বসে, তার জন্য অপেক্ষা করে। সারাদিনে কে কি করলো তাই নিয়ে গল্প হয়। আজও বেতন হয়নি আপার। তবে ঈদের আগে বেতন দিতে পারবে হয়তো। সারাদিন আজ ভালো বিক্রি হয়েছে।

অরুণ উঠে গিয়ে আপাকে আজকের টাকাটা দেয়। বিলসহ পুরো ফ্লাটের ভাড়া হয় হাজার দশেক। তাদের দিতে হয় চার হাজার। মাসে চার হাজার টাকা উপার্জন করা কদিন আগেও কোন ব্যাপার ছিল না। অরুণ ছাত্র ভালো। ঢাকা কলেজে ইকনমিক্স নিয়ে পড়ছে। তিন চারটা ছাত্র পড়ায়। কিন্তু এক বছর স্কুল বন্ধ। টিউশনিগুলা ছুটে গেছে। তাই সাময়িক ডেলিভারিম্যানের কাজে ঢুকে পরেছে। বসে থাকার উপায় নাই।

বয়সের তুলনায় অরুণ অনেক পরিপক্ক, বাস্তববাদী। সেই সাথে ইকনমিক্স পড়তে গিয়ে সে আরও অনেক বেশি সমাজটাকে বুঝতে শুরু করেছে। সে বোঝে, যে কোন ভাবেই হোক, টাকা এবং সময় এ দু’টোকে গতিশীল রাখাটাই মূল অর্থনীতি।

বাজারে টাকাটা ঘুরতে হবে। সেটা মৌলিক চাহিদা পূরণে হোক কিংবা বিলাসিতায়! সে তাই মনে মনে খুব চায়, যাদের হাতে টাকা আছে তারা প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে কেনাকাটা করুক। নতুন নতুন ইনভেস্টমেন্ট করুক। ঘুরে বেড়াক রিসোর্ট কিংবা রেস্টুরেন্ট! সব পরিস্থিতিতেই! তার সৌখিনতা পূরণে তৈরি হবে একটা বাজার। সেখানে নতুন নতুন ইমপ্লয়মেন্ট, আরও অনেক মানুষের বেঁচে থাকা! এই করোনাকালে সৌখিন বিত্তবানেরা অনলাইনে কেনাকাটা চালিয়ে যাচ্ছে বলেই আজ সে না খেয়ে নেই। সেই সাথে বেঁচে থাকছে মাঝের ব্যবসায়ীরা। তাদের কর্মচারীরা বেতন পাচ্ছেন। মার্কেট বা বাড়ির মালিকেরা ভাড়া পেয়ে, সেই টাকা খরচ করছেন বা সেভিংস। সেটাও আবার বাজারেই ফিরে আসছে। একই টাকা, কতো হাত হয়, শুধু যদি লেনদেন থাকে।

তাই ‘কেনাকাটা বন্ধ রাখো, খাওয়া দাওয়া কমাও, একবছর পরে না হয় ঈদ করো!’ এই সব উপদেশগুলো তার কাছে বিপজ্জনক মনে হয়।

হ্যাঁ, সময়টা সাবধানে থাকার। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতেই হবে। খেয়াল রাখতে হবে, ধার করে যেন অপ্রয়োজনীয় খরচ না করি। চিকিৎসার জন্য, বড় কোন বিপদের জন্য জমানো টাকা যেন কিছু থাকে। কিন্তু যার উপার্জন আছে, সেভিংস আছে, তাদের এখন খরচ করতে হবে। নিজের ভোগের জন্যই হোক কিংবা দানের উদ্দেশ্যে। তার হাতের টাকাটা বাজারে হাঁটুক। এক ঘর থেকে অন্য ঘর। পৃথিবীতে জীবন এবং জীবিকা দুটোই খুব নাজুক অবস্থায় আছে। তাই এখন যার সম্পদ আছে, সে যত বেশি সম্ভব খরচ করুক, সব রকম স্বাস্থ্যবিধি মেনে।

আর সময়! সময় অর্থেরই আরেকটা নাম। বসে থাকলে চলবে না। সম্ভব হলে ঘরেই থাকি, কিন্তু কাজ যেন বন্ধ না হয়। যত সামান্যই হোক, আয় করো। তোমার হাতে আসবে, তুমি খরচ করবে, আরেকটা হাতে যাবে। তুমি সেভিংস করবে, দেশের সচ্ছলতা বাড়বে। তুমি দান করবে, দরিদ্রের জীবন বাঁচবে।

আর তোমার আয় নাই, মানে বাজার অর্থনীতিতে তোমার ভূমিকা শুন্য!

সে মোবাইলটা হাতে নেয়। আগামীকাল কোথায় কোথায় ডেলিভারি আছে সেটা দেখে নেয়। সে জানে… বেঁচে থাকলে এটাই তার জীবন নয়, এটা কেবল দুঃসময়ের কাছে বিনা লড়াইতে হেরে না যাওয়ার চেষ্টা!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *